ফনেটিক ইউনিজয়
যুগযন্ত্রণার শিরাজী ও বিপ্লবী সাহিত্য মানস
পলিয়ার ওয়াহিদ
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীৎ
----

একটা গল্পের বয়ানে ঢুকে পড়তে হবে। কারণ তিনি এখন শুধুই গল্প হয়ে আছেন! জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তিনি কে? চলুন। একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াব যমুনার পাড়ে। সেখানে গিয়ে উঁকি মারব আরেকটু। তারপর শোনাব সেই বিপ্লবী কবির নাম, যিনি ১৮৮০ সালে ১৩ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। বংশলতিকা ছেনে যদ্দূর জানা যায়, তার পূর্বপুরুষ সুদূর পারস্যের সিরাজ নগরী থেকে প্রথমে ১৫৭২ সালে দিল্লি আসে। তারপর মুর্শিদাবাদ ও নিজামপুরে বসবাস। সেখান থেকে ১৭৩৮ সালে বঙ্গদেশের তৎকালীন পাবনার সিরাজগঞ্জে বসত গাড়ে। পাঁচ বছর বয়সে তিনি সাহেবউদ্দিন পণ্ডিতের পাঠশালায় শিক্ষার হাতেখড়ি নেন। জ্ঞানদায়িনী মাইনর স্কুলে যখন ভর্তি করা হয়, তখন তার বয়স মাত্র আট। ১৮৯৭ সালে বিএল হাইস্কুলে ফোর্থ ক্লাসে (বর্তমানে সপ্তম শেণিতে) ভর্তি হন। বাল্যকালেই ছিল লেখালেখির প্রবল ঝোঁক। স্কুলে থাকাকালীন কবিতা লিখে শিক্ষকদের নজর কাড়েন। বন্ধুদের কাছ থেকে পান প্রসংশা। ঠিক এমনই সময়ে এক জলসায় যান বক্তৃতা শুনতে। সেখানে যশোর থেকে এক মুন্সী যান বক্তৃতা করতে। সে সভায় সাহিত্যের আলোচনা হতো। তিনি আগ্রহভরে সেই সভায় কবিতা আবৃত্তি করেন। ‘অনল প্রবাহ’ শিরোনামের কবিতা শুনে মুগ্ধ হন শ্রোতারা। অভিভূত হলেন সে সময়ের সাহসী বীর ও বাগ্মী মুন্সী মেহেরুল্লাহ। তিনি আর কেউ নন। ওই সভার প্রধান অতিথি ও জ্ঞানী পণ্ডিত। এতটাই আনন্দিত হলেন যে, যশোরে ফিরেই সেই কাব্য প্রকাশের ভার নিলেন। এভাবেই শুরু তার কবি ও লেখক হওয়ার গল্প। ওই গ্রন্থ ইংরেজ শোষক ও মুসলিমবিদ্বেষী সরকার নিষিদ্ধ করে। ভুলে গেলে চলবে না। এটাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিষিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ। প্রথম কাব্য রচনার ফলে মাত্র ৩০ বছর বয়সে দুই বছরের কারাবাস। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি বিশ্বমুসলিমের ঐক্য বিধানে বলকান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওই সময় তিনি মুন্সী মেহেরুল্লাহ ও সৈয়দ জামাল উদ্দীন আফগানীর দ্বারা প্রভাভিত হন। ফলে যুদ্ধ থেকে ফিরে কলমযোদ্ধা থেকে হয়ে উঠলেন কণ্ঠসৈনিকও। তার জীবন ও কর্মের দিকে তাকিয়ে এ কথা স্বীকার না করে উপায় থাকে না যে, তিনি এক বিশ্ব ও বিস্ময়মানস! তিনি আর কেউ নন। বাংলার মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত, নারী শিক্ষার অন্যতম অগ্রগামী সৈনিক, প্রতিবাদী ও সাহসী কবি, সার্থক জবাবি উপন্যাসিক, যুক্তিপূর্ণ প্রাবন্ধিক, বিপ্লবী ও বাগ্মী সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী।
