ফনেটিক ইউনিজয়
লিয়েফ তলস্তোয় : মানবদরদি মহত্তম শিল্পী
ফারুক সুমন

পুরো নাম লিয়েফ নিকলায়েভিচ তলস্তোয় (১৮২৮-১৯১০)। সংক্ষেপে তাঁর নাম লিয়েফ তলস্তোয়। যাঁকে রুশ-সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। যিনি বর্ণাঢ্য ব্যক্তিজীবন ও বিস্ময়কর শিল্প-সাফল্যের স্রষ্টা হিসেবে উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম শিল্পের রূপ-রস-গন্ধকে ধারণ করে হয়েছে কালোত্তীর্ণ। বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের সারিতে যাঁর অবস্থান মহাকাব্যিক ব্যাপকতা নিয়ে। তাঁর শিল্পপ্রতিভা বৈশ্বিক সাহিত্য পরিম-লে সর্বজনস্বীকৃত। লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন মানবতাবাদী লেখক। এই মানবতা তিনি কেবল গল্পের প্লটেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। নিজের যাপিতজীবন ছিল মানবপ্রেমের অসামান্য নিদর্শন। তিনি চেয়েছেন একজন ‘মুঝিক’ তথা চাষির মতো মৃত্যু। বিলাসী জীবন ছেড়ে নিতান্তই সাদামাটা জীবনে অন্বেষণ করেছেন জীবনের মর্মার্থ। ব্যক্তিগত জীবনবোধ ও শিল্পসত্তার গভীর স্তরে পাঠককে তিনি নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। বাস্তব জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিচরণ করে তিনি তুলে আনেন শিল্পের রসদ। বিচিত্র জীবনাভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছেন তিনি। ফলে তাঁর সাহিত্য সর্বস্তরের মানুষকে সমানভাবে ¯পর্শ করেছে। তিনি ক্ষণকালের এই সীমাবদ্ধ জীবনকে মানবকল্যাণে নিয়োজিত রেখে সফল জীবনের অনুসন্ধানে সদা নিমগ্ন ছিলেন। তৎকালীন জার-শাসিত রাশিয়ান সমাজে সুবিধাবঞ্চিত চাষিদের সপক্ষে তাঁর ভূমিকা ছিল অবাক করার মতো। ভূমিদাসদের মুক্তির কথা এসেছে তার উপন্যাসে। তাঁর কালজয়ী সাহিত্যকর্ম  ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ ‘আন্না কারেনিনা’, ‘পুনর্জন্ম’ এবং ছোটগল্পগুলোর বিষয় ও চরিত্রে মানবমুক্তির কথাই লক্ষ্যে-অলক্ষে ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর মতো করে শিল্প ও জীবনের যৌথ উপস্থাপন সাহিত্যে কমই দেখা যায়।
‘শিল্পের জন্য শিল্প’ তথা ‘কলাকৈবল্যবাদ’ সাহিত্য সৃষ্টিতে লিয়েফ তলস্তোয় এমন বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ ছিলেন না। তাঁর লেখা ডযধঃ রং অৎঃ’ ১৮৯৮ গ্রন্থেও এর সপক্ষে তাঁর ভাষ্য রয়েছে। তিনি মনে করেন, ‘শিল্পসৃষ্টির মৌলিক শর্ত হলো : শিল্পীর চেতনায় কিছু একটা নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ধারণা জাগতে হবে এবং সে জন্যই অতীতকালের মতো ভবিষ্যতের প্রকৃত শিল্পীকে স¤পূর্ণ নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা অনুভব করতে সক্ষম হতে হবে কিংবা যা পূর্বে কেউ দেখেনি, অনুভব করেনি, কল্পনা করেনি, অনুভূতির গভীরতা দ্বারা শিল্পী যখন তাকেই সবার কাছে ¯পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেন, তখনই জন্ম হয় একটি যথার্থ শিল্পকর্মের।’ তাঁর এই দেখা ও অনুভবের জায়গা ছিল বাস্তব প্রতিবেশ ও মানুষ। তৎকালীন জারশাসিত রাশিয়ায় শতকরা ৯০ জন মানুষ শ্রমজীবী কৃষক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যাঁদের ‘নুন আনতে পানতা ফুরায়’ অবস্থা। তাঁরা কী করে শিল্প পড়ে বিনোদিত অথবা সচেতন হবেন? তাঁদের কাছে আর যা-ই হোক, শুদ্ধ সংস্কৃতির প্রকাশ আশা করা বাতুলতা নয় কি? তাই আগে প্রয়োজন সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির অর্থনৈতিক মানোন্নয়ন ও মুক্তি। মূলত এই অন্তর্তাড়না থেকেই একজন ধ্রুপদি লেখক হয়েও ব্যক্তিগতভাবে সক্রিয় হয়ে নেমে পড়েছেন মানবকল্যাণে। জীবনী পড়ে জানা যায়, তিনি নিজ উদ্যোগে বেশ কিছু জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। যেমন ক. তিনি নিজ খরচে স্কুল খুলেছেন। যেখানে চাষি ও সুবিধাবঞ্চিতদের নিজেই পাঠদান করতেন। খাবারের ব্যবস্থা করতেন। তাদের জন্য উপযোগী পাঠ্যবই প্রণয়ন করেছেন। খ. অভিজাত পরিবারের একজন হয়েও কেবল মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেই লাঙল চালাতে শিখেছেন। অক্ষম ও অসহায়দের জমি নিজেই চাষ করে দিতেন। গ. নিরন্নদের জন্য নিজ উদ্যাগে লঙ্গরখানা খুলে দিয়েছেন।
একজন মহৎ শিল্পীর জীবনদর্শন কখনো এক জায়গায় থিতু থাকেনি। নিরন্তর ভাবনার স্তরে স্তরে বিচরণ করে আবিষ্কার করেছেন মানবপ্রেমের উজ্জ্বল বাতিঘর। শিল্পচর্চা ও জীবনচর্যা উভয় ক্ষেত্রেই তিনি মানুষের সংকটে নতজানু। ভূস্বামী শ্রেণির হয়েও গরিব চাষাভূষাদের আর্থিক অনটন তিনি সহ্য করতে পারেননি। অধিকার বঞ্চিতদের পক্ষে, সাম্যের পক্ষে তাঁর শিল্পসৃজন ও কণ্ঠস্বর সদা উচ্চকিত ছিল। ফলে, তলস্তোয়কে অকপটে ‘রুশ বিপ্লবের দর্পণ’ বলতে দ্বিধা করেননি বিপ্লবী লেনিন। মূলত তাঁর জীবনদর্শনের স¤পূর্ণ বিপরীত ছিলেন স্ত্রী সোনিয়া। পারিবারিক অশান্তির কারণ দর্শনগত বৈপরীত্য। পার্থিব মোহ ত্যাগ করে সাধারণের জীবনযাপন স্ত্রী সোনিয়ার কিছুতে প্রত্যাশিত ছিল না। প্রসঙ্গক্রমে স্ত্রীকে উদ্দেশ করে লেখা একটি চিঠির কিয়দাংশ উল্লেখ করছি। যেখানে ব্যক্তিক তলস্তোয়ের একান্ত কথা জানা যাবে।

