ফনেটিক ইউনিজয়
বাঘা
খন্দকার মাহমুদুল হাসান

হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়াল ঐশী। পথের বাঁকে এত লোকের জটলা কেন? বড্ড ভাবনায় পড়ে গেল সে। ছোট্টটি থেকে এ ইশকুলে পড়ে ও। প্রতিদিন ইশকুল থেকে বাড়ি আসে এই পথ দিয়ে। একটি দিনের জন্যেও কোনো জটলা দেখেনি এখানটায়। ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে গেল সে। দেখল, একটা কুকুর গাড়িচাপা পড়েছে। মরে পড়ে আছে। দুটো বাচ্চাও মরেছে। আর একটা বাচ্চা পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কী যে করুণ তার দৃষ্টি। রাজ্যের যত দুঃখ সবই যেন উপচে পড়ছে তার দুটো চোখ দিয়ে। কোনো চিৎকার নেই, উচ্চবাচ্য নেই। কিন্তু চোখ থেকে অবিরল ধারায় গড়িয়ে পড়ছে জল। ঐশীর মনটা ভরে গেল দুঃখে। মনে হলো, আহ্ হা। মা-হারা এই বাচ্চাটা কঠিন পৃথিবীতে বাঁচবে কী করে!
ও অবাক হয়ে দেখল, সবাই হায়-আফসোস করছে। যে ট্রাকের তলে চাপা পড়ে ওরা মরেছে, সেটার চালককে গালাগাল করছে। কিন্তু বেঁচে থাকা বাচ্চাটার কথা ভাবছে না কেউ। এ সম্পর্কে কিছু বলছেও না তারা।
কিছুক্ষণের মধ্যে এক এক করে সবাই চলে গেল। যাওয়ার সময় ওর চেয়ে একটু বড় একটা ছেলে বাচ্চাটাকে লাথি মেরে হাসতে হাসতে চলে গেল। ছেলেটা ওর চেয়ে বয়সে বড় এবং ষ-া কিসিমের বলে তার সাথে লাগতে গেল না ও। কিন্তু খুব দুঃখ হলো এটা দেখে। ভাবল, এরাও মানুষ? মায়া-মমতার কিচ্ছু নেই এদের মনে?
পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে শিরীষ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে কুকুরছানাটাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ ওর নজর পিছলে চলে গেল পথের উল্টো পাশের ছাতিম গাছের দিকে। সেই গাছের নিচু একটা ডালের বাসায় ছানাকে তখন মুখে করে আনা খাবার খাওয়াচ্ছে একটা মা-পাখি। ওর বুকের ভেতরটায় তখন মোচড় দিয়ে উঠল। ঠিক করল মা-হারা কুকুর ছানাটাকে বাড়ি নিয়ে যাবে। এগিয়ে গিয়ে ছানাটাকে কোলে তুলে নিল সে। শোকাচ্ছন্ন ছানাটা মোলায়েম গলায় কাঁউ-কাঁউ করে উঠল। সেটা স্বস্তির নাকি আনন্দের প্রকাশ, তা বুঝে উঠতে পারল না ঐশী। তবে ওকে কোলে নিতেই অন্য রকম আনন্দে ভরে উঠল ঐশীর মন। একটি অসহায় ছানাকে আশ্রয় দেয়ার আনন্দে শুধু নয়, মা ও ভাইবোনদের মৃতদেহের সামনে বসে থাকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়ার আনন্দেও।
কুকুর ছানাটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বাড়ি ফিরল ঐশী। ওর চোখেমুখে তখন খুশির ঝিলিক। কিন্তু সামনের উঠোনে পা রাখতেই থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে। ও দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কাকা। শহরের কলেজে ছুটি হওয়ায় বাড়ি এসেছেন কাল। ওর দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছেন তিনি। কয়েক কদম এগিয়ে প্রশ্ন করলেন, এটাকে আবার কোত্থেকে জোগাড় করা হলো?
