ফনেটিক ইউনিজয়
মাকড়ি
বিবিকা দেব

নিদারুণ কষ্টে জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। কখনও কাক্সিক্ষত মাকড়ি জোড়া হাতছাড়া করিনি। নিজের কাছে আগলে রেখেছি। এমনকি প্রিয়তম স্ত্রী বিয়োগের পরও দিব্যি মাকড়ি জোড়া ছিল। বেশ কয়েকবার মালকোচা লুঙ্গির কোচড়ে করে নিয়ে গিয়েছি মনিহারের দোকানে। মনটা আকুপাকু করতে থাকে। আবার বেমালুম ফিরে এসেছি মনিহারের দোকান থেকে। সযত্নে পুরনো মরচেপড়া টিনের বাক্সে লাল কাপড়ে মুড়িয়ে রাখি। বড়ই সুন্দর ও মায়াবতী মাকড়ি জোড়া। হাঁটু গেড়ে বসে মাকড়ি জোড়ার ওপর হাত বুলিয়ে রাখি। যতদূর মনে পড়ে, বাবা অনেক কষ্টে গড়েছে। তখন স্বর্ণের দাম ছিল বেশি। টাকার ছিল দুরবস্থা। বাবা একটু একটু করে টাকা জমিয়ে মাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল। বিনিময়ে ছেলের জন্ম দিতে হবে। উপরওয়ালার দয়ায় ফুটফুটে ছেলের জন্ম হলো। তাই বাবা খুশিতে আত্মহারা হয়ে মাকড়ি জোড়া দিয়েছিল আঁতুড়ঘরে। সেই থেকে মা অনেক যত্ন করে কাছে রাখতেন।
হেসেখেলে ছেলে বড় হতে থাকে। ছেলের নাম রাখেন রায়হান। রায়হানের বয়স যখন আট ছুঁই ছুঁই। তখনই বাবার মৃত্যু হয়! সকালবেলা পান্তাভাত খেয়ে হাতে কোদাল নিয়ে ধানি জমিতে যায়। ১০টার সময় দুজন মিলে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসার সূত্রে বাবাকে জমির আইলে পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসে। অনেকক্ষণ পর বাবার জ্ঞান ফেরে। পাশে বসে মা তালপাতার পাখা দিয়ে ধীরগতিতে বাতাস করতে থাকে। বাবার মাথার পাশে রায়হান এসব দেখছে। বাবা হাতের ইশারায় রায়হানকে ডাকে। দুচোখ বেয়ে উষ্ণ ধারা প্রবাহিত হতে থাকে। নিঃশ্বাসে বয়ে চলা বায়ু বাধা পেয়ে উঁচু-নিচু ঢালুতে সঞ্চারিত হয়। এভাবে দুটো রাত-দিন পার করে। একদিন গৌধূলি লগ্নে সূর্যটা সবে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় বাবার ভারি নিঃশ্বাস হালকা হয়। বাতাসে মিশে অজানায় পাড়ি দেয়। মায়ের মহাচিৎকারে আকাশটা ভারি। মুখ কালো করে আছে। আর বাতাসটা সঙ্গে নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টায় আছে।
কিছুই বুঝে ওঠার আগে পাড়া-প্রতিবেশীর ভিড় বাড়তে থাকে। রায়হান বেমালুম বসে আছে। গ্রাম্য মুরব্বি কয়েকজন একই স্বরে বলে, মুর্দা বেশিক্ষণ রাখা যাবে না। তাতে আরও কষ্ট বাড়ে! একটি নিকষ ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে বাবা মাটির নিচে ঘুমিয়ে পড়ল। আজীবন ঘুমিয়ে থাকবে। সমস্ত কাজ ইস্তফা দিয়েছে। দিন-মাস পেরোতে মা ঠাঁই পেল নানা বাড়িতে। মা অবশ্য আসতে চায়নি স্বামীর ভিটে-মাটি ছেড়ে। বিশেষ করে বাবার কবরের জন্য। মামারা মাকে আর রায়হানকে ছনের তৈরি একচালা ঘর ওঠিয়ে দেয়। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি ঘরের যাবতীয় কাজ মাকে করতে হয়। বিনিময়ে মা ও ছেলে খাবার পায়। বছরে দুটো কাপড় পাবে। যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। তাই অগত্যা রান্নাঘর থেকে শুরু করে গোয়ালঘর পর্যন্ত সব মাকে এক হাতে করতে হয়।
