ফনেটিক ইউনিজয়
পড়ো জমি
মূল : টিএস ইলিয়ট । । ভাষান্তর : সারওয়ার মো. সাইফুল্লাহ্ খালেদ

৪. পানির ধারে মৃত্যু
ফিনিশীয় ফ্লেবাস, এক পক্ষকাল হলো মৃত,
বিস্মৃত হয়েছিল সমুদ্রপক্ষীর ডাক, আর গভীর সমুদ্রের স্ফীতি  
এবং লাভ লোকসান।
                                 সমুদ্র তলের স্রোত
ফিসফিসিয়ে অপহরণ করেছে তার হাড়গোড়। যখন তরঙ্গতে সে ডুবেছে আর ভেসেছে   
সে অতিক্রম করে গেছে তার বয়স এবং যৌবনের স্তর      
পানির আবর্তে প্রবেশের মধ্যে দিয়ে।
                                   পৌত্তলিক কিংবা ইহুদি
ওহে তোমরা যারা চাকা ঘোরাও এবং তাকাও বাতাসের দিকে, (৩২০)
বিবেচনা করে দেখো ফ্লেবাসকে, যে ছিল একদা সুদর্শন আর সাহসী
                                  তোমাদেরই মতো।  

৫. বজ্র কী বলেছিল
ঘামে ভেজা মুখম-লের ’পরে মশালের লালিমার পর      
তুষার শীতল নীরবতার পর বাগানে        
মরণ যন্ত্রণার পর পাথুরে স্থানে     
উচ্চৈঃস্বরে হাকডাক এবং চিৎকার
কারাগারে আর প্রাসাদে এবং বজ্রপাতের   
অনুরণন বসন্তের দূরের পাহাড়ের উপর    
যে ছিল জীবিত এখন সে মৃত
আমরা যারা জীবিত ছিলাম এখন মুমূর্ষু
অতি অল্প সহিষ্ণুতার বলে (৩৩০)

এখানে কোন পানি নেই কেবল পাথর,
পাথর এবং পানি নয়, আর ধুলোমাখা পথ,
পথ পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উপরে উঠেছে পাহাড়ে     
যেসব পাহাড় পানিহীন পাথুরে
যদি পানি থাকতো আমরা অবশ্যই থামতাম আর তা পান করতাম
পাথরের মাঝে কেউ পারে না থামতে কিংবা ভাবতে  
শুকনো ঘাম আর পা’দুটো বালুর ভেতর
যদি পাথরের মাঝে সেখানে কেবল পানি থাকতো   
মৃত পাহাড়ের ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের মুখ ফেলতে পারে না থুথু
এখানে কেউ না পারে দাঁড়াতে, শুতে কিংবা বসতে (৩৪০)    
এমনকি নীরবতাও নেই সেখানে পাহাড়ে
কেবল শুষ্ক বন্ধ্যা বৃষ্টিহীন বজ্রধ্বনি
এমনকি নির্জনতাও নেই সেখানে পাহাড়ে  
কেবল লাল বিষণ্ন বদন দেঁতো হাসে আর খেঁকায়   
চৌচির কাদামাটির ঘরের দরজা থেকে
                               যদি-বা সেখানে পানি থাকতো
এবং পাথর নয়
যদি-বা সেখানে পাথর থাকতো
আর পানিও
এবং পানি
একটি ঝরনা (৩৫০)        
পাথরের মাঝে একটি ডোবা
যদি-বা সেখানে থাকতো পানির শব্দ কেবল
ঝিঁঝিঁপোকা নয়
শুকনো ঘাস গান গায়
কেবল পানির শব্দ পাথরের উপরে
যেখানে সাধক-পাখি গায় পাইন শাখায়
টিপ্ টাপ্ টিপ্ টাপ্ টাপ্ টাপ্ টাপ্
কিন্তু সেখানে পানি নেই   

কে ওই তৃতীয় জন যে হাঁটে সর্বদা তোমার পাশে?
যখন আমি গুণী, সেখানে কেবল তুমি আর আমি এক সাথে (৩৬০)                                                                                                
কিন্তু যখন আমি তাকাই সফেদ সড়কের সমুখ পর্যন্ত                                                                           
সেখানে সর্বদা দেখি অন্য একজন হাঁটে তোমার পাশে       
সন্তর্পণে, জড়িয়ে ঢোলা বাদামি জামা, মাথাঢাকা   
আমি জানি না এ নারী কি না পুরুষ
-কিন্তু কে সে অন্যজন তোমার অপর পাশে?  

