ফনেটিক ইউনিজয়
ওভারব্রিজের কাছে
আনোয়ারা আজাদ

ফার্মগেটে নেমেই জটলাটা দেখতে পায় লিটন। এ সময় রোজই তাকে এখানে নামতে হয়। নেমে একটুখানি হাঁটলেই তার অফিস। জটলা অবশ্য প্রায়ই দেখে সে। ওভারব্রিজটার নিচেই বেশি দেখা যায়। এমনিতেই ব্রিজের ওপরে এবং নিচে নানা ফিকিরের মানুষজন কাজ ছাড়াই হুদাই ঘোরাঘুরি করে, ঠ্যালাগুঁতা করে, তার ওপর যদি কোনো ছুতোয় একটা জটলা লেগে যায়, তখন বিনে পয়সায় বায়োস্কোপ দেখারও সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। চারদিকে ভ্যা-ভু, ক্যাচোর-ম্যাচোরসহ লাগ ভেলকি লাগ! বেকার লোকগুলো ছাড়াও যাদের কৌতূহল বেশি, তারাও মওকা ছাড়ে না। লিটনও মওকা নেয়া গ্রুপের। জটলা কোনোদিন ছোট, কোনোদিন বড়। তবে বড় হলেই আগ্রহ নিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করে লিটন, নাহলে কানে ফোন লাগিয়ে নিজের পথে হাঁটা শুরু করে। অফিস যাওয়ার সময় তাড়া থাকে বলে সময় ব্যয় করা যায় না, কিন্তু ফেরার সময় বাসে ওঠার আগ পর্যন্ত দু-চারটা জটলার কাছে গিয়ে তামাশা উপভোগ করে সে। দীর্ঘ ছয় বছরে যত জটলা দেখেছে, তার বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করতে পারলে ভালো গল্পকার হয়ে যেতে পারত এতদিনে, কিন্তু সে মেধা তার নেই। লেখার সময় তো নেই-ই, পড়ারও সময় নেই। পড়ার ইচ্ছেও নেই তার। এসব পড়ে রাষ্ট্রের বা জনগণের কোনো উপকারে লাগছে? পড়েই চোখ ধুয়ে চোখ বন্ধ করে নিচ্ছে সবাই। তার চাকরি অডিটের। সেটাই সে ভালো বোঝে। সেটা করতে করতেই পড়ার জন্য আর চোখ খুলে রাখার ধৈর্য থাকে না। একটু-আধটু ইচ্ছে হলেও পড়ার সময় ঘুমে চোখ ধরে আসে। অবশ্য তার একটা অন্য গুণ আছে। সেটা হলো, যা কিছু দেখে সে মনে রাখতে পারে। শুধু মনে রাখা নয়, চমৎকার করে গল্পটা অন্যদের শোনাতেও পারে। অফিসে দু-চার মিনিট ফাও সময় পেলে কলিগদের এসব জীবন্ত গল্প শোনায় সে, মানে যা দেখে সেসব। কলিগরা মনোযোগ দিয়ে শোনে। ‘আর একটা বলেন, আর একটা বলেন’ বলে আবদার ধরলে নিরাশ করে না সে। লিটনের নাম দেয় তারা ‘কথক’। অখুশি হয় না লিটন, খুশিই হয়। গল্প বলতে পেরে আনন্দিত হয় সে। সবাই গল্প বলতে জানে না। গল্প বলার আনন্দের বাইরে তেমন কোনো আনন্দ আর নেই তার জীবনে।
ওভারব্রিজের সিঁড়ির নিচে কিংবা একটু আশপাশেই বিচিত্র সব গল্প আবিষ্কার করে সে! নানা রকম মানুষের হাঁটাচলা, কথা বলা, ব্যস্ততা, ফেরি করা, ভিক্ষা করা, আড্ডা দেয়া, বাসের পিঠে ঢাম ঢাম বাজিয়ে প্যাসেঞ্জার ডেকে তোলাসহ বদমাশ কিছু লোকের বদমায়েশি দেখার মধ্যে যে আনন্দ লুকিয়ে আছে, তা দেখার চোখ লিটনের আছে। তাই সে দেখে। এই তো সেদিন কেবল সিঁড়ির গোড়ায় এসেছে, দেখে একটা ৩০-৩৫ বছরের লোক একটা মেয়েকে কাছে ডাকছে। মেয়েটির পরনে