ফনেটিক ইউনিজয়
শুভ জন্মদিন কবিতার রাজপুত্র আল মাহমুদ
শিল্প-সংস্কৃতি ডেস্ক

১৯৫৪ সালের এক শীতের সকাল। ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ ১৮ বছরের এক যুবক। তাকালেই বোঝা যায় নিতান্তই মফস্বলের এক যুবক কোন দুর্বিপাকে এখানে এসে উঠেছে। তার মুখের রেখায় ফুটে উঠেছে শ্রান্তির চিহ্ন কিন্তু চোখ জোড়া সাক্ষ্য দিচ্ছে বিজয় বার্তা।
ঢাকায় এসে আল মাহমুদ পরিচিত হন রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের সাথে। জীবিকার প্রয়োজনে দাদাভাই তাকে ১৯৫৪ সালে দৈনিক মিল্লাতের প্রুফ রিডারের চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন। পরবর্তীতে তিনি সাপ্তাহিক কাফেলা ও দৈনিক ইত্তেফাকে চাকুরি করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে কবি আল মাহমুদ রণাঙ্গণের প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দেশে ফেরার পর ১৯৭২ সালে দৈনিক গণকন্ঠ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব হাতে তুলে নেন। ১৯৭৩ সালে তিনি কারাবরণ করেন। জেলে থাকাবস্থায় গণকন্ঠ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৭৫ এ তিনি মুক্তি পান। তার কবি খ্যাতি ততদিনে পৌঁছে গিয়েছিলো রাষ্ট্রপতির বাসভবন পর্যন্ত। কারামুক্তির পর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তাকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর চাকরি দেওয়া হয় এবং ১৯৯৩ সালে তিনি পরিচালক পদ থেকে অবসর নেন। আল মাহমুদ জন্মেছিলেন ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামের মাতুলালয়-মোল্লা বাড়িতে। পিতা আব্দুর রব মীর। মা রৌশন আরা বেগম ছিলেন গৃহিনী। একদিকে ধর্মীয় চেতনার কারণে ইংরেজি ভাষার প্রতি বিদ্বেষ অন্যদিকে পারিবারিক ঐতিহ্যের আলোকে কবিতার প্রতি অসাধারণ অনুরাগ- এমনি এক দ্বন্ধমুখর পরিবেশে আল মাহমুদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। ছোটবেলাতেই আস্তে আস্তে উপলব্ধি করেন বাল্যশিক্ষার জঞ্জালের বাইরেও বইয়ের একটি বিশাল জগৎ আছে।
আল মাহমুদের বাড়িটি ছিল স্টেশনের পাশেই। রাতের স্টেশনের চাঞ্চল্য, বিচিত্র সব মানুষের আনাগোনা তার মনে এক ধরনের রোমাঞ্চের সঞ্চার করত। একদিন এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন দু’জন মহিলা। গন্তব্য স্টেশন থেকে অনেক দূরে- কিভাবে যাবে। এ সময় আল মাহমুদ কিছু না বুঝেই তাদেরকে তার বাড়িতে নিয়ে যান। এই সহোদরা দুই মহিলা প্রকৃতপক্ষে ছিলেন তখনকার নিষিদ্ধ ঘোষিত কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য। কবির বই পড়ার আগ্রহ দেখে শুভা নামের মেয়েটি আল মাহমুদকে লালমোহন পাঠাগারের খোঁজ দেন। লালমোহন পাঠাগারটি ছিলো মূলত তখনকার নিষিদ্ধ ঘোষিত কম্যুনিস্ট পার্টির একটি পাঠকেন্দ্র। শহরের প্রগতিশীল চিন্তাধারার লোকেরা এই পাঠাগারে এসে ভাব বিনিময় করত। এই পাঠাগারেই আল মাহমুদ কিশোর বয়সেই পড়েন ছোটদের রাজনীতি, ছোটদের অর্থনীতি, ইতিহাসের ধারা ও ডারউইনের বিবর্তনবাদ বিষয়ক বইগুলো।
রবীন্দ্র পরবর্তী তিরিশোত্তর বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। কবি আল মাহমুদের কবি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে একটি চিঠি। কলকাতার রাসবিহারী এভিন্যুর কবিতা ভবনের স্মৃতিচিহ্ন আঁকা সাদা পোস্টকার্ডটির প্রেরক ছিলেন কবিতা পত্রিকার সম্পাদক কবি বুদ্ধদেব বসু। কবিতা পত্রিকার জন্য আল মাহমুদ তিনটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন, তারই প্রাপ্তি সংবাদ জানিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু এভাবে- “প্রীতিভাজনেষু, তোমার কবিতা পেয়েছি, একটি বা দু’টি কবিতা ছাপা যাবে বলে মনে হচ্ছে” এই একটি মাত্র বাক্য। কিন্তু ১৯৫৫ সালে বাংলাভাষার একজন নবীন কবির জন্য এটি ছিলো অসাধারণ প্রেরণা ও স্বীকৃতির বিষয়, যেন এক দৈববাণী। পরবর্তীতে চৈত্র সংখ্যায় আল মাহমুদের তিনটি কবিতাই ছাপা হয়েছিলো। একই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিলো শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, ওমর আলী, শহীদ কাদরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ পঞ্চাশের