ফনেটিক ইউনিজয়
কঞ্জুস
সুমন্ত আসলাম

লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে পৃথিবীর সবচেয়ে সেলিব্রিটি মিতব্যয়ী বলেন কেউ কেউ। তাদের যুক্তি হচ্ছে- সামান্য কালি খরচের ভয়ে মোনালিসার ভ্রু আঁকেননি তিনি। বাংলাদেশের অনেকে আবার বাংলা সিনেমার নায়িকাদের সবচেয়ে উপরে রেখেছেন এ ব্যাপারে, কারণ তারা যথেষ্ট অর্থশালী হয়েও অনেক ছোট পোশাক পরেন, জনসম্মুখে শ্যুটিং করেন, নাচ-গান করেন রূপালী পর্দায়। আর চাক্ষুস দেখা সবচেয়ে বড় মিতব্যয়ী হচ্ছেন আমাদের গ্রামের আক্কাস চাচা; যিনি দুই টাকা দামের পাখা কিনে, তা ভেঙে যাওয়ার ভয়ে, পাখাটি স্থির রেখে মাথাটা এদিক-ওদিক করে বাতাস খাওয়ার চেষ্টা করেন প্রতিদিন।
বিখ্যাত রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী অবশ্য এ ব্যাপারে অফিসের বড় সাহেবকে আগে রেখেছেন সবার। অফিসের বড় সাহেব নিখিল চন্দ্র খরচ করতে ভালোবাসেন খুব। তাই কয়েকদিন যেতে না যেতেই টানাটানি শুরু হয়ে যায় তার। হাত পাতেন অধীনস্থ অফিসের প্রধান সুপার ভাইজার হারাধন বাবুর কাছে। অথচ এ বড় সাহেব প্রতি মাসে তিন গুণ বেশি বেতন পান তার চেয়ে।
বড় সাহেব একদিন ভাবলেন- প্রতি মাসে আমি এত টাকা উপার্জন করি, আর হারাধন বাবু পান আমার চেয়ে অনেক কম, সারা মাস সংসার চালিয়ে তার পরও টাকা ধার দেয়ার ক্ষমতা তিনি কোথায় পান?
মাসের শেষদিকের এক ছুটির দিন। হাতের অবস্থা খুবই টানাটানি বড় সাহেবের। চলে গেলেন তিনি হারাধন বাবুর বাড়ি। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে তখন। বেশ অন্ধকার। কোথাও আলোটালো জ্বলছে না বাড়ির। দরজায় কড়া নাড়লেন বড় সাহেব। দুবার নাড়ার পর টিমটিমে একটা আলো জ্বলে উঠল বাড়ির ভেতর। একটু পর হারাধন বাবু নিজেই দরজা খুললেন- খালি গা, পরনে গামছা তার। বড় সাহেব তার প্রয়োজনের কথা বলতেই বাড়ির ভেতর থেকে টাকাটা নিয়ে এলেন হারাধন বাবু। টাকা হাতে নিয়েই তৎক্ষণাৎ চলে আসতে সংকোচ হচ্ছিল বড় সাহেবের। তিনি তাই এটা-ওটা বলতে লাগলেন হারাধন বাবুর সঙ্গে।
বড় সাহেবের অনাহূত অপেক্ষা করা দেখে হারাধন বাবু শরমিন্দা মুখে বললেন, ‘স্যার কি আরও কিছু কথা বলবেন?’ বড় সাহেব বিব্রত বোধ করলেন, ‘না না, এই একটু খোঁজখবর নিচ্ছিলাম আর কি। কোনো সমস্যা?’ ‘না, সমস্যার ব্যাপার না। আপনি যদি আরও একটু থাকেনই, তাহলে হাতের আলোটা নিভিয়ে দিতাম আর পরনের গামছাটা খুলে ফেলতাম। অযথা এ অপব্যয় করি কেন বলুন তো!’