সবুজ রঙের ময়লা একটা কামিজ, কোমরে সবুজ ওড়না পেঁচানো আর কালো পাজামা, খালি পা। চুলও লিকলিকে একটা বিনুনি করা, পরিপাটি নয়। লোকটির পরনে ময়লা না হলেও একেবারে ধোপদুরস্ত পাটভাঙা পোশাক নয়, সাদামাটা পোশাক। পায়ের স্যান্ডেলটাও ওই মানেরই। মেয়েটি প্রথমে সামান্য ঠোঁট বেঁকিয়ে একটু হেসে কাছে এলেও দুটা কথা বলেই মোচড় দিয়ে উল্টোপথে হাঁটা ধরে। লোকটি ডাকতেই থাকে। মেয়েটি কি লোকটির আগে থেকে চেনা? দেখে মনে হয়, জায়গাটায় মেয়েটি স্বতঃস্ফূর্ত; মানে ঘোরাঘুরি করে, অনেককে চেনেও। যে দৃশ্যটা প্রায়ই দেখে লিটন এবং কলিগদের বললে বেশ হাসাহাসি হয়, উপভোগ করে, তা হলো, মেয়েদের শরীরে হাত দেয়া। অনেক লোককেই দেখেছে, সামনে পেলেই চট করে হাত দিয়ে দেয় ওই জায়গাটায়। মেয়েটি ঘুরে দেখার আগেই উল্টোপথে নিরীহ মুখ করে কেটে পড়ে। মেয়েটির মুখ আর দেখা হয় না তার। রেগে, অপমানিত হয়ে মেয়েটির মুখের রঙ কেমন হয় জানা যায় না। মেয়েটির চোখ থেকে কি ফোঁটা ফোঁটা পানি বের হয়ে আসে?
তবে কৌশলটার নৈপুণ্য দেখে চমৎকৃত হয় লিটন। সত্যিই পুরুষ জাতটা জানে বটে! শরীরের অনেক জায়গাতেই হাত দিতে দেখা যায়। সে কি গর্বিত হবে নাকি লজ্জিত! কয়জন পুরুষ লজ্জিত হয়, আদৌ হয় কি? মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে হয় লিটনের। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে লিটন। হাতে কিছু সময় পাওয়া যাবে। যদিও বেশ গরম লাগছে, আবহাওয়াটা মোটেও জুতের নয়, তার পরও অফিসে ১০ মিনিট পর যাওয়ার কথা ভাবে সে। একে-ওকে হালকা ঠ্যালা মেরে পায়ে পায়ে এগোয়। জটলার ভেতরেই ঢুকে যায় বলতে গেলে।
হারামজাদির সাহস কত, নাগর জুটাইছে!
শক্ত করে এক হাতে বউয়ের চুলের মুঠি ধরে আছে লোকটা। অন্য হাতে একটা লাঠি। খেয়াল করে দেখে লিটন, লাঠিটা মারার জন্য না, এটা তার চলার লাঠি। লোকটা অন্ধ। জটলা থেকেই কথা হাওয়ায় ভাসে- ফার্মগেটের এ জায়গায় জুটিটা প্রায় ১৫ বছর  ভিক্ষা করছে। থাকেও বোধহয় আশপাশেই। বেশকিছু মানুষ চেনেও এদের।
নাগর জুটাইছে, তুমি জানলা কেমনে? দেখতে তো পাও না!
‘নাগর’ শব্দটায় আনন্দ পেয়ে কৌতূহলী একজন প্রশ্ন ছোড়ে। ৫ মিনিটের আগেই আরও দু-চারজন এসে গোল হয়ে দাঁড়ায় তামাশা দেখতে। দেখতে লাগে না মিয়া, এমনেই কওন যায়। চোখ আন্ধা হইছে তো কি সব আন্ধা হয়া গেছে? চুলের মুঠি আরও শক্ত করে জবাব দেয় লোকটা। অন্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায় না তার মধ্যে; বরং সাধারণের চেয়ে অনেকটাই গাট্টাগোট্টা লাগে। ‘উ বাবারে মইরা গেলামরে’ বলে বউটাও জড়ো হওয়া মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠে।
আই মিয়া, ছাড়ো ছাড়ো, চুল ছেড়ে দাও। ছিঁড়ে ফেলবা নাকি?