‘প্রিয় সোনিয়া,
অনেকদিন যাবৎ আমার জীবনের সাথে, আমার ধর্মবিশ্বাসের অসামঞ্জস্যতা আমাকে পীড়া দিচ্ছে। নিজের জীবনও  অভ্যাস, যার প্রতি আমি নিজেকে অভ্যস্থ করিয়েছি। তা আমি আপনাকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হইনি।
যে পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা ছোট থাকবে, আমি তাদের বঞ্চিত করব-এই ভেবে এ পর্যন্ত আপনার কাছ থেকে সরে যেতেও পারিনি। তাই অনেক আগেই যা করতে চেয়েছিলাম, সেই সিদ্ধান্তই এখন নিয়েছি। তা হচ্ছে, সরে যাওয়া। হিন্দুরা যেমন ষাট বছরের কাছাকাছি সময়ে বানপ্রস্থ অবলম্বন করে, সব ধর্মপ্রাণ বৃদ্ধই যেমন হাসি-ঠাট্টা, শ্লেষ, কুৎসা, টেনিস খেলা প্রভৃতির পরিবর্তে জীবনের অন্তিম বৎসরসমূহ ঈশ্বরকে উৎসর্গ করেন, আমারও। তেমনি সত্তর বছরে পা দিয়ে প্রশান্তিও একাকিত্ব পেতে ইচ্ছে করছে। এ জন্য আমার এমন আচরণ যদি তোমাকে ব্যথা দেয়, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবে। তোমাকে আমি কোনো দোষ দিই না বরং ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি আমাদের জীবনের দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর। আমার পদাঙ্ক অনুসরণ না করার জন্য তোমাকে আমি অভিযুক্ত করতে পারি না এবং তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। তুমি আমাকে যা দিয়েছ ভালোবাসার সঙ্গে তা স্মরণ করছি এবং স্মরণ করব’ (মূল রুশ ভাষা থেকে চিঠিটি অনুবাদ করেছেন ড. দিলীপ কুমার নাথ)। সমকালীন যুগ-যন্ত্রণা তলস্তোয়ের সাহিত্যকর্মে উপস্থাপিত হয়েছে বাস্তবতার নিরিখে। শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রচলিত ধর্মগুলোকে পুঁজি করে একশ্রেণির মানুষের স্বার্থোদ্ধার এবং আইন-আদালত ইত্যাদির বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারণ ছিল ¯পষ্ট। এ ছাড়া ওই সব প্রতিষ্ঠানকে তিনি সমালোচনা করেছেন। যেগুলো আধুনিকতার তকমা দিয়ে নিজেদের আরাম-আয়েশ ও ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী জারি রাখে। তলস্তোয়ের সাহিত্যকর্ম পড়ে রুশ শ্রমিক শ্রেণি অধিকার-সচেতন হয়েছে। ‘কে শত্রু আর কে মিত্র’, সে স¤পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেয়েছে। সর্বোপরি লিয়েফ তলস্তোয় ছিলেন মানবদরদি মহত্তম শিল্পী।

Disconnect