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকেও বেশ মিতব্যয়ী বলেন অনেকে। কারণ টাকা আর সময় বাঁচানোর জন্য পাঁচদিনের ক্রিকেট ম্যাচ আড়াই দিনে শেষ করে ফেলেন তারা প্রায়ই।
ওয়েলটিং বার্ট ছিলেন একজন মাল্টিমিলিয়নেয়ার, কিন্তু অপরিসীম মিতব্যয়ী। তিনি তার সম্পদের উইল করে যান একটা- মৃত্যুর পরও যেন পরিবারের কোনো সদস্য তার রেখে যাওয়া সম্পতি ভোগ করতে না পারে। তার শেষ নাতির মৃত্যুর ২১ বছর পর পর্যন্ত এ উইল কার্যকর ছিল। ১৯৮৯ সালে বার্ট যখন মারা যান, তখন তিনি আমেরিকার আটজন ধনীর একজন ছিলেন।
স্ত্রীর প্রচণ্ড অসুখ, প্রায় মরণাপন্ন অবস্থা। কিন্তু ডাক্তারের কাছে নেন না তার স্বামী। ব্যথায় কাতরে উঠলেই স্ত্রীর পিঠে হাত বুলিয়ে স্বামী বলেন, ‘আর দুটো দিন, ভালো হয়ে যাবে তুমি।’ বাসায় একদিন খবর এল- গ্রামে ওই লোকটার বাবাও খুব অসুস্থ। বাবা দেখতে চান ছেলেকে। গ্রামে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন তিনি। তারপর স্ত্রীর পাশে বসলেন। লাইটের বেড সুইচটি মরণাপন্ন স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাবাকে দেখতে যাচ্ছে আমি। কখন না কখন ফিরি। যদি তুমি দেখো মারা যাচ্ছ, তৎক্ষণাৎ ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিও। অযথা কারেন্ট বিল উঠিয়ে লাভ কী!’ তবে বেদনাদায়ক মিতব্যয়ী হচ্ছেন আমাদের দেশের কিছু মানুষ, যারা একটি ম্যাচের কাঠি বাঁচানোর জন্য ২৪ ঘণ্টা গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখেন।
বিখ্যাত লেখক তারাপদ রায় একদিন বললেন, ‘আমার এক কাকা আছেন, খুবই হিসাবি মানুষ। সেভ করার পর সেভিং ব্রাশটা ধুয়ে রাখেন না, সাবান শুদ্ধ ওভাবেই রেখে দেন। ভাত-তরকারি খাওয়ার পর হাতের তেল ছাড়ানোর জন্য তিনি সেভিং ব্রাশটা কচলে নেন হাতের সঙ্গে।’ কেউ কেউ আবার সেভ করার জন্য সেভিং ব্রাশও ব্যবহার করেন না। খরচ বাঁচানোর জন্য গালের দাড়ি চিমটি দিয়ে তোলেন তারা!
লটারিতে ৪০ লক্ষ টাকা পেয়েও একটা লোকের ভীষণ মন খারাপ। আশপাশের সবাই জিজ্ঞেস করছে, ‘কী ব্যাপার মন খারাপ কেন তোমার?’ ‘আর বোলো না, দশ দশ বিশ টাকা দিয়ে দুটো টিকিট কিনেছিলাম আমি। একটা টিকিটেই তো কাজ হয়ে গেল, আরেকটা যে কেন কিনেছিলাম!’ এই লোকটা তাও টিকিট কিনেছিলেন। এক লোক লটারি জেতার জন্য দিন-রাত প্রার্থনা করার পর দোয়া করেন, অথচ পয়সা খরচ করে লটারির একটা টিকিটও কেনেন না তিনি।
সাদাত আলী ২০০ টাকা দিয়ে একটা পাঞ্জাবি কিনে বছর দুয়েক পরার পর ছিঁড়ে গেল সেটা। তিনি ওটা কেটে একটা শার্ট বানালেন। শার্টটা এক বছর পরার পর অবস্থা বেগতিক দেখে একটা ফতুয়া বানালেন। আরও ছয় মাস ব্যবহার করার পর তা দিয়ে একটা গেঞ্জি বানালেন তিনি। শেষ পর্যন্ত গেঞ্জিটা কেটে রুমাল হলো তার।
রুমালটাও ছিঁড়ে গেল একদিন। একদিন সকালে রুমালটা পুড়িয়ে ছাই বানালেন তারপর। ওই ছাই দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে পানিতে কুলি করে আফসোসের স্বরে তিনি বললেন, ‘আহারে, ২০০টা টাকাই পানিতে গেল!’
