ফনেটিক ইউনিজয়
আগুন
মাহবুব আলী

ঠাস ঠাস ঠাস। সাতসকালে কাঠ ফাঁড়ছেন রাবেয়া বেগম। পুরোনো আলনা। কয়েকটি দিন না হয়, ক’খানা কাপড় বিছানার কোনায় বা এদিক-ওদিক গড়াবে। উপায় নেই। উনুনের পেট খড়ি খায়। আগুন জ্বলে। মানুষের পেট খাবার খায়। সেখানেও আজ আগুন। আগুনের জন্য এত কিছু। লোকটি কোথায়? ভোরে বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন। সারা রাত ধরতে গেলে না খাওয়া। গতকাল অনেক রাতে যখন ফিরে এলেন, রাবেয়া বেগম যেটুকু ছিল ভাত বাড়েন। রাত কোনোমতো চলে যায়। কাল কী হবে কে জানে। কী তুলে দেবেন পাতে, জানেন না। সুখলতা যা দিয়ে গিয়েছিল সব শেষ। এরপর গতকাল ভোরে পাশের বাড়ি থেকে কিছু চাল, চারটি আলু ধার করা হয়েছে। রান্নাঘরের কৌটায় তারই দু-তিন মুঠো চাল। সকালে ফুটিয়ে নেবেন। এসব ভাবতে ভাবতে ভাত বাড়েন রাবেয়া বেগম। লোকটি টিউবওয়েলে গিয়ে হাতল চেপে চেপে ঢক ঢক করে পানি খান। পানিতে পেট ভরালে খাবেন কী? রাবেয়া বেগম অবাক হন না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন। তারপর লোকটি ঘরে এসে বলে বসেন, খাবেন না, অ্যাসিডিটি করছে। রাবেয়া বেগম সব বোঝেন। কিছু বলেন না। শুকনো মরিচ পোড়া, লবণ আর আধটুকরো পেঁয়াজ দিয়ে ভাত মাখেন। লোকটির মুখে তুলে ধরেন। ‘একটু মুখে দাও, না হলে আমি কী করে খাই।’ ‘তুমি সেই রীতি এখনো ধরে আছ রাবেয়া?’ রাবেয়া বেগম ধীরে ধীরে কয়েক গ্রাস তার মুখে তুলে দেন। এইটুকু বাহানা না করলে চলছিল না। তাকানো যায় না মুখের দিকে। এই ক’মাসে শরীর ভেঙে গেছে। শুকিয়ে কাঠ। তবু যাহোক কোনোমতো আধপেটা হলো। তারপর রাতভোর এপাশ-ওপাশ। ঘুমাতে পারেন না। মনে শান্তি না থাকলে ঘুম আসে? কিন্তু কী করা যায়? কোনো সমাধান নেই। হয়তো আছে। হাতড়ে খুঁজে মিলছে না। এই ভেবে ভেবে সকাল। তখন দুচোখজুড়ে মড়ার ক্লান্তি নেমেছে। রাবেয়া বেগম বুঝলেন, লোকটি বেরিয়ে গেল। তিনিও উঠলেন। সারা জীবনের অভ্যাস। অথচ এখন কী করবেন? মাথা গুলিয়ে গেল। সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে। সকালের বাতাস পরিশুদ্ধ। মুক্ত। তার মনে ভাবনার জট। কোনো খেই খুঁজে পাচ্ছেন না। অবশেষে ঘর থেকে আলনা বের করে বসেছেন। খড়ির জোগাড় করতে হবে। চালটুকু লবণ দিয়ে মাড়ভাত করে রাখবেন। লোকটি ফিরে এলে খাবেন।
সুখলতা এই তো কয়েক দিন আগে গামলায় করে ভাত-তরকারি দিয়ে যেত। প্রথম প্রথম খুব লজ্জা লাগত রাবেয়া বেগমের। পাশের বাড়ির অমিতের বউ। ভারী মায়াময় মুখ! বলে, ‘কাকি আপনে আমার মা। স্যার আমার বাবা। আপনারা কদিন ধরে না খেয়ে আছেন, একদম জানি না। আজ থেকে আমার এখানে খাবেন।’ ‘সে কি কথা মা? তোমার কাকা তো কাজের চেষ্টা করছে। তা ছাড়া ঊর্মির বাবা কী বলবে?’ ‘সে ভাবনা আমার। স্যারের কাজ হোক, তারপর নাহয় দেখা যাবে।’ ‘কিন্তু মা ও কী বলবে?’