আপনে চুপ থাকেন, কে কইতাছেন? হাতের লাঠি একটু উঁচু করে চুলের মুঠি ধরেই অন্ধ লোকটা খেঁকিয়ে ওঠে। একটুও আলগা হয় না তার হাত।
আন্ধা বেটার মর্দানি দেখছেন? এদিকে চোখে দেখে না, বউটাই বোধহয় রাস্তা দেখায় নিয়ে বেড়ায়! খাওয়ায় পরায়।
‘পুরুষ মানুষের জাতটাই তো এ রকম! এমনি এমনি তো আর নারীবাদীরা গলা ফাটায় নারে ভাই’
বলেই যে মানুষটা কেটে পড়ার চেষ্টা করছিল, অন্ধ লোকটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সবাই তার দিকে ঘুরলে বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
অ্যাই, তুমি এখনও চুলের মুঠি ধরে আছো? তোমার সাহস তো কম না মিয়া! এত্তগুলা লোক বলতেছে, তার পরও তুমি মুঠি করে ধরে আছো! লিটনও কথা না বলে আর থাকতে পারে না।
এই ব্যাটার চোখ থাকলে যে কী করত রে ভাই!
নির্ঘাত ডাকাতি করত। চেহারাটাও তো ডাকাত ডাকাতই লাগে।
ও আল্লাগো, হেয় তো ডাকাতই ছিল গো। এবার বউটা আবার কঁকিয়ে উঠে বলার সুযোগ পায়।
বলো কী? ডাকাত ছিল?
ছিল মানে! গফরগাঁওয়ের ডাকাতের সর্দার ছিল। নাম শোনেন নাই! ঝন্টা ডাকাত। বউ ওই অবস্থায়ই মুখ খিঁচিয়ে মহা উৎসাহে চিৎকার করে বলে।
অ্যাই গফরগাঁওয়ের কে আছেন ভাই হাত তোলেন, হাত তোলেন। কেউ নেই?
নাহ, কেউ নেই। এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিরাশ হয়ে জনতা আবার মনোযোগী হয় ঝন্টা ডাকাতের দিকে।
তো অন্ধ হলো কেমন করে?
হারামজাদি আর একটা কথা কইছিস তো তরে মাইরা ফেলামু। ঝন্টা ডাকাত চুলের মুঠিতে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে লাঠি উঁচিয়ে বলে।
অ্যাই তুমি চুপ করো এখন, অ্যাই তুমি বলো তো শুনি, কেমন করে অন্ধ হলো ডাকাতটা?
বউ চিল্লাতে চিল্লাতেই মহা উৎসাহে যেটুকু বলল, তাতে পুরোটা পরিষ্কার না হলেও ঝন্টা ডাকাতের হিস্ট্রি-জিওগ্রাফি সবই মোটামুটি বোঝা গেল।
পুরো অঞ্চলটাকে কাঁপিয়ে রেখেছিল ঝন্টা ডাকাত। রাত হলে নিরিবিলি রাস্তায় কেউ রক্ষা পেত না তার বাহিনীর হাত থেকে। কিন্তু ওই যে বলে, চোরের দশদিন তো সাধুর একদিন। পুলিশের হাতে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে গেল ঝন্টা ডাকাত। তবে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও পাবলিকের হাত থেকে রক্ষা পায়নি, পুলিশও ইচ্ছে করেই একটু আলগা সুযোগ করে দিয়েছিল পাবলিককে। গ্রামের লোকের একটা হক আছে না পিটন দেওনের! পাবলিকও সুযোগ পেয়ে প্রথমেই বরই গাছের কাঁটা দিয়ে চোখ দুটোয় গুঁতো মারলো। গুঁতো মেরে রক্ত বের হওয়া দেখল মনের সুখে। এ চোখ দিয়েই না সব সামলায় ডাকাতটা! তাছাড়া তারা জানত, জেলখানায় বেশি দিন রাখা যাবে না লোকটাকে। ঠিক ম্যানেজ করে বের হয়ে যাবে। আর বের হলে তাদের রক্ষা থাকবে? রক্ত বের হওয়া দেখে অবশ্য