শক্তিমান কবিদের কবিতা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি আল মাহমুদকে। আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি তিরিশ দশকীয় প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ দৃশ্যপট, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের কর্মমুখর জীবন চাঞ্চল্য ও নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহের বিষয়কে অবলম্বন করেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যেই অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের সুন্দর প্রয়োগে আল মাহমুদ কাব্যরসিকদের মধ্যে নতুন পুলক সৃষ্টি করেন। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর এবং ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় কাব্য কালের কলস। এ দু’টি কাব্যের ভেতর দিয়ে আল মাহমুদ নিজেকে প্রকাশ করেন সম্পূর্ণ মৌলিক ও নিজস্ব ঘরানার কবি হিসেবে। তার তৃতীয় কাব্য সোনালী কাবিন প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। সমগ্র বাংলা কবিতার ইতিহাসে সোনালী কাবিন একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সোনালী কাবিন কাব্যে আল মাহমুদ লোকজ ও আঞ্চলিক শব্দের সমন্বয়ে উদ্ভাবন করেন এক ধরনের শব্দ জাদুময়তার।
আমার ঘরের পাশে ফেটেছে কি কার্পাশের ফল।
গলায় গৃঞ্জার মালা পরো বালা, প্রাণের শবরী,
কোথায় রেখেছো বলো মহুয়ার মাটির বোতল
নিয়ে এসো চন্দ্রালোকে তৃপ্ত হয়ে আচমন করি।
ব্যাধের আদিম সাজে কে বলে যে তোমাকে চিনবো না
নিষাদ কি কোনদিন পক্ষিণীর গোত্র ভুল করে
(সোনালী কাবিন)।
এই শব্দ জাদুময়তার ভেতর দিয়ে আল মাহমুদ তার পাঠকদেরকে চমকিত করে যাচ্ছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। সোনালী কাবিন আল মাহমুদকে এনে দিয়েছে তুমুল কবি খ্যাতি। এরপর আল মাহমুদের কবিতা একটি ভিন্ন বাঁক নেয় মায়াবি পর্দা দুলে ওঠো’র ভেতর দিয়ে। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা বিশের অধিক।
কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যে আল মাহমুদের আবির্ভাব এ দেশের গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৫৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। তারপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পর দৈনিক ‘গণকন্ঠ’ সম্পাদনার সময় তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেছিলেন। এ সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার পানকৌড়ির রক্ত, কালোনৌকা, জলবেশ্যা প্রভৃতি গল্পগুলো প্রকাশ পায়। ১৯৭৫-এ তার প্রথম ছোটগল্পের বই পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয় এবং বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পায়। পানকৌড়ির রক্ত’র পর তিনি সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, মযূরীর মুখ সহ প্রায় দশটি গল্পগ্রন্থ লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা তার উপন্যাস কাবিলের বোন ও উপমহাদেশ উপন্যাস দু’টি বাংলা উপন্যাস সাহিত্যকে শুধু ঋদ্ধই করেনি সংযোজনও করেছে ভিন্নমাত্রা। এছাড়া আল মাহমুদ তার উপন্যাসের ভেতর দিয়ে ফ্রয়েডিয় যৌন চেতনাকে দিয়েছেন শিল্পরূপ। আল মাহমুদের উপন্যাসের সংখ্যাও বিশের অধিক। কবি নিজের কবিতার জগতে ঘুরেছেন যেমন, তেমনি ঘুরেছেন বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশও। কবিতার জন্য পেয়েছেন- বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক সহ প্রভৃতি পুরস্কার।
১৯৫৪ সালের শীতের সকালে যে যুবকটি রাবারের স্যান্ডেল পায়ে টিনের সুটকেস নিয়ে পদার্পণ করেছিলেন ঢাকায় কেবল কবিতাকে অবলম্বন করে, সে আজ বার্ধক্যে নুয়ে পড়া এক জ্ঞানবৃদ্ধ। জীবনের কত কিছুকে তিনি পেছনে ফেলে এসেছেন, কিন্তু কবিতাকে তিনি যেমন ফেলে দেননি তেমনি কবিতাও তাকে ফেলে দেয়নি। আল মাহমুদ আর কবিতা একই সংসারে বাস করছেন আজ পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে। এ সপ্তাহে কবির ৮২তম জন্মদিন পালিত হলো। বাংলা কবিতার ভিন্ন ভাষার সম্ভ্রান্ত এই কবিকে জন্মদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা।

Disconnect