ফনেটিক ইউনিজয়
রাজ্য আছে, রাজা নেই
ফ্লোরা সরকার

বাংলাদেশের বিশিষ্ট অভিনেতা জনাব ওবায়দুল হক সরকার তাঁর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের ইতিহাস বইটার উৎসর্গপত্রে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক নুরুল মোমেন, কাজী খালেক, ফাতেহ লোহানী, আব্দুল জাব্বার খানসহ নাট্যজগতের আরও অনেক প্রতিভাবানদের নাম উল্লেখ করার পর লিখেছেন, ‘সেদিন নাটক ছিল নিন্দিত, আজ নন্দিত; এখন নাটক করলে সম্মান ও সম্মানী উভয়ই লাভ হয়। তখন জুটত সম্মার্জনী। গাছ কাটতে কাটতে তাঁরা শেষ হয়ে গেছেন, এই পথ দিয়ে চলার সৌভাগ্য তাঁদের হয়নি। আজ যাঁরা এই পথ দিয়ে সগৌরবে ধেয়ে চলেছেন, তাঁরা যেন তাঁদের পূর্বসূরিদের সংগ্রামের কথা ভুলে না যান, এই আশায় রইলাম।’ ঠিক এই কথাগুলো সদ্য প্রয়াত বাংলাদেশের সিনেমা জগতের কিংবদন্তি নায়ক, নায়ক রাজ রাজ্জাকের (২৩ জানুয়ারি ১৯৪২-২১ আগস্ট, ২০১৭) জীবনের সঙ্গে যেন হুবহু মিলে যায়। নায়ক রাজ্জাক শুধু এই দেশের একজন বড় মাপের নায়কই ছিলেন না, দীর্ঘ একটা যুগের প্রতিনিধিত্বকারী নায়কও ছিলেন। ‘রাজ্জাক’ মানে বাংলা সিনেমার আদি যুগ হয়ে বর্তমান অর্থাৎ ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ এক সময়কালের প্রতীক। রাজ্জাক মানে বাংলা ভাষায় বাংলা চলচ্চিত্র আত্মপ্রকাশের এক সংগ্রামী প্রতীক। ১৯৬৪ সালে রাজ্জাক যেমন শূন্য হাতে ভারত থেকে বাংলাদেশে আগমন করেছিলেন এবং দীর্ঘ এক জীবন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজকের ‘নায়করাজ’ হয়েছিলেন, তাঁর এই সংগ্রামী জীবনের ইতিহাসের সাথে বাংলা সিনেমার জন্মলগ্নের সংগ্রামী ইতিহাস যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রাজ্জাক সেদিন যেমন কপর্দকশূন্য ছিলেন, বাংলাদেশের বাংলা সিনেমাও যেন তাঁর মতোই কপর্দকশূন্য ছিল।
১৯৫৬ সালে যখন মুখ ও মুখোশ মুক্তি পায়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের বয়স তখন পঞ্চাশ (লুমিয়ের ভাইদের ছবি মুক্তি পায় ১৮৯৫-এর ২৮ ডিসেম্বর) হয়ে গেছে। তার মানে পৃথিবীর বাকি অংশের অধিকাংশ দেশ বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর সিনেমার পূর্ণ বয়ঃপ্রাপ্তি ঘটে গেছে। শুধু বাণিজ্যিক ছবিই নয়, চ্যাপলিনের অবাক করা পৃথিবী পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন, ইতালির নিও-রিয়ালিজম, ফ্রান্সের থিয়েট্রিকাল সিনেমা এবং আভাঁ গার্দ পার করে বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতে ইম্প্রেশনিজম, সুরিয়ালিজম, এক্সপ্রেশনিজমসহ নানা ইজমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় শেষ। আর আমাদের এখানে তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দূরে থাক, স্টুডিও বিহীন, দক্ষ টেকনিশিয়ান বিহীন, দুর্বল অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়ে একধরনের শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে সেদিনের মুখ ও মুখোশ নির্মিত হয়েছিল। চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) ১৯৫৭ সালে নির্মিত হলেও, এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫৯ সাল থেকে। সেই বছর মাত্র চারটা বাংলা ছবি (আকাশ আর মাটি, মাটির পাহাড়, এদেশ তোমার আমার ও জাগো হুয়া সাভেরা) মুক্তি পায়। ১৯৬০ সালে মুক্তি পায় সংখ্যায় আরও কম, মাত্র দুটি ছবি-আসিয়া ও রাজধানীর বুকে। ১৯৬১ সালে সংখ্যা বাড়লেও মাত্র চারটায় সীমিত থাকে (কখনো আসেনি, হারানো দিন, যে নদী মরুপথে ও তোমার আমার)। ১৯৬২ ও ১৯৬৩-তেও