ফনেটিক ইউনিজয়
বি শ্ব সা হি ত্য
পিকাসোর রঙের জগৎ
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

জীবন ও জগৎকে রাঙাতে, বোধ ও উপলব্ধিকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করতে শিল্পীদের রং হাজার হাজার বছর ধরে জনজীবনে তুলির আঁচড় দিয়ে আসছে। শিল্পী মাত্রই একজন সুচিন্তক মানুষ, যিনি কিনা তাঁর ছবির মধ্য দিয়ে ভাব ও ভাবনাকে, প্রকৃতি ও মানুষকে, পরিবেশ ও প্রতিবেশকে প্রকাশ করেন। এ কথা বোধগম্য যে চিন্তা পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার একটি অংশ, যা ভেঙেচুরে আবার নতুন কোনো বৃহৎ অথবা নান্দনিক কোনো বিষয়কে ধারণ করে গড়ে ওঠে। চিন্তার বদলের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীর চিত্রকর্মটি নতুন কোনো উপস্থাপন কৌশলের মুখোমুখি হবে-এমন প্রবাহই শত শত বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে। শিল্পের অন্যান্য শাখার মতো চিত্রকরদের মধ্যে যাঁরাই নতুন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁরাই ‘মহান শিল্পী’র তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। এই নাম লেখানোর দলে ভ্যান গগ, রাফায়েল, ভিঞ্চিদের মতো জগজ্জয়ী আরেকজন শিল্পীর নাম পাবলো পিকাসো। আরেক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ল্যুভর দেখতে না গিয়ে প্রথমে আপনাকে দেখতে এসেছি।’ অথচ এই পিকাসোকেই শিল্পী জীবনের মধ্যাহ্নে পৌঁছাতে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর দারিদ্র্যমুখর পথ হাঁটতে গিয়ে ক্লান্তি ও শ্রান্তি তাঁকে জেঁকে ধরলেও ছবি আঁকা তিনি ছাড়েননি। বরং দারিদ্র্যকেই করেছেন ছবি আঁকার বিষয়। এমন সময় বিগত হয়েছে যে, ছবি আঁকার জন্য রং কেনার পয়সা তাঁর ছিল না। পিকাসো তখন শুধু নীল রং দিয়েই ছবি আঁকতেন। তাঁর এ সময়কে বলা হয় ‘ব্লু প্রিয়ড’। পিকাসো বলতেন, ‘আমার আবেগ কোনো রঙের অপেক্ষায় থাকে না। আমার যখন হলুদ রং থাকে না, তখন শুধু নীলেই আঁকতে পারি।’ কিন্তু এসব নীল চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হলে স্পেনীয়রা ছবিগুলোর তুমুল সমালোচনা করে। মাত্র একজন বরেণ্য ছিলেন, যিনি চিত্রকর্মগুলোর প্রশংসা করেছিলেন। প্যারিসের প্রখ্যাত কবি ম্যাক্স জেকব এসব ছবি দেখে বলেছিলেন, ‘শিল্পীই যথার্থ নিরীক্ষণ করে চলেছেন সময়। তাঁর হাতে জন্ম নিচ্ছে নতুন শিল্প-শিল্পের নতুন ভাষা।’ মাত্র কবছর পরেই বিশ্ব দেখল জেকবের কথা সত্যি হয়েছে। শিল্পী পিকাসো খুঁজে পেয়েছেন শিল্পের নতুন ভাষা। মূলত নীল রঙে আঁকা পিকাসোর ছবিগুলো ধারণ করেছিল অন্য এক প্যারিসকে। কী ধারণ করে আছে এসব ছবিতে, সে সম্পর্কে মইনুদ্দীন খালেদ লিখেছেন, ‘অন্ধ-ভিখিরি, নগ্নপ্রায় পাগল, চোখে ছানিপড়া বৃদ্ধা, মধ্যরাতের করুণ পতিতারা নীল পর্বে পিকাসোর মডেল। নিজের নীল ঘরটা, অদূরের ভূদৃশ্যও নীলে এঁকে নীলের ক্ষমতায় নিজের শৈল্পিক প্রতিভার পরিচয় বিধৃত করলেন শিল্পী। বেদনায় মুহ্যমান নিজেকেও আঁকলেন তিনি। সেই আত্মপ্রকৃতির দিকে তাকালে মনে হয়, শিল্পীর চোখের পাতায় রাতের নীল কুয়াশা জমে আছে। অস্তিত্বের এক নীলার্তি প্রকাশ পেয়েছে এসব ছবিতে।’
১৯০০ সাল থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত চলে পিকাসোর ‘ব্লু প্রিয়ড’। পরবর্তী সময়ে খ্যাতি কুড়ানো ও দারিদ্র্য ঘোচানোর পাশাপাশি প্রেমিকাও জুটিয়ে নেন পিকাসো। তাঁর প্রথম প্রেমিকা ‘ফার্নান্দে অলিভিয়ে’। অলিভিয়ের সান্নিধ্যে শুরু হয় পিকাসোর ‘রোজ প্রিয়ড’। এ সময় তিনি বিভিন্ন রঙে দম্পতি, প্রেমিক-প্রেমিকা, সার্কাসের মানুষ প্রভৃতিবিষয়ক ছবি আঁকতেন। অলিভিয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক সাত বছরের বেশি সময় থাকলেও পরবর্তী সময়ে পিকাসো আরও অনেক নারীকে প্রেমিকা হিসেবে গ্রহণ করেন। নতুন প্রেমিকার সান্নিধ্য পাওয়া মাত্রই পিকাসো আগের আঁকা থেকে বেরিয়ে এসে নতুনভাবে ছবি আঁকতেন। প্রত্যেক প্রেমিকাই নতুন কিছুর সৃষ্টির পথে পিকাসোর অনুভূতিকে ধাবিত করেছিল। ১৯০৪ সালে শুরু হয়ে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলে পিকাসোর ‘প্রণয় পর্ব’। তিনি এ সময়ে আটজন নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রেমিকাদের অভিযোগ ছিল, ‘পিকাসোর ব্যবহার উল্লেখ করার মতো নয়।’ তাঁর প্রেমিকা ফ্রাঁসোয়াজ জিলো পিকাসো সম্পর্কে লিখেছেন, ‘পাবলো অনবদ্য এক মানুষ, তার সঙ্গ আতশবাজির সঙ্গে থাকার মতো। পাবলো বিস্ময়কর ধরনের সৃজনশীল, মেধাদীপ্ত ও জাদুকরী ব্যক্তিত্বের মানুষ। তার মন যখন মোহিত করতে চায়, এমনকি পাথরও তার সুরে নাচতে চাইবে। কিন্তু পাবলো একই সঙ্গে অন্যের প্রতি নির্মম, মর্ষকামী ও নির্দয়, কখনো নিজের প্রতিও। পাবলো চাইত সবকিছুই তার ইচ্ছে অনুযায়ী হবে, নারীকে থাকতে হবে তার সেবায়। সে নারীর জন্য নয়। পাবলো ভাবত সে ঈশ্বর, কিন্তু সে তো ঈশ্বর নয়, এটা তাকে বিচলিত করত।’