রায়হান নতুন করে আবার স্কুলে ভর্তি হয়। তার খরচ মামারা বোঝা মনে করে। তাই রায়হানকে মামাদের মুদির দোকান দেখাশোনা করতে হয়। দোকানে রাতে থাকার জন্য মামার নির্দেশ। অমান্য করার মতো ক্ষমতা নেই। কিন্তু রায়হান মায়ের গা থেকে যে ঘ্রাণ পায়, তা না শুঁকে ঘুম আসে না। তখন বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু চোখে আদুরে স্বপ্নের হাতছানি। রায়হান লেখাপড়া করে বড় চাকরি করবে। মাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। যেখানে কষ্ট মাকে স্পর্শ করতে পারবে না। লেখাপড়ায় মেধাবী। মামারা নারা ছুতোয় বিভিন্ন কাজে আটকে রাখে। রায়হান বুঝতে পারে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলে না। রায়হানের দুর্বলতা মাকে ঘিরে। মামিদের লোভী চোখ মাকড়ির ওপর। মা হয়তো বাবার স্মৃতিকে আকড়ে বেঁচে আছে।
রায়হান আর লেখাপড়া করে বড় মানুষ হতে পারেনি। কিন্তু নিজের ইচ্ছায় স্বাবলম্বী হয়ে ব্যবসা শুরু করেছে। মাকে আর মামার বাড়িতে কাজ করতে দেয় না। এভাবে ঘুরছে সংসার নামক জীবনের দ্রুততম চাকা। কোন পর্যায়ে পরিণতি হবে জানি না। তবু এগিয়ে যাচ্ছি। সেখানে সবকিছু দুরূহ ব্যাপার। শত ক্লান্তিতে মা আছে বট বৃক্ষ হয়ে।
যখন ২২ বছরের টগবগে যুবক। তখনই রুমিকে ঘরের বউ করে আনে। মা নিজে পছন্দ করে এনেছে। অবশ্যই আমারও বেশ ভালো লেগেছে। পূর্ণিমার চাঁদ পৃথিবীতে কতটুকু আলো দিয়েছে জানি না। কিন্তু রুমি আমাদের ছোট্ট কুঁড়েঘর আলোকিত করেছে। মা রুমিকে বাবার হাতে গড়া মাকড়ি জোড়া কানে পরিয়ে দেয়। আর এও বলেছিল যে, রায়হান জন্মানোর পর ওর বাবা খুশি হয়ে আমাকে দিয়েছিল। শত অভাব-অনটনে কোনো দিন নিজের থেকে আলাদা করেনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি মাকড়ি জোড়া সঠিক মূল্য দিয়ে যত্ন করে রাখবে।
রুমি শাশুড়ির আদর্শকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করে। সুখে-দুঃখে এভাবে জীবনের ২৫টা বছর কেটে গেল। চারটে ছেলে ও একটি মেয়ের জন্ম দিল। রায়হান বাজারে মুদির দোকান ও নৈশপ্রহরীর কাজ করে। ছেলেরা বড় হয়ে যে যার মতো আলাদা থাকে। মেয়েটার বিয়ে হয়েছে কসাইয়ের কাছে। পালিয়ে গেছে মাংস বিক্রেতার হাত ধরে। রুমি মরে গিয়েও বেঁচে গেছে। সোনার সংসার নষ্ট হয়ে গেছে। রুমি বেঁচে থাকলে অনেক বেশি আঘাত পেত। রায়হানকে দেখার মতো কেউ নেই! তাই বাধ্য হয়ে মামাতো বোনকে আবার বিয়ে করে। ভেবেছিল, রুমির জায়গায় বসতে দেবে না। কিন্তু নিরুপায়, শেষ বয়সে কে দেখবে। এই ভেবে আবার বিয়ে করে। মাকড়ি জোড়া আর কাউকে দেয়নি। সযত্নে ট্রাংকে তুলে রাখে। বিষণœতা কাটিয়ে ওঠার আগে ছেলের সম্পত্তি ভাগ করতে চায়। ঝগড়া-বিবাদে না গিয়ে রায়হান তার বাবার পাওয়া সম্পত্তি চার ছেলের মাঝে ভাগ করে দেয়। রায়হান মেয়েকে বঞ্চিত করেনি। তাকে তার প্রাপ্যটুকু বুঝিয়ে দেয়।