বিরস মুখে অদ্ভুত পোশাক পরিহিত হেটি গ্রিন যখন নিউইয়র্কের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন, সবাই তখন তার দিকে করুণার চোখে তাকাতেন আর মনে মনে বলতেনÑ ওয়াল স্ট্রিটের ডাইনি। কিন্তু কেউ জানত না, সে সময় তিনি ছিলেন ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের মালিক। তার মিতব্যয়িতা এমন কৃপণতায় পৌঁছে গিয়েছিল, তার মেয়ে সিলভিয়াকে দেখা যেত তালি দেয়া পোশাক পরে থাকতে।
হেটির ছেলে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা পেল একদিন। তিনি তাকে নিয়ে গেলেন একটি ফ্রি চিকিৎসা কেন্দ্রে। কিন্তু তাকে চিনতে পেরে ডাক্তাররা তার কাছ থেকে যখন টাকা দাবি করলেন, চিকিৎসা না করিয়েই ছেলেকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলেন হেটি গ্রিন!
সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে ম্যাচের কাঠিকে লম্বালম্বিভাবে ব্লেড কেটে ব্যবহার করেন কেউ কেউ। অনেকে আবার টাকা নষ্ট হবে ভেবে সিগারেটের ধোঁয়া গিলে খান। চায়ের কাপে মাছি পড়লে সেই মাছি তুলে চুষে খান কোনো কোনো চা-খোর। অনেক চা-খোর চিনি খাওয়া পিঁপড়ের পেট চিপে চা মিষ্টি করেন, তারপর ওই মরা পিঁপড়েটা পাঠিয়ে দেন সুগার মিলে।
তো এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলল, ‘তোর চায়ের কাপ থেকে নাকি একটা পিঁপড়া চা খেয়েছিল, তারপর তুই ওই চা-সহকারে ওই পিঁপড়াটাকেই খেয়ে ফেলেছিস?’
‘এটা কী বলছিস তুই- পিঁপড়ে দিয়ে চা!’
‘তাহলে?’
‘রুটি দিয়ে খেয়েই কোনো টেস্ট পেলাম না, আবার চা!’
ভলতেয়ার খুব আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘ওই মানুষটা সবচেয়ে মিতব্যয়ী, পক্ষান্তরে কৃপণ- যিনি অনেক কিছু জানেন, কিন্তু অন্যকে তা জানান না।’
বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরে গোপাল ভাঁড় একদিন জানতে পারলেন, একজন অতিথি এসেছিল তার বাড়িতে। পরে জানতে পারলেন, অতিথিকে একটা মিষ্টি খাইয়েছেন তার স্ত্রী। গোপাল উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘কী, তুমি তাকে মিষ্টি খাইয়েছ?’ গোপালের বউ মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘তুমি কি আমাকে পাগল পেয়েছ, আমি তো কেবল আঙুলগুলো মিষ্টির মতো গোল করে হাত দেখিয়েছি।’ গোপাল আগের চেয়ে উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘হাত গোল করে অত বড় মিষ্টির আকৃতি দেখিয়েছ কেন, ছোট করে দেখাতে পারোনি। মিতব্যয়ী হও, রোজগার করতে আমার যে কত কষ্ট, সেটা তো জানো না!’
গোপালের মতো একজন লোকের বউ মারা গেল একদিন। তার এক বন্ধু তাকে ফোন করে বললেন, ‘স্যরি দোস্ত, তোর বউ মারা গেছে। মানুষ মরণশীল। দুঃখ করিস না।’ সদ্য বউহারা লোকটা হাসতে হাসতে বলল, ‘আমি তো দুঃখ করছি না, আনন্দ করছি। কারণ খাওয়া-দাওয়া ছাড়াও তেল, সাবান, লিপস্টিক-টিপস্টিক বাবদ কাল থেকে আমার বেতনের অর্ধেক বেঁচে যাবে যে!’