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী নিয়ে কথা বলতে হলে অনিবার্যভাবে তার সময় নিয়ে আলাপ পাড়তে হবে। আর সে কারণে কালের মইয়ে পা রেখে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আরও প্রায় ১৫০ বছর আগে। সে সময়ের আগুনে শিল্পের খোলা রেখে বিচার করতে হবে তার জীবন ও সাহিত্য। তাহলেই কিছুটা সিদ্ধ হবেন সৈয়দ শিরাজী। আমরা কিন্তু সে সময়ের নদীতে গা ভাসিয়ে চলে যাচ্ছি। অথচ কেউ তার স্রোতের সন্ধান আজকাল তেমন করি না। আর সে কারণে বোধহয় একই জলে হাবুড়–বু খাচ্ছে নিরন্তর। ফলে না চিনতে পারছে নদী, না ধরতে পারছে স্রোত। আমরা কি তাকে ভুলে গেলাম? নাকি তিনি আমাদের মনোযোগ রক্ষায় ব্যর্থ হলেন? তার দু-একটা পর্ব আলোচনা করতে এই সামান্য ব্যবচ্ছেদ।
প্রশ্ন হতে পারে, কেন তিনি এমন উন্মাদনায় মেতে উঠলেন? কী সেই কারণ? ইতিহাস বলছে, যে সময় শিরাজীর জন্ম, সে সময় মুসলমানরা ছিল এক দুর্যোগময় রাতের যাত্রী। আকাশে ছিল ঘন মেঘ, কালো মেঘের গর্জন ও বিদ্যুতের ঝলকানি; পথ অন্ধকার। এ বিষয়ে আরও একটু বললে সে সময়টাকে বেশ উপলব্ধি করা যাবে। একবার শিরাজী ফরিদপুর গিয়ে কবি জসীমউদ্দীনকে খুঁজে বের করলেন। বুকে আলিঙ্গন করে মিষ্টিমুখ করিয়ে বলতে শুরু করলেন। ‘আমরা যখন সাহিত্য আরম্ভ করেছিলাম, তখন সমস্ত দেশ অন্ধকারে আবৃত ছিল। সেই অন্ধকারে দেশের এক কোণ হতে অন্য এক কোণে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াতাম। চীৎকার করে ডাক দিতাম। অনাগত যুগের সিংহাসন খালি পড়ে আছে, যশের সিংহাসন- সম্মানের সিংহাসনÑ ইতিহাস রচনার সিংহাসন। কে এসে সেই সিংহাসনে আরোহণ করবে? আজ তোমাদের সাহিত্য-সাধনা দেখে মনে আশা জাগে, হয়তো তোমাদের ভেতর হতেই কেউ আমার সেই ডাক শুনতে পেয়েছে। তোমাদের কাছে পেলে তাই বড় আনন্দ পাই।’ এই হলো সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশে সংস্কৃতির অভিঘাতে বাংলাদেশের নবজাগরণ সূচিত হয়। তা ছিল নবোদ্ভূত শহুরে মধ্যশ্রেণি ও ভূম্যাধিকারীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। ব্রিটিশ প্রবর্তিত শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফলে এ দেশের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। অর্থনৈতিক জীবনের মূল মাপকাঠি রূপান্তর হয় জমি থেকে মুদ্রায়। ফলে এ দেশীয় সমাজে এক নতুন শ্রেণিবিন্যাস দেখা দেয়। শোষণমূলক এ নতুন ব্যবস্থায় ইংরেজদের সহযোগী হিসেবে যে নতুন ভূম্যাধিকারী ও মধ্যশ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল, তারা বেশির ভাগ হিন্দু সম্প্রদায় থেকে আসা। নবাবি আমলে রাজস্ব সংগ্রাহকের দায়িত্ব এ হিন্দুরাই পালন করত। ফলে হিন্দুদের হাতে নগদ অর্থ মজুদ থাকায় তারাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল ভোগ করে। মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই ছিল মুসলমান। তাদের অধিকাংশ ছিল গরিব চাষি, ক্ষেতমজুর ও নানা ধরনের হস্তশিল্পের কারিগর। কোম্পানি আমলের ব্যাপক লুণ্ঠন ও শোষণের প্রাথমিক শিকার হয় এ মুসলমানরাই। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। বলা বাহুল্য, দেশীয় হিন্দু দোসরদের সহায়তায় ব্রিটিশ শাসকরা সমস্ত বিদ্রোহ সেদিন নির্মমভাবে দমন করতে সমর্থ হয়। ওয়াহাবি ও ফারায়েজি আন্দোলন অনুরূপ বিদ্রোহের অন্যতম। সে অর্থে একাত্তরের রাজাকার ও দালাল শব্দটা তাদের ক্ষেত্রেও যুক্তিযুক্ত। মুসলমানের হীনাবস্থা কাটিয়ে ওঠার সাথে সাথে এ আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম সংঘটিত করেছিল। একটি স্বাধীন ও শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থার প্রত্যয় বিক্ষিপ্তভাবে সংঘটিত এ কৃষক বিদ্রোহগুলোর মধ্য থেকে বিচ্ছুরিত হয়েছিল। আরও দেখা যায়, বাংলাদেশের নবজাগরণের পুরোভাগে ছিল এ দেশের শহুরে ও উচ্চবিত্ত হিন্দু সম্প্রদায়। এদের আত্মিক সংযোগ ছিল ব্রিটিশ শোষকদের সাথে। ভেদবুদ্ধির প্রবর্তক ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যকার অসম বিভাজনের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিল।
তিনি ছিলেন একাধারে কলমবাজ লেখক, ভ্রাম্যমাণ বক্তা, অনাহূত সংস্কারক ও জেল ফেরত বিপ্লবী। দুর্ভাগ্য আর সৌভাগ্য হোক, এত সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন শিরাজী। আমার তো মনে হয়, তিনি সাহিত্য-সাধনা করতে চাননি। বাধ্য হয়ে সময়ের দাবি মিটিয়েছেন। কারণ তিনি ‘অনল প্রবাহ’ লেখেন মুসলমানদের জরা মনকে জাগাতে। সেখানে তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন। শিল্পের জন্য শিল্পকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। জীবন ও মানুষ ছিল তার সাহিত্য রচনার মূল্য উদ্দেশ্য। সেখানে তিনি হেরে যাননি। তখনকার হিন্দু লেখকেরা যেসব সাহিত্য রচনা করেন, তার মুসলমান চরিত্রগুলো ছিল হীনস্বভাব আর হিন্দুরা ছিল গুণপনায় ভরা। মুসলমান আমির-নবাব-বাদশাদের বেটি-বোন-বেগমরা সবাই হিন্দু নৃপতি ভূপতি সেনাপতির শৌর্ষে-বীর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের অঙ্গসহচরী হওয়ার জন্য ধর্ম-কুল-মান সব বিসর্জন দিয়েছেন তাদের সাহিত্যের চরিত্রে। এগুলো বরাবর মুসলমান পাঠকদের কাছে পীড়াদায়ক ছিল। ‘রায় নন্দিনী’ উপন্যাস তো বঙ্কিমের ‘দুর্গেশ নন্দিনী’র জবাব। ‘স্পেন বিজয়’ মহাকাব্য মাইকেলের ‘মেঘনাদ বধে’র আদলে লেখা। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলী’র ফলে ‘প্রেমাঞ্জলী’ লেখেন। প্রায় ক্ষেত্রে তিনি জবাবি সাহিত্য রচনা করেন। কারণ বাঙালি হিন্দুরা তখন ইংরেজি শিখে আর শাসকদের পুচ্ছ ধরে জাতে উঠে গেছে! তারা তখন সবক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানকে হেয় করতে থাকে। এমনকি সাহিত্য রচনায়ও মুসলমানকে হীন ও নিচু চরিত্রের সৃষ্টি করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, হিন্দু সম্প্রদায় সবসময়ই সাম্প্রদায়িক একটা মনোভাব পোষণ করত। এখনও করে। বাঙালি মুসলমান যে অসম্প্রদায়িক, তার উদাহরণ আছে ভূরি ভূরি। এদিক থেকে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশ দত্ত, হেমচন্দ্র ও নবীবচন্দ্রেরই সহধর্মী। তিনি আল্লামা শিবলী নোমানী ও ইকবাল প্রমুখ মনীষারই ভাবাদর্শবাহী ইসলামি সাহিত্য রচনার সূতিকাগার। তবে এ কথাও বলতে হবে যে, তার সাহিত্যে হৃদয়ের উষ্ণতা আছে যতটা, সেই পরিমাণে তেমন সার্থক সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা প্রশ্ন থেকে যায়।