উঁচু স্বরে কিসের শব্দ ভাসে বাতাসে
মাতৃসুলভ চাপা গুঞ্জন বিলাপের
ওরা কারা সমবেত মাথাঢাকা তস্কর
অন্তহীন প্রান্তরে, হোঁচট খায় চৌচির মাটিতে
পরিবেষ্টিত যা কেবল সমতল দিগন্ত দ্বারা (৩৭০)
কোন এ নগর পাহাড়ের উপর
চিড়ে আর গড়ে আর বিস্ফোরিত হয় বেগুনি বাতাসে
পড়ন্ত টাওয়ার
জেরুজালেম এথেন্স আলেকজান্দ্রিয়া
ভিয়েনা লন্ডন
মায়াময়

এক রমণী শক্ত করে টেনে বাঁধে তার লম্বা কালো চুল      
আর বেহালার সুস্বর ফিসফিসিয়ে উঠে সে সব তন্তুতে       
আর বাদুর শিশুর মুখ যেমন বেগুনি আলোয়             
শিস দেয়, আর ডানা ঝাপটায় (৩৮০)                                
আর মাথা নিচু করে হামাগুড়ি দিয়ে হেঁটে নামে কালো রঙ দেয়াল
আর শূন্যে বাতাসে উপর-নিচ টাওয়ার
সময় নির্দেশক স্মৃতির ঘণ্টা বাজায়,
আর কণ্ঠস্বর গান গেয়ে উঠে ছাদের শূন্য চৌবাচ্চা আর শূন্যোদর
     পাতকুয়া হতে।       

এই পাহাড়ের মাঝে ক্ষয়িষ্ণু গুহায়    
ক্ষীণ চন্দ্রালোকে, ঘাস গান গায়         
তরঙ্গায়িত কবরের ’পরে, ভজনালয়ের চতুর্দিকে     
সেখানে শূন্য ভজনালয়, কেবলই বাতাসের আস্তানা।
এর কোন জানলা নেই, আর দরজাগুলো দুলছে,   
শুকনো হাড় ক্ষতি করতে পারে না কারো। (৩৯০)                   
কেবলই একটি মোরগ দাঁড়িয়েছিল করিকাঠে  
কক্অক্ কক্  কক্অক্  কক্
বিদ্যুৎ ঝলকানির মাঝে। তখন আর্দ্র  দমকা বাতাস
বৃষ্টি আনে

গঙ্গার পানি তলায় নেমেছে, আর থলথলে পাতাগুলো
ছিল বৃষ্টির অপেক্ষায়, পরন্তু কালো কালো মেঘ
জমছিল দূরন্ত-দূর, হিমালয়ের ’পরে।
জঙ্গল অবনত, নীরবতায় কুঁজ।
তখন বজ্র বলে

দ্য (৪০০)

দাতা : কী আমরা দিয়েছি?
বন্ধু আমার, রক্ত কম্পিত করে আমার হৃদয়    
ভক্তিসঞ্চারক সাহসে মুহূর্তের আত্মসমর্পণ  
যাহা বিচক্ষণ যুগ কখনও পারে না ফিরাতে  
এর দ্বারা, এর দ্বারাই কেবল, আমরা টিকে আছি   
যা মিলবে না খুঁজে আমাদের মৃত্যুর মুদ্রিত বিজ্ঞাপনে   
কিংবা দয়ালু মাকড়সার জালে মোড়া স্মৃতিতে
কিংবা কৃশকায় আইন পরামর্শক দ্বারা ভাঙা সিলমোহরের তলে     
আমদের শূন্য কক্ষগুলিতে

দ্য (৪১০)                                                                                                   

