ফনেটিক ইউনিজয়
ছোটগল্পের বড়মিয়া
মারুফ কামরুল

আধুনিকতার ফলে আমাদের সরলরৈখিক জীবন খণ্ড খণ্ড হয়ে বহুমুখী বাঁকে ঘুরপাক খাচ্ছে। এখন আমাদের জীবন যেমন টুকরো টুকরো, জীবনের জটিলতাগুলোও নানাভাবে বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে। খণ্ড জীবনকে তুলে ধরতে আমরা ছোটগল্প সৃষ্টিতে প্রয়াসী হই। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে কাজটি করেছেন, জীবনের সাথে গল্পকে একাকার করে তুলেছেন এবং সেটি করেছেন ছোটগল্পের আদলে। ‘হৈমন্তী’ পড়ার সময় আমাদেরও রুমালে চোখ মুছতে হয়, যেমনটি হৈমন্তীর বাবা মুছে ছিলেন। গল্প পড়তে পড়তে কখন যে হৈমন্তী আমাদের আপন হয়ে গেল টের পাইনি। আবার পোস্টমাস্টারকে যখন ‘আমাদের পোস্টমাস্টার’ বলে উপস্থাপন করলেন, তখন সত্যিই হৃদয়ের একটি আসন ছেড়ে দিই পোস্টমাস্টারকে। এ নামহীন চরিত্র যেন প্রতিটি পোস্টমাস্টারকে বহন করছে। তবে রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্প লেখায় হাত দিয়েছেন অনেক পরে, তাও আবার যখন জীবনের অতি নিকটে গেলেন তখন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন ‘‘আমি প্রথমে কেবল কবিতাই লিখতুম, গল্পে-টল্পে বড় হাত দিই নাই, মাঝে একদিন বাবা ডেকে বললেন, ‘তোমাকে জমিদারির বিষয়কর্ম দেখতে হবে।’ আমি তো অবাক; আমি কবি মানুষ, পদ্য-টদ্য লিখি, আমি এসবের কী বুঝি? কিন্তু বাবা বললেন, ‘তা হবে না, তোমাকে এ কাজ করতে হবে।’ কী করি? বাবার হুকুম, কাজেই বেরুতে হলো। এই জমিদারি দেখা উপলক্ষে নানা রকমের লোকের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয় এবং এ থেকেই আমার গল্প লেখারও শুরু হয়।’’ (শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ/ জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রভাত, ভাদ্র/১৩১৬)। এবং রবীন্দ্রনাথের যা দেখেছেন, তাই লিখেছেন।
তিনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছেন, ‘‘পোস্টমাস্টার’টি আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।’’ আবার এয়ো বলেছেন, ‘আমি একটা কথা বুঝতে পারি নে, আমার গল্পগুলোকে কেন গীতিধর্মী বলা হয়। এগুলো নেহাত বাস্তব জিনিস। যা দেখেছি, তাই বলেছি। ভেবে বা কল্পনা করে আর কিছু বলা যেত, কিন্তু তা তো করি নে আমি।’ নিজের সম্পর্কে দুটো বক্তব্যের শেষটুকু খোলাসা করলে দারুণ জিনিস বের হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রথমটিতে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘কতকটা বানিয়ে নিয়েছি’ এবং দ্বিতীয়টায় বললেন ‘ভেবে বা কল্পনা করে আর কিছু বলা যেত, কিন্তু তা তো করি নে আমি।’ এই ‘বানিয়ে নেয়া’ আর ‘কল্পনা করার’ পার্থক্য করলে বিষয়টা ক্লিয়ার হবে। তিনি দেখে যতটা লিখেছেন সেটা ঠিক আছে, সীমাবদ্ধতা হলো বানিয়ে নেয়া অংশে। কল্পনা করলে হয়তো এ সীমাবদ্ধতা থাকত না। এর উদাহরণ হলো নব্য ইউরোপীয় সভ্যতায় দীক্ষিত পোস্টমাস্টার সমাজ সংসার বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। পারেনি অনাথিনী রতনকে তার জীবনধারায় একাকার করে দিতে। এখানে যদি কল্পনা করার