রায়হানের দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হলো। সুখের দিন পার করে। দোকান আর নৈশপ্রহরীর চাকরি। সামান্য চাষাবাদ ও চারটে হালের গরু নিয়ে সুখের সংসার। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। এর মধ্যে বড় ছেলে এসে বলে, সম্পত্তি ঠিক বণ্টন হয়নি!
রায়হানের মামারবাড়ি থেকে পাওয়া সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে আর দোকানের ভাগ দিতে হবে। রায়হানের একটাই উত্তর, তোমাদের ভাগ আমি বেঁচে থাকতে বুঝিয়ে দিয়েছি। আর দোকানের ভাগ পাবে না। অনেক কষ্টে তিল তিল করে টাকা জমিয়ে ব্যবসা করেছি। আমার মামাবাড়ি থেকে পাওয়া সম্পত্তি দ্বিতীয় পক্ষের ছেলেরা পাবে। বড় ছেলে রাফি রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে। বাবার সাথে আর কোনো তর্কে যায়নি। কারণ সোজাভাবে কাজ হবে না। তাই মাথা ঠাণ্ডা রেখে সম্পত্তি আর মাকড়ি জোড়া হাতে আনতে হবে। রায়হান তার সিদ্ধান্ত থেকে একটুও নড়চড় হবে না। চার ছেলের কোনো খেয়াল নেই বাবার প্রতি। সম্পত্তির ভাগ চাইতে এসেছে নতুন করে। কোনো দায়িত্ব-কর্তব্য নেই। শুধু টাকার মোহ আর লোভে পড়ে চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। রক্তের সম্পর্ক বলতে কিছুই মর্যাদা দিতে জানে না। কী দিনকাল এসে পড়েছে। আগে আমাদের সময়ে বড়দের সামনে দুকথা বলতে সাহস পায়নি। আর এখনকার ছেলেমেয়েরা মা-বাবার মুখে মুখে তর্ক করে।
একটাই প্রার্থনা। ছেলেদের জায়গাজমি নিয়ে হানা-হানি, মারামারি দেখার আগে যেন মৃত্যু হয়! তাড়াতাড়ি বাজারে যেতে হবে। শনি ও মঙ্গলবার হাট বসে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসে। দোকানের বেচাকেনা বেশি হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের যে হারে দাম বাড়ছে, তাতে গরিব মানুষগুলো খেতে পাবে না। কেন যে দিন দিন এমন হচ্ছে জানি না। এত উৎপাদন তাতে দেশের চাহিদা পূরণ করতে অক্ষম। হু-হু করে বাড়ছে মানুষ। বাড়ছে পেটের ক্ষুধা। বিড় বিড় করে বলতে থাকে রায়হান।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী এসে তাড়া দিতেই সংবিৎ ফিরে পায়। কী ব্যাপার! আশপাশে তো কেউ নেই। আপনি কার সাথে কথা বলেন। উত্তরে রায়হান বলল, কারও সাথে নয়। এমনি নিজের কতগুলো প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে নিচ্ছি। আচ্ছা শোনো, রিফাতকে তাড়াতাড়ি দোকানে পাঠিয়ে দিও। শনিবারে বেচা বেশি। এক হাতে শেষ করতে পারি না। রিফাত গেলে হাতে হাত এগিয়ে দেবে। আচ্ছা আমি গেলাম। ওকে অবশ্যই পাঠিয়ে দিও।