নিচু গলায় জবাব দিল ঐশী, এনেছি পথের ধার থেকে। ওর মা নেই, ভাইবোনও কেউ নেই।
অমন কুকুরছানা তো পথে পথে নিত্যই ঘুরে বেড়ায়। সবগুলোকে বাড়ি এনে কুকুরাশ্রম বানাতে হবে নাকি?- দাঁতে দাঁত চেপে বললেন কাকা।
কাকার হুঙ্কারে মুখ থেকে ভাষা হারিয়ে গেল ওর। কী বলবে বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আর তখনই কাকা গমগমে গলায় বলে উঠলেন, নর্দমায় ফেলে দিয়ে এসো। এক্ষুনি নর্দমায় ছুড়ে ফেলো। কুকুর পুষতে চাও তো অ্যালসেশিয়ান পোষো। রাস্তাঘাটের নেড়ি কুকুর কেন?
কাকার হুঙ্কার শুনে কুকুর ছানাটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল ও। মোলায়েম পশমের তুলতুলে ছানাটাকে ‘রাস্তাঘাটের নেড়ি কুকুর’ বলায় মনে বড্ড চোট পেল ঐশী। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলল না। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ছানাটাকে কিছুতেই ও ফেলে দেবে না নর্দমায়।
ছানাটা নিয়ে মাথা নিচু করে চলে গেল সে বাড়ির পাশের বাগানে। হরেক রকমের গাছ আছে সেখানে। বড় একটা জাম গাছের নিচে ছানাটাকে বসিয়ে রেখে পথের ধারের ইটের গাদা থেকে কয়েকটা ইট এনে ছোট্ট একটা ঘর বানাল সে। তারপর ছানাটাকে সেই ঘরে বসিয়ে রেখে বাড়ি এসে ঢুকল। আর ঢুকতেই মা বললেন, কীরে এটাকে কোথায় পেলি?
অবাক হয়ে বলল ও, কার কথা বলছ তুমি?
মা বললেন, কার কথা আবার? তোর পেছন পেছন যে এসেছে তার কথা।
পেছন ফিরে দেখল ও, ছানাটা ওর হাতখানেক পেছনে দাঁড়িয়ে কুঁ-কুঁ করছে আর অনবরত নেড়ে চলেছে লেজ।
ওর মনের ভেতর থেকে ভয় তখনও যায়নি। মায়ের গাঘেঁষে দাঁড়িয়ে, ফিসফিসিয়ে কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলল ও, বড় রাস্তার ধার থেকে ওকে এনেছি। অ্যাকসিডেন্টে ওর পরিবারের সবাই মারা গেছে। একেবারে অসহায় ছানা। ওখানে বসিয়ে রাখলে নির্ঘাত আরেকটা গাড়ি এসে ওকে চাপা দিয়ে যেত...
কথাটা আর শেষ করতে পারল না ও। কেঁদে ভাসিয়ে দিল। মায়ের মনেও বেশ মায়া হলো ছানাটার প্রতি। ওকে আশ্বস্ত করে বললেন তিনি, আচ্ছা, আমি তোর বাবাকে বলে দেখব। কিন্তু তোর বাবা-কাকারা তো দুচোখে কুকুর দেখতে পারে না।
বাবা বাড়ি ফিরতেই কাকা নালিশ জুড়লেন, নিষেধ সত্ত্বেও ঐশী কুকুর এনেছে বাড়িতে। তবে ঐশীর কান্নাকাটি আর মায়ের ওকালতিÑ এ দুয়ের জোরে ছানাটার ঠাঁই হলো বাড়িতে। অল্পদিনের মধ্যেই বেশ নাদুসনুদুস হয়ে উঠল। পুরো বাড়ি, উঠোন, পুকুরপাড়, বাগান সব জায়গায় তার অবাধ বিচরণ। হাঁকডাক ছেড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে টহল দিয়ে বেড়ায়। অপরিচিত কাউকে বাড়ির ত্রিসীমানায় পা রাখতে দেখলে হুলস্থূল কা- বাঁধিয়ে ফেলে। এ বাড়ির সবকিছুকে আগলে রাখাটাকে নিজের অধিকারের বিষয় বলে ধরে নিয়েছে সে। যেই কাকা ওকে আশ্রয় দেয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন, তার