ফনেটিক ইউনিজয়
শিশুরা জান্নাতের ফুল
কবির কাঞ্চন

আর মাত্র কয়েকদিন পর ঈদুল ফিতর। সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন সিদ্দিক সাহেব। কিছু পথ চলে আসার পর হঠাৎ মনে পড়ল, রেণুটার জন্য ভালো থেকে কিছু খেলনা নেয়া উচিত। বাজারে আসার সময় ও খেলনার জন্য যেভাবে কেঁদেছে তাতে ওর জন্য খেলনা না নিয়ে বাড়ি ফেরা বড় অন্যায় হবে। এই ভেবে আবার ঈদের বাজারে চলে এলেন তিনি। মেয়ের জন্য বেশ সুন্দর পুতুলসহ কিছু আকর্ষণীয় খেলনা কিনলেন। রেণু পাশের বাসার মেয়েটার খেলনা দেখে রোজ বায়না ধরে, ওকেও ওরকম খেলনা কিনে দিতে হবে। আজ না কাল করতে করতে আর কেনা হয়নি তার। খেলনাগুলোকে যত্নে ব্যাগের মধ্যে নিয়ে আবার বাসার উদ্দেশে রওনা হন। বাসায় ফিরতেই রেণু বাবার পায়ের আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে চলে আসে বাবার কাছে। রেণুটা এমনই ওর বাবা বাড়ি ফিরলে সবার আগে ও বুঝতে পারে। মনে হয় কেউ একজন বাবার আসার খবর ওর কাছে আগে আগে পৌঁছে দেয়। বাপ-বেটির এমন আনন্দ দেখে মা দূর থেকে হাসেন। এরপর বেডরুমে এসে বাবা ওকে এক এক করে সব খেলনা বের করে দেখালেন। এমন সুন্দর সুন্দর খেলনা পেয়ে রেণু আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। খুশিতে বাবার গালে পরপর বেশ কয়েকটি চুমো খায়। মা আবার হাসেন। রেণু হঠাৎ মায়ের দিকে তাকিয়ে লজ্জা পায়। মা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে চুপিসারে কাছে এসে মায়ের গালেও চুমো খায় রেণু। ওর এমন কাণ্ডে মা বাবার দিকে তাকালে দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলেন। বাবা-মাকে এভাবে হাসতে দেখলে যেকোনো সন্তানের মনে আনন্দের ঢেউ জাগে। এরপর রেণু সব খেলনা নিয়ে এক পলকে চলে যায় পাশের বাসার মুনিয়ার কাছে।
মুনিয়া ওর খেলার সাথী। জন্মের পর থেকে শহরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি জীবনে থেকেও সে মুনিয়াকে কাছে পেয়ে হাসতে শিখেছে। মুনিয়াও তার সব খেলনা নিয়ে রেণুর সাথে খেলতে আসে। দুজনে মজার খেলায় মেতে উঠেছে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর রেণু আর মুনিয়া খেলার সময় খেলনা নিয়ে টানাটানিতে মুনিয়ার একটি খেলনা ছিঁড়ে যায়। সে ফ্যালফ্যাল করে কেঁদে উঠে। রেণু তখন কিছু না বুঝে উঠতে পেরে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। এদিকে মুনিয়ার মা রেগে এসে বলল, ‘আবার কী সমস্যা তৈরি করেছ? সারাক্ষণ খেলতে চাও। দুজনে একটু থেকে একটু হলেই ঝগড়া কর। এখন থেকে আর এক সাথে খেলার কোনো দরকার নেই, বুঝলে?’ রেণু বড়দের মতো বলল, ‘আন্টি, আমি ওর খেলনা ছিঁড়িনি। ও নিজে টান দেয়ায় ছিঁড়ে গেছে।’
পরদিন রেণু যখন টিভির রুমের দিকে যেতে লাগল, তখনই সে দেখল কতকগুলো খেলনা হাতে  মুনিয়া ওদের ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। অমনি খুশি হয়ে ওকে বাসায় নিয়ে এসে ড্রয়িং রুমে দুজনে পা মেলে খেলতে বসে গেল। আবার মজার খেলায় ওরা ব্যস্ত হয়ে গেল। খেলতে খেলতে একসময় ওরা ড্রয়িং রুমেই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। ওদিকে মুনিয়ার মা ওকে কোথাও না পেয়ে শেষে রেণুদের বাসার দিকে এসে নাম ধরে ডাকতে লাগলেন, ‘মুনিয়া, মুনিয়া...।’
মুনিয়ার মায়ের ডাক শুনে রেণুর মা-বাবা দুজনেই বেরিয়ে আসেন ড্রয়িং রুমের দিকে। এসেই ওদের দেখতে পান। তারপর রেণুর মা মুনিয়ার মাকে ডেকে বললেন, ‘দেখুন ভাবি, কিছুক্ষণ আগে এরা ঝগড়া করেছে। আর কখনও একে অন্যের সাথে খেলবে না বলে প্রতিজ্ঞাও করেছে। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সব ভুলে গিয়ে আবার এক হয়ে গেছে। এটাই শিশুর মন। এ কারণে ওরা নিষ্পাপ। দেখুন না ভাবি, কীভাবে একজন অন্যজনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে।
মুনিয়ার মা মৃদু হেসে বললেন, ‘আসলে শিশুরা ফুলের মতো। ওরা নিজস্ব সৌরভে অনন্য। ওদের মনের মধ্যে কোন হিংসা-হানাহানি থাকে না। লোভ-মোহ থাকে না। আর কাউকে ঠকানোর চিন্তা ওদের কচি মস্তিষ্কে স্থান পায় না। ওদের সাথে তো সত্যের ফেরেশতারা থাকে।’ রেণুর বাবাও এগিয়ে এসে বলেন, ‘হ্যাঁ ভাবি, আপনার কথাগুলো একদম সত্য। আমরা যারা প্রাপ্তবয়স্ক তারা যদি সমাজে নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতাম, তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও সেই আদর্শে বেড়ে উঠত। শিশুদের মতো আমরা বিস্তৃত মনের বাসিন্দা হতে পারি না বলেই আমাদের মাঝে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই থাকে। যেকোনো তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে বিরোধের জের ধরে আমাদের পারস্পরিক দূরত্বের পরিধি বাড়ে। মীমাংসা বা সমঝোতার চিন্তা মাথায় না এলে প্রতিপক্ষকে চিরতরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতেও আমাদের বুক কাঁপে না। অথচ দেখুন, এর ঠিক উল্টো চিত্র শিশুদের ক্ষেত্রে। ওরা পৃথিবীকে দেখে হাসি-আনন্দ আর ভালোবাসার চোখে। এজন্যই ওরা জান্নাতের ফুল। ওদের দেখে আমরা আনন্দ পাই। শিশুরা আছে বলেই আমাদের পৃথিবী এত সুন্দর!

Disconnect