ফনেটিক ইউনিজয়
অপরাহ্ন
কাজী মেহজাবিন

-একটা স্যান্ডউইচ আর একটা কফি
-ওকে ম্যাম
-দেরী হবে?
-না ম্যাম ৫/৭ মিনিটেই হয়ে যাবে
-আরে অরু না?
অরুনিমা পিছে ফিরে মোটামোটি বড়সড় ধাক্কা খেল। জানালার কাছের একটা সিটে সায়হ্ন বসে আছে। সে সহজ থাকার অভিনয় করল। অভিনয় বোধহয় ভালই হল।
-আরে তুমি? এখানে? এই সময়? তোমার অফিস নেই?
-ম্যাডাম আমি কি আপনার মত ইঞ্জিনিয়ার? আমি ছোটখাট টেম্পুরারি চাকরি করি তা তো জানেনই।
-যতদূর জানি ব্যবসায় নেমেছিলে
-অরু! তুমি এমন আগন্তুকের মত কথা বলছ কেন? আমার চাকরি ব্যবসা সব কিছুর হালহকিকতই তো তুমি জানো।
-এখনও যে জানি তা তো নয়, তোমার সাথে দেখা হল প্রায় দেড় বছর পর
-তুমি কি ভেবেছিলে? এই তিন বছরে আমি ডিম ব্যবসায়ী থেকে বিজনেস ম্যাগ্নেট হয়ে যাব? এক্সিও গাড়ি হাঁকিয়ে শহরে ঘুরে বেড়াবো?
ওয়েটার অরুর স্যান্ডউইচ নিয়ে এল
-তুমি কিছু অর্ডার করনি?
-না। কি অর্ডার করব, করব কি করব না এসব বসে বসে ভাবছিলাম। ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ তুমি উদয় হলে। হাহাহা...
- দুপুরে লাঞ্চ করেছ?
-উহু। এক ফোর্টুয়েন্টি ৩ হাজার টাকা লোন নিয়েছিল। এখনও দিচ্ছে না। ওই ব্যাটাকেই তাগাদা দিতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
-এখন ৫ টা বাজে। তুমি কিছুই খাওনি সারাদিনে?
-হাহাহাহাহাহহাহা....ম্যাডাম অরু! যতই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সেজে গাড়ি দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াও না কেন, তুমি এখনও সেই শরৎচন্দ্রের নায়িকা রয়ে গেলে
-দয়া করে বাজে কথা বলা বন্ধ কর। তোমার এসব মুখ ভরা বুলি শুনে শুনে আমি ক্লান্ত
অরু হাত ইশারায় ওয়েটারকে ডাকল
-জ্বি ম্যাডাম!
-একটা পিৎজা, ৮ ইঞ্চি। সাথে একটা কোক
-ম্যাম আর কিছু? কোন ডেজার্ট?
-খাওয়া শেষে একটা আইসক্রিম দিতে পারেন।
-ফ্লেভার?
-স্ট্রবেরি
-ওকে ম্যাম
ওয়েটার চলে যায়
-ইয়ে অরু! তোমার বিব্রত বোধ করার কিছু নেই।
-মানে?
-মানে এই যে আমি জেনে গেলাম.......তুমি এখনও সবকিছু মনে রেখেছ, আমার প্রিয় প্রিয় সব খাদ্য সমূহ। হাহাহাহা।
-সায়হ্ন! তোমার প্রতি আমার বিব্রতবোধ বা অন্য যেকোন বোধই এখন বিলাসিতা। আমি দরিদ্র মানুষ। বিলাসিতা করার জো কোথায় বল! তোমাকে আমার নতুন করে আর কিছুই জানানোর নেই। তোমার কাছ থেকে নতুন কিছু জানবারও নেই।
-রেগে যাচ্ছ কেন অরু? তুমি জানো না? রেগে গেলে তুমি বড় আনস্মার্ট হয়ে যাও। যদিও একথা মানতেই হবে তুমি আগেরচে’ অন্তত অনেকখানি স্মার্ট হতে পেরেছ
-তাই নাকি?
-হুম। যেভাবে তুমি আমাকে দেখে আমার সাথে কথা বলতে এগিয়ে এলে, আমি নিজেই ভুলে গিয়েছিলাম যে দেড় বছর আগে আমাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল এবং এর মধ্যে আমাদের আর দেখা হয় নি।
কিছুক্ষণ নিরব থাকলো অরুনিমা, তারপর জানতে চাইলো
-তা, কখন মনে পড়ল?
-পড়ল একসময়। বাদ দাও। তুমি কি করছ বল? আগের অফিসেই আছ?