শিরাজীকে আরও ভালো চিনতে পারা যাবে কবি জসীমউদ্দীনের সাথে আরেক আলাপে। তিনি বলেন, ‘জসীম! তুমি ত কবি! কবিরা নাকি দেশের দূর-ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। বলতে পার আমার এই আজন্ম সাধনা কি একদিন সফল হবে? আমি নিজের জন্যে সম্মান চাইনে, অর্থ সম্পাদ চাইনে, আমি চাই এই ঘুমন্ত জাত আবার মাথা নাড়া দিয়ে জেগে উঠুক। সিংহ গর্জনে হুঙ্কার দিয়ে উঠুক। আমি চাই এমনই একটি মুসলিম সমাজ, যারা বিদ্যায়, সাহিত্যে, সাহসে, আত্মত্যাগে, কারো চাইতে পিছপা হবে না। যা কিছু মিথ্যা, যা কিছু অন্ধ কুসংস্কার তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। দেশের মেয়েদের পরদায় আবন্ধ রেখে তাদের কাছ থেকে দুনিয়ার আলো-বাতাস বন্ধ করে রাখবে না স্বাধীন সজীব একটি মুসলিম জাতি। বলো ত জসীম! একি আমি দেখে যেতে পারব?’। এই যার হৃদয়ের আকুতি, সেই শিরাজীকে আমার ভুলে থাকি কেমন করে? শিরাজী তার ‘তুরস্ক ভ্রমণে’ লেখেন ‘মুসলমানদের দক্ষিণ হাতে কুরআন আর বাম হাতে বিজ্ঞান গ্রহণ করতে হবে।’ যে ফজিলাতুন্নেছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিদেশে লেখাপড়া করার সুযোগ পান, যাকে নিয়ে নজরুল কবিতা লেখেন, সেই ফজিলাতুন্নেছার ঢাকায় লেখাপড়া করার পুরো অবদানই ছিল শিরাজীর। একই সময়ে জন্ম হলেও বেগম রোকেয়ার সাথে শিরাজীর পরিচয় না হওয়া বিস্ময়কর বটে। কবি কায়কোবাদ মহাকাব্য লেখার পর শিরাজীর উদ্যোগে সোনার দোয়াত-কলম উপহার দেয়ার ব্যবস্থা করেন শিরাজী।
শিরাজীকে গৌরবের মশাল ঘোষণা দিয়ে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক লেখেন, ‘শিরাজীর জীবনধারা আমাদের দেশে অতুলনীয় ঐতিহাসিক ব্যাপার। একদিন না একদিন, এ দেশ পরাধীনতার নাগপাশ হইতে মুক্ত হইবেই। সেইদিন শিরাজীর প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সত্যিকার সুযোগ আসিবে।’ দুর্ভাগ্য স্বাধীনতা এল, কিন্তু সুযোগ আর এল না। শিরাজীকে জাতীয় নেতা মেনে নিয়ে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী লিখেছেন, ‘একটি সুপ্ত জাতিকে কলঙ্কলিপ্ত করিতে না দেওয়া এবং ঘুমন্ত জাতিকে জাগাইয়া অতীত গৌরবের মহিমায় উদ্বুদ্ধ করিবার কঠিনতম পথে একাকী তিনি অগ্রসর হইয়াছিলেন।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শিরাজীকে ‘বেহেশতের বুলবুলি’ সম্বোধন করে সিরাজগঞ্জে সাহিত্য সম্মেলনে গিয়ে বলেন, ‘এ যেন হজ্জ করিতে আসিয়া কাবা শরীফ না দেখিয়া ফিরিয়া যাওয়া।’ এখানে বলে রাখা ভালো, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী চেয়েছিলেন, বাঙালি মুসলমান তথা বিশ্বমুসলিম যেন আর ঘরে বসে না থাকে। আন্দোলন-সংগ্রামে তারা যেন তাদের অধিকার আদায় করতে পারে। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে যেন তারা পিছে না পড়ে। তার সে স্বপ্ন বিফলে যায়নি। আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন, নজরুল হলো শিরাজীর সাক্ষাৎ পুত্র। নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশ হলে শিরাজী কবিতা পড়ে একটা চিরকুটসহ ১০ টাকা পাঠান। সেখানে তিনি তার আবেগময় কথাটি বলেছেন। মূলত ‘অনল প্রবাহ’ই সময়ের চাহিদায় ‘অগ্নিবীণা’য় রূপ নিয়েছে যেন। নজরুল শিরাজীকে পিতার মতো মান্য করতেন এবং সম্মান করতেন। শিরাজীও নজরুলকে ছেলের মতো স্নেহ করতেন ও ভালোবাসতেন। তা আমাদের সবার কমবেশি জানা।