‘কিছু বলবে না, বাবা ডেকেছি না গো কাকি, না না আপনে আমার মা।’ রাবেয়া বেগম কত সহজে মেয়ে পেয়ে গেলেন। তাঁর দৃষ্টি শুকিয়ে গেছে। মনের মধ্যে কান্নার প্লাবন। আহা কোন মায়ে এমন লক্ষ্মী পেটে ধরেছেন গো...সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণা। আর তাঁর ছেলেকে দেখো, বউয়ের কথায় উঠে আর বসে। আজ এক মাস কুড়ি দিন হয় চলে গেছে, কোনো খোঁজখবর নিল না। তাঁরা দুজন মানুষ বেঁচে আছেন নাকি মরেছেন, কী খাচ্ছেন, না অনাহারে, কোনো খবর নেয় না। বউ-বাচ্চা নিয়ে শহরে থাকছে। বেশি দূরের পথ তো নয়। একবার খোঁজ নিতে পারে না? এমন করেই কি রক্তের সম্পর্ক মিলিয়ে যায়? সেদিন চলে যাওয়ার আগে কানচুপি ফিসফিস করে শুধু দুটো কথা বলে, ‘ড্রামে চাল-ডাল থাকল। সবজি আর বাজারও আছে। এ টাকা কয়টি রাখো, দরকারি যা লাগে কিনে নেবে। আমি পরে এসে খরচ দিয়ে যাব।’
তুই কোথায় যাবি?
মলির মা থাকতে চায় না। এখানে বিদ্যুৎ নেই, ফ্যান নেই, টিভি নেই। গ্রামের ছেলেমেয়েরা আজেবাজে কথা বলে, গালিগালাজ করে। মলি এসব নোংরামি শিখবে। তাকে তো মানুষ করতে হবে নাকি?
শহরে কোথায় থাকবি?
ওর এক মামার বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে।
ও!
রাবেয়া বেগম কথা বাড়ান না। যে ছেলে বুড়ো মা-বাবাকে ফেলে রেখে যায়, তাকে কী বলবেন? যা বলার বা বোঝার সব পাঠ শেষ। মঈনের উপায় নেই। বউ গ্রামে থাকতে চায় না। তাই ছেলের কষ্ট। তার মনে দুঃখ দিতে চান না। অনেক আদর-যত্নে মানুষ করেছেন। সে ছেলে মানুষ হয়েছে নাকি অমানুষ, মনের দোলাচল এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু পারলেন কই! পরে হাতের মুঠো খুলে দেখেন, দুই শ টাকা। এ না দিলেও পারত সে। সন্ধ্যায় ফিরে এসে হতবাক বিহ্বল হলেন লোকটি। অবসরে যাওয়ার সাত মাস পেরিয়েছে। অন্য কোথাও কাজের সন্ধান চলছে। এখানে-ওখানে ছুটে যান। অনুরোধ-উপরোধ করেন। কাজ চাই। যে লোক মাস গেলে হাতে কিছু টাকা পেতেন, হোক না সেটি অনিয়মিত; এক টুকরো নিশ্চিত আশা দৃষ্টিতে ছিল। সেটি নিভে গেছে। মিলিয়ে গেছে। এখন কিছু নেই। হতাশার অন্ধকার বুকে চেপে রেখে কাজ খোঁজেন। কিন্তু কেউ কাজ দেয় না। যেখানে শত শত জোয়ান কর্মঠ মানুষ বেকার পড়ে আছে, তাঁর মতো ধীরগতি বুড়োর জায়গা কোথায়? তবু চেষ্টা চলে। আর সেই চেষ্টায় এর মধ্যে আরও বুড়িয়ে গেলেন। রাবেয়া বেগম কখনো লোকটির দিকে তাকিয়ে ঘাবড়ে যান। কোনদিন কী হয় কে জানে! কোনো সঞ্চয় নেই। সম্পদ নেই। স্কুলে মাস্টারি আর আশায় আশায় দিন গোনা জীবন। অভাব আর অসচ্ছলতা ছাড়া কী জমা থাকে? কখনো দমকা বাতাসে ভাবনার ঢেউ জাগে মনে। যে মানুষের জোয়ান ছেলে থাকে, ভয় কিসের? কিন্তু স্বস্তি খুঁজে পান না। দেখেছেন কত দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায় সবকিছু। নিজ রক্তের রং বদলায়। এই মানুষের জীবন! লোকটি হয়তো ভেবে ভেবে কোনো টুঁ শব্দ করেন না। তারপর সে রাত, অনেক অন্ধকার; লোকটি ফিরে এসে উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে আক্ষেপ করে বসেন, ‘আমাদের কার কাছে রেখে গেল মঈনের মা?’ রাবেয়া বেগম কী বলেন? নিজের মনকে প্রবোধ। ভালো সন্তান পেটে ধরেছেন বটে!