প্রশ্রয় দিতেন নিজেকে, তাহলে বৈষম্যের বেড়াজালে আটকাতে হতো না। তবে সেই সাথে আনোয়ার পাশার মন্তব্য নিতে পারি, ‘ইউরোপীয় সভ্যতার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নগর-পল্লীর ব্যবধান ক্রমেই বেড়ে গেছে আমাদের দেশে। এ দুইয়ের মধ্যে কোন প্রকারের হৃদয় সেতুবন্ধন সম্ভব নয়। পল্লীর হৃদয়ের সঙ্গে শহরের হৃদয়ের কোনো সূত্রেই বাধা পড়ে না- ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে সে কথা আরেকটু বেশি করে মনে হয়।’’ (রবীন্দ্র ছোটগল্প সমীক্ষা, আনোয়ার পাশা)। এ জায়গায় রবীন্দ্রনাথ সমাজ বাস্তবতার শিকলে আটকে গেলেন। কল্পনায় আটকাতেন না বলে ধরে নেয়া যায়। যা হোক, সবকিছুর পরও রবীন্দ্রনাথ বাংলা গদ্যে বিশেষত ছোটগল্পের দরজায় হাওয়া লাগিয়ে স্বাস্থ্যকর বাতাস ছড়িয়েছেন। অতিপ্রাকৃত বিষয়, সমাজ, নারী, সাধারণ মানুষ নিয়ে গল্প লিখেছেন এবং চরিত্রগুলোর সাথে পরিচয় করিয়েছেন; যারা সমাজে কথা বলার সুযোগ পায় না কিংবা সরে থাকে। গল্পে এসে নিজ নিজ কথা বলেছে আমাদের সামনে।
রবীন্দ্রনাথ কখনও কথক সেজে, কখনও আসর জমিয়ে গল্প করেছেন আমাদের সামনে। তবে এমনটা বলব না যে, রবীন্দ্রনাথ না লিখলে এসব গল্প জানতাম না বা কেউ লিখত না কিংবা চরিত্রগুলোর সাথে আমাদের পরিচয় হতো না। এটাই সত্যি, কেউ না কেউ লিখত। তবে এতটা আপন করে চরিত্র, প্রকৃতি, সমাজকে তুলে দিতে পারত কিনা, সে নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে। সেই সাথে রবীন্দ্রনাথ আমাদের হতাশও করছেন। মোজাফ্ফর হোসেনের মতে, ‘‘পোস্টমাস্টারের এই পরাজয়ের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ঔপনিবেশিক চেতনা। যে কারণে রতনের মতো মানবিক সম্পর্কের বোধ তাঁর ছিলো না। রতন তাঁর সঙ্গে যেতে চাইলে তিনি এই চাওয়ার কোনো হেতু খুঁজে পান না। পরিবর্তে টাকা দিতে চান। সব কিছু মাপার মানদ- হলো অর্থ, এ জ্ঞান পোস্টমাস্টারের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার কাছ থেকে রপ্ত। নামহীন এই পোস্টমাস্টার কলকাতায় ফিরে যেতে পারলেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন; অথচ তিনি গ্রাম্য প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা দেখিয়ে কাব্যচর্চা করেন- এমনই স্ববিরোধী চেতনা তিনি বহন করে মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও।’’ (বিশ্বসাহিত্যের কথা : মোজাফ্ফর হোসেন)। এ জায়গায় রবীন্দ্রনাথ হতাশ করেছেন। সেই সাথে রলিংসের নামটাও আসে। তিনি জেরিকে নিয়ে এমন দায়বদ্ধহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। জীবনের কাছে গিয়ে শিল্প নির্মাণ করে জীবনকে দূরে ঠেলে দিলেন। এক্ষেত্রে রবিঠাকুর আর রলিংস সমপরিমাণ দায়ী। যাক, সব দায় অথবা দায়বদ্ধতা কিংবা এড়িয়ে চলা নিয়েই রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের জগতে, শুধু বাংলা সাহিত্যে নয় বরং বিশ্বসাহিত্যে অনন্য উজ্জ্বল। তবে বাংলা ছোটগল্পের জনক-জননীতে রবীন্দ্রনাথকে টানতে আমি ইচ্ছুক নই। বরং এটা বলা যায়, তিনি বিশ্বসাহিত্যে ছোটগল্পের গৃহে বড়মিয়া গোছের একজন।

Disconnect