ফনেটিক ইউনিজয়
অপেক্ষার একটি দিন
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

রুমে ঢুকেই জানালাগুলো বন্ধ করে দিলো ও। আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম, লক্ষ করলাম বেশ অসুস্থ দেখাচ্ছে ওকে, থরথর করে কাঁপছে পুরো শরীরটা। মুখ সাদা ফ্যাকাসে হয়ে আছে। ব্যথার কারণে ঠিকমতো নড়তে পারছে না, ধীরে ধীরে হাঁটাচলা করছে।
-কী ব্যাপার, স্কাজ?
‘মাথাটা ধরেছে একটু।’
-বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ো।
‘না, ঠিক আছে।’
-‘বলছি শুয়ে পড়ো, যাও। আমি কাপড় পাল্টে এসে যেন তোমাকে বিছানায় দেখি।’
কাপড় পাল্টে নিচে নেমে দেখলাম ফায়ারপ্লেসের পাশে নয় বছরের শিশুর মতো গুটিসুটি মেরে বসে আছে ও। মুখটা ভারী অসুস্থ দেখাচ্ছে। কপালে হাত দিয়ে দেখলাম, জ্বর।
-তোমার বিছানায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া উচিত, বললাম, খুব অসুস্থ তুমি।
‘আরে আমি ঠিক আছি তো,’ সে জানায়।
ডাক্তার এসে জ্বর মেপে দেখলেন।
-কেমন জ্বর?
‘এক শ দুই,’ ডাক্তার বললেন।
নিচে নামার সময় তিনি আমাকে তিন রঙের কতগুলো ক্যাপসুল বুঝিয়ে দিলেন। একটি জ্বর নিরাময়ের জন্য, একটি হজমের জন্য, বাকিটা অ্যাসিডিটির। বলেন, সামান্য ইনফ্লুয়েঞ্জা, এক শ চার ডিগ্রি পর্যন্ত ভয়ের কিছু নেই।
‘জ্বর। নিউমোনিয়া না হতে দিলে আপাতত ঘাবড়ানোর দরকার নেই,’ বললেন তিনি। ডাক্তার চলে গেলে এসে ওর তাপমাত্রা মেপে দেখলাম, ওষুধ খাইয়ে দিলাম, হিসাব করে রাখতে নোটে টুকে রাখলাম সময়গুলো।
-আমি কি তোমাকে একটা বই পড়ে শোনাব?
‘শোনাতে পারো,’ সে জানায়।
ওর মুখটা সাদা ফ্যাকাসে হয়ে আছে, চোখের নিচে কালি। বিছানায় শুয়ে আছে চুপচাপ। একটা বই টেনে নিয়ে পড়ে শোনাতে লাগলাম আমি। লক্ষ করলাম আমার কথায় তার মন নেই। খেয়াল অন্য কোথাও পড়ে আছে।
-স্কাজ, কেমন লাগছে এখন?
‘আগের মতোই, খুব একটা ভালো লাগছে না,’ বললো সে।
বিছানায় বসে বইটি পড়ছিলাম। সেটা রেখে দ্বিতীয়বার ক্যাপসুল খাইয়ে দিলাম ওকে। তারপর অপেক্ষা করতে থাকি ওর অবস্থার উন্নতি হয় কি না দেখতে। ঘুমিয়ে পড়া উচিত ওর। অথচ ভাবলেশহীন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে তখনো।
-ঘুমাচ্ছ না যে? ওষুধ খাওয়ানোর সময় এলে আমিই জাগিয়ে দেব তোমাকে। চোখ দুটো বন্ধ করে শুয়ে থাকো, ভালো লাগবে। ঘুম এলে ঘুমিয়ে পড়ো।
‘না। জেগেই থাকি,’ জবাব দেয়। একটু পর বলল, ‘তোমার অসুবিধে হচ্ছে? তুমি চলে যাও তাহলে।’
-না, আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
‘তোমার বোরিং লাগবে এখানে। তুমি যেতে পারো, অসুবিধা নেই।’
ভেবেছিলাম মাথা ধরাটা বুঝি কমে এসেছে। এগারোটা নাগাদ দ্বিতীয় ক্যাপসুলটা খাইয়ে দিয়ে আমি বেরিয়ে গেলাম।
ঠান্ডা দিন, উজ্জ্বল, বাইরে পথঘাটগুলো সব বরফে ঢাকা। দেখে মনে হবে পাতাশূন্য গাছ, ঝোপঝাড়, ঘাস সবকিছুর ওপর কোনো চিত্রশিল্পী বরফের কারুকাজ করে দিয়ে গেছে। আমার আইরিশ কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে বের হলাম। কিন্তু পথঘাটের এমন অবস্থা, ঠিকমতো হাঁটাই মুশকিল। পিচ্ছিল রাস্তাঘাটে আমার কুকুরটা বারবার পিছলে যাচ্ছিল, এমনকি আমিও দুবার পড়তে পড়তে রেহাই পাই। তাই বেশিক্ষণ বাইরে থাকা গেল না, একটু হাঁটাহাঁটি করে বাসায় ফিরে আসি। বাসায় এসে অন্যদের কাছে শুনলাম স্কাজ কাউকে তার ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না।
আমি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘এসো না। তুমিও অসুখে পড়বে।’
ওর কাছে গেলাম, যেভাবে রেখে গিয়েছিলাম, সেভাবেই শুয়ে আছে। মুখটা আরও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে জ্বরের কারণে। ওর তাপমাত্রা মেপে নিলাম আবার। ‘কত?’
