ফনেটিক ইউনিজয়
সুনীলের প্রথম কবিতা ও কৃত্তিবাস
বাসার তাসাউফ

একজন তরুণ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, কবিতার উৎস কোথায়? জবাবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘প্রেমে পড়ো, পড়ে ব্যর্থ হও, সেই ব্যর্থতা আর বেদনা থেকে সৃষ্টি হতে পারে কবিতা।’ আসলেই কি কবিতার উৎসমূলে আছে ব্যর্থতা, হতাশা ও বেদনাবোধ? বেদনাবোধই কি জন্ম দেয় কবিতার? ইংরেজ কবি কিটস-শেলি-মিল্টন তাঁদের প্রেয়সীর বিরহে লিখেছেন অনেক কবিতা। নজরুলও লিখেছেন। কালিদাস ‘মেঘদূত’ লিখেছিলেন প্রিয়াবিরহের বেদনা থেকেই। কথিত আছে, বাল্মীকির ক্রোঞ্চমিথুন বিয়োগজনিত শোকই ‘শ্লোক’ রূপে উৎসারিত হয়েছিল। কেউ কেউ মনে করেন, কবিতার জন্মজঠর হচ্ছে কল্পনা ও সাধনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বলেই ফেলেছেন, ‘কবিতা কল্পনা-লতা। সাধনার ধন।’ এ প্রসঙ্গে কনসিনোস আসেন্সের কথা উল্লেখযোগ্য। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ‘সেভিল’-এ, কিন্তু থাকতেন মাদ্রিদে। সমুদ্র নিয়ে তিনি একটি অনুপম কবিতা লিখেছিলেন। এ জন্য বোর্হেস তাঁকে অভিনন্দন জানালে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ সমুদ্র নিয়ে কবিতাটি সুন্দরই। কোনো একদিন হয়তো সমুদ্র দেখার সৌভাগ্য হবে।’ তিনি কখনো সমুদ্র দেখেননি। অর্থাৎ কবিতাটি কাল্পনিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও বলেছেন, ‘লেখা পড়ে যেমন ভাবো, লেখক তেমন নয় গো...!’
কবিতার উৎসমূলে রয়েছে সৌন্দর্য-অনেকে আবার এ ধারণাও করেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং রমণীর রূপলাবণ্যমণ্ডিত শরীর, মুখ অবয়ব ভাবুক মনকে নাড়া দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিচ্ছে বারবার। যুগের পরিবর্তনে কবিতার ধরন বা গঠনের ক্ষেত্রেও ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আধুনিক গীতিকবিতা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইদানীং আধুনিকতা বা উত্তরাধুনিকতাকে কেন্দ্র করে কবিতার বক্তব্য বিষয়বস্তুতে এসেছে নানা রকম পরিবর্তন। দিনে দিনে কবিতা হয়ে উঠছে একটি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। কাদিকামো বলেছেন, ‘নব্বই মিনিটের একটি চলচ্চিত্র যা প্রকাশ করতে না পারে, তিন মিনিটের একটি ট্যাঙ্গো (দক্ষিণ আমেরকিার নৃত্য) কবিতা তা সফলভাবে উপস্থাপন করতে পারে।’ বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ ‘যেতে নাহি দিব’ ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ ‘আট বছর আগে একদিন’ মির্জা গালিব কিংবা কবি হাফিজের অসংখ্য ফারসি ও আরবি কবিতা কাদিকামো’র উক্তির স্বার্থকতা প্রমাণ করে। জাপানি ‘হাইকু’ উর্দু ‘শের’ ইংরেজি অনেক কবিতা এর উদাহরণ।
অনেকের ধারণা, নির্জনতার পথ ধরেই আত্মপ্রকাশ ঘটে কবিতায়। এ কথা সত্য, নির্জনতা ব্যক্তিমনকে টেনে নেয় ভাবনার গভীরতায়, ক্ষণিকের জন্য হলেও করে তোলে ভাবুক ও কবি। রবীন্দ্রনাথকেও নির্জনতার অভিসারী বললে ভুল হবে না। পোলিশ কবি শিম্বোর্সকা এই নির্জনতার শিকার। নির্জনতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এ ছাড়া আমি লিখতে পারি না। এমন কোনো লেখকের কথা আমি কল্পনা করতে পারি না, যিনি শান্তি ও নির্জনতা খুঁজে পতে চেষ্টা করেননি। দুর্ভাগ্যক্রমে, কবিতা কোলাহল, হুল্লোড় কিংবা বাসে সৃষ্টি হয় না। চার দেয়াল এবং টেলিফোন যেন না বাজে, সে নিশ্চয়তা থাকতে হবে।’
