ফনেটিক ইউনিজয়
মহাপুরুষের ছেলেমানুষী
তাপস রায়

মৃণালিনী দেবী মারা যাওয়ার বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা। প্ল্যানচেটে বসেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পারলৌকিকচর্চার বিচিত্র অভ্যাস ছিল তার। তিনি ডাকছেন স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে।
: কে?
: না, বলব না, আমার নাম তুমি বলো।
: ছোট বৌ নাকি?
: হ্যাঁ।
ছোট বৌ অর্থাৎ কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী। পারলৌকিকচর্চার এ অভ্যাস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছিলেন। ধারণা করা যায়, আধুনিকমনা নয় দাদার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর) হাত ধরেই এর সূচনা। কৈলাস মুখার্জী (ঠাকুরবাড়ির খাজাঞ্চি) মারা যাওয়ার পর একবার প্ল্যানচেটে তার আত্মা ডেকে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। মুখার্জীবাবু বেজায় রসিক ছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যেখানে আছ, সেখানকার ব্যবস্থাটা কিরূপ বলো দেখি? উত্তর এল, আমি মরিয়া সেদিন যাহা জানিয়াছি আপনারা বাঁচিয়াই তাহা ফাঁকি দিয়া জানিতে চান? সেটি হইবে না।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, ঠাকুরবাড়িতে এর প্রচলন আগে থেকেই ছিল। যদিও কবির এ ব্যাপারটি অমিয় চক্রবর্তী ‘মহাপুরুষের ছেলেমানুষী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মহাপুরুষদের এমন ছেলেমানুষী না থাকলে আমরা হয়তো ভাবতেই পারতাম না, তারাও আমাদের মতোই রক্তমাংসে গড়া মানুষ। এ ছেলেমানুষীগুলো যখন স্বভাবে পরিণত হয়, তখন বোঝা যায় তারাও এসবের ঊর্ধ্বে নন; সাধারণের মতোই তারাও অভ্যাসের দাস। কখনও কখনও এ অভ্যাস তাদের খেয়াল থেকেও তৈরি হতে দেখা যায়।   
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় একবার খুব ভোরে শান্তিনিকেতন এসে পৌঁছেছেন। তখনও রাতের আঁধার পুরোপুরি কাটেনি। হঠাৎ শুনতে পেলেন, স্নানঘর থেকে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। অবাক হয়ে কবির ব্যক্তিগত পরিচারক আলুকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, কর্তা স্নান করছেন। শীত-গ্রীষ্ম যাই হোক প্রতিদিন ভোররাতে ঘুম থেকে উঠেই ঠাণ্ডা জলে তার স্নান করা চাই-ই চাই।
আলুর কথা যখন এলই তখন এই ফাঁকে বলি, কবিগুরুর আরেকটি স্বভাব ছিল এই, কাছাকাছি যারা থাকতেন তিনি প্রায়ই তাদের নতুন নামকরণ করতেন। পার্সোনেল সেক্রেটারি, এমনকি অ্যাটেন্ডেন্টদেরও রসিকতা করে ডাকনাম দিতেন। সুধাকান্ত রায়চৌধুরীর মাথায় বিরাট টাক দেখে কখনও ডাকতেন ‘বলডুইন’, কখনও ‘সুধাসমুদ্র’ আবার মাড়োয়ারিদের কাছ থেকে শান্তিনিকেতনের অর্থসংগ্রহ করার জন্য কখনও ডাকতেন ‘সুধোরিয়া’। সচ্চিদানন্দ রায়কে বলতেন ‘আলু’।
কবির ভাষায় : ওর একটা মজবুত রকম সংস্কৃত নাম ছিল, কিন্তু সে এখন আর কেউ জানে না। যেদিন শুনলুম ও পটোলের ভাই সেইদিন থেকে ও আলু। আজকাল আবার দেশী আলুতে কুলোচ্ছে না, তাই বলি পটেটো। আমার একদিকে বলডুইন, একদিকে পটেটো- জোরালো সব নাম।
