ফনেটিক ইউনিজয়
পড়ো জমি
মূল : টিএস ইলিয়ট ।। ভাষান্তর : সারওয়ার মো. সাইফুল্লাহ্ খালেদ

টিএস ইলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) বিশ শতকের একজন শক্তিমান কবি। তিনি আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করে পরে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তার পুরো নাম Thomas Stearns Eliot. TS Eliot-এর The Weste Land (পড়ো জমি) কবিতাটির শিরোনামে নানা প্রকার রূপক অলঙ্কারযুক্ত অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। যেমন- ব্যক্তিসত্তার পতিত অংশ; সমকালীন ইউরোপ এবং আরও বিস্তৃত অর্থে কোনো স্থান বা অস্তিত্বের যেকোনো অবস্থা, যা প্রাকৃতিক দিক থেকে, আবেগের দিক থেকে এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকে বন্ধ্য। কবিতাটির গূঢ়ার্থ সমসাময়িক বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেও প্রাসঙ্গিক। পাশ্চাত্যের এ কবি শেষাবধি প্রাচ্যের ব্যক্তিক-সামাজিক বন্ধন ও আধ্যাত্মিক চেতনার ‘শান্তি’তেই আত্মমুক্তি খুঁজেছেন।  
‘একবার আমি আমার নিজ চোখে সিবাইলকে কুমায়েতে একটি খাঁচার ভেতর ঝুলন্ত অবস্থায় দেখি। বালকেরা যখন তাকে জিজ্ঞেস করল : সিবাইল, তুমি কী চাও; সে উত্তর দিল : আমি মরতে চাই।’
এজরা পাউন্ডকে
দক্ষতর কারু

১. মৃতের দাফন
এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস, মৃত মাটি ফুঁড়ে
জন্ম দেয় লাইলাক, মিশ্রিত করে
স্মৃতি ও কামনা, উজ্জীবিত করে
নিরস শিকড় বসন্তের বারিপাতে।
শীত আমাদের রেখেছিল উষ্ণতায়,
বিস্মৃতিশীল তুষারে আবৃত করে ধরিত্রীকে,
পুষ্ট করে ক্ষুদ্র জীবন শুষ্ক কন্দ দ্বারা ।
গ্রীষ্ম আমাদের চমকে দিয়েছে, স্টার্নবার্গের সির ’পরে
একপশলা বৃষ্টি ঝরিয়ে; থেমেছিলাম দু’পাশের বৃক্ষসারির মাঝে,
এগিয়ে গেলাম সূর্যালোয়, হফ্গার্টেনের ভেতরে, (১০)
সেখানে কফি পান হলো এবং এক ঘণ্টা গেল আলাপচারিতায়।
আমি নই রুশি মোটেও, লিথুনিয়া থেকে এসেছি, আমি এক খাঁটি জার্মান।
যখন আমরা শিশু ছিলাম, রাজপ্রাসাদে বসবাস ছিল আমাদের,
চাচাতো ভাইয়ের সাথে, সে বাইরে নিয়ে যেত স্লেজে করে,
ভয় হতো আমার। সে বলত, মেরি,
মেরি, শক্ত করে ধরো। চলে গেছি নিচে।
পর্বতেই, মুক্তির অনুভব পাবে তুমি।
পড়ি, অনেক রাত অবধি, আর শীতে চলে যাই দক্ষিণে।

কোন সব শিকড় পরিপুষ্ট হয়, কোন সব শাখা জন্মায়
এ প্রস্তরময় জঞ্জালে? মানবপুত্র, (২০)
তোমার জানা নেই, কিংবা অনুমান নেই, তোমার কেবল জানা                                                                      
স্তূপীকৃত ভগ্ন প্রতিমূর্তিগুলো, যার ’পরে সূর্যরশ্মি আঘাত করে,
আর আশ্রয় দেয় না মরা গাছ, ঝিঁঝিঁ পোকা সান্ত¡না দেয় না,
আর শুকনো পাথর জল-কলকল ধ্বনিতে মাতে না। কেবল
ছায়া আছে এই লাল পাহাড়ের নিচে,
(এসো এই লাল পাহাড়ের ছায়ার তলে),
আর আমি দেখাব তোমাকে অন্য কিছু ভিন্নতর     
সকালে তোমার যে ছায়া তোমার পেছনে লম্বা পা ফেলে চলে
কিংবা তোমার যে ছায়া সন্ধ্যায় উঠে আসে মিলিত হতে তোমার সাথে;
আমি তোমাকে একমুঠো ধুলোর ভেতরে আতঙ্ক দেখাব। (৩০)
প্রবাহিত বিশুদ্ধ হাওয়া
জন্মভূমি হতে
হে আমার আইরিশ তনয়া
তুমি কোন ভিতে?     
‘তুমি আমাকে হায়াসিন্থ দিয়েছিলে প্রথম, বছরখানেক আগে;
‘তারা আমাকে হায়াসিন্থকন্যা বলে ডাকত।’
-তবুও আমরা যখন ফিরেছিলাম, বিলম্বে, পদ্ম-বাগান হতে,
তোমার দু’বাহু পূর্ণ, এবং তোমার চুল ভেজা, আমার মুখে ছিল না
কোনো ভাষা, এবং আমার দু’চোখ ক্লান্ত, আমি ছিলাম-
জীবিত ও মৃতের মাঝামাঝি কেউ, এবং আমি কিছুই জানতাম না, (৪০)
আলোর গভীরে চোখ মেলে দেখি, নীরবতা।
জনশূন্য ও ক্ষুধিত সমুদ্র।