তাহলে দেখা যাচ্ছে, কবিতার সৃষ্টিরহস্য বা উৎসমূল বিচিত্র। উল্লিখিত উৎসগুলো ছাড়া যে কবিতার উৎসস্থল থাকতে পারে না, এ কথা বলার উপায় নেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম কবিতা লেখার পেছনে কী উৎস ছিল? বাল্যকালে অনেকেরই যেমন আকাক্সক্ষা থাকে বড় হয়ে লেখক হবেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তেমন কিছু ছিল না। বরং ইচ্ছা ছিল, বড় হয়ে ভূপর্যটক হবেন। ইচ্ছেটা মূলত তখনকার দিনে কিছু লেখকের গল্প পড়ে হয়েছিল। তখনকার দিনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা ছিল। ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফল বের হতে তিন মাস সময় লাগত। এ তিন মাস সময়ে সুনীলের বাবা তাঁকে বাড়িতে আটকে রাখার একটি প্ল্যান করলেন। বাড়িতে টেনিসনের কাব্যসংগ্রহ ছিল। বইটি সুনীলের হাতে দিয়ে রোজ দুটো করে কবিতা অনুবাদ করতে বললেন তিনি। বাবাকে বেশ ভয় পেতেন সুনীল। তাঁর নিষেধ অমান্য করার সাহস ছিল না। অগত্যা বসে বসে টেনিসনের কবিতা অনুবাদ করতে লাগলেন। তখন সুনীলের বয়স পনেরো কিংবা ষোলো বছর। দু-এক দিন অনুবাদের সেই বিরক্তিকর কাজটি করার পর তার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। বাবা অনুবাদগুলো মিলিয়ে দেখতেন না। শুধু টেনিসনের কবিতার লাইন আর সুনীলের অনূদিত লাইনগুলো গুণে গুণে টিক মেরে দিতেন। সুনীল ভাবলেন, যেহেতু বাবা কবিতা মিলিয়ে দেখেন না, তাহলে এত কষ্ট করা কেন? এরপর দিনই টেনিসনের কবিতার প্রথম লাইনটার মতো মোটামুটি মিল রেখে বাকিটা সুনীল বানিয়ে লিখলেন। কাজটি একেবারে সহজ মনে হলো তাঁর কাছে। এভাবেই প্রথম কবিতা লেখা হয়ে উঠেছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। সেসব কবিতা কিন্তু সুনীল কোথাও সংকলন করেননি, এমনকি কোথাও ছাপতেও দেননি।
সুনীলের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল বিখ্যাত দেশ পত্রিকায়। তখনকার দিনে বন্ধুর বোনদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ খুব একটা ছিল না। একজন বন্ধুর বোনের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল সুনীলের। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারতেন না। শেষে বন্ধুর সেই বোনকে উদ্দেশ করে লিখে ফেললেন চিঠি। তারপর মেয়েটির হাতে চিঠি দেবেন কী করে? উপায়ন্তর না দেখে, ‘একটি চিঠি’ শিরোনাম দিয়ে দেশ পত্রিকায় পাঠিয়ে মনের কোণে সুপ্ত বাসনা নিয়ে বসে রইলেন, যদি ছাপা হয় তাহলে মেয়েটি হয়তো পড়বে। তখন দেশ পত্রিকা রাখা হতো মেয়েটির বাড়িতে। কিন্তু কবিতা পাঠালেই যে দেশ-এ ছাপা হয় না, সে কথা কিন্তু সুনীল জানতেন ও না। তাঁকে অবাক করে দিয়ে সম্পাদক সেই কবিতাটি ছেপে দিলেন, সময়টা তখন ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দ। তখন দেশ পত্রিকায় বিখ্যাত লেখকদের গল্প ও প্রবন্ধ ছাপা হতো বেশি। কবিতা তেমন ছাপা হতো না। দু-একটি ছাপা হতো, তা-ও বড় কোনো লেখার তলায়। কোথাও হয়তো প্রবন্ধ শেষ হয়েছে, তলায় খানিকটা জায়গা বের হলো, সেখানে একটি কবিতা বসে গেল। এ জন্যই বোধ হয় অচিন্ত্যকুমার সেন ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘গদ্যের পাদদেশে স্থান হয় বলে কবিতার আরেক নাম পদ্য।’ দেশ পত্রিকায় ছাপা হয়ে গেল সুনীলের প্রথম কবিতা, কবিতার আদলে আসলে সেটি একটি চিঠি। মেয়েটি পড়ল সেই কবিতা (চিঠি)। কিন্তু এটি যে তার দাদার বন্ধু সুনীলের লেখা তা আর বিশ্বাস করল না। মেয়েটি জানাল, সুনীলের নামের সঙ্গে মিলে গেছে কবির নামটা। বলাবাহুল্য, মেয়েটির কবিতার দিকে বিশেষ মনোযোগ ছিল। কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে এমন কিছু পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি দিত, যা সুনীল আগে কখনো পড়েননি। পরে খুঁজে খুঁজে সেই কবিতাটি পড়ে নিতেন। মেয়েটির কাব্যের প্রতি মনোযোগ ছিল বলে সুনীল মুগ্ধ হতেন। তার মনোযোগ নিজের দিকে টেনে আনতেই কবিতায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সুনীল। যদি মেয়েটির খেলাধুলায় উৎসাহ থাকত সুনীল বোধ হয় খেলোয়াড়ই হতেন। এভাবেই লেখা হয়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম কবিতা। সুনীল যখন আইএসসি ক্লাসের ছাত্র, তখন তাঁর সহপাঠী ছিলেন দীপক মজুমদার। দীপক কবিতা-টবিতা লেখে বলে সহপাঠীদের বেশ খাতির পান। তখন দীপকের প্রতি একটু একটু ঈর্ষা হতে থাকে সুনীলের। তাঁর কাছে মনে হয়, কবিতা লেখা কী এমন কঠিন কাজ? আমিও তো পারি! দীপকের সঙ্গে একটা শীতল প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। দুজনেই কলেজের ম্যাগাজিনে কবিতা পাঠান। একটা পত্রিকায় দীপক কবিতা পাঠান তো সুনীল পাঠান আরেকটায়। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর দুই বন্ধু ঠিক করেন, তাঁরা একটি কবিতার বই বের করবেন। ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করতে তাঁরা চলে গেলেন সিগনেট প্রেসের দিলীপ গুপ্তের কাছে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ-কোলরিজের যেমন একসঙ্গে বই হয়েছিল, তাঁদের মাথায়ও তেমন প্ল্যান কাজ করছিল। দীপক মজুমদার ছিলেন সাগরময় ঘোষের (দেশ পত্রিকার সম্পাদক) দূর সম্পর্কের ভাগ্নে। ফলে কলকাতার সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকের সঙ্গে তাঁর জানাশোনা ছিল। সুনীল ছিলেন বেশ লাজুক প্রকৃতির। থাকতেন দীপকের ছায়া হয়ে। দীপক ছিলেন অকুতোভয় ও মিশুক। মানুষকে যেকোনো প্রস্তাব দিয়ে ফেলতে পারতেন। দীপক একদিন সুনীলকে সঙ্গে নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের কাছে গিয়ে বলে বসলেন, ‘এই আমাদের বই, মলাট এঁকে দেন!’ সত্যজিৎ রায় তখন কিছুটা অবাক হলেও বেশ ভদ্র গলায় বলেছিলেন, ‘দেব তো বটেই। তবে কবিতাগুলো আমায় পড়তে হবে। কবিতার ভাব বুঝে তবেই তো মলাট আঁকতে হয়! তা ছাড়া কবিতার বইয়ের শুধু মলাট আঁকলেই তো বই বের হয় না, একজন প্রকাশকও দরকার হয়।’ তখন দুই বন্ধু মিলে প্রকাশক খুঁজতে লাগলেন। সত্যজিৎ রায়ই তাঁদের পাঠালেন সিগনেট প্রেসের দিলীপ গুপ্তের কাছে। এলগিন রোডে বিশাল এক বাড়িতে সিগনেট প্রেসের অফিস ছিল তখন। দুজন বালখিল্যকে দেখে কিন্তু দিলীপ গুপ্ত অগ্রাহ্য করেননি, তাড়িয়েও দেননি। তাঁদের সযতনে বসিয়ে অনেক কথা বলাবলির পর বললেন, ‘আমিও চাই এখান থেকে তরুণদের লেখা বের হোক।’ দিলীপ গুপ্ত তখন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও নরেশ গুহ নামের দুই তরুণ কবির কবিতার বই বের করছিলেন, সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাঁদের বলেছিলেন, ‘শুধু আপনাদের দুজনের কেন, এ বয়সের আরও যাঁরা আছেন, তাঁদের কবিতা নিয়ে একটি পত্রিকা বের করে ফেলতে পারেন।’ দিলীপ গুপ্তের পরার্মশটা তখন তাঁদের মনে ধরেছিল। মনে হলো, বইয়ের আগে পত্রিকা বের করা জরুরি। তাঁরা পত্রিকা বের করার চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। কিন্তু পত্রিকা বের করার অনেক কিছুই তখন তাঁরা জানতেন না। কেমন করে লে-আউট হয়, ছাপাছাপির নানা রহস্য, কীভাবে বিজ্ঞাপন জোগাড় করতে হয় ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে দিলীপ গুপ্ত তাঁদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। ‘কৃত্তিবাস’ নামটিও দিয়েছিলেন দিলীপ গুপ্ত। এ হচ্ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার উৎস।

Disconnect