বাংলার মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী এক অবিস্মরণীয় নাম। অগ্নিপুরুষ শিরাজীর কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও অনলবর্ষী বক্তৃতার মাধ্যমে তদানীন্তন পশ্চাৎপদ, অবহেলিত, উপেক্ষিত মুসলিম সমাজকে জাগরিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। জাতি ও সমাজের কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন তিনি তার সমগ্র জীবন। ব্রিটিশ শাসন চক্রের জেল-জুলুম-ভীতি প্রদশন সর্বত্যাগী এ বীর বিপ্লবীকে তার সত্য সাধনা থেকে বিচ্যুত করতে পারিনি। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতাশ জাতিকে তিনি মুক্তির গান শুনিয়ে পরম কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। স্বজাতির জন্য গভীর মমতা ও দরদে পরিপূর্ণ স্বর্ণ হৃদয়ের অধিকারী শিরাজীর ঘটনাবহুল, বর্ণিল জীবন শাশ্বত সংগ্রামের প্রতীক। উনিশ ও বিশ শতকের উপমহাদেশের, বিশেষত বাংলার মুসলমানদের জাতীয় জীবনের চরম দুর্দিনে পরাধীন জাতির মনে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করতে জেগে ওঠার জন্য যারা ডাক দিয়েছিলেন, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী তাদের মধ্যে অন্যতম। অগ্নিঝরা বক্তৃতা ও জাগরণমূলক লেখনীর মাধ্যমে তৎকালীন বৃহত্তর বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার আহ্বান। তার জ্বালাময়ী ডাকে সেদিন বাঙালি মুসলমি জাতির মোহনিদ্রার ঘোর কেটে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সন্ধান করেছিল নিজের মুক্তির পথ। আর সে কারণে শিরাজীকে আমাদের জাতীয় জীবনের ভোরের নকিব বলে সহজেই আখ্যায়িত করা চলে। সর্বপ্রকারে নিজ জাতির কল্যাণ করাই ছিল শিরাজীর জীবনের সাধনা। বিশ্বমুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা ছিল তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। এ সাধনা ও লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি বহুবিধ পন্থায় সংকল্পদৃঢ় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আর এসবের প্রতিফলন ঘটেছে তার সাহিত্যে। তার কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সংগীত প্রভৃতি সাহিত্যকর্ম, যা পরিমাপের দিক দিয়ে বিপুল। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এক উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছেন। উল্লেখ্য, ‘অনাল প্রবাহ’ বাজেয়াপ্ত করার পর শিরাজীর বাসায় তল্লাশি করতে এসে মহাকুমা ম্যাজিস্ট্রেট মি. লয়েড শিরাজীর লাইব্রেরির গ্রন্থসম্ভার দেখে মন্তব্য করেন, ‘sirazy not only a poet and great wonder but also a great scholer.’