সুখলতা আসে। দুদণ্ড গল্প করে যায়। মেয়েটির মুখে সব সময় হাসি। বড় আদুরে কথাবার্তা। রাবেয়া বেগম দুচোখ ভরে দেখেন। ভাবেন, আহা তার যদি একটি মেয়ে থাকত! সুখলতা ভাগ্যবতী। স্বামীকে রাজা বানিয়ে নিজে রানি হয়েছে। অমিত সামান্য লেদ-মেসিন মিস্ত্রি, অথচ...। আর তার মঈন? বউ তাকে দাস বানিয়েছে। আঙুলের ছড়িতে হুকুম করে। সেই শাসনে লেজ নাড়ে মঈন। তার ছেলে। এ কেমন করে হলো? কেন হলো? শুকনো ঘুণেধরা কাঠ। কোথাও ভালো কোথাও নষ্ট। ঝুর ঝুর করে হলুদ গুঁড়ো ঝরে যায়। এই ফাঁকে চোখ পড়ে ছেলের ঘরে। নতুন একটি তালা চকচকে আলোয় উপহাস ছড়িয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়। অগত্যা আবার দুয়ার আঙিনায় মন ছুটে যায়। লোকটি ফেরেন নাই। এখনো কাজ জোটেনি। দিন পাঁচেক হয় দুটো টিউশনির কাজ পাওয়া গেছে। দুপুর থেকে বিকেল, তারপর সন্ধ্যা; দুই জায়গায় ছুটতে হয়। এই শরীরে হাঁটা বেশ কষ্ট। হাঁটু আর কোমরে ব্যথা। উপায় কী? বেঁচে থাকতে হলে কিছু টাকা লাগে। কে দেবে তাকে? চাকরি জীবনে কোনো দিন যা করেননি, ভালো লাগত না; এখন পারবেন কেন? এর মধ্যে কোনো দিন ফিরে এসে ঘর্মাক্ত আক্ষেপ, ‘পারি না...এখনকার পড়ালেখা পারি না। অঙ্কের নিয়মকানুন ভালো বুঝি না রাবেয়া।’ ‘কোথাও কাজ পেলে ছেড়ে দেবে, এ ছাড়া করবে কী?’ রাবেয়া বেগম নিজের মধ্যে সান্তনা খোঁজেন। অঙ্ক না বুঝলে জীবন চলে কী করে? বেঁচে থাকা তো হিসাবের নিয়মকানুন। সে নিয়ম মানেননি। অবহেলা করেছেন। এখন তার খেসারত। এই বয়সে অন্য কোথাও কবে কাজ পাবেন কে জানে! অভিজ্ঞতার সঞ্চয় থাকলেও অঙ্ক না জানায় ‘সকলি গরল ভেল’। অনেক কিছু বুদ্ধিতে ধরা দেয় না। শরীর-মনজুড়ে ক্লান্তি আসে। শক্তি নেই। কাজের ভারী বোঝা টানতে পারেন না। পাগলের মতো বিশ্রাম খুঁজে পেতে চায় মন। তারপর, যে বয়সে ছেলের কাঁধে হাত রেখে হাঁটবেন, সেই ভরসা নেই। শুকনো মুখে ঘর থেকে বের হন, ফিরে আসেন আরও বিষণ্ন শুষ্ক। রাবেয়া বেগম একপলক তাকিয়েই বোঝেন, কোনো খবর নেই। সুখবর তো নয়। তেত্রিশ বছর হয়ে গেল একসঙ্গে পথ চলার। প্রতিটি স্পন্দন যে চেনা। এখন কবে কখন কার হাত ছুটে যায় কে জানে। তার বুক থেকে খুব জোরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। আঁতকে ওঠে মন।
