ফনেটিক ইউনিজয়
বিশ্বকবিতে বিশ্বে চিনেছে বাংলা ভাষা
মাহমুদ নোমান

সহস্র শতাব্দী শেষে বাংলা ভাষাটা পৃথিবীতে একজন মানুষের মুখের ভাষা হয়েও যদি থাকে, সেদিন সে ব্যক্তির বোধের গভীরে রবীন্দ্রনাথ বাস করবেন নির্দ্বিধায়। হতেও পারে এটি গায়েবি বা তার জানার ছকের বাইরে। কবিতা, গল্পে, গানে, দর্শনে কী এমন ভাষা প্রকাশের শিল্পীত মাধ্যম আছে যে, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব নেই! শুধু প্রভাব বলছি কেন? রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-পরবর্তী আজকের এই দিনে এসেও শিল্পের সব জগতে রবীন্দ্রনাথের দোর্দণ্ডশাসন। এ শাসনের আগল খুলে বের হতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। অনেকে অস্বীকার করবে, করেছে তবে আমি বলি, অস্বীকারের স্পর্ধাও অস্বাভাবিক নয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে; রবীন্দ্রনাথ একটি প্রাণ অথচ অলৌকিকভাবে দুটি সত্তার প্রবলতম অধিকারী। সে দুটি সত্তা হলো, ভারত আর বাংলাদেশ। দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। সাংস্কৃতিক যাপনে বা লালনে বিশদ তফাৎ না থাকলেও এটা বিরল বটে। পাশাপাশি বিশ্বের অনেক দেশের ভাষাও এক অথচ এমন নজির অন্তত আমার জানা নেই। একটি দেশের জাতীয় সংগীত মানে দেশের সামগ্রিক পরিচয় দান।
মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের গোড়া থেকে এ গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাঙালির চেতনমনে অজান্তেই মিশে যেতে থাকে। ১৯৪৭ সালে ভারত তাদের জাতীয় সংগীত নির্ধারণ করলেও বাংলাদেশ সময় নেয় এবং তা স্বাধীনতার পরে। যেন চেতনাত্মক বাস্তবতাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি; ভারত অবশ্য বহুভাষাভাষী দেশ। বহু বিচিত্রতার মধ্যে তাদের সংস্কৃতির ঐক্য। তবুও সেখানে সমকক্ষতার দাবি অনেকের। তবু ‘জনগণমন অধিনায়ক’ তাদের জাতীয় সংগীত। তারা এটাকে হৃদয়ের খোরাক আর পরম শ্রদ্ধায় মাথা তুলে নিয়েছে। দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রের নির্মাণে ‘সর্বজনের মনের মাঝে’ এক আদর্শিক বাস্তবতাকে ঐক্যের বাঁধনে সুর তোলা, দুই জায়গাতেই জাতিগঠনে সমান ভূমিকা রাখা অবাক করার মতোই। এ কৃতিত্ব শুধুই রবীন্দ্রনাথের, তবে একটা প্রশ্ন মাথা তুলতে চায়। ইতিহাসের অভিজ্ঞান অনেক দূর পর্যন্ত দুটি দেশ একই ধারায় এগোলেও সমষ্টিগত উপলব্ধি এক নয়। আত্মপরিচয়ে, আশা-নিরাশা, সহায়-সম্বলে বিস্তর ফারাক। দুটি দেশের আজকের অবস্থানও বেশ পরিষ্কার! এ আধুনিকতার দায় বা আজকের এ অবস্থানের জন্য কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রস্তুত থাকার কথাও নয়। কেননা দুটো দেশের বন্দনা তার জন্য স্ববিরোধীও বটে! কেবল একটা গান রচনা করেছেন বাংলাদেশের রূপ পরিচয়ে, প্রতীক ও চিত্রকল্পের (ইমোজিস্ট) মাধুর্যে; হয়তো সে গানে ভালোবাসা বা মুগ্ধতার কোনো কমতি নেই। তবে যখন জাতীয় সংগীত গণচিত্তের অতুলনীয় অদ্বৈত রূপই প্রতিষ্ঠা করে, তখন রচয়িতার সামগ্রিক কার্যকলাপ সামনে আসবে এটাও স্বাভাবিক।