স্মৃতি-বিস্মৃতির আলো-আঁধারির পটভূমিতে একটি নাম এখনও আমরা মাঝে মধ্যে উচ্চারিত হতে শুনি। স্বীকার্য, সে নামের ব্যঞ্জনা তার অন্তর্নিহিত অসাধারণত্বের জন্যই হৃদয়ে এখনও শিহরণ তোলে। অন্বেষণ করতে বলে আত্মপরিচয়কে। আত্মমর্যাদাবোধের ঐশ্বর্যে শির সমুন্নত রাখার জন্য জানায় বলিষ্ঠ আহবান। চেতনায় সঞ্চারিত করে জাতীয় উন্নতি ও কল্যাণ সাধনের একটি মহতী স্পৃহাকে। নামটি স্মরণ করলেই কানে ভেসে আসে একটি বজ্রের নির্ঘোষ। মনে হয় যেন চমকে উঠেছে বিদ্যুৎ। বিশাল চরাচরব্যাপী লেগেছে প্রচণ্ড ঝড়ের দোলা। আর এসবের মিলিত দাপটে বিপুল স্রোতমুখে তৃণের মতো ভেসে চলেছে পরাধীনতার জঞ্জালভার। শৃঙ্খল টুটে পড়েছে বিদেশী শাসনের। সুদীর্ঘকালের ঘুমঘোর থেকে টগবগে প্রাণচঞ্চল্যে জেগে উঠেছে নিপীড়িত একটি জাতি। আবাহন করছে মুক্ত ও স্বাধীনতার প্রতীক আলোকদীপ্তি সূর্যের। আর সেই নামটি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী, যিনি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম পুরুষ। মুসলিম পুনর্জাগরণ প্রয়াসে অন্যতম পুরোধা মনীষী ও ব্যক্তিত্ব।
তারাপদ মুখোপাধ্যায় ঈশ্বর গুপ্তকে বলেছেন, গ্রিক পুরাণের ভেনাস দেবতার মতো তার এক মুখ অতীতের দিকে আর এক মুখ অনাগত দিনের দিকে। এ উপমার সাথে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীকে যথাযথ ও সার্থকভাবে জুড়ে দেয়া যায়। কারণ তিনি একদিকে মুসলমান সমাজের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করা ও যুগচেতনার পটভূমিকায় মুক্তবুদ্ধির চিন্তাভাবনায় অত্মোপলব্ধির সঞ্জীবনী মন্ত্র উচ্চারণ করেন। ইবরাহীম খাঁ স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘অমন ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা তার আগে আর কখনো শুনিনি।’ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লেখেন, ‘বলকান যুদ্ধে শিরাজীর যোগদানের ইতিকথা নাকি তুর্কি ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এবং তা আঙ্কারা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এ ঘটনা যে একটা জাতির পক্ষে কত বড় গৌরবের বিষয়, তা অতি সহজেই উপলব্ধি হতে পারে।’ তার জীবন সাধনার ওপর গভীর আলোকপাত করতে দেখা যায় ড. মুহম্মদ এনামুল হক, সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবদুল কাদির, মুহাম্মদ আবদুল হাই, নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, গবেষক ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সৈয়দ আলী আহসান, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদের মতো জ্ঞানী মানুষদের।
১৯৩০ সালে মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও শিরাজী অসহযোগ আন্দোলনের দরুন তিন মাসের কারাবরণ করেন। মৃত্যুযাত্রায় তিনি তার মাকে বলছেন, ‘মা, তোমার ছেলে এসেছিল ডঙ্কা বাজিয়ে। ডঙ্কা বাজিয়েই সে চলল। তবে দুঃখ কিসের?’ এমন তেজে যারা জ্বলতে জানেন, তাদের সেই জ্বালাময়ী কর্মকে ভুলে গেলে কেমন এগিয়ে যাবে জাতি ও সমাজ। ইসলামী ভাবধারাকে এক পাশে রেখে প্রগতির নামে অন্ধকূপে আর কত নিক্ষিপ্ত হব আমরা? মুসলমান হিন্দু বলে বিভেদের দেয়াল আর কত কঠিন হবে? আমরা শুদ্ধ মানুষের চিন্তার চর্চা কবে শুরু করতে পারব? সবকিছু ভুলে কি গলতে আরম্ভ করবে মানুষের সভ্যতার কষ্টিপাথর? ১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই এ বীর বিপ্লবী বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ক্ষণজন্ম পুরুষ আমাদের মধ্যে থেকে দেহত্যাগ করেন। তার কোনো মৃত্যু নেই।

Disconnect