সুখলতা এক সপ্তাহের বেশি হলো নেই। বাপের বাড়ি গেছে। যাওয়ার আগে এসে বলে, ‘মা এগুলো রাখো। কষ্ট করে রেঁধে নিয়ো গো, মায়ের অসুখ, দেখে আসি। পরশু কিংবা দুটি দিন থেকে আসব। বাবার তো কাজ জোটেনি না?’ ‘না মা।’ ‘আসি মা, দোয়া কোরো।’ সুখলতা তড়িঘড়ি বলতে বলতে জোর করে হাতে কিছু গুঁজে দেয়। টেবিলের ওপর বড় গামলা। নিশ্চয় ওতে চাল আর সবজি রয়েছে। রাবেয়া বেগম প্রাণভরে দোয়া করেন। অভাব মানুষকে বড় অসহায় করে দেয়। ভিক্ষে নিতে কী! স্বভাব ভেবে কী! মনের মধ্যে খাঁ খাঁ করে রোদের দুপুর। শজনের ডালে একটি কাক থেকে থেকে তারস্বরে চিৎকার করে ওঠে। তার দুচোখ ভিজে যায়। সেখান থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়বে নাকি? নিজেকে খুব যত্নে আড়াল করার চেষ্টা করেন। সুখলতা ফেরেনি। নিশ্চয় মায়ের অসুখ বেড়েছে। খোদা এমন ভালো মানুষের অসুখ সারিয়ে দাও। বড় ভাগ্যবতী মহিলা। রত্নগর্ভা মা। যদি কপালে থাকে একবার তাঁর মুখ দেখতে ইচ্ছে হয়। লোকটি এখনো ফেরেননি। ঘরে কিছু নেই। সকালে কিছু মুখে দেবেন, নেই! সামান্য দুমুঠো চাল পড়ে আছে। রাবেয়া বেগম ভাবেন, ওইটুকু ফুটিয়ে দিলে তবে মানুষটির খাওয়া হয়। কত দিন কত মাস ভালো কিছু জোটে না। সব সময় ভালো খাবার। যা রোজগার করতেন, ভালো খেয়ে শেষ। কোনো সঞ্চয় নেই,  হয়নি। তাই পাতে যা জোটে চুপচাপ খেয়ে নেন। এটা ভালো হয়নি, ওটা বেশ হয়েছে; তেমন বলার সুযোগ নেই। সেই লোক ধরতে গেলে সারা রাত না খাওয়া। কী খাবেন? দুজনেই তো একরকম উপোস। রাবেয়া বেগম সকালে উঠে দেখেন, আশপাশের গাছতলা থেকে যতটুকু শুকনো পাতা কুড়িয়ে রেখেছিলেন, বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। খড়ি নেই। তাই অনেক পুরোনো সময়ের সাক্ষী ফাঁড়তে হচ্ছে। আর কোনো মায়া নেই হারানো দিনে। এটি জ্বালিয়ে চালটুকু ফুটিয়ে রাখবেন। নারকেলের খোলায় কিছু লবণ আছে। তেমন অসুবিধা হয়তো হবে না। হলেই কী! অনেক দূর ইটভাটায় এক লোক ইট ভাঙেন। মাটি পোড়ানো শক্ত লাল পাথর। মন পুড়ে পুড়ে শক্ত শিলা। তার শক্তিহীন হাতে সুরকি হয়। একেকটি আঘাতে আগুনের ফুলকি ছোটে। আগুন শুধু আগুন। উনুনের আগুন। পেটের আগুন। মনের আগুন। আগুন জ্বালতে মন ভাঙতে হয়। মন পুড়িয়ে সুরকি হয় কি? তার বৃদ্ধ আঙুলে ধীরে ধীরে ফোসকা পড়তে থাকে। ঠাস ঠাস ঠাস!

Disconnect