রবীন্দ্রনাথের আরেকটি খেয়াল ছিল বেশিদিন এক জায়গায় বা একই বাড়িতে থাকতে পারতেন না। তিনি কখনও জোড়াসাঁকোতে, কখনও শান্তিনিকেতনে কিংবা চন্দননগর, কালিম্পংয়ে থাকতেন। এসব জায়গায় তার একাধিক বাড়ি ছিল। শুধু শান্তিনিকেতনেই তার জন্য কয়েকটি বাড়ি তৈরি করতে হয়েছিল। এসবের নামও চমৎকার- কোনার্ক, শ্যামলী, উদয়ন, পুনশ্চ, দেহলী, উদীচী প্রভৃতি। তিনি কিছুদিন এক বাড়িতে থেকে খুঁতখুঁত করে হয় বাড়ি বদলাতেন, না হলে নতুন বাড়ি তৈরি করতেন। অথচ প্রতিবারই বলতেন, এই-ই আমার শেষ বাড়ি।
বাড়ি নিয়ে কবির এই বাড়াবাড়ি কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু ভালোভাবে নেননি। যদিও শান্তিনিকেতনে অনেক টানাপড়েনের মধ্যেও তিনি এতে বাধা হয়েও দাঁড়াননি।
একবার নতুন বাড়ির জন্য জল্পনা-কল্পনা করছেন, কিন্তু পছন্দমতো জমি পাচ্ছিলেন না দেখে কবিগুরু বললেন, বাড়ির জন্য এবার আর জায়গা ঠিক করা হবে না। আগে বাড়ি হোক তারপর সে অনুযায়ী জায়গা ঠিক করা হবে।
আবার তার মত বাদল দিনের মেঘের মতোই পাল্টে যেতে সময় লাগত না। আরেকটু অতীতে ফিরে তাকালে আমরা দেখব, দ্বারকানাথ ঠাকুর ইউরোপে প্রবাসের সময় ভ্রমণ সম্বন্ধে প্রায়ই মতের পরিবর্তন ঘটাতেন। একবার তার এক সহচর চিঠিতে লিখলেন, আমাদের শিগগিরই অন্যত্র যাওয়ার কথা আছে, কিন্তু স্থির বলা যায় না। কারণ বাবু চেঞ্জেস হিজ মাইন্ড সো ওফেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রেও এমন ঘটতে দেখা গেছে। বিশেষ করে ভ্রমণের পরিকল্পনা প্রায়ই বদলে যেত। কাছের মানুষেরা এ কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি মুচকি হেসে বলতেন, এ আমাদের বংশানুক্রমিক সংস্কার। বাবু চেঞ্জেস হিজ মাইন্ড- সে জানো তো!
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোথাও যাবেন, দিন ঠিক হয়েছে, কিন্তু দেখা যেত সেদিন আর যাওয়া হলো না। শেষ মুহূর্তে এসে তিনি মত বদলাতেন। এ কারণে তার সেক্রেটারি প্রায়ই বলতেন, গুরুদেব ট্রেনে না ওঠা পর্যন্ত বলা যায় না কবে তিনি যাবেন।
এমনও হয়েছে, তার মালপত্র ট্রেনে উঠে গেছে অথচ আশ্রমে বসে বর্ষা উপভোগ করবেন বলে আকাশে মেঘ দেখেই গুরুদেব স্টেশন থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে কাউকে কিছু না বলেই আশ্রমে ফিরে এসেছেন।
এসব খেয়াল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ আমোদ পেতেন। শুধু তা-ই নয়, কাছের কেউ কিছু বললেই বলতেন, আমি আর কি খেয়ালী রে? খেয়ালী ছিলেন আমার বড়দা (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর)। একবার খেয়াল চাপল, কাপড়ের যদি জোব্বা হয় তবে কাগজের জোব্বাই বা হবে না কেন? বসে বসে নানা রঙের কাগজ জুড়ে জোব্বা বানালেন; কেবল তাই-ই নয়, সেই জোব্বা গায়ে দিয়ে কলকাতা শহর ঘুরেও এলেন একদিন।
আবার একদিন খেয়াল হলো, ঘিয়ে যদি লুচি ভাজা যায় তবে জলে ভাজা যাবে না কেন? হেমলতাকে (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ছেলে দ্বিপেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় স্ত্রী) বললেন, একবার জলে লুচি ভেজে দেখোই না বউমা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসেন আর বলেন, জিনিয়াসে জিনিয়াসে বাড়ি আমাদের ভরা ছিল। জিনিয়াস হওয়া বড় বিপদের কথা। জানিস, আমি একটুখানির জন্য বেঁচে গেছি। আর একচুল বেশি জিনিয়াস হলেই বিপদ হতো রে।