কোনো কোনো মেয়ে আছে, যারা সত্যি খুব মিতব্যয়ী। কারণ লিপস্টিক নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে হাসির চরম মুহূর্তেও মুখ বন্ধ করে রাখেন তারা!
জে. পল গেটি ১৯৭৬ সালে যখন মারা যান, বিশ্বের অন্যতম একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন তখন তিনি। ১৯৭৩ সালে তার এক নাতি কিডন্যাপ হয়, কিন্তু কিডন্যাপাররা তার একটা কান কেটে না পাঠানো পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে রাজি হচ্ছিলেন না তিনি। কান পাওয়ার পরও গড়িমসি করছিলেন এজন্য যে, এক নাতির জন্য মুক্তিপণ দিলে অন্য নাতিদের ক্ষেত্রেও দিতে হবে। পরে তার কৃচ্ছ্রতার কাছে হার মেনে কিডন্যাপাররা মুক্তিপণ ১৭ মিলিয়ন ডলার থেকে নামিয়ে ৩ মিলিয়ন ডলার আনেন। দরকষাকষি করে শেষ পর্যন্ত গেটি রাজি হন ২ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে।
যাযাবর তার ‘দৃষ্টিপাত‘-এ লিখেছেন, এ জগতে নিঃসম্বল দরিদ্রের আছে মহত্ত্ব, অমিতব্যয়ী ধনীর আছে ঔদার্য, ব্যয়কুণ্ঠ বিত্তবানের নেই কোনোটাই।
সচরাচর মাছ কেনেন না সজল সাহেব। খুব খেতে ইচ্ছে করলে দেয়ালে মাছের ছবি এঁকে সেদিকে তাকিয়ে ভাত খান তৃপ্তি ভরে। চালের দোকানে চাল কিনতে গেছেন তিনি একদিন। এক প্রতিবেশী তাকে ফিসফিস করে বলল, ‘আপনি কী করছেন সজল সাহেব! এ দোকানে চালের সঙ্গে অনেক পাথর থাকে।’ সজল সাহেব মুচকি হেসে বললেন, ‘এই তো ভাই, আর মাত্র সাত-আটটা মাস?’
‘মানে!’ প্রতিবেশী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
‘মানে আর কিছু পাথর জমলেই বাড়ির কাজটা ধরতে পারি আর কি!’
এই সজল সাহেব একটা চশমা কিনে দিয়েছেন ছেলেকে। মাছ-মাংস কেনেন না বলে পুষ্টির অভাবে ছেলের চোখে সমস্যা। একদিন তার ঘরে গিয়ে দেখেন, ছেলে চশমা খুলে স্কুলের পড়া পড়ছে। তিনি বেশ রাগত স্বরে বললেন, ‘ডাক্তার না তোমাকে চোখে চশমা রেখে পড়তে বলেছে সবসময়, চশমা খুলে পড়ছ কেন তুমি?’ চশমাটা হাতের কাছ থেকে আরও একটু দূরে সরিয়ে রেখে ছেলে বলল, ‘কাচ ক্ষয় হয়ে যেতে পারে বাবা, তাই চশমা খুলে পড়ছি।’
গ্রিক রাজা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট একদিন বুঝতে পারলেন মৃত্যু সন্নিকটে তার। তিনি তার সেনাপ্রধানকে ডেকে বললেন, ‘তিনটি ইচ্ছে আছে আমার।’ দুটো ইচ্ছে বলার পর তৃতীয় ইচ্ছের কথা বললেন তিনি, ‘কবরে নেয়ার সময় আমার হাত দুটো যেন কফিনের বাইরে অনাবৃত অবস্থায় থাকে। কারণ সবাই যেন বোঝে, খালি হাতে এসেছি আমরা; যত ধন-সম্পদই থাক, খালি হাতেই যেতে হবে আমাদের।’
সুতরাং মিতব্যয়ী বা কৃপণতায় ভরা জীবন নয়, সূর্যের আলোর মতো অবারিত জীবন হোক আমাদের সবার।

Disconnect