ফনেটিক ইউনিজয়
সিঁড়ি
মাহবুব আলী

এখন কীভাবে নিজেকে সেখানে নিয়ে যাই, থই পায় না সখি। দিশেহারা ভাবনা খেই। প্রচণ্ড ভিড়ে পিঁপড়ে কিলবিল। তারা এগিয়ে যায়। ছোটাছুটি-হুড়োহুড়ি। কে কাকে ঠেলে ফেলে দেয়, কে পড়ে যায়, কার বুকে কার পা ওঠে; কারও নজর নেই। অনেক ভিড় দেখেছে সখি। কোটি মানুষের ভিড়ে মানুষ একলা পথিক। সখি আজ আবার পথে নেমেছে। পথের মানুষ পথে। আজ ফেরার পথ।
সখি একলা। একদিন শূন্যহাতে এখানে এসেছিল। সন্ধ্যার ট্রেন যাত্রা। তখন ঈশাণ কোণঘেঁষে একলা চাঁদ। চারিদিক হিম-কুয়াশা ঘোলা আলো। মায়ের জন্য মন কেমন করে। ফিরে যাবে? সে যায়নি। এরপর কেটে গেছে ১৮৫ দিন। আজ ফিরে যেতে এসেছে। একটিবার দেখা। ট্রেনে উঠবে। এখন বেলা ৩টে। আজ আকাশে চাঁদ নেই। সন্ধ্যায় উঠবে কিনা কে জানে, মানুষ চাঁদের খোঁজে চোখ রাখবে; এদিক-ওদিক খুঁজবে। চাঁদ দেখা দিতে পারে অথবা...। সন্ধ্যা ৬টা ৪৩-এ ইফতার। ২৯ রমযান। সখি এখনও উঠতে পারল না। পারবে কিনা জানে না। মাথায় পোকা কামড়ায়। অস্থির মন। কত সময় আছে?
মানুষ আর মানুষ। একদিন মানুষের ভিড়ে এসেছিল। ইট-পাথরের শহর। কেউ কারও দিকে তাকায় না। এখানে চেনা মানুষও অচেনা। ট্রেন চলে। ঝিকঝিক উথাল-পাতাল ভাবনা। তার উপায় নেই। পারা যায় না আর। সেই রাতে কোন ভাবনায় অবশেষে বলে ফেলে। মা বিশ্বাস করে না। এমন আবার হয়! এত বড় পাপ! অথচ তেমনই হয়। সখির অসহ্য লাগে। সে পারে না। কী করতে পারে সে? শেষ পর্যন্ত পরম নির্ভরতার আশ্রয়... বলে ফেলে। কিন্তু পাথর চেহারায় অবিশ্বাস। দোলাচল খেলা। চোখের দৃষ্টিতে ঝাপসা বৃষ্টি। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আর কিছু নেই। রাত নামে। নেমে আসে অন্ধকার। সখি কু-লিত কুকুরের মতো শুয়ে থাকে। ঘরের পশ্চিম কোনায় চৌকির ওপর দুজন মানুষ ঘুমোয়। গভীর নিঃশ্বাসে দেয়াল কাঁপে। সখির বুক। এই বুঝি কোনো রোমশ হাত এগিয়ে আসে। তাকে চেপে ধরে। সেই মানুষ তার বাবা। বড় ভরসায় বাবা ডাকে।

‘কি গো বেটি উঠতে পারো নাই?’
‘না গো চাচা। কেমনে উঠুম!’
‘যাবা কই?’
‘দিনাজপুর।’
‘টিকিট নিছো?’
সখি সামনে তাকায়। একজন মানুষ এক মেয়েকে জানালা দিয়ে ভেতরে নিতে ব্যস্ত। এত মানুষ কেমন করে যায়? ট্রেন থেমে আছে। মানুষের ভিড়। ভেতরে যেতে মরিয়া। কেউ ছাদে ওঠে। সখি কি ছাদে উঠবে? সে পাশে তাকায়। লোভে চকচক করে শেষ দুপুরের দৃষ্টি।
‘তুমি ছাদে যাও। উঠবা?’
‘কেমনে উঠুম? অনেক উঁচা গো চাচা।’
‘এই যে মই আছে। বোঝলা মই না, সিঁড়ি; এডা দিয়া চান্দেও ওঠা যায়। স্বর্গেও। তুমি আহো।’
‘আজ চাঁদ উঠব?’