মাদাম সোসোসট্রিস, বিখ্যাত ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা মহিলা,
খারাপ ঠা-া লেগেছে তার, যা হোক
ইউরোপের বিজ্ঞতম মহিলা বলে খ্যাত তিনি,
তার সাথে এক প্যাকেট অভিশপ্ত তাস। এখানে, সে বলেছিল,
তোমার তাস, পানিতে ডুবা ফিনিশীয় নাবিক,
(মণি-মুক্তাসদৃশ তার চোখ। দেখো!)
এখানে বেলাডোনা, পর্বত-রমণী,
নিপুণ মহিলা। (৫০)     
এখানে ত্রিফলাবিশিষ্ট এই লোকটি, এই সে চক্র,
এই একচোখা বণিক, আর এই তাস,
সব ফাঁকা, যা কিছু সে বহন করছে পিঠে,  
হয়তো আমার দেখতে বারণ। আমি খুঁজে পাচ্ছি না
ফাঁসিতে লটকানো লোকটিকে। ভয় করো পানিতে ডুবে মৃত্যুকে।
আমি দেখি জনতার ভিড়, হাঁটছে রিংয়ের ভেতর গোল চক্রাকারে।
ধন্যবাদ। যদি প্রিয়ে মিসেস একুইটোনের দেখা পাও,
তাকে বলবে- আমি নিজেই ঠিকুজি আনি:
তেমন সতর্ক হওয়া লাগে আজকাল সবাইকে।

মায়াবি নগর, (৬০)
শীতের সকালে বাদামি কুয়াশায় ঢাকা,                                                    
লোকেরা ভিড় করে চলে লন্ডন সেতুর ’পরে, এত লোক,
আমি ভাবিনি মৃত্যু বিনাশ করেছে এত লোককে।
দীর্ঘশ্বাস, হ্রস্ব ও অনিবিড়, শ্বাসের টান,
এবং প্রতিটি লোকের দৃষ্টি পায়ের সমুখে।
লোক বয়ে চলেছে পাহাড়ের চূড়ায় আর নিচে রাজা উইলিয়াম সড়কে,
যেখানে সন্তু মেরি উলনথ্ সময় নির্দেশ করে
ঠিক ৯টায় স্তব্ধ ধ্বনি তুলে ঘণ্টিতে চূড়ান্ত আঘাতে।
সেখানে দেখেছি একজন যাকে চিনতাম, থামিয়েছি তাকে চেঁচিয়ে: ‘স্টেটসন!
‘তুমি তো সে-ই যে ছিলে মাইলেতে আমার সাথে জাহাজে! (৭০)      
‘যে মৃত দেহ সমাহিত করেছ গতবার তোমার বাগানে,
‘সেটা কি গজাতে শুরু করেছে? ওটা মুকুলিত হবে এবার?
‘নাকি আচমকা কুয়াশায় তার কেয়ারি পেয়েছে বাধা?
‘ওহো! কুকুরকে দূরে রেখো ওই স্থান থেকে, সেটা মানুষের বন্ধু,
‘নতুবা সে নখের আঁচড়ে খুঁড়ে তুলবে ওকে আবার!
‘ওহে! ভ- পাঠক! -সহচর, -ভাই আমার।’