পুলিশ আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি কোমরের দড়ি ধরে কেটে পড়ে। কিছুদিন বাদে গ্রামের লোকের কথাই সত্যি হলো। ঝন্টা ডাকাতকে বেশি দিন আটকে রাখা গেল না জেলখানায়। ছাড়া পেয়ে গেল। আর না ছেড়েই বা উপায় কী; অন্ধ হয়ে যাওয়া কয়েদিকে রাখাও তো ঝামেলা ! তবে ছাড়া পেলেও ঝন্টা ডাকাতের মেরুদ- সোজা করার উপায় আর থাকল না। অন্ধ ডাকাতের সর্দারি মানে কে! সাঙ্গোপাঙ্গরা আস্তে আস্তে নানা অজুহাতে কেটে পড়লে একা হয়ে গেল ঝন্টা ডাকাত। কে তাকে দেখে, কে তাকে রেঁধে খাওয়ায়। বউ তো কবেই পালিয়ে বেঁচেছিল। শেষ পর্যন্ত এই জরিনা বেগমই তাকে উদ্ধার করে। দুজনে দুজনের সহায় হয়। দূর সম্পর্কের একটু আত্মীয়মতো ছিল। দুজনেরই আর কেউ ছিল না, তাই সব বিবেচনা করে জীবনযাপনের সবচেয়ে সহজ উপায় ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমে পড়ল দুজনে। আর ভিক্ষা করতে হলে তো গফরগাঁওয়ে করা যাবে না, তার জন্য উত্তম জায়গা হলো ঢাকা শহর! ঢাকা শহরের মানুষের বস্তা বস্তা টাকা, ঝাঁকি দিলেই টাকা পড়ে! হাঁটতে চলতে টাকা ছুড়ে দেয়! আর যারা টাকা কুড়োয় বা হাত পেতে নেয়, তাদেরও আর অভাব থাকে না! কুড়ানো টাকায় জমি জিরাত পর্যন্ত কিনে ফেলে। ঝন্টা ডাকাত আর জরিনারও আর অভাব নেই। দিব্বি ভিক্ষা করে ভালোমন্দ খেয়ে দেয়ে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার তাদের। তিনজনই এখন ময়মনসিংহ শহরে পড়াশোনা করে। তাদের মা-বাবা ঢাকা শহরে ঠিক কী করে জানা নেই, জানার প্রয়োজনও মনে করে না তারা! মাসে মাসে টাকা পেয়ে তাদের নিশ্চিত জীবন চলে গেলেই হলো।
ঝন্টা ডাকাতের টুকটাক মারধোর খেয়েও ভালোই কেটে যাচ্ছিল জরিনার জীবনযাপন, কিন্তু হুজ্জোত বাধে তার নতুন নাগর জোটায়!
তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে নতুন নাগর? দুনিয়ায় দেখার আর কী থাকল রে ভাই? দার্শনিকের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে মত প্রকাশ করে একজন।
আমাদের কপালে তো কিছুই জোটে না! শুকনো মুখে আরেকজনের আফসোস।
ঘুরে দেখার চেষ্টা করেও লিটন বুঝতে পারে না কথাটা কে বলে। ঝন্টা ডাকাত মারমুখী চেহারায় তখনও জরিনার চুলের মুঠিতে হাত ধরে রেখে এদিক-ওদিক মাথা ঘোরানোর চেষ্টা করে।
এই বেটি থাকে কেমন করে এই ডাকাত বেটার সাথে!
ভাইরে, থাকি কী আর এমনি। মাইয়া মাইনসের একটা পাহারাদার লাগেই। নাইলে ওই যে কইতেছে নাগর জুটছে। আসলে হেয় তো দেখা পায় না, তাই কোনো পুরুষ মাইনসের গলা পাইলেই মনে করে, আমি চদরবদর করতাছি। ভাই, দরকারে কতজনের লগে কতা কইতে হয়, সব আমার নাগর?
তোমার তো সাহস কম না বেটি, এই ডাকাতটাকে বিয়ে করতে গেছো। লিটন মাথা এগিয়ে বলে। অন্ধ হইলেও তো ডাকাতই নাকি?