প্রায় একই রকম অবস্থা দেখি। ১৯৬৪ থেকে মোটামুটিভাবে ছবির সংখ্যা বাড়তে থাকে। অর্থাৎ যে বছর নায়ক রাজ্জাকের পদার্পণ ঘটে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। ছবির সংখ্যা বাড়লেও সেই সময় উর্দু ও ভারতীয় ছবির দাপটে বাংলা সিনেমা কোনোভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে লিপ্ত থেকেছে। পাশাপাশি কপর্দকশূন্য রাজ্জাকও সিনেমায় নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য তৃতীয় বা চতুর্থ সহকারী পরিচালক হিসেবে, টেলিভিশনে বাংলা সিরিয়াল (বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের মতো) ‘ঘরোয়া’য় অভিনয়, সিনেমায় ছোটখাটো রোলে অভিনয় ইত্যাদি কাজ করে যাচ্ছিলেন। সিনেমার পর্দায় নায়ক হওয়া তাঁর কাছে তখন সুদূর এক স্বপ্ন। উর্দু ও ভারতীয় ছবিকে সরিয়ে দিয়ে বাংলা ছবিও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতে পারছিল না।
শিল্প-সাহিত্য এমন এক জগৎ, যেখানে বিনয়, প্রতিভা, ধৈর্য ও পরিশ্রম ছাড়াও পঞ্চম আরেকটা বিষয়ের প্রয়োজন পড়ে। আর সেটা হলো, শনাক্তকরণ ও পৃষ্ঠপোষকতা। প্রতিভাবানদের মূল্য সবাই সব সময় দিতে পারে না, শনাক্তকরণের অভাবে। জার্মানির ভাইমারের ডিউক কবি গ্যাটের প্রতিভা ঠিক ঠিক শনাক্ত করতে পেরেছিলেন এবং তার কবিসত্তা বিকাশের পেছনে যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা করে গিয়েছিলেন। ভ্যান গঘের ছোট ভাই থিউ তাঁর ভাইয়ের প্রতিভা ধরতে পেরেছিলেন বলেই সারা জীবন ভ্যান গঘকে তার আঁকার খরচ জোগান দিয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালে এই দেশের খ্যাতিমান পরিচালক জহির রায়হান ঠিক সেভাবে রাজ্জাককে নায়ক হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন। বেহুলা ছবির মধ্যে দিয়ে সেই নায়কের আত্মপ্রকাশ ঘটালেন। তার আগের বছর অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে রূপবান ছবির বিশাল সাফল্য হয়তো জহির রায়হানকে বেহুলা ছবি নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বলাবাহুল্য, বেহুলাও সফলতার মুখ দেখল। মজার বিষয় হলো, একই বছর (১৯৬৬) ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন ছবিটাও মুক্তি পেয়েছিল এবং সেই ছবিতে রাজ্জাকের ছোট একটা চরিত্র ছিল। কিন্তু বেহুলার সাফল্য তাঁকে আর কোনো ছোট রোলে আবদ্ধ রাখতে পারেনি। বিশেষ করে পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে আগুন নিয়ে খেলা রাজ্জাকের জীবনে যেন একটা টার্নিং পয়েন্ট। এই ছবির সফলতা তাঁকে একের পর এক সাত ভাই চম্পা, আবির্ভাব, অরুণ বরুণ কীরণমালা, ময়নামতী, নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, পীচ ঢালা পথ, স্মরলিপি, নাচের পুতুল, ঝড়ের পাখি, রংবাজ, আলোর মিছিলসহ শতাধিক ছবিতে তাঁকে শুধু নায়ক নয়, নায়করাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দিল। একই সাথে উর্দু ও ভারতীয় ছবিকে দূরে ঠেলে দিয়ে বাংলা ছবি বাংলার সিনেমা হলে ঠাঁই পেতে শুরু করল। ইতিমধ্যে দেশ স্বাধীনতা লাভ করে বাংলা ছবিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকল।