প্রেমিকাদের চোখে প্রেমিক হিসেবে পিকাসোর ভিন্ন অবস্থান থাকলেও প্রতিবাদ ও ভিন্নস্বর হিসেবে তাঁর অবস্থান ছিল শক্ত। তিনি মনে করতেন, ‘চিত্রশিল্প হলো এমন এক মিথ্যা, যা আমাদের সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়।’ এমন চিন্তার কারণে সত্যের প্রতি পিকাসোর অবস্থান সব সময়ই ছিল অবিচল। শিল্পকে তিনি প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছেন বহুবার। পিকাসো নিজেই বলেছেন, ‘আমি সব সময়ই শিল্পকে মারণাস্ত্র ভেবে সময়ের সঙ্গে লড়াই করেছি। বিবেক, বুদ্ধি ও হৃদয় দিয়ে আমি এক এক করে শিল্প রচনা করি।’ এ ব্যাপারটি তাঁর প্রেমিকারাও স্বীকার করেছেন। ফ্রাঁসোয়াজ জিলো লিখেছেন, ‘আমার প্রজন্মের কাছে পিকাসো একজন নায়ক; পিকাসো গুয়ের্নিকা এঁকেছে। ফ্যাসিবাদ ও ফ্রাঙ্কোর রাজত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক এই ছবি। আমেরিকায় পালিয়ে না গিয়ে তখন প্যারিসে থাকা তার জন্য অসম সাহসের কাজ। যেকোনো দিন গ্রেপ্তার হতে পারত, অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার এটাই তার পথ।’ পিকাসো স্পেনের দুঃশাসক ফ্রাঙ্কোর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সব সময়ই সরব ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়ার জন্য ফ্রাঙ্কো-সরকারের ছাড়পত্র নিতে হবে বলে পিকাসো আর সেখানে যাননি। উল্টো তিনি ফ্রাঙ্কোর শাসনকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘ফ্রাঙ্কোর কাছ থেকে কাগজ নেওয়ার মতো ঘৃণ্য কাজ আমি করতে পারি না। আর আপনাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি যে পিকাসো নির্বাসনে আছে মানে স্পেন দেশটাই নির্বাসনে আছে।’ এমনই প্রতিবাদী ও সাহসী পিকাসো। চিত্রকর্মের পাশাপাশি তাঁর সাহসের প্রশংসাও করেন শিল্পবোদ্ধারা।
১৮৮১ সালে জন্ম নেওয়া পিকাসোর মুখের উচ্চারিত প্রথম শব্দ ছিল ‘পিজ’। স্পেনের ভাষায় যার অর্থ ‘পেনসিল’। মাত্র নয় বছর বয়সেই পিকাসো তাঁর প্রথম ছবি ‘এল পিকাদোর’ আঁকেন। প্রথমদিকে তিনি বাস্তবধর্মী ছবি আঁকতেন। কিন্তু তাঁর সেই ছবিগুলো ছিল বয়স্ক আঁকিয়েদের মতো। পিকাসো নিজেই বলতেন-‘শৈশবে আমি কখনো কোনো শিশুসুলভ ছবি আঁকিনি। বুড়ো হয়ে আমি শিশুদের মতো আঁকতে চেষ্টা করেছি।’ পিকাসো সারা জীবনে বিশ হাজারেরও বেশি ছবি এঁকেছেন। ‘ল্য মুঁল্যা দ্য লা গালেৎ’, ‘দ্য ব্লু রুম’, ‘ওল্ড গিটারিস্ট’, ‘সেলফ-পোর্ট্রটে’, ‘টু নুডস’, ‘থ্রি মুজিশিয়ানস’, ‘মডেল অ্যান্ড ফিশবৌল’, ‘গেয়ের্নিকা’, ‘উইমেন অব আলজিয়ার্স’ তাঁর আঁকা বিখ্যাত চিত্রকর্ম। একদিকে পিকাসো ছিলেন চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, প্রিন্টমেকার, মৃৎশিল্পী, মঞ্চ নকশাকারী, কবি, নাট্যকার; আবার অন্যদিকে তিনি ছিলেন কিউবিস্ট আন্দোলনের সহপ্রতিষ্ঠাতা, গঠনকৃত ভাস্কর্যের উদ্ভাবক ও কোলাজের সহ-উদ্ভাবক। ১৯৭৩ সালে ৯১ বছর বয়সে ফ্রান্সের মুগী শহরে এই ছবির জাদুকর মৃত্যুবরণ করেন।

Disconnect