টীকা: ১. মৃতের দাফন
শিরোনাম : The Burial of the Dead. (মৃতের দাফন)-এর দ্বারা ১. উর্বরতার দেবতার মৃতদেহ দাফন এবং ২. খ্রিস্টানদের গির্জায় যে মৃতের দাফন করা হয়, তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই মৃত্যুর পর পুনর্জীবনের প্রতি বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে। কিস্তু সমসাময়িক কালের ‘পড়ো জমি’র অধিবাসীরা আধ্যাত্মিক দিক থেকে মৃত এবং পুনর্জন্ম বা আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের চিন্তা তাদের কাছে পীড়াদায়ক।
কবিতার প্রথম দিকের পঙ্ক্তিগুলো মানবতার প্রতীক টাইরেসিয়াসের ধ্যানপ্রসূত। টাইরেসিয়াস অতঃপর আধুনিক সভ্যতার জরিপ করে মন্তব্য করে যে, এ সভ্যতা বন্ধ্য ও মৃত।
পঙ্ক্তি সংখ্যা ৮ : স্টর্র্নবার্গেরসি: পশ্চিম জার্মানির মিউনিখের কাছে একটি হ্রদ। এলিয়ট ১৯১১ সালের আগস্টে মিউনিখ সফর করেন।
১০ :    হফ্গার্টেন : মিউনিখের একটি সাধারণ পার্ক।
১২ :    Bin gar keine Russin, stamm´ aus Litauen, echt deutsch.  এটি লিথুয়ানিয়ার রাজপরিবারের মেরির উক্তি।
১৫-১৬ : মেরি : এক জার্মান মেয়ে। এ মেয়ে বিশ্বময় ঘুরে বেড়ায়। সে পরিবার ও সম্প্রদায়-বন্ধনমুক্ত। তাকে আধুনিককালে পরিবার বা সমাজে শিকড়হীনতার প্রতীক রূপে ব্যবহার করা হয়েছে।
২০-২৩ : এখানে Old Testament-এর Ezekiel ও Ecclisiastes অংশের কথা স্মরণ করা হয়েছে।
২৫ :    লাল পাথর : লাল পাথর খ্রিস্টানদের গির্জার প্রতীকরূপে ব্যাবহার করা হয়েছে।            
৩১-৩৪ : Frisch weht der Wind /Der Heimat zu /Mein Irisch Kind/Wo weilest du? উদ্ধৃতাংশটি রিচার্ড ওয়াগনার রচিত হেরমান অপেরা Tristan and Isolde থেকে নেয়া হয়েছে। ফেলে আসা তার প্রিয়ার জন্য এক নাবিকের গান এটি।
৩৫ :    হায়াসিন্থ : এ ফুল উর্বরতার দেবতার পুনরুত্থানের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গ্রিক পুরাণে উল্লেখ আছে, হায়াসিন্থ দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং তার রক্ত থেকে একটি ফুলের জন্ম হয়।
৪২ :    Oed und leer das Meer. উপর্যুক্ত (পঙ্‌ক্তি ৩১-৩৪) অপেরার তৃতীয় অংশ থেকে নেয়া হয়েছে। ত্রিস্তান সমুদ্রতীরে সে তার প্রিয়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় রয়েছে, কিন্তু তার প্রিয়ার জাহাজের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। তখন মুমূর্ষু ত্রিস্তান এ উক্তি করে।
৪৩ :    মাদাম সোসোসট্রিস : Aldous Huxley-Gi Crome yellow (১৯২১) উপন্যাসে মিথ্যা ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে একটি চরিত্র আছে। এলিয়ট সে চরিত্রের নামটি এখানে ব্যবহার করেছেন।
৪৬ :    এক প্যাকেট অভিশপ্ত তাস : এক প্রকার তাস, যার উপরে অঙ্কিত চিত্র দেখে কার ভাগ্যে কী আছে তা ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়। এ-জাতীয় তাস Tarot pack নামে পরিচিত।
৪৭ :    ফিনিশীয় নাবিক : উর্বরতার প্রতীক এক দেবতাবিশেষ, যার মূর্তি গ্রীষ্মের মৃত্যু সংকেতিত করার জন্য প্রতিবছর সমুদ্রে ফেলা হয়।      
৪৯ :    পর্বতের রমণী : অশুভ ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত।
৫১ :    চক্র :  ভাগ্যের চাকা। এক প্যাকেট অভিশপ্ত তাসের একটি তাস।
৫২ :    একচোখা বণিক : অভিশপ্ত তাসের নির্বোধটি। কবিতাটিতে স্মার্নার বণিক মি. ইউজেনাইডসের সাথে যুক্ত (পঙ্‌ক্তি ২০৯-১৪)।
৫৫ :    ফাঁসিতে লটকানো লোকটি : অভিশপ্ত তাসের একটি চিত্র। তাসটিতে দেখানো হয়েছে এক যুবক একটি ঞ আকৃতির ক্রুশ থেকে মাথা নিচের দিকে করে এক পায়ে ঝুলে আছে।
৫৭ :    মিসেস একুইটোন : একটি বিদ্রুপাত্মক নাম। এখানে সমাজের এমন একজনকে বুঝানো হয়েছে, যে ম্যাডাম সোসোসট্রিসের মক্কেল।     
৬০ :    মায়াবি নগর : শার্ল বোদলেয়ারের Les Seps Vieillards (The Seven Old Men) কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি থেকে নেয়া। ভিড়ের শহর, স্বপ্নের শহর।
৬৬ :    রাজা উইলিয়াম সড়ক : লন্ডন নগর জেলার একটি সড়ক।
৬৭ :    সন্তু মেরি উলনথ্ : রাজা উইলিয়াম সড়কের একটি গির্জা।
৬৯ :    ‘স্টেটসন’ : টুপি প্রস্তুত কারক এক আমেরিকানের নাম।
৭০ :    মাইলে : রোম ও কার্থেজের মধ্যে সংঘঠিত খ্রিস্টপূর্ব ২৬০ সালের যুদ্ধ। মাইলে সিসিলির উত্তর উপকূলীয় একটি প্রাচীন নগর।
৭৬ :    ‘You! hypocrite lecteur!-mon semblable, - mon frère! এলিয়ট বোদলেয়ারের Fleurs du Mal Flowers of Evil কাব্যগ্রন্থের ভূমিকার কবিতার শেষ লাইনটি উদ্ধৃত করেছেন। (চলবে)

Disconnect