ভারতের অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক উৎপল দত্ত অভিনেতাদের উদ্দেশে তাঁর গদ্য সংগ্রহে বলেছেন, ‘দাম্ভিক মানুষ অভিনেতাই হতে পারে না। অভিনয়ের প্রাক্শর্ত হচ্ছে নিজ সত্তা বিলোপ। নিজেকে ভুলে নাটকের চরিত্র হতে হবে। দাম্ভিক মানুষ নিজেকে ভুলতে পারে না।’ নিজেকে ভুলে গিয়ে নাটক বা সিনেমার চরিত্র ধারণ করা যে কি কঠিন এক সাধনা, সেটা যাঁরা অভিনয়শিল্পে আছেন, তাঁরাই সব থেকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। সাধারণভাবে রাজ্জাক অত্যন্ত রোমান্টিক নায়ক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। রাজ্জাকের জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল রোমান্টিসিজম। কিন্তু এই রোমান্টিসিজমের মাঝে থেকেও তাঁর অভিনীত কয়েকটা ছবির চরিত্র যদি বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাব, কত অনায়াসে বিভিন্ন চরিত্রে তিনি মিশে গিয়েছিলেন। অধিকার ও রজনীগন্ধা ছবি দুটি যদি পাশাপাশি রাখি, তাহলে বিস্ময়ের সাথে আমরা লক্ষ করব দুটি চরিত্রের মাঝে কি বিশাল পার্থক্য নায়করাজ দেখিয়েছেন। দুটি ছবিতেই ছবির নায়ক বিলাতফেরত। রজনীগন্ধায় বিলাত থেকে ফিরে উচ্ছৃঙ্খল যুবক হয়ে যায়, অন্যদিকে অধিকার ছবিতে একই বিলাতফেরত যুবক কত ভদ্র, শান্ত ও মানবিক। ঝড়ের পাখীর ভীরু ফেরারি আসামিকে রংবাজ-এর রাজা চরিত্রে যেন চেনাই যায় না। ঝড়ের পাখীর সারা ছবিতে এমন জড়সড় হয়ে থাকেন যে দেখলে শুধু অসহায় মনে হয় না, নায়কের প্রতি ভীষণ এক করুণার উদ্রেক করে। অন্যদিকে রংবাজ-এর রাজা চরিত্র পাড়ার মাস্তানদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যদিও সেই রাজা ছবির শেষে রংবাজি ছেড়ে দিয়ে ভালো মানুষ হয়ে যায়। অনির্বাণ ছবিতে আবার গ্রাম থেকে শহরে উঠে আসা এক অসহায় ‘হাশেম’ চরিত্রে দেখি। আমরা দেখতে পাই এ রকম অনেক হাশেম যেন ঢাকা শহরে ছড়িয়ে আছে। নাচের পুতুল-এর শিক্ষিত ও স্মার্ট যুবকটা অশিক্ষিত ও ছুটির ঘন্টায় কেমন মূর্খ আর সহজ-সরল হয়ে দেখা দেয়। স্মরলিপি ছবিতে যে গায়কের চরিত্রে রাজ্জাককে দেখা যায়, দেখে মনে হয় শুধু একজন গায়ককেই ছবিতে দেখছি। অন্যদিকে একই গায়ক বাদী থেকে বেগম ছবিতে গুরুগম্ভীর নবাব হয়ে যান। আলোর মিছিল ও জীবন থেকে নেয়া সেই নায়ক প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে ওঠেন। উদাহরণ বাড়ানোর আর প্রয়োজন নেই। এভাবেই আমরা দেখতে পাই, এত অজস্র ছবিতে অভিনয় করে, এত রোমান্টিক নায়ক হয়েও রাজ্জাক চেষ্টা করেছেন চরিত্রের স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্য বজায় রাখতে। আর এই স্বাতন্ত্র্য তখনই বজায় রাখা যায়, যখন নিজের ‘আমিত্ব’কে বিলোপ করে দেওয়া যায়।
এবার আমার ব্যক্তিগত দুটি ঘটনার মাধ্যমে রাজ্জাকের সাথে একটু পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। ঘটনা এক. স্থান, এফডিসির ৩ অথবা ৪ নম্বর স্টুডিও, সময়কাল ১৯৭২/৭৩, চোখের জলে সিনেমার শুটিংয়ের সেট। ওই ছবিতে শিশু চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সেদিন আমিও স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলাম। সেট, লাইট, ক্যামেরা সব তৈরি। একটু পরে শট নেওয়া হবে। রাজ্জাক মেকআপ নিয়ে সেটে এলেন। পরিচালক আজহার তাঁকে দৃশ্যটা বুঝিয়ে দিয়ে স্ক্রিপ্ট দিলেন। দেড় পাতার একটা দীর্ঘ সংলাপ এক শটে বলতে হবে। রাজ্জাক স্ক্রিপ্টটা হাতে নিলেন, শুধু একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, টেক। অর্থাৎ শটটা পরিচালক নিতে পারেন। দেড় পাতার এমন দীর্ঘ সংলাপ, মাত্র একটা রিডিংয়ে মানুষ কী করে মুখস্থ করে ফেলতে পারে ছোট ওই বয়সে আমার জন্য একটা বিস্ময় ছিল এবং এখনো সেটা থেকে গেছে। ঘটনা দুই. স্থান, সেই এফডিসি, সময়কাল ২০১৬। এফডিসির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এফডিসির চত্বরে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হবে। শিল্পী-কলাকুশলীসহ অনেকেই উপস্থিত। মঞ্চে রাজ্জাকসহ অনেকেই উপস্থিত। বক্তৃতা, কথামালা ইত্যাদি শেষ করে যখন সবাই নিচে নামলেন র‌্যালি বের করার জন্য, হঠাৎ ওনার মুখোমুখি হয়ে পড়লাম। প্রায় তিরিশ বছর পরে দেখা। আমি সালাম দেওয়ার আগেই উনি বলে উঠলেন, ভালো আছেন? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে মনে আছে আপনার? উনি হেসে উত্তর দিলেন, মনে থাকবে না কেন? এই হলেন ব্যক্তি রাজ্জাক।
