ফনেটিক ইউনিজয়
রস-বিরসের কাল
রবিউল করিম মৃদল

ঘুটঘুটে জমাট কুয়াশা চারদিকে। পাঁচ হাত দূরে দেখা যায় না। যেন একটা মখমলে সাদা চাদরে ঢেকে আছে গাছগাছালি-বন। চুপ করে জড়সড় হয়ে চারপাশটা বসে আছে সাদা তাঁতের শাড়ি পরা শতবর্ষী বিধবার মতো। উত্তাপ নেই, উচ্ছ্বাস নেই। পেঁজা পেঁজা তুলো তুলো কুয়াশা চারদিকে। এমন ঘোর কুয়াশার মধ্যে চোখমুখ আঁচলে ঢেকে সমস্ত ঠান্ডা পেছনে ফেলে সরিষা ক্ষেতের ভেতর থেকে উঠে এল এক নারী। তার চোখের ভ্রুতে জমেছে শিশির, ছোট ছোট জলকণা। দুই পা খালি। ভেজা দূর্বা ঘাসের ওপর ছোপ ছোপ পা ফেলে মাঠ থেকে উঠে এল ঘাটে। শাড়ি হাঁটুর একটু নিচ বরাবর উঁচু করে এক প্যাঁচে পরা। বয়স আন্দাজ করা গেল না তার। কেউ তারে চিনতেও পারল না। যতক্ষণ না খয়বরের বাপ তারে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করল- ‘এই কুয়াশার মধ্যে কোইত্থিকা হাজির হইলা জমিলা? শীত লাগে না গায়ে? এতকাল ডুব দিছিলা কই?’ নারীটিকে আমাদের গ্রামের সবাই জমিলা বলে চিনল। অবশ্য খয়বরের বাবার প্রশ্নের কোনো উত্তর সে করেনি। এই ভোরবেলায় ঘন কুয়াশার ভেতর সরিষাক্ষেতের আল বেয়ে সে কোত্থেকে এল, তা অজানাই থেকে গেল। খয়বরের বাপ সাঁজাল জ্বেলে আগুনে হাত-পা সেঁকতে সেঁকতে কাচের আধসেরি গ্লাস ভর্তি করে খেজুর রস আর মুড়ি খাচ্ছিল। জমিলাকেও জিজ্ঞেস করল, ‘রস খাইবা?’ জমিলা এবারও কোনো উত্তর করল না। হাজার বছর ধরে অনবরত দেখতে থাকা ঘোলাটে দুটি চোখে তাকল তার দিকে। সে খাবে খেজুর রস? এই সারা গাঁয়ের সমুদয় গাছের সমুদয় রস একত্র করলে যা পরিমাণ হয়, তারও অধিক রস এককালে ছিল জমিলার। খয়বরের বাবারা কত হাঁড়ি নিয়ে ছুটত তখন এক ফোঁটা রসের আশায়। জমিলা কাউকে দেয়নি। যাকে দিয়েছিল, সেই সয়ফুল তার কদর বোঝেনি। তারপরই না নিরুদ্দেশ হলো জমিলা। গায়ের রক্ত ঠান্ডা হওয়া এক শীতের রাতে। তারপর কেটে গেছে কত দিন অদিন। জমিলার দেখা নেই। বহুকাল বাদে, আবারও এই শীতে জমিলা সরিষাক্ষেতের কুয়াশা ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। খালি পা। গায়ে এক প্যাঁচে পরা শাড়ি। রস এখন আছে কেবল খেজুরগাছে। বেরসিক গাছির হাতে পড়ে জমিলা এখন শুষ্ক মরুভূমি! এই দেশেরও অবস্থা অনেকটা জমিলার মতো!

Disconnect