রোদের তেজ কমার সাথে সাথে হাটে বিভিন্ন রকম মানুষের সমাগম ঘটে। সবজি বাজারে হাঁকডাক কম। তাজা তাজা টাটকা সবজি। মাছ বাজারে হাঁক বেশি। বিশেষ করে ইলিশের চাহিদা বেশি। হাটের মধ্যখানে বিশাল বট বৃক্ষ। অনেক বছর ধরে মাথা উঁচু করে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
গত বছর বর্ষায় কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বট বৃক্ষ কিছুটা হেলে পড়েছে। পাশে শান্ত স্নিগ্ধ হালদা নদী। বাঁশের সাঁকো পারাপারে ব্যস্ত দুকূলের মানুষ। পুনর্মিলনী মেলা এ হাটে। পরিচিত মানুষের সমাগম। সূর্যের আলো ডুবো ডুবো। হাটে মানুষের ভিড় কমতে থাকে। কোলাহলের রেষ বয়ে যায়। রিফাত বাড়ি গিয়ে আনাজপাতি দিতে যায়। ৮টার দিকে রাতের খাবার নিয়ে আসে। এ সময় মানুষ নেই বললেই চলে। নিশ্চুপ রাত। শুধু জোনাকের ছোটাছুটি। রাত বাড়তেই হাতে টর্চ লাইট ও লাঠি নিয়ে পুরো বাজার ঘুরে আসে। সব দোকান ভালোভাবে বন্ধ করছে কিনা তদারক করে। পরে চেয়ার নিয়ে বসে থাকে।
রাতের খাবারের ঢেকুর গলা অবধি উঠে আসে। তাতে মলা মাছের স্বাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোট মেয়েটা পাকা হলদে খেজুর খেতে চেয়েছিল। ব্যস্ততার কারণে ভুলে গেছি। কালকে অবশ্যই কিনে দেব। আসলে মিষ্টি গন্ধ আমারও ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। আনমনে জীবনের বাঁকে বারবার ফিরে আসে। অসম্পূর্ণ মানুষ বটে। কোনো কিছুই সার্থকভাবে হয়নি। হোঁচট খেয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। সংবিৎ ফিরে আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে থাকে। একটানা ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে মিলিয়ে যায়। নিত্যদিনকার এসব কাজ রায়হান করে। বারবার হাতঘড়ির ওপর চোখ। কখন রাতের সমাপ্তি ঘটবে। আবার বাজার টহল দিয়ে আসে। রাত ৪টা বাজে। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই।
নামাজ পড়ে বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে। কিছু দূর এগিয়ে যায়। হঠাৎ চারজন মানুষের ছায়া চারপাশ ঘিরে ধরে। মুখ কালো কাপড়ে আবৃত। চেনার উপায় নেই। মুখ থেকে কোনো স্বর বের হচ্ছে না। ভেতরটা জ্ঞানশূন্য। জিভটা শুকানো খড়খড়ে। শরীরটা বাঁশের কঞ্চির মতো নেতিয়ে পড়ে। এলোপাতাড়িভাবে ধারালো ছুরির ফলা মাংসে বিঁধতে থাকে। আধভেজা চোখে রুপালি ভোর। নাসার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাকা খেজুরের মিষ্টি গন্ধ। সবুজ পাতার গন্ধ। মাটির সোঁদা গন্ধ। সন্তানের রাঙানো হাত ও গরম নিঃশ্বাসের প্রতিশব্দে জেগে ওঠে স্রোতস্বিনী হালদা।

Disconnect