‘উঠবার পারে, না হলে শনিবার ঈদ হইবই। তুমি যাইবা না? আহো ছাদে তুইল্যা দিই। দশ ট্যাহা।’
‘দশ ট্যাহা?’
‘হ স্বর্গের সিঁড়ি ১০ ট্যাহা। উঠবা?’
সখির ১০ টাকা খরচ করতে অসুবিধে নেই। ১০ কেন, ২০, ৫০, ১০০। মায়ের জন্য মন টানে। কেমন আছে মা? আহা কতদিন মাকে দেখে না! সেই আনন্দময়ী মা বোবা হয়ে গেল। সেই রাতে একটি মানুষ সারাজীবন বিছানায় শুয়ে শুয়ে অবশেষে পালঙ্কে ওঠে। মানুষের কাঁধে হেঁটে যায়। অনেক দূরের দেশ। মুখে কথা নেই। নতুন পোশাকে আতর-লোবান বাতাসে ভেসে যায়। মা কাঁদে। আকাশ-দিগন্তে অদ্ভুত বিষাদ। সোনালি-লাল আলোয় ধূসর অন্ধকার নামে। মানুষেরা বাবাকে নিয়ে যায়। ঝোপজঙ্গল পেরিয়ে বাঁশবাগান। সেখানে হাজার জোনাকি। রাত পাহারায় জেগে থাকে।
‘মা বাবারে কই নিয়া যাইতাছে?’
‘তোর বাবা যে স্বর্গে যায় গো বেটি। জাদু রে...।’
আকাশের দেয়ালে কান্নার প্রলম্বিত সুর। সখির অবুঝ মায়া চোখ ভাসে। সেও যাবে। বাবার কষ্ট। বাবা কত কথা বলে। সখি শোনে। সখি বলে। বাবার মুখের হাসি। কখনও বিষাদ। কোনো কথা বলে না। চোখের দৃষ্টি কথা কয়। বিছানায় শুয়ে কেটে যায় দিন-রাত।
‘ওগুলা কিসের আলো গো মা?’
‘স্বর্গের বাতি মা। মা রে অ্যাহন কী করি?’
‘আমি বাবার কাছে যামু।’
সখি কাঁদে। বাবাকে কোথায় রেখে এলো মানুষেরা? সখি কাঁদে শুধু কাঁদে। তারপর সেই বাড়িঘর-আঙিনা বদলে যায়। মায়ের সঙ্গে হেঁটে এলো দূরের পথ। নতুন ঘরদোর। একজন গাট্টাগোট্টা মানুষ মিটমিট তাকায়। চোয়ালে ঝুলে থাকে অচেনা হাসি। মানুষ কোলে তুলে নেয়।
‘এই হলো তোর বাবা। অ্যাহন থাইক্যা বাবা ডাকবি।’
‘না এ মানুষ আমার বাবা না। আমার বাবা মইরা গেছে।’
‘যে গেছে... গেছে গ্যা। অ্যাহন এই তোর বাপ।’
সখি বাবা ডাকে। এই বাবা হাসে না। চেহারায় কী খেলা করে বোঝে না সখি। তার কেমন লাগে। শিরশির ভয়। মনে হয় একটা সাপ হিম-শীতল ছুঁয়ে রাখে। গালে চুমু দেয়। ঠোঁটে চুমু খায়। সেই মুখ সেই ঠোঁট ধীরে ধীরে নেমে যায়। বুকের কাছে। আরও নিচে। সখির খারাপ লাগে। কখনও ঘুম পায়। অন্ধকার রাত। সে হারিয়ে যায়।
সখি স্কুলে ভর্তি হয়। এলোমেলো পথ ধরে হেঁটে যায়। রোদ-ছায়ায় ক্লান্তি। মাথা আউলায়। মানুষের জীবন জটিল। মা বলে,-
‘চুপ থাক। কাউরে কবি না।’
‘মানুষডা ভালা না। আমি বাবা ডাকি। কিন্তু...।’
‘চুপ যা মা। এগুলা মুখে আনা পাপ।’