কেডা কইছে হ্যারে বিয়া করছি? বিয়া করি নাইরে ভাই।
বিয়া করো নাই মানে কী? লিটন অবাক হয়ে একে-ওকে গুঁতো মেরে একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ায় জরিনার। বাকিরাও চোখ-কান সজাগ করে। জায়গাটার কোলাহলে সব কথা পরিষ্কার বোঝা যায় না।
বিয়া করনের টাইম পাইছি নি! তার আগেই তো প্যাট হইয়া গেল। প্যাট নিয়া কাজির সামনে যাই কেমনে! বাচ্চাই বা ফেলাই কেমনে কন? একবার যখন হইয়াই গেল, তখন আর বিয়ার কতা ভাবি নাই গো। দু-একবার মনে হইলেও ইচ্ছা হয়নি আর। জানি তো ব্যাটার যাওনের জায়গা নাই, আমারও একই অবস্থা। সংসার তো করতাছি, কন! দিন তো চইলা যাইতেছে! কারও তো কুনো ক্ষতি করতাছি না। বিয়া করতে গ্যালেই খরচাপাতি! বাচ্চারে খাওয়ামু না বিয়ার খরচা উঠামু! তার পরও আছে এই ব্যাটার পান-সিগারেটের খরচা। বিড়ি খায় না বড়লোকের পুত! প্রতিদিন হোটেল থন গোশত আনা লাগে, নাইলে গলা দিয়া ভাত ঢোকে না ব্যাটার। কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই নির্দ্বিধায় বলে যায় জরিনা। এতদিনে সংকোচই বা থাকে কেমন করে!     
বাহ, বিয়ে ছাড়াই তোমাদের তিন-তিনটা ছেলেমেয়ে? সংসার? বলে কী রে বেটি। কেউ জানে না? টাসকি খাওয়ার অবস্থা লিটনের।
আরে ভাই, এরা বলে কী? এ যে ঝন্টা ডাকাতের দিনদুপুরে ডাকাতি! গ্রামে থাকলে তো দোররার বাড়ি খেয়ে মরে যেত!
নাউজুবিল্লাহ। নাজায়েজ কারবার। এই বেটিরে অবশ্যই দোররা মারা উচিত। বেটির সাহস দেখেন খালি। টুপি পরা একজন চোখ-মুখ লাল করে ভিড় ছেড়ে বের হয়ে যায়।
কথাটা শোনার সাথে সাথে ঝন্টা ডাকাতের প্রতি মারমুখী জনতার আক্রোশ এবার জরিনার দিকে হেলে পড়ে। চুলের মুঠিতে ধরে রাখা ঝন্টার হাত দেখে যাদের হৃদয়ে এতক্ষণ প্রতিবাদের ফেনা উছলে উঠেছিল, স্তিমিত হয়, তাদের চোখে এবার নেচে ওঠে ভয় ও ঘৃণা। চোখ-মুখ কুঁচকে ভিড় থেকে সরে যেতে থাকে মানুষ। কোনো একটা সিডির দোকানে জোরে বেজে ওঠে ‘চিকনি চামেলী...’ গাড়ির তীব্র হর্নেও পরের লাইন কানে পৌঁছার আগেই লিটনও সরে পড়ার জন্য পা বাড়ায়। আর দেরি করলে বসের কথা শুনতে হবে। তবে জরিনার চিৎকার হালকা করে কানে এলেও ভেতরে অন্য রকম এক আলোড়ন অনুভব করে সে। খরচের ভয়সহ আরও নানা রকম ভয় নিয়ে সংসার করার কথা এখনও সে ভাবতেই পারছে না, অথচ জরিনা আর ঝন্টা ডাকাত কত সহজে সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাদের নিজস্ব দর্শন নিয়েই জীবন চালিয়ে যাচ্ছে! সত্যিই সাহস আছে ওদের। আরও কত রকম জীবন আছে এই শহরে কে জানে, কে খোঁজ রাখে! সব ছাপিয়ে এই একঘেয়েমি জীবনে জরিনাদের অন্য রকম জীবনের গল্প পেয়ে উৎফুল্ল ও চমৎকৃত হয় লিটন।

আরো খবর

Disconnect