ফনেটিক ইউনিজয়
ধারাবাহিক গল্প: দ্বিতীয় পর্ব
পার-অপার
অভিজিৎ সেন

লোকটি সাইকেল থেকে ওপারে নামল। ধুতির খুঁট একটু উঁচু করে গুঁজে দিল সে। পায়ের কেম্বিশের পামশু খুলে একটা একটা করে এপারে ছুড়ে মারল। পাতলা গড়নের লোকটি সাইকেলের সিটের নিচের বড় মাঝামাঝি জায়গায় ডান হাত দিয়ে ধরে ঝুলিয়ে নিল। তারপর এতটুকু ইতস্তত না করেই ওই খেজুরগাছের সাঁকো বেয়ে তরতর করে এগোতে লাগল। আমর গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠলেও সে কিন্তু নির্বিঘ্নে এপারে চলে এল।
আমি তাকে কিছু অনুরোধ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। তার চেহারায় সচ্ছল মধ্য চাষির লক্ষণ। তা ছাড়া ভীষণ ব্যস্ত মানুষ সে, এমনও মনে হলো। এপারে এসে কোনো দিকে না তাকিয়ে পামশু পায়ে গলিয়ে সাইকেলে উঠে বসল লোকটি। আমার দিকে একবার তাকিয়েছে কি তাকায়নি, খিরাইলের রাস্তায় সে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে দিল।
এই প্রথম শহরে বড় হওয়ার কারণে আমার আফসোস হলো। আমার আর কিছু বলা হলো না। এও এক শহুরে সংকোচ বোধ হয়। এমন একজন অচেনা মানুষকে তো আর অনুরোধ করা যায় না যে, আমার সাইকেলটা একটু ওপারে দিয়ে আসুন না, ভাই! গ্রামাঞ্চলে যাতায়াতের যতটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে আমি এখন একটা কিংবা দুটো বাঁশ একত্র করে যে সাঁকো বাঁধা হয়, তার ডাইনে কিংবা বাঁয়ে যদি এড়বড়ে আর একটা বাঁশের সাপোর্ট থাকে এবং সে হেতু যদি ভীষণ নড়বড়ে হয়, যদি আশঙ্কাজনকভাবে দোলও খায়, আমি ভারসাম্য রেখে এক হাতে সাইকেল ঝুলিয়ে দিব্যি ওপারে চলে যেতে পারব। কিন্তু পাশে ধরার মতো কিছুই নেই, এমন একটা ডাইনির বাহনের মতো মরা খেজুরগাছের ওপর দিয়ে আমি হাতে সাইকেল ঝুলিয়ে কীভাবে পার হব! কখনো হয়? অতএব এই নির্জন খাড়ির ধারে আমি ‘অপার’ হয়ে বসে রইলাম।
পারে যাওয়া বা পার হওয়া বড় সাধারণ ব্যাপার নয়। একটা সিগারেট ধরিয়ে দুটান দেওয়ার পর একটা দার্শনিক ভাবালুতা আমার ভেতর জেগে উঠল। সমুদ্র নয়, নদী নয়, কেমনমাত্র একটা সামান্য খাড়ি যাতে জল দুহাতও গভীর নয়। সেই খাড়ি আমি পার হতে পারছি না। সব পথের জন্যই একজন পথপ্রদর্শক লাগে পারের জন্য একজন পারের কর্তা লাগে, তা সে পারাবারই হোক অথবা এই খাড়ি। আমার পারের কর্তার এখনো দেখা মেলেনি, তাই অপার হয়ে বসে আছি। পারের কর্তা চাই, পারের কড়িও তাকে গুনে দিতে হবে।
এই চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রথম দিকে একদিন একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। হাট থেকে গরু কিনে ফিরছিল দুটি অল্প বয়সের ছেলে। সম্ভবত তাদের সঙ্গের অভিভাবক পিছিয়ে পড়েছিল। শীতের নদীতে জল খুবই অল্প। ছেলে দুটি পারাপারের বাঁশের মাচানে উঠল না। তার বদলে হাত দশেক জায়গা জল ভেঙে গরু নিয়ে ওপারে গিয়ে উঠল তারা। জল তাদের হাঁটুর ওপরে উঠল না। কিন্তু তারা ওপারের ঘাটোয়ালের চোখ এড়িয়ে যেতে পারল না। ঘাটোয়াল তাদের পথ আটকল। ছেলে দুটি কিছুতেই পয়সা দেবে না। তারা তো ঘাটোয়ালের বাধা মাচানের ওপর দিয়ে যায়নি, তবে কেন দেবে পয়সা? আমি ছেলে দুটির পেছন পেছন আসছিলাম। তবে ওদের মতো জলে না নেমে মাচান- সাঁকোর ওপর দিয়েই নদী পার হয়েছিলাম। বিরোধ দেখে আমি বললাম, ‘সত্যিই তো ওরাতে গরু নিয়ে জল ভেঙে এপারে এল, তবে পয়সা দেবে কেন?’ হিন্দুস্তানি ঘাটোয়াল বলল, ‘পয়সা দিতে হবে, স্যার। এ ঘাট আমি সরকারের কাছ থেকে পয়সা দিয়ে ইজারা নিয়েছি। জল ভেঙে গেলেও পারানি দিয়ে যেতে হবে। এটাই নিয়ম। এরা হয়তো এখনো সেটা জানে না। তা ছাড়া ঘাটের পারানি কেউ ফাঁকি দেয় না, স্যার।’ কথা-কাটাকাটির মধ্যে ছেলে দুটির অভিভাবক ও তার একজন সঙ্গী চলে এল। অভিভাবকের গলায় দুগাছা তুলসীর মালা। সব শুনে ছেলে দুটিকে ধমক দিয়ে বলল, ‘হারামজাদা, ঘাটের পয়সা আলাদা করে দিয়ে দিলাম না তোদের, অ্যাঁ?’ ছেলেরা বলল, ‘আমরা তো নদী দিয়ে হেঁটে পার হলাম! পয়সা দেব কেন?’ অন্য ব্যক্তি বলল, ‘না, বাবা, তা হয় না। পারের কড়ি ফাঁকি দেওয়া যায় না।’ তারা ঘাটোয়ালকে পয়সা দিয়ে চলে গেল।
আমি যেন ক্রমশ বুঝতে পেরেছিলাম ব্যাপারটা। একটা সামাজিক সৎ আচরণবিধিকে ধর্মীয় অনুশাসনে বেঁধে অলঙ্ঘ্য করা। আরও বহু অভ্যাস ও নিয়মকে বিবেকের শৃঙ্খলায় বাঁধা হয় ধর্মীয় অনুশাসনের মোড়কে। সাধারণ ও সাধারণ নয়, এমন যাবতীয় মানুষকে এই বিবেক অচ্ছেদ্য বন্ধনে বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক বা ইতিহাস-পূর্বকাল থেকে আবদ্ধ রেখেছে। গভীর ধর্মীয় তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় দ্বিতীয় বয়স্ক মানুষটির কথা বিস্তারিত করা যায়। যদি পারের কড়ি ফাঁকি দেও, যদি তোমার সঞ্চয়ে পারের কড়ি না থাকে, তোমাকে অপার হয়ে নদীপারে বসে থাকতে হবে!
হঠাৎ আমার মাথার ওপরে একজোড়া শালিক কোথা থেকে এসে হাজির হলো। শুধু হাজির হওয়া নয়, দুটোতেই উড়ে উড়ে তারস্বরে চেঁচাতে লাগল। আমি যে গাছের নিচে বসে আছি, তার পেছনের দিকে একটা আগাছার বৃদ্ধি দক্ষিণ দিকের খাড়ির পার ধরে এগিয়ে গেছে। পাখিদের সতর্ক চিৎকারে আমি সন্ত্রস্ত হয়ে পেছনে তাকালাম। পেছনে তাকাতে আমার নড়াচড়া একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। আমি স্থির হয়ে রইলাম প্রায় দম বন্ধ করে। আমি আমাদের বাংলাদেশের সাপ মোটামুটি চিনি। কিন্তু যে সাপটি পেছনের ঘন আগাছার ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসছে, তাকে চিনতে আমার একটু সময়ই লাগল। অত মোটা দাঁড়াস সাপ আমি জীবনে আর কখনো দেখিনি। পাঁচ-ছয় ইঞ্চি করে যদি ওর প্রস্থচ্ছেদ করা হয়, একেক টুকরোর ওজন অন্তত এক কিলো করে হবে। দশ ফুটের মতো লম্বা সাপটার ওজন কম করে পনেরো- ষোলো কিলোগ্রাম তো হবেই। সাপ আমার বাঁ দিক ঘেঁষে, আমার থেকে চার- পাঁচ হাত দূর দিয়ে শালিকদের চিৎকার, ঠোক্কর উপেক্ষা করে চলে গেল। সম্ভবত সে ঝোপের মধ্য দিয়ে খাড়ির নিচের দিকে নেমে গেল। হয়তো সেও ওপারে যাবে। আমি অনেক সময় সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। (চলবে)

Disconnect