কেননা আজকাল বিশ্ব অস্থির সাম্প্রদায়িকতার হুড়োহুড়িতে। এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়কে খারিজ করতে থাকে অনবরত। দলন-পীড়ন সেখানে, যেখানে সংখ্যালঘু। যেন সংখ্যালঘুদের ধর্ম থাকতে নেই। অস্বীকার করার কিছুই নেই। কেবল সম্প্রদায়ের বলয়ে মানুষ আর মানুষ থাকে না। অথচ ধর্মের শিক্ষাও এটা নয়। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুল অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী। নজরুল জন্মসূত্রে ভারতীয়। ভারতীয় উত্তরাধিকারকে নিজের বলে জেনেছেন আর গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে ধর্মসূত্রে তিনি পশ্চিম এশীয় তথা ইসলামের অতীত গৌরব আর ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। সাবলীলভাবে সচেতনতায় উভয় ঐতিহ্যকে লালন করেছেন আপন কবিসত্তায়। তাই একই কবিতায় ভারতীয় আর পশ্চিমার ইতিহাস-ঐতিহ্য দারুণভাবে মেলালেন। যে হাতে লিখেছেন অনবদ্য আত্মিকবাদী শ্যামাসংগীত, সে একই হাতে লিখেছেন অনন্য গজল আর ইসলামি গান। কোনো ধর্মই এসব সৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করার স্পর্ধাও রাখে না। এ জায়গায় রবীন্দ্রনাথ ধর্মের বলয়ের বাইরে যাননি। হয়তো সাম্যের গান গেয়েছেন- ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই হেরি তায় সকল খানে।’ এই যে সকলখানে বিরাজমান বলাটা কিন্তু জনসাধারণের অনুভূতিতে তেমন প্রভাবে ফেলে না বা বুঝতে সক্ষমও নয়। যেমন উভয় ধর্মে নজরুল সমান প্রভাববিস্তারী।
আরেকটি কথা, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ রবীন্দ্রনাথ কেবল গান হিসেবে রচনা করেছেন। কোনো জাতীয় সংগীত হবে তার বিবেচনাধীন না থাকতে পারে। এখানেই এ দেশের অনেকের মনে গুপ্ত অনিচ্ছা ঘুমিয়ে আছে কেবল; যদি এমন হতো যে মসজিদের মাইকে নজরুলের ‘মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গাচ্ছে শায়ের সুললিত কণ্ঠে। সে একই শায়ের যদি রবীন্দ্রনাথের রচিত কোনো গজল, হামদ-নাত গাইতেন ঐ একই মাইকে? তবে ওই যে গুপ্ত অনিচ্ছা মিইয়ে যেত বোধহয়। যেমন নজরুলের শ্যামাসংগীত প্রতি পূজোয় শুনি। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে ‘রক্তাম্বরধারিণী মা, ‘আগমনী’ কবিতায় আছে দুর্গার চণ্ডীরূপ, আছে তার সৃষ্টিশীলতার অপরূপ অনুষঙ্গ। নটরাজ শিবও সমানভাবে উদ্দীপ্ত করেছে নজরুলকে। সমকালীন অবক্ষয় ও বিপন্নতা অতিক্রমণের বাসনায়, অপশক্তি ধ্বংসের আকাক্সক্ষায় দুর্গার দ্বৈত সত্তা স্মরণ করেছেন নজরুল। পুরাণের দুর্গাকে সমকালের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে বিকিরণ করেছে নতুন ব্যঞ্জনা। এখানেই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমার মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসীরা এমন কিছু চেয়েছেন। আজ ২৫ বৈশাখ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ মেলে তাকাই এ দেশের আলো বাতাসে। গভীরে কান রাখলেই শুনি আজো রবীন্দ্রনাথের পদধ্বনি। যার জন্য বিশ্বব্যাপী এ বাংলা ভাষা পেয়েছে অসামান্য মর্যাদা। এটুকু বলি, বাংলার মস্তক কেটে নিলে কোন অশুভ শক্তিতে, অন্তরের গহিনে থাকবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

Disconnect