-‘এক শর মতো,’ বললাম। ওর জ্বর তখন এক শ দুইয়ের সামান্য বেশি।
‘এক শ দুই,’ সে বিষণœ মুখ করে বলে। ‘কে বলল?’
-ডাক্তার। এই তাপমাত্রা এমন কিছু না, চিন্তার কিছু নেই।
‘আমি ভয় পাচ্ছি না কিন্তু ভাবনা থামাতে পারছি না।’
-ভেবো না। ঠিক হয়ে যাবে।
‘আমি স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছি,’ নিজেকে প্রাণপণে দৃঢ় করার চেষ্টা করল।
-এটা খেয়ে নাও পানি দিয়ে।
‘তোমার কী মনে হয়, এতে কোনো উপকার হবে?’
-নিশ্চয়ই।
আবার বসে পড়লাম, জলদস্যু নিয়ে একটা গল্পের বই পড়ে শোনাতে থাকি ওকে। কিন্তু এবারও লক্ষ করলাম সে গল্প শুনছে না। ওর খেয়াল অন্যদিকে। থামলাম।
‘তোমার কী মনে হয় বাবা, আমি কখন মারা যাব?’ সে জিজ্ঞাসা করে।
-কী?
‘আমার মারা যেতে আর কত দেরি?’
-তুমি মারা যাচ্ছ না। এ কথা কেন মনে হলো তোমার?
‘হ্যাঁ, আমি মারা যাচ্ছি। আমি ডাক্তারকে বলতে শুনেছি, আমার জ্বর এক শ দুই ডিগ্রি।’
-এটা খুব বোকার মতো কথা হলো। মানুষ এক শ দুই ডিগ্রি জ্বরে মারা যায় না।
‘আমি জানি, যায়। স্কুলে সবাই বলত, কেউ চুয়াল্লিশ ডিগ্রিতেই বাঁচতে পারে না। আর দ্যাখো, আমার এক শ দুই ডিগ্রি তাপমাত্রা।’
হেসে ফেললাম, মায়াও হলো ওর জন্য। আমার ছেলেটা এই ভেবে সারা দিন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, সেই সকাল নয়টা থেকে।
-ওহ্ স্কাজ! বেচারা, এটা মাইল ও কিলোমিটারের হিসেবের মতো। তুমি মারা যাচ্ছ না। ওটা থার্মোমিটারের অন্য এককের হিসাব। ওই থার্মোমিটারে সাঁইত্রিশ ডিগ্রি হচ্ছে স্বাভাবিক। সেখানে কেউ চুয়াল্লিশ ডিগ্রিতে টিকতে পারে না। আর তোমার জ্বর মাপা হয়েছে অন্য থার্মোমিটারে। এখানে আটানব্বই হচ্ছে স্বাভাবিক তাপমাত্রা। বুঝলে?’
‘তুমি নিশ্চিত?’
-অবশ্যই, ব্যাপারটা মাইল ও কিলোমিটারের হিসাবের মতো। তুমি জানো, আমাদের গাড়িতে সত্তর মাইল গেলে তা কত কিলোমিটার হয়!
‘ওহ, আচ্ছা,’ সে বলল।
বিছানায় পা দুটো স্বস্তির সঙ্গে মেলে দিল। স্বস্তি ফিরে পেল শেষমেশ। বেচারা! পরদিন লক্ষ করলাম অনেক ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কেঁদে ফেলছে সে। সেসব নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বহীন।
ভাষান্তর : রনক জামান

Disconnect