খাবারের বেলায়ও রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র খেয়াল ছিল। একাধিক পদের রান্না না হলে রাগ করতেন। অথচ খেতেন সামান্যই। অনেক খাবার হয়তো ছুঁয়েও দেখতেন না। ব্যাপারটি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মধ্যেও আমরা দেখতে পাই। এ দুই পুরুষের আরেকটি মিল হচ্ছে, তারা যা লিখতেন অধিকাংশ সময় ঘরোয়া আড্ডায় কাছের মানুষদের পড়ে শোনাতেন। শান্তিনিকেতনের সেই আড্ডায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বহুবার এসেছেন। সেখান থেকে তার জুতো চুরি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ নিয়ে রসিকতাও করেছেন।
রসিকতা কবিগুরুর সহজাত স্বভাব। ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে তিনি প্রায় সময়ই সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রাখতেন। তার অনেক গুরুগম্ভীর কথাতেও সূক্ষ্ম হাস্যরসের আভাস পাওয়া যেত। এমন উদাহরণ রবীন্দ্র পাঠকের অজানা নয়। তার পরও বলি, একবার সীতা দেবী (রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা) শান্তিনিকেতন এসেছেন। গানের আসর বসেছে। কবিগুরুও গাইলেন। হঠাৎ দূরে কোথাও দুম করে শব্দ হলো। কিসের শব্দ জানতে চাইতেই কবিগুরু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, সাড়ে ৯টার তোপ পড়ল। শুনে সরল বিশ্বাসে দু-একজন ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলেন। সীতা দেবী কিন্তু নিশ্চিত হতে পারলেন না। বললেন, কোথায় তোপ পড়ল? রবীন্দ্রনাথ ততধিক গম্ভীর হয়ে বললেন, ফোর্ট উইলিয়ামে। উপস্থিত অনেকেই তার রসিকতা ধরতে পারলেন না। গুরুদেব যখন বলেছেন তখন তা-ই হবে ভেবে তারা আর কথা বাড়ালেন না। অথচ শান্তিনিকেতন থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের দূরত্ব প্রায় ১০০ মাইল।
লেখাটি শুরু করেছিলাম কবিগুরুর ছেলেমানুষী দিয়ে। শেষটাও তবে তাই দিয়ে হোক। ঐশ্বর্যময় জীবনের শেষ দিকে কবি প্রায়ই রঙতুলি নিয়ে মেতে উঠতেন। এ সময় তার পাশে থাকতেন রানী চন্দ (কবির সেক্রেটারি শ্রী অনিলকুমার চন্দের স্ত্রী)। কবি তাকে মডেল করে বেশকিছু ছবিও এঁকেছেন। কিন্তু সে ছবিগুলোয় রানী চন্দের চেহারার কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যেত না। অনেক সময় কবিগুরু লাইন ড্রয়িং করে তার ওপর রঙের পর রঙের প্রলেপ লাগাতেন। ফলে ছবিগুলো একেকবার একেক মূর্তি ধারণ করত। তাই দেখে দুজনই হেসে উঠতেন। কবিগুরু হাসতে হাসতেই রানী চন্দকে বলতেন, তোর গর্ব হওয়া উচিত। দেখ তো আমি কতরূপে তোকে দেখছি।
আবার অনেক সময় ছবি আঁকতে আঁকতে তিনি ছবির সঙ্গেই কথা বলতেন : কী গো, মুখ ভার করে আছ কেন? আরেকটু রঙ চাই তোমার? কালো রঙটা তোমার পছন্দ হলো না বুঝি? আচ্ছা, এই নাও, দেখো তো কত করে তোমার মন পাওয়ার চেষ্টা করছি, তবু তোমার চোখ ছলছল করছে। তা থাকো ছলছল চোখেই, আমি আবার একটু জলভরা নয়নই ভালোবাসি কিনা দেখতে।
রানী চন্দ কবির এই ছেলেমানুষীকে কী আখ্যা দিয়েছেন, এখন আর তা জানার উপায় নেই। তবে অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একে ‘মহাপুরুষের ছেলেমানুষী’ বলা যেতেই পারে।

Disconnect