দয়ধ্বম :  আমি শুনেছি চাবিটা
ঘুরে দুয়ারে একবার এবং ঘুরে একবার কেবল
আমরা ভাবি চাবিটার কথা, প্রত্যেকে নিজ কারাগারে
চাবিটার কথা ভাবছি, প্রত্যেকের কাছে প্রমাণিত এ কারাগার
কেবল রাত্রি নেমে এলে, বায়বীয় গুজবেরা
ক্ষণিকের তরে চৈতন্যে আনে ভেঙে পড়া কোন কেরিওলেনাস

দ্য

দম্যত : তরণী সানন্দে দিয়েছে
সাড়া, পাল ও দাঁড়ে দক্ষ হাতের কাছে
সমুদ্র ছিল শান্ত, তোমার হৃদয় দিত সাড়া (৪২০)
সানন্দে, নিমন্ত্রণ পেলে, বাধ্য হৃৎস্পন্দনে
নিয়ন্ত্রণী  হাতে   
                         আমি মাছ ধরছিলাম
তীরে বসে, শুষ্ক উন্মুক্ত প্রান্তর পেছনে আমার
আমি কি বিন্যস্ত করব আমার জমিটা অন্তত?
লন্ডন সেতুর পতন হচ্ছে পতন হচ্ছে পতন হচ্ছে
আমার কষ্ট স্মরণ করো দয়া করে
আমার গান বাজে না কারো কানে- হায় দোয়েল দোয়েল
একুইটাইনের পতিত টাওয়ারের রাজকুমার
আমার বিনাশের বিপরীতে এই টুকরোগুলো তীরে তুলেছি (৪৩০)                
তাহলে আমি তোমাকে শাস্তি দেব। ইয়ারোনিমো পাগল হয়েছে আবার।  
দত্ত। দয়ধ্বম। দম্যত।
                শান্তি শান্তি শান্তি

টীকা :
৪. পানির ধারে মৃত্যু
কবিতার এই অংশটি ইলিয়টের ১৯১৮ সালের মে-জুনে লিখিত ফরাসি কবিতা ‘Dans le Restaurant’ কবিতার শেষ সাত চরণের পুনর্লিখন। ‘পানিতে মৃত্যু’ পানি ও নশ্বরতা এবং পানিতে ডুবে মৃত্যুর- পানিতে নিমজ্জিত উর্বরতার দেবতার ধর্মীয় পদ্ধতির প্রধান প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী যাবতীয় অনুষঙ্গকে একত্রিত করেছে। ফ্রেজার ও জেসি ওয়েস্টন বর্ণিত ফিনিশীয় গ্রিক দেবতা Adonis-এর ধর্মীয় পদ্ধতির অনুরূপ মনে হয়। আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রতি বছর বিলাপের সাথে দেবতার মস্তকের কুশপুত্তলিকা সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হত এবং সাত দিন পর সেটা স্রোতে ভেসে বাইব্লোসে ( Byblos ) পৌঁছলে আনন্দের সাথে গৃহীত হতো। এই যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতার মৃত্যু ও পুনরুত্থান আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পাদিত হতো। তবে ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু’তে প্রধান ঝোঁক হচ্ছে মৃত্যুর ওপর, পুনর্জন্মের মাধ্যমে নবজীবন লাভের উপর নয়। বস্তুত, ফ্লেবাসের বয়স এবং যৌবনের স্তরের মধ্যে দিয়ে সময় অনুযায়ী ফিরে আসা উর্বরতার দেবতার পুনরুত্থানের স্থান পেয়েছে। ইলিয়ট মানব জীবনের নশ্বরতার বিষণ্নতার দিকটি তুলে ধরার জন্যই এই স্মরণার্থ চিহ্ন ব্যবহারের কৌশল অবলম্বন করেছেন। এও হতে পারে এখানে খ্রিষ্টধর্মে দীর্ঘাকালের ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানের কথা পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে পানি জীর্ণ সত্তার মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের শক্তিরূপে ব্যবহৃত হয়।
পঙ্ক্তি সংখ্যা
৩১২: ফিনিশীয় ফ্লেবাস: সে নিমজ্জিত ফিনিশীয় নাবিক (পঙ্ক্তি ৪৭), এক চোখা বণিক (পঙ্ক্তি ৫২) এবং স্মার্নানার বণিক মি. ইউজেনাইডসের সাথে সংযুক্ত।
৩১৯: সমগ্র মানব জাতিকে বুঝানো হয়েছে।
৩২০: ভাগ্যের চাকা যা পাপি তাসের একটি।

