ফনেটিক ইউনিজয়
পরীর দেশের দুটি ছেলে
মহিউদ্দীন আহ্মেদ

নভরা যে এলাকায় থাকে তার নাম অরুণাপল্লী। এটি সাভারের একটি হাউজিং সোসাইটি। এর উত্তরে ডেইরি ফার্ম, দক্ষিণে মিলিটারি ফার্ম, পূর্বে জিনজিরা গ্রাম ও পশ্চিমে ছাগল, মুরগি, মৎস্য, ঘোড়া উন্নয়ন খামার। জায়গাটি বেশ উন্নত। নিরিবিলি, সে কথা বলাই বাহুল্য। রিকশার টুংটাং নেই। গাড়ির হর্ন নেই। এমনকি মানুষও নেই বললেই চলে। আছে হাতেগোনা বিশিষ্ট কয়েকটি পরিবার। পল্লীর রাস্তাগুলো ঝকঝকে, তকতকে। ঠিক সুইজারল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো। রাস্তার দুধারে সকালবেলা নানারকম ফুল পড়ে বিছিয়ে থাকে। দেখে মনে হয় যেন পরীর রাজ্য। ফুলপরী, লালপরী ও নীলপরীরা যেন সোনালি রোদের সাথে মিলেমিশে লুকিয়ে রয়েছে কোথাও!
নভদের বাসার চারদিকে রাস্তা। এ রাস্তা ধরেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রুটিনমাফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি বাসগুলো যাওয়া-আসা করে, পল্লীর মানুষদের নিতে ও দিয়ে যেতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ রঙের বাস যখন ক্যাম্পাসে যায় অথবা এখানে আসে, তখন নভ দৌড়ে জানালার কাছে যায়। অতি কষ্টে গ্রিল ধরে ছোট্ট পায়ে ভর করে উঁকি মারে। থুতনি উঁচিয়ে কোনোরকমে দেখতে থাকে বাসের বিস্ময়কর যাওয়া-আসা। তখন ওর পায়েসের মতো মিঠে কণ্ঠে আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। বাবাই! টা টা! বাবাই...। ওর বয়স তো দুই বছর তাই বেশি কথা বলতে পারে না। রাস্তা দিয়ে যখন কুকুররা হেঁটে যায়, তখন সে ভাঙা ভাঙা ভাষায় কুকুরকে ভাউভাউ বলে ডাকে। যখন গার্ডরা যায় তখন সে তাদের মামা মামা বলে ডাকে। বাস ও কুকুরেরা কথা বলতে না পারলেও মামারা ঠিকই ওর সাথে দূর থেকে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলে। নভর সারাদিন এভাবেই কেটে যায়।
জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ এভাবেই একদিন একটি কিশোর ছেলের আগমন ঘটে। ছেলেটি হই-হুল্লড় করে দৌড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ নভর চোখে তার চোখ পড়ে যাওয়ায় সে থেমে পড়ে। নভ বিস্মিত হয়ে ছেলেটিকে দেখতে থাকে। নভ বাসকে বাস বলে। কুকুরকে ভাউভাউ বলে। গার্ডকে মামা বলে। কিন্তু আব্দুল খালেককে কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। কিছু– বলতে না পেরে ওর বাবার দিকে তাকায়। নভর বাবা ছেলেটিকে ডাকে। ওর নাম জানতে চায়। বাবা জানতে পারে, ওর নাম আব্দুল খালেক। অরুণাপল্লীর একটি বাড়িতে ওর মা গার্ডের চাকরি করে। ওরা থাকেও এ পল্লীতেই। পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই নভর সাথে আব্দুল খালেকের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। নভ ওকে আব্দুল খালেক বলতে পারে না। সংক্ষেপে বলে আদ্দু!
জানালায় দাঁড়িয়ে আদ্দুকে দেখতে পেলে ওর চোখে-মুখে আনন্দের ছটা ফুটে ওঠে তাতে বুঝতে ভুল হয় না, ছোট্ট নভ আব্দুল খালেককে নিজেরই প্রতিচ্ছবি বলে মনে করে। আব্দুল খালেক পাখির মতো স্বাধীন। ফুলের মতো সজীব। সারা দিন যখন তখন দৌড়ে বেড়ায় গাছের ছায়ায়, আনাচে-কানাচে। নভ অনেক ছোট তাই এখনও এ কাজগুলো করতে পারে না। কিন্তু ওর ইচ্ছা করে। আদ্দু ওর ইচ্ছেগুলোকে পূরণ করে। আব্দুল খালেক ক্লাস ওয়ানে পড়ে। লিকলিকে শরীর, মিশমিশে কালো। গরমের দিনে গায়ে জামা পরে না। জুতো পরে কালেভদ্রে। সারা দিন টইটই ঘুরে বেড়ায়। ওর গতিবিধি জানার জন্য ওকে দেখার প্রয়োজন নেই। ওর তীব্র তীক্ষè কণ্ঠস্বর শুনলেই যথেষ্ট। সে হয়তো তার কোনো বন্ধু কিংবা ভাই-বোন বা পরিচিত কাউকে ডেকে বেড়ায় অথবা নিজের মনেই গান করে। তাতেই নভ দৌড়ে চলে যায় জানালার কাছে। জলের ওপর রোদ পড়লে যেমন ঝিকমিক করে তেমনি আদ্দুর কণ্ঠ শোনামাত্র নভ চোখ চিকচিক করে ওঠে। নভর মাবাবাও আদ্দুকে ভালোবাসে। সামনে ঈদ। তাই তারা নভর সাথে আদ্দুকেও মার্কেটে নিয়ে যান। নতুন জামাকাপড় কিনে দেন। ঈদের দিন পরীর দেশের এ দুটি ছেলে নতুন জামা পরবে। দুজনে দারুণ খুশি!

Disconnect