‘নায়করাজ’ উপাধিটা সেই সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় সিনে পত্রিকা চিত্রালীর মাধ্যমে ওনাকে প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু সে জন্য তাঁর কখনো অহংকার হয়নি। সামিয়া জামানকে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘তালি (হাততালি) আর মালা হজম করতে হয়। এই দুটো হজম করতে না পারলে কিছু করতে পারবে না।’ দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে বর্তমান শিল্পীদের মাঝে এই হাততালি ও মালার বদহজমের কারণে আমরা ‘শিল্পী’ খুঁজে পাই না। যে বাংলা সিনেমাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজ্জাকসহ সেই সময়ের আরও অনেক শিল্পী, কলাকুশলী আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কী ভয়াবহভাবে আমরা সেই বাংলা সিনেমাকে নিজেদের হাতে তিল তিল করে ধ্বংস করে ফেলেছি। যে সিনেমা হলের সংখ্যা ৫০০ থেকে তারা ১ হাজার ২০০-তে উন্নীত করেছিলেন, আজ সেখানে সিনেমা হলের সংখ্যাকে ৩০০-এর নিচে নামিয়ে এনেছি। ওবায়দুল হক সরকারের ভাষায় বলতে হয়, আমাদের পূর্বসূরিরা যে শ্বাপদসংকুল জঙ্গলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে গাছ কেটে সিনেমার পথ করে দিয়েছিলেন, আমরা শুধু তাঁদের ভুলেই যাইনি, সেই মসৃণ পথকে আবার জঙ্গলাকীর্ণ করে ফেলেছি। নাটক, সিনেমা এতটাই সহজলভ্য এখন আমাদের কাছে যে নাটককে নাটক মনে করি না, সিনেমাকে সিনেমা নাম দিতে চাই না। বিয়ের রাতেই রাজ্জাক তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীকে বলেছিলেন, তুমি আমার দ্বিতীয় বউ। প্রথম বউ আমার নাটক। নাটকের প্রতি কতটা মমতা, প্রেম আর ভালোবাসা থাকলে মানুষ বাসর রাতেই তাঁর প্রিয়তমা বউকে এভাবে বলতে পারেন। শিল্পের প্রতি তাঁর এই প্রেম, শুধু রাজ্জাককেই সমৃদ্ধশালী করেনি, বাংলাদেশের বাংলা সিনেমাকেও সমৃদ্ধ করেছিল। বাংলা সিনেমার নায়কের বিরাট শূন্যতা তিনি একাই পূরণ করেছিলেন। অনেকে হয়তো বলবেন, সময়ের প্রয়োজনে তা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের প্রয়োজন সব সময়েই থাকে। এখনো আছে। কিন্তু তাঁর মতো নায়কের আবির্ভাব আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। তাঁর কাছে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু। সিনেমার রাজ্যে নায়কদের রাজা হয়ে রাজার মতোই চলে গেছেন তিনি। সেই রাজ্য আছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের রাজা নেই। নাটক ও সিনেমা শিল্পের সঙ্গে যাঁরা এখনো সংযুক্ত হয়ে আছেন, তাঁদের প্রতি তাই বিনীত অনুরোধ থাকবে, রাজার মৃত্যুতে শুধু যেন শোক জ্ঞাপন করেই আমাদের কর্তব্য শেষ করে না দিই। রাজা ও তাঁর সমসাময়িক শিল্পী-কলাকুশলীরা বাংলা ছবিকে যেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন, আমরা শুধু সেখানে নয়, তার চেয়েও আরও অনেক ধাপ যেন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। ভবিষ্যতে আমরা যেন বলতে পারি, আমাদের রাজ্য ও রাজা দুটোই আছে এবং দুটোই অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী।

Disconnect