৫. বজ্র কী বলেছিল
ইলিয়ট মনে করেন কবিতার এই অংশটি ‘কেবল শ্রেষ্টাংশই নয়, বরং একমাত্র অংশ যা সমগ্র কবিতাটিকে সর্বোতভাবে সমর্থন করে’। (বার্ট্রান্ড রাসেলের কাছে প্রেরিত ১৫ অক্টোবর ১৯২৩ তারিখের চিঠি, উদ্ধৃত WL Drafts, p.129.)

পঙ্ক্তি সংখ্যা
৩৫৩: ঝিঁঝিঁপোকা: এক জাতীয় পোকা তার দীর্ঘ তীক্ষè সুরের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
৩৯৫: গঙ্গা: ইলিয়ট নদীটির ইংরেজি নাম ব্যবহার না করে সংস্কৃত নামটি ব্যবহার করেছেন।
৩৯৭: হিমালয়: মূল কবিতায় ‘হিমালয়’ পর্বতমালার সংস্কৃত নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
৪০০: দ্য: স্বর্গীয় বজ্র ধ্বনি পুনঃপুনঃ বলে দ্য, দ্য, দ্য, অর্থাৎ নিজকে সংযত কর, দাও, সদয় হও। প্রত্যেকের আত্মসংযম, দান কর্ম এবং সদয় হওয়া- এই একই ত্রয়ীর অনুশীলন করা উচিত। এখানে ইলিয়ট Brihadaranyaka Upanishad v, 2.-এর বজ্রের  গল্পের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।          
৪০১: দাতা: দাও।
৪১১: দয়ধ্বম: ইলিয়ট এর অনুবাদ করেছেন ‘সহানুভূতি প্রদর্শন করো’; অন্যদের পছন্দনীয় অনুবাদ হলো ‘সদয় হও’।
৪১৬: কেরিওলেনাস: শেক্সপিয়রের Coriolanus নাটকের রোমান সেনাপতি যে বীরত্বের সাথে ভোলসিয়ানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।
৪১৮: দম্যত: ইলিয়ট এই শব্দের অনুবাদ করেছেন ‘সংযম’; অন্যদের পছন্দনীয় অনুবাদ ‘সংযত করো/নিজকে নিয়ন্ত্রণ করো’। বজ্রের এই তৃতীয় উক্তি জোর দিচ্ছে আত্মনিয়ন্ত্রণ, কিংবা আত্মসংযমের ওপর।  
৪২৭: Poi s´ascose nel foco che gli affina : এখানে এলিয়ট দান্তের Purgatorio xxvi, 145 -48-এর প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
৪২৮: Quando fiam uti chelidon: এ পঙ্ক্তিটি এক অজ্ঞাতপরিচয় লেখকের লাতিন কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে। কবিতাটি সম্ভবত দ্বিতীয় শতকের, কবিতাটির নাম ‘Pervigilium Veneris’ (The Vigil of Venus).
৪২৯: Le Prince d´ Aquitaine à la tour abolie: এটি Gerard de Nerval (1808-55) লিখিত ‘El esdichado’ (The Disinherited) নামক একটি সনেটের পঙ্ক্তি। একুইটাইনে দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি অঞ্চল।
৪৩১: ইলিয়ট এখানে Thomas Kyd (1557-95) রচিত The Spanish Tragedy যার উপশিরোনাম Hieronymo is Mad Again-এর প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
৪৩৩: এলিয়ট তার টীকায় উল্লেখ করেছেন শব্দটি এখানে যেভাবে পুনঃপুনঃ উচ্চারণ করা হয়েছে একটি উপনিষদের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তিতেও এভাবে উচ্চারণ করা হয়েছে।

Disconnect