- না। অন্য একটাতে জয়েন করেছি
-বিয়ে করেছ? অর এনি রিলেশনশিপ ? ভাইকে সঙ্গে আনলে না কেন? ও আচ্ছা তুমি তো বোধহয় অফিস থেকে বাড়ি ফিরছ। তোমার ঠিকানাটা দিয়ে যেও তো। একদিন তোমার বাসায় গিয়ে ভাইয়ের সাথে আলাপ করে আসব
-স্মার্টনেস কিন্তু তুমিও কম দেখাচ্ছ না সায়হ্ন।
-হাহাহাহা। আমি তো বরাবরই স্মার্ট অরুনিমা। তোমার ভাষার গাল ভরা বুলি। কোনও কাজের জিনিস না।
-তবুও তো বদলালে না।
-বদলালে কি এমন লাভ হত বলতো! তোমার আমার বিয়েটা টিকে যেত। এই তো? তারপর? আমাদের ছেলেপুলে হত। তুমি তোমার ছেলেকে কোলে করে নিউমার্কেটের দোকানে দোকানে বিরক্ত মুখে ঘুরে বেড়াতে। আমি অফিস শেষে ঘরে ফিরে আরো বেশি বিরক্তি চোখে মুখে নিয়ে সেসব বদ ছেলে বা মেয়েকে পড়াতে বসাতাম। তারচেয়ে এই ভালো না? হঠাৎ করেই আজ দেখা হয়ে গেল, দেড় বছর পর। বাড়ি ফিরে আমরা দুজনই আজ কিছুটা দ্রবীভুত থাকব? তুমি তোমার স্বভাব মত কোন কবিতা লিখে ফেলবে আর আমি গিটারে অর্নবের “তোমার জন্য” গানটা বহুদিন পর আবার তুলব!
-বাদ থাকুক এসব কথা।
-আমার খাওয়া তো মোটামুটি শেষ। তুমি কি উঠবে? নাকি আরো কিছক্ষন বসবে? কিছু অর্ডার করবে?
-আমি এখন উঠব। আমার কিছু অর্ডার করার নেই। তোমার কিছু লাগলে বল। নয়তো ওয়েটারকে বল বিল দিয়ে যেতে
-বিল কি আজও আপনি দেবেন নাকি ম্যাডাম?
-কেন? তুমি দিতে চাও?
-হাহাহাহা। না। চাই না। প্রেম থেকে শুরু করে আমাদের বিয়ের শেষদিনগুলো পর্যন্ত যতবারই বাইরে খেতে এসেছি তুমি বিল দিয়েছ। আমাকে দিতে দাওনি। এটাই তোমার অলিখিত নিয়ম ছিল। আমাদের প্রেম বা বিয়ে কোনটাই না থাকুক। এটলিস্ট নিয়মটা থাক।
-এত কথা না বললেও বিলটা আমি দিতাম।
-হাহাহাহা। তুমি আবার রেগে যাচ্ছ অরু। রেগে গিয়ে আমাকে অপমান করার চেষ্টা করছ। তুমি জানো না? আমি তোমার কোনও কথায় অপমানিত হই না?
-আমিও শেষ কবে তোমার কথায় অপমানিত বোধ করেছিলাম ভুলে গেছি। ওই যে বললাম! তোমার ক্ষেত্রে এসব বোধ টোধ বিলাসিতা! চল ওঠা যাক।
-ইয়ে অরু! তুমি কি আমাকে ফার্মগেট নামিয়ে দিতে পারবে?
-তুমি কোথায় যাবে?
-বাসায়
-আমরা এখন ধানমন্ডি। তোমার বাসা হল মোহাম্মদপুর। ধানমন্ডি থেকে গাড়িতে করে ফার্মগেট গিয়ে লেগুনা করে মোহাম্মদপুর যেতে তোমার খুব সুবিধা হবে বুঝি!
-আরে আরু! তুমি দেখি রাস্তাঘাট চিনে গেছ!!! দ্যাটস হাইলি ইম্প্রেসিভ। আমি অবশ্য সত্যি সত্যি ফার্মগেট যেতে চাইনি। তোমার সাথে পরিচয়ের শুরুর দিকে তুমি রোজই বলতে “সায়হ্ন! চল তোমাকে ফার্মগেট নামিয়ে দিচ্ছি”। সেটা মনে পড়ল বলেই বলেছিলাম।
-স্মৃতিচারণ তোমার প্রিয় বিষয় নয় বলেই আমি জানতাম!
-আজকাল হয়ে উঠেছে। আচ্ছা অরু, অনেকদিন পর দেখা হল তোমার সাথে। আমি যাই এখন?
-হাহাহাহা! অনুমতি চাইছ? থেকে যেতে বললে থেকে যাবে?
-নাহ। তবে তা নিয়ে তোমার এখন আর কোন দুঃখও নেই সেটা জানি। ভালো থেকো অরু। ভাগ্যে থাকলে আবার দেখা হবে।
-আমাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যাও
-বিনিময়ে?
-বিনিময়ে না হয় আমি তোমায় রিকশা খুঁজে দেব
-থাক! আমি মজা করছিলাম। চল তোমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি।
-আমিও মজাই করেছি। তুমি বরং এখন এসো। আমিও যাই। সন্ধ্যা হয়ে এল।
-হ্যা সন্ধ্যা হয়ে এল।
সায়হ্ন অরুনিমার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেল। অরু তার গাড়িতে উঠে বসল। ড্রাইভার বলল “এসি দিমু আপা?” সে বলল, “না। জানালা খোলা থাক”। মাগরিবের আযান দিচ্ছে। গাড়িতে খুব হালকা করে জন ডেনভার চলছে। অরু গান থামাতে বলল না। সে গাড়ির খোলা জানালায় চোখ রেখে সন্ধ্যার আয়োজনপূর্ণ নেমে আসা দেখছে। সে কি কিছু খুঁজছে? কাকে খুঁজছে? সায়হ্নকে? নাকি সায়হ্নের সাথে হারিয়ে যাওয়া কিছু অপরাহ্নকে..

Disconnect