ফনেটিক ইউনিজয়
ধারাবাহিক উপন্যাস
সন্ধ্যা নামার আগে
আবু উবায়দাহ তামিম

চার.
এটা নিছক স্বপ্ন ছিল! আহ! ভাবতেই দাঁত কিড়মিড়িয়ে ওঠে জলীর। আর ঘুম আসে না। স্বপ্নভাঙার বেদনা সত্যি মানুষকে বিব্রত করে। আচ্ছা, এমনও তো হতে পারত এটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব!
বিকেলে ভৈরবের পাড়ে হাঁটছিলেন জহুরুল হক সাহেব। ভোঁ ভোঁ মোটা আওয়াজের বাতাস গায়ে লেগে তাঁর মনে হচ্ছিল, আবার তিনি যৌবনে ফিরে গিয়েছেন। তিনি বড় বড় শ্বাস নিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন আকাশের দিকে। পুরো আকাশটা কেমন টকটকে লালবর্ণ হয়ে আছে। ছোটবেলায় এটা দেখলে তাঁর খুব ভয় লাগত। তাঁর মনে পড়ে একবার মাঠে ঘুড়ি ওড়ানোর কথা। ঘুড়ি আকাশে উড়ছে, হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল আকাশের দিকে, পরমুহূর্তে তাঁর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। মেঘেরা তার নিজস্ব রূপ পাল্টে লালে লাল হয়ে আছে। টকটকে লাল। মারাত্মক ভয়ে তাঁর কিশোর বুক কেঁপে উঠেছিল। তিনি ঘুড়ি-নাটাই সব মাঠের ভেতরে ফেলে দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে চলে এলেন মায়ের কাছে। মা বললেন, কী হয়েছে বাপু! দাবড়াল কিসে?
শিশু জহুরুল বললেন, মা, আকাশে লাল মেঘ, ঘুড়ি মাঠে, আমি দৌড় দিছি। তখন জহুরুল সাহেবের মা হাসতে হাসতে যেন মাটিতে গড়িয়ে পড়লেন। ছোট্ট জহুরুল কেবল অবাক হয়েই তাকিয়ে রইলেন মায়ের দিকে, কিন্তু মায়ের হাসির কারণ বুঝতে পারলেন না।
আজ তিনি শৈশব-কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে! অথচ জীবনের কোনো স্তরই তিনি ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেননি। হক সাহেবের মনে হয়, এবার হয়তো তিনি এই জীবনের মানেটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারবেন। জীবনের শেষের দিকে এসে জীবন বোঝার মতো অভিজ্ঞতা মানুষের হয়ে যায়। কিন্তু বুঝে নেওয়ার মতো যথাযথ সময় কি মানুষকে দেওয়া হয়? হক সাহেব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন রক্তরাঙা আকাশের দিকে। ভৈরবের এই বড় মাঠে অনেক মানুষ আছে, কয়েকটা দল আছে সেখানে। কেউ ফুটবল খেলছে। কেউ খেলা দেখছে। আবার যারা ফুটবলে অনাসক্ত, তারা ব্যাট বল নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। কেউ কেউ আবার মাটির উঁচু ঢিবিতে বসে লুডু বা তাস খেলায় নিমগ্ন রয়েছে। হক সাহেব কৈশোর কিংবা যৌবনে অতটা খেলাধুলা করেননি। তাই এখনো অন্য বয়স্ক লোকদের মতো তিনি কোনো খেলাধুলার পাশে গিয়ে দাঁড়ান না কিংবা আগ্রহবোধ করেন না। তিনি কেবল ভাবতে থাকেন, তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে ছেলে দুটো কিংবা স্ত্রীর কী অবস্থা হতে পারে। অথবা তাঁর জীবনে অসুখী হওয়ার নেপথ্য গল্পগুলো পাঠ করতে থাকেন মনে মনে। হঠাৎ যেন হক সাহেবের মাথার ভেতরে চক্কর মেরে উঠল। পুরো দৃষ্টি একটু একটু কাঁপছে, তিনি খেয়াল করলেন, বুঝতে পারলেন, অবস্থা খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রেশার ওঠার লক্ষণ টের পেয়ে তিনি দ্রুত বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। প্রেশার উঠলে তাঁর খুব হার্ট অ্যাটাকের ভয় হয়। কেন করবে না! এই রোগটা হুটহাট মানুষকে ঠেলে নিয়ে যায় মৃত্যুর দরজায়।
সন্ধ্যার পর দোতলার ছাদে গিয়ে প্লাস্টিক চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন তিনি। জোবেদাকে ডেকে নিয়ে বসালেন নিজের পাশে। বললেন, জোবেদা, আমার বোধ হয় প্রেশার বেড়েছে।
কী বলো! কখন! দাঁড়াও মেপে দেখি।
জোবেদা, আমি আর হয়তো বেশিদিন বাঁচব না-জহুরুল সাহেব বললেন। জোবেদা এ কথায় মাথা তোলেন না। প্রেশার মাপায় তিনি নিমগ্ন।
প্রেশার তো ঠিক আছে তোমার।
এখন মনে হয় তাহলে কমেছে।  
জোবেদা বেগম তাকিয়ে থাকেন হক সাহেবের মুখের দিকে।
আচ্ছা, জোবেদা, আমি আর কদ্দিন বাঁচতে পারি?
হঠাৎ কণ্ঠে করুণ স্বর এনে হক সাহেব কথাটি বলেন।
কেন? অনেক দিন বাঁচবে তো। অম্লান সুরে বলেন জোবেদা, যেন তিনি সত্যিই হক সাহেবের বেঁচে থাকার সময় কতটুকু তা জানেন।
তুমি কি শিওর, হক সাহেব হাসেন। জোবেদা হাসেন না। তিনি কী যেন একটা ভাবেন।
তুমি আমার পরে মরলে ভালো হবে। তুমি আগে মরলে আমার পৃথিবীটা কবরের চেয়েও অন্ধকার হয়ে যাবে।
তা বলছ কেন, জোবেদা।
হক সাহেব জোবেদা বেগমকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেন। জোবেদা বেগমের কাঁদতে ইচ্ছে করে। তবু তিনি চেপে রাখেন সে কান্না। মনে হয়, এ জড়িয়ে ধরার মধ্যে সেই পুরোনো একটি শান্তি লুকিয়ে আছে, যা তিনি বিয়ের পর একবারই অনুভব করেছিলেন। আজ পুরোনো সেই শান্তি আবারও তিনি অনুভব করছেন। বাইরে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

Disconnect