সখি বলে না। সে ভাবে। পাপ-পুণ্য কী? একদিন পথে নেমে যায়। ট্রেনে বসে। কেউ জানে না। সে থাকবে না। পালিয়ে যাবে। তখন সন্ধ্যারাত। পুব কোনায় চাঁদ ওঠে। আজও চাঁদ উঠবে অথবা কাল। মানুষ আকাশে চাঁদ হাতড়ায়। সে ফিরে চলে। মাকে দেখতে মন টানে। কেমন আছে মা? সখি এখনও ট্রেনে উঠতে পারেনি। নিজেকে কেমন করে ভেতরে নেয়? ছাদের ওপর? অবশেষে ছাদেই উঠতে হবে। সেই মানুষ অস্থির। এদিক-ওদিক তাকায়। হাতে মই। সিঁড়ি। কেউ সিঁড়ি দিয়ে ছাদে ওঠে। সখি অস্থির চঞ্চল। কাল ঈদ। একবার সেই বাঁশবাগানে যেতে সাধ জাগে। সেখানে বাবা শুয়ে থাকে। সখি কয়েকটি মালা নিয়েছে। বকুল ফুলের মালা। এসব ভাবতে ভাবতে পাজামার ফাঁসে হাত রাখে। একটি লালরং নোট।
‘চাচা আমারে উঠায়া দাও।’
‘আইস আইস... সমায় কম গো বেটি।’
মানুষ ছোটে। সখি পেছন পেছন। ব্যস্ত ভিড়। সে যেতে পারে... পারে না। তার হাতে পুঁটলি। সেখানে বকুলের মালা। তাজা ফুলের মালা। কয়েকটি শুকিয়ে গেছে। ফুলের তবু সুবাস মরে না। সখির মন মরে গেছে। সে বাঁচতে এসেছিল। ইট-পাথরের শহর। এখানে মানুষ বেঁচে থাকে। মানুষ মরে যায়। বকুলের গন্ধ তবু বাঁচে। মাকে মনে পড়ে। মায়ের জন্য মন টানে। বাবার জন্য। বাবা জোনাকি আলোর নিচে ঘুমোয়। বাবার বুকে বকুল ছুঁয়ে দেবে। রেখে আসবে। বাবা খুব ভালোবাসত। সখির বুকজুড়ে সুখ। সেই সুখ হারিয়ে গেল। একদিন পালিয়ে আসে। ইট-পাথরের শহর। পথে ঘুরতে ঘুরতে কত কাজ। মানুষ ভালো মানুষ খারাপ। সখি কাজ ছেড়ে দেয়। তারপর পার্কের খোলা বাতাস। সে গাছের নিচে শুয়ে থাকে। সারারাত বকুল ফোটে। তারার আলো। সকালে ফুলের বিছানা। সখি মালা গাঁথে। মন ভাবনা। একটি মানুষ মালা নিয়ে আসে। মা খোঁপায় পরে। মুখে হাসি। সেই মানুষ এখন জোনাকির আলোয় শুয়ে থাকে। মা কেন ভুলে গেল তাকে? মা তুমি কেমন করে বাবাকে ভুলে গেলে? কেন ভুলে গেলে?
অবশেষে উঠতে পেরেছে সখি। সিঁড়ি সরে যায়। যেতে হবে। কাল ঈদ। আনন্দ উৎসব। সখি বসে থাকে। নিচে মানুষজনের ছোটাছুটি। একটি হুইসেল। ট্রেন এগিয়ে যায়। সখির মাথা ঘোরে। অদ্ভুত ঘোর ঘোর দৃষ্টি। আকস্মিক কী হয়? কয়েকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। হইহই চিৎকার। সখির মন উন্মন। মায়ের কথা মনে পড়ে। বাবাকে দেখতে সাধ। সে ভিড়ের মধ্যে উঠে দাঁড়ায়। একটি মেয়ে শুয়ে থাকে। হাতে বকুলের মালা। সে রাস্তায় রাস্তায় মালা বিক্রি করে। সুগন্ধ বিলোয়। সে এখন শুয়ে আছে। ওঠে না। তার মুখ থেকে রক্ত নেমে যায়। সখি সিঁড়িতে পা রাখে। অনেক ওপরে বসে আছে কেউ। সে তার বাবা। সখি ওপরে ওঠে। উঠে যায়। স্বর্গের সিঁড়ি।

Disconnect