প্রতিও ওর দরদের শেষ নেই। শহরে থেকে কলেজে পড়ান তিনি। ছুটি হলে মাঝে মাঝে বাড়ি আসেন। আর তিনি আসতেই উঠোনের সামনে গিয়ে লেজ নাড়তে শুরু করে দেয় ও। যদিও কুকুর তিনি পছন্দ করেন না, কিন্তু ঐশীর কারণে ওর ওই বাড়াবাড়ি রকমের ঘেঁষাঘেঁষিটাকেও প্রশ্রয় দেন তিনি। এভাবেই গড়িয়ে গেল বছর। কুকুরটার বাহাদুরি দেখে বাবা ওর নাম দিয়েছেন বাঘা। এখন বাঘা বলে ডাক দিলে দূর থেকে ছুটে এসে লেজ নাড়তে থাকে ও। এভাবে অল্প দিনের মধ্যেই সে পরিণত হলো ঐশীর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুতে।
এক বিকালে কাকা বাড়ি এলেন। সেদিন ক্লাস শেষে বাড়ি এসে সন্ধ্যার পর পরই বই নিয়ে বসে গেছে ঐশী। পরীক্ষা সামনে বলে পড়ার খুব চাপ। ক্লাসের পড়া, পরীক্ষার পড়া সবকিছু শেষ করতে হবে। সময় গড়াতে গড়াতে রাতও হলো গভীর। আর সেই রাতে গরমও পড়েছিল বড্ড। কাকা ভেতরবাড়ির বারান্দায় চৌকিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। বারান্দার সিঁড়িতে বাঘা ঝিমুচ্ছে। এমন সময় সামনের উঠোন থেকে কে যেন নিচু গলায় ডাক দিল, বাঘা।
বাঘা কান খাড়া করল। ডাকটা তার পরিচিত, কিন্তু কণ্ঠটা তো পরিচিত মনে হচ্ছে না। পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল সে বাড়ির সামন দিকটায়। যে ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে বাইরে থেকে ভেতরবাড়িতে ও আসা-যাওয়া করে, সেখানটায় গিয়ে মাথাটা বাইরে গলিয়ে দিয়ে বাতাসে কিসের যেন ঘ্রাণ শুঁকল। আর তখনই বাড়ির ভেতরে ঝুপ ঝুপ করে দু-তিনবার শব্দ হলো। আর একই সাথে বিদ্যুৎ গতিতে মাথা ঘোরালো বাঘা। একটু ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করল সে। তারপর ঘুরে দাঁড়াল। প্রায় সাথে সাথে ঝড়ের বেগে ছুটে গেল শব্দের উৎস লক্ষ্য করে। আর ছুটতে ছুটতে ঘেউ ঘেউ করে মহা শোরগোলও তুলে ফেলল। বাড়ির সবারই ঘুম ভেঙে গেল তাতে। কিন্তু এরই মধ্যে ঘটে গেছে মহা দুর্বিপাক।
পেছন দিকের দেয়াল টপকে উঠোনে লাফিয়ে পড়েছিল তিন বদমাশের একটা দল। ওই দলেরই এক সাঙ্গাৎ সামনের উঠোন থেকে বাঘার নাম ধরে ডেকে ওকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। উঠোনের সেই লোকের পেছনে ছুটতে শুরু করলে বাড়ির ভেতরে ঢোকা লোকগুলো নির্বিঘেœই কাজ শেষ করে ফেলতে পারত। কিন্তু বাঘা যে উল্টো দিকে ছুট লাগাবে সে ধারণা ওদের ছিল না। তবুও বাঘার বুঝে উঠতে যে সময়টুকু লেগেছে, সেই সুযোগেই ওদের একজন ছুটে এসে কাকার বুকের ওপর চেপে বসে ধারালো ছুরি তাক করেছে। কাকাকে হুমকি দিচ্ছে, পরদিন জমি কেনার জন্য শহরের ব্যাংক থেকে যে টাকা তিনি এনেছেন, তা ওই বদমাশকে না দিলে সে তার গলায় ছুরি চালিয়ে দেবে।
