গণহত্যার দায় এড়াতে পারেন না সু চি

অং সান সু চি।

অং সান সু চি।

গত তিন বছর ধরে মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন নির্বাচনী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী অং সান সু চির রাজনৈতিক দল। সু চি ক্ষমতাসীন সরকারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা, বা অঘোষিত রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। কিন্তু রোহিঙ্গা নিধন ঠেকাতে বা এর প্রতিবাদে তিনি মুখ খোলেননি। বরং গণহত্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতেও কালক্ষেপণ ছাড়া কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি সু চি। রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়ও অস্বীকার করে আসছেন তিনি। এমনকি বিভিন্ন সময়ে মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্যও দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এমন অবস্থানের পর গণতন্ত্রের নামে আন্দোলনকারী, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী কোনো নেতা গণহত্যার দায় এড়াতে পারেন কি? 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ জাতিগত নির্মূলীকরণ জোরালো করে। তখন ১০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাড়ে সাত লাখেরও বেশি মানুষ। ওই ঘটনায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানাবাধিকার সংগঠনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জাতিগত নির্মূলীকরণ ও গণহত্যার আলামত উঠে আসে। 

রোহিঙ্গা নিধনের পর থেকে জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ওই ঘটনার তদন্ত করে আসছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে এখনো ছয় লাখ রোহিঙ্গা থেকে গেছে। তারা শোচনীয় পরিস্থিতিতে বসবাস করছে। ওই রোহিঙ্গাদের চলাফেরায় এমন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও অন্য সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে হত্যা, ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি ও অন্যান্য মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য যেসব অনুষঙ্গ কাজ করেছিল সেগুলো এখনো বহাল রয়েছে। রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের দায়ে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) প্রেরণ বা যুগোস্লাভিয়া ও রুয়ান্ডার মতো ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন। এ ছাড়া জাতিসংঘ তদন্তকারীদের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের সরকার ও কোম্পানিগুলোকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী ও জাতিসংঘ প্যানেলের সদস্য ক্রিস্টোফার সিডটি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মিয়ানমারে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গারা এখনো গণহত্যার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।’

২০১৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করা সু চি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। জাতিসংঘের তদন্তকারী দল জানায়, মিয়ানমারের পার্লামেন্টে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন দল ৬০ শতাংশ আসন নিয়ন্ত্রণ করলেও দেশটির সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই ক্ষমতাসীন সরকারের। তবে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে, শুধু মিয়ানমারের সংবিধান পরিবর্তন করা ছাড়া, দেশের যে কোনো আইন পরিবর্তনের ক্ষমতা সু চি সরকারের রয়েছে। এ সময়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

সেনাবাহিনী পরিচালিত রোহিঙ্গা নিধনের বিষয়ে সু চি কতটা জড়িত ও তার কেমন শাস্তি হতে পারে, তা এক কথায় বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা নিধনের ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের তত্ত্বাবধানে গঠিত বিশেষ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রধান মারজুকি দারুসম্যান। তিনি বলেছেন, ‘এমন হতে পারে যে, সু চি নিধনযজ্ঞের ব্যাপারে আগে থেকে জানতেন না। তবে জানার পরও তিনি তা স্বীকার করেননি। এজন্য তার কী শাস্তি হবে, এক কথায় সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব না।’ অন্যদিকে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সদস্য ক্রিস্টোফার সিদোতি বলেছেন, ‘মিয়ানমারে গত ১২ মাসেও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি। কোথাও কোথাও আরও অবনতি হয়েছে। যত দিন যাবে ততই বেসামরিক সরকারের পক্ষে দায় এড়ানো কঠিন হয়ে যাবে।’

এর আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ফোরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংঘি লি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সু চি অভিযুক্ত হতে পারেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর সব ধরনের আলামত এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে।’ 

এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান জেইদ রাদ আল-হুসাইন বিবিসি প্যানোরোমাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সেখানে (মিয়ানমারে) যে ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ফলে ভবিষ্যতে কোনো আদালত যদি রুল দেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের খবরগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে গণহত্যার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’ তিনি আরও বলেন, “মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ওপর সু চির ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু তিনি অন্তত সেনা নির্যাতন বন্ধে চেষ্টা করতে পারতেন। এমনকি সু চি ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিও ব্যবহার করেননি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিপরীতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া এমন আশঙ্কা জাগাচ্ছে যে, বর্তমান সংকট হয়ত আরও খারাপ কিছুর সূচনা।” 

সু চির মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাবও নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিবিসি রেডিও ফোরের ‘টুডে শো’ অনুষ্ঠানে সু চির সাক্ষাৎকার নেন মিশাল হুসাইন নামের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এক মুসলিম নারী সাংবাদিক। সাক্ষাৎকার চলাকালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন নিয়ে সু চিকে প্রশ্ন করেন মিশাল। এক পর্যায়ে ‘শান্তশিষ্ট’ বলে পরিচিত সু চি তার নিয়ন্ত্রণ হারান। তাকে বিড় বিড় করতে দেখা যায়, ‘একজন মুসলমান সাংবাদিক আমার সাক্ষাৎকার নেবেন বিষয়টি আগে আমাকে জানায়নি কেউ।’ ওই সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারের মুসলমানদের ওপর বৌদ্ধদের নির্যাতন এবং মুসলমানদের দেশ ত্যাগ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সু চি বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে অনেক বৌদ্ধও দেশ ছেড়ে চলে গেছে। সামরিক শাসনামলে মিয়ানমারের সব মানুষই দুঃখকষ্টে ছিল।’

২০১৭ সালের রোহিঙ্গা নিধনের পর তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার প্রেক্ষিতে বিবৃতি দেয় সু চির কার্যালয়। ওই বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সংকটকে ‘পুরোপুরি ভুয়া খবর এবং মিথ্যা প্রচারণা’ বলে দাবি করা হয়। সেখানে সু চি বলেছেন, ‘মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে রাখাইনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টিতে উসকানি দেওয়া হচ্ছে।’

ওই বিবৃতির বিপরীতে সু চির জীবনীকার জাস্টিন উইন্টেল বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি তার এই মন্তব্যে হতবাক। তার এই মন্তব্য তো তাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাতারে ফেলে দিচ্ছে। তিনি কার্যত দেশের নেতা হলেও আসলে তিনি এখন সেনাবাহিনীর পকেটে। বার্মার সেনাবাহিনী সম্পর্কে তিনি সবসময়ই কিছুটা অস্পষ্ট- কারণ দেশটির সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তার বাবা। সু চি হাড়ে মজ্জায় বার্মিজ। আমার বলতে খারাপ লাগছে- কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মিযানমারের পশ্চিমে রাখাইনে যা ঘটছে, তা চরম জাতিবিদ্বেষী। সেখানে রোহিঙ্গাদের প্রতি সমন্বিত বিদ্বেষ রয়েছে।’

এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিন্তু সু চির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি, তার বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়নি। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের দায়িত্বে থেকে, নিজেদের গণতন্ত্রের দাবিদার বলে উল্লেখ করা এ নেতার গণহত্যাকে আড়াল করার চেষ্টা নৈতিকভাবে ও আন্তর্জাতিক আইনে প্রশ্নবিদ্ধ। এর দায়ভার সু চি এড়াতে পারেন না। আর তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা না দেওয়াটা নিশ্চিতভাবেই বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার প্রতি অবমাননা। আর এ সময়ে সু চি ও তার দেশের সেনাবাহিনীকে আন্তর্জাতিক আদালতের মুখোমুখি করা এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের পথে অগ্রসর হওয়ার দায়টা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপরই বর্তায়।


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh