ফনেটিক ইউনিজয়
ধারাবাহিক উপন্যাস
সন্ধ্যা নামার আগে
আবু উবায়দাহ তামিম

নয়.
কাজলের চোখে পড়ে তার অনুপস্থিতিতে তাদের বাড়িঘর কিংবা গ্রামের ছবি সব যেন পাল্টে গেছে। কাজলের তা দেখে খুব মায়া হলো। কাজলের মনে হলো, বাড়ির পেছনে তার বাবার কবরটি একটু দেখা উচিত। তার বাবা মরে গেছে প্রায় তিন বছর হয়ে গেল, অথচ মাত্র এই তিনটি বছরে বাবার স্মৃতির ওপরে ধুলা জমে গেছে। কাজলের ভেবে দুঃখ লাগে। ঠিক করে বিকেলে বাবার কবর দেখতে যাবে সে। বাবাকে সালাম করে আসবে। হয়তো ওর বাবা তার ওপরে কোনো কারণে অভিমান করে আছে।
বিকেলে বাড়ি থেকে হাঁটতে বেরোয় কাজল। প্রথমে তার বাবার কবরের কাছে যায়। দেখে, বাবার কবরটা মলিন হয়ে পড়ে আছে। আশপাশে ঘাস, লতাপাতা কিছু নেই। কবরের উঁচু মাটি রোদে শুকিয়ে ফেটে গেছে। কাজলের ভেতরটা বাবার জন্য হাহাকার করে ওঠে। তার কাছে বাবার কবরটি বাবার শুকনা মুখের মতো মনে হয়। সে কবরের একেবারে সন্নিকটে যায় না। কারণ নারীদের নাকি কবরস্থানে যাওয়া নিষেধ। তাই সে দূরে দাঁড়িয়ে দেখে।
বাবার কবর দেখে ফিরতে ফিরতে খুকু ফুফুর কথা মনে হয় কাজলের। খুকু ফুফু তার আপন কোনো ফুফু নয়। একই গ্রামে থাকে। সে তার মায়ের বয়সী এবং সেই সঙ্গে মায়ের বান্ধবী স্তরের। কাজল যখন গ্রামে থাকত, তখন এই ফুফু কাজলকে খুব ভালোবাসত। সে যেদিন ভালো স্বাদের তরকারি রান্না করত, সেদিন তা থেকে ছোট্ট এক বাটি আঁচলের তলায় করে কাজলের জন্য নিয়ে যেত। কাজল ভাবে বাড়ি যাওয়ার পথে কি একবার খুকু ফুফুর সঙ্গে দেখা করে যাবে! না দেখা করে গেলে সে যদি পরে জানতে পারে যে কাজল বাড়ি থেকে ঘুরে গিয়েছে অথচ তার সঙ্গে দেখা করেনি। তাহলে মনে ব্যথা পেতে পারে। কাজল খুকু ফুফুর বাড়ির গলিতে ঢোকে। খুকু ফুফু বাড়িতে একলা থাকে। বেশি সময়ই বাইরে বাইরে থাকে আর অধিকাংশ সময়ই কোথায় কোথায় যে ঘুরে বেড়ায়, তা কেউ খোঁজখবর রাখে না অথবা বলা যায় তাকে খোঁজ করার মতো মানুষ এই জগতে কেউ নেই। নারীটি খুব দুঃখী মানুষ। এ দুঃখের গল্প কাজল খুব ছোটবেলা থেকে জানে। যখন খুকু ফুফু এসে তার মায়ের সঙ্গে এসব বলত, কাজল তখন মায়ের কোলে বসে বসে মনোযোগ দিয়ে তা শুনত। সেখান থেকেই কাজলও দুঃখী এই মানুষটির প্রতি দরদি হয়েছিল।
কাজল খুকু ফুফুর ঘরের সামনে এসে দেখে দরজায় তালা ঝুলছে। সে আবার চলে আসে সেখান থেকে। তারপর খুকু ফুফুর বাড়ি থেকে বেরোনোর পরেই ঘটে যায় অকল্পনীয় ঘটনাটি। সেই ছেলেটা হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়ে কাজলের সামনে! যে ছেলেটা দূর থেকে কাজলকে দেখে যেত এত দিন। আজ সে অনেক সাহস নিয়ে কাজলের সামনে দাঁড়ায়। কাজল অপ্রস্তুত অবস্থায় বুঝে উঠতে পারে না কী করবে। সে কেবল ভাবতে থাকে ছেলেটা এত এত সাহস কোত্থেকে জোগাড় করল? চোখ মোটা মোটা করে তাকিয়ে থাকে কাজল ছেলেটার দিকে। আপনি এখানে কেন? কাজল বলে। আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল। কী কথা? আর কথা বলার জন্য কি এভাবে রাস্তা ব্লক করে দাঁড়াতে হয়! সরি! সরি!
ছেলেটা কাজলের সামনে থেকে সরে দাঁড়ায়। এবার ছেলেটির ভেতরে লজ্জার একটি আবরণ পড়ে যায়। আর কাজল নিজের ভেতরের সাহসটি বাড়িয়ে নেয়। তো এবার বলেন, কী কথা? আপনাকে ভালো লাগে, আই মিন আপনাকে...। ভালোবাসেন তো? পরেরটুকু বলে দেয় কাজল। হুম। ছেলেটি কাজলের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাজল না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, নাম কী আপনার? শ্রাবণ! পুরো নাম, শ্রাবণ রহমান শাওন। আচ্ছা শোনেন, আপনাকে আমি অনেক আগে থেকেই দেখছি, আপনি আমাকে ফলো করেন। আপনাকে খুঁজেছিলাম আমিও মনে মনে। তাই নাকি? ছেলেটির মুখ থেকে সাফল্যের হাসি ঝরে পড়ে। আসলে কী জানেন, এসব প্রেম আমার মধ্যে কেনো যেন আসে না। অনেক চেষ্টা করেছি একটি প্রেম করব বলে। কিছুতেই পারলাম না! ছেলেটি কাজলের গলায় তাচ্ছিল্যের সুর বুঝতে পারে হয়তো একটু, তাই তার হাসি হাসি মুখে হঠাৎই যেন মেঘ নেমে আসে। কাজল আরও গলে গলে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। আপনি তবে একটা কাজ করতে পারেন। ছেলেটি তার ডান হাত প্রায় কাজলের মুখের কাছে এনে কাজলের কথা থামিয়ে দেয়। কাজল চুপ হয়ে যায় তাতে। আমি কথা বলি একটা, সিস। কাজল হ্যাঁ-সূচক ইশারা করলে আবার ছেলেটি বলতে শুরু করে, যারা এত ভাব নেয় না? মানে যারা খুব প্রেমকে ঘৃণা করে তারা লুজ ক্যারেক্টার হয়। আপনার অবস্থাও তা-ই।
কাজলের মাথা জ্বলে যায় একটা অপরিচিত ছেলের মুখ থেকে এমন কথা শুনে। সে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। ঠাস করে একটি চড় মেরে দেয় ছেলেটির মাংশে ভরা চোয়ালে। ছেলেটি এত অভদ্র কাজল কল্পনা করতে পারে না। সে রাগে গজগজ করতে করতে সামনে হাঁটা শুরু করে। আর ছেলেটি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। চড়টি মারার পরে কাজলের মনে হয়, চড়টি মারা মনে হয় ঠিক হয়নি। কাজলের এখন এমন মনে হচ্ছে, যদি সে চড়টি ছেলেটির গাল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারত, তাহলে এক্ষুনি তা-ই করত। কে জানত কাজলের এ বিকেলের ঘোরাঘুরিটা অশুভ হবে? নিজেকেই দায়ী করে এর জন্য। কেন শুধু শুধু দরকার ছিল খুকু ফুফুর ওখানে যাওয়ার! আর এটাও বা কীভাবে সম্ভব যে আমার ওখানে যাওয়ার কথা ছেলেটি আগে থেকেই জানবে। কাজল হাঁটতে থাকে ইটের রাস্তায় আর মৌমাছির মতো জটলা পাকানো দুর্ভাবনার দল তার মাথার ওপর ঘুরতে থাকে অবিরাম।

Disconnect