বদমাশ দলের একজন অন্ধকারেই বাঘাকে লক্ষ্য করে ধারালো দা ছুড়ে মেরেছে। দায়ের কোপ পুরোপুরি না লাগলেও খানিকটা লেগেছে বাঘার পেছনের পায়ে। খুব লেগেছে তার। আঘাত পেয়েই মাটিতে পড়ে গিয়ে কাতরাতে শুরু করেছে। দরদর করে রক্ত ঝরছে। আর এক বজ্জাত মস্ত এক টর্চলাইট জ্বেলে ফেলেছে ততক্ষণে। বাড়ির সবার ঘুম তখন ভেঙে গেছে। সবাই এসে জড়ো হয়েছে এ বারান্দায়। আলোটা গিয়ে পড়েছে সবার মুখের ওপর। বজ্জাতটার বাঁ হাতে টর্চ, ডান হাতে পিস্তল। চিৎকার করে সে আলমারির চাবি চাইতে শুরু করেছে।
বাড়ির লোকেদের এ হতবিহ্বল দশার মধ্যে ঘটে গেল আর একটা আশ্চর্য ঘটনা। দায়ের আঘাত পেয়ে কাতরাতে থাকা বাঘার কিছুতেই সহ্য হলো না বদমাশগুলোর কাজকারবার। ও দেখল, কাকাকে ওরা এক্ষুনি মেরেই ফেলবে। নিজের প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে কোনো রকমে উঠে দাঁড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঘা। কাকার বুকের ওপর চেপে বসা লোকটা ‘ওরে বাবারে, মরে গেলাম রে’ বলে চিৎকার দিয়ে ছিটকে পড়ল পাশে দাঁড়ানো পিস্তল হাতে লোকটার ওপরে। তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল টর্চ আর পিস্তল দুটোই। লোকটাও উল্টে পড়ল তার গাঘেঁষে দাঁড়ানো বাঘার গায়ে দা ছুড়ে মারা শয়তানটার ওপর। ঠিক তার পর পর আরও দুবার একই রকমের আর্তচিৎকার শোনা গেল। ঐশী ভেতরের ঘরে তখনও পড়ছিল। ঘরের ভেতর থেকে আলো এনে সবার সামনে ধরল। হইচই চেঁচামেচিতে পাড়া-প্রতিবেশীরা কোন দিক দিয়ে যে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে, তা এ বাড়ির কেউ বুঝতেই পারল না।
পুরো বাড়িতে গিজগিজ করছে লোক। অন্তত গোটা দশেক ১৪ ব্যাটারির টর্চ লাইট একসাথে জ্বলে উঠেছে। সেই আলোয় রাতের আঁধার কোথায় যে গেছে টুটে! সবাই দেখল, তিন বদমাশের পায়েই শক্ত কামড় বসিয়েছে বাঘা। শয়তানগুলোর উঠে দাঁড়ানোর সাধ্য নেই। কিন্তু আহত বাঘার অবস্থাও সঙ্গিন। বন্ধু বাঘার এ বিপজ্জনক অবস্থা দেখে আর্তনাদ করে উঠল ঐশী। ভেতর বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি ডেটল আর তুলো নিয়ে এলো সে। তারপর সবাই মিলে বাঘার কাটা জায়গাটায় ডেটল ঢেলে তুলো দিয়ে বেঁধে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে রক্তপাত বন্ধ হলো। বাঘাকে হাসপাতালে আর বদমাশগুলোকে থানায় নেয়ার প্রস্তুতি শুরু হলো।
ততক্ষণে পুবের আকাশে ফুটে উঠেছে ভোরের আলো। কাকা এসে বসেছেন বাঘার পাশে। যন্ত্রণাকাতর বাঘার চোখ দুটো থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল। বিলাপ করে বলছেন কাকা, আহারে বাঘা। কথা বলতে পারলে তুই নিশ্চয় কত কিছুই না বলতিস। আমার জন্য তুই মরতে বসেছিস। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে আমাকে বাঁচাতে এলি। অথচ আমি তোকে এ বাড়িতে ঢুকতেই দিইনি...
বাক্য আর শেষ করতে পারলেন না কাকা। চোখের জলে দৃষ্টি তার ঝাপসা হয়ে গেল।

Disconnect