ফনেটিক ইউনিজয়
কঙ্কাবতীর কথা
ধ্রুব এষ

রাজকন্যা
কঙ্কাবতী
বিদ্যাবতী
বুদ্ধিমতী।
ঢেরা দিয়েছে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ঈষাণ, অগ্নি, নৈঋত, বায়ু কোণে।
বিদ্যাবতী বুদ্ধিমতী রাজকন্যা কঙ্কাবতীর বিয়ে হবে এই আশ্বিনের পূর্ণিমায়। কার সঙ্গে বিয়ে হবে সে ঠিক হয়নি এখনো। কত রাজপুত্তুর, মন্ত্রীপুত্তুর, কোটাল পুত্তুর হত্যে দিয়ে গেছে। গুণপনারও শেষ নেই তাদের। কেউ চোখ বেঁধে তীর ছুড়তে পারে, কেউ তলোয়ার দিয়ে বাতাস কাটতে পারে। কেউ আকাশের সব তারা গুণতে পারে। আরো কত রকম। রাজপুত্তুর হয়েও কেউ গান গায়, মন্ত্রীপুত্তুর হয়েও কেউ সারেঙ্গী বাজায়, কোটাল পুত্তুর হয়েও কেউ ছবি আঁকতে পারে। যার যার মতো করে তারা মুগ্ধ করতে চেষ্টা করেছে রাজকন্যা কঙ্কাবতীকে। কবি রাজপুত্তুর কবিতা লিখেছে,
রাজকন্যা কঙ্কাবতী
শূন্যে ভাসমান
এক প্রজাপতি।
শুনে তো কঙ্কাবতী হেসেই আকুল। স্বর্ণলতা তার বকুলফুল সই। বকুলফুল সইকে বলেছেন,
‘ওরে ও স্বর্ণলতা
উন্মাদের মতো কথা।’
স্বর্ণলতা বলেছে, ‘বাদ’।
কঙ্কাবতী বলেছেন, ‘উন্মাদ! উন্মাদ!’
আচ্ছা, কবি রাজপুত্তুর না হলে উন্মাদ। তা বলে অন্যরা? কেউ বা কিছু সত্যি কি একটুও মুগ্ধ করতে পারেনি কঙ্কাবতীকে? তা পেরেছে। মন্ত্রী পুত্তুরের সারেঙ্গী শুনে তো চোখে জল এসে গিয়েছিল। তলোয়ার দিয়ে বাতাস কাটা দেখেও খুবই মুগ্ধ হয়েছিলেন। আরও কত কী মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন, শুনেছেন। মুশকিলটা কোথায় তাহলে?
মুশকিল মনে হয় কঙ্কাবতীর মাথায়। না হলে এমন একটা শর্ত দেয় কেউ?
কথা বলা এক কাকতাড়–য়া
কোন দেশের কোন মাঠে থাকে
কঙ্কাবতী তাকেই বিয়ে করবেন
যে নিয়ে আসতে পারবে তাকে।
অদ্ভুত শর্ত। কোন দেশের কোন মাঠ আবার কী? কোন দেশ বলে কোনও দেশ আছে? থাকতেও পারে। কিন্তু কথা বলা কাকতাড়–য়া! কী করে সম্ভব? কাকতাড়–য়া তো বাঁশ আর খড় দিয়ে বানায়। মু-টা বানায় কেলে হাড়ি দিয়ে। কেলে হাঁড়িতে চুন দিয়ে চোখ মুখ এঁকে দেয়। ছেঁড়াখোঁড়া শার্ট পরিয়ে পুঁতে রাখে ক্ষেতির মাঝখানে। কাকপক্ষী দেখে ভয় পায়। সেই কাকতাড়–য়া কি কথা বলতে পারে?
আশ্বিনের পূর্ণিমার আর তিন দিন। আরও অমুক পুত্তুর, তমুক পুত্তুর এসেছে। যার যার বাহাদুরি দেখিয়ে কেউ কেউ মুগ্ধও করেছে কঙ্কাবতীকে। কিন্তু ওই যে কঙ্কাবতীর শর্ত, কথা বলা কাকতাড়–য়া এখনও কোনও পুত্তুর এনে হাজির করতে পারেনি। কে পারবে? কানাঘুষা ফিসফাস হাসাহাসিও শুরু হয়ে গেছে লুকিয়ে চুরিয়ে।
শর্ত না এ, বায়না
রাজকন্যা আসলে তার
বিয়ে হোক, চায় না।
ছি! ছি! ছি!
ছি! ছি! ছি!
গুপ্তচর রাজাকে এসব ফিসফাস কানাঘুষা হাসাহাসির কথা বলেছে। রাজাও তেমন। গুপ্তচরের গুপ্তকথা শুনে হো হো করে হেসেছেন। হতভম্ব গুপ্তচর ব্যাপারটাকে ঠিক এতটা হাসির হিসাবে নিতে পারেনি। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তাতে করে আরও কেলেংকারি হয়েছে। রাজসভায় কথা উঠেছে।
‘এ ঘোরতর অন্যায় মহারাজ
কঙ্কাবতীর জন্য
এ অবস্থা, আজ।’
রাজা শুধু বলেছেন, ‘আর তিন দিন।’
কী তিন দিন? কিসের তিন দিন? আশ্বিনের পূর্ণিমার? কথা বলা কাকতাড়–য়া নিয়ে এর মধ্যে হাজির হয়ে যাবে কেউ?
রাজকন্যা কঙ্কাবতী
তার মাথা থেকে যাক
এই দুর্মতি।
আশা করল রাজ্যের মানুষজন। তারা অনেক ভালোবাসে তাদের রাজকন্যা কঙ্কাবতীকে। বেঙ্গমা, বেঙ্গমীও বাসে। কতকালের বেঙ্গমা-বেঙ্গমী। তারাও এমনটা কখনো দেখেনি, শোনেনি।
ঈষাণ কোণের এক চাষার ছেলে সুরুজ। নৈঋত কোণের হাটে ছিল সন্ধ্যায়। ঢেরা শুনেছে ঢেরাদারের। তাদের ছনের ঘরের দাওয়ায় বসে মাটির সানকিতে ভাত খেতে খেতে সে একটু রাতে তার মাকে বলল, ‘আমি একবার রাজমহলে গিয়ে দেখি মা?’
সুরুজের মা ভয় পেয়ে বললে, ‘সেকী কথা, বাছা! রাজমহলে গিয়ে কী করবি তুই? শান্ত্রীরা তোর গর্দান না নেয়!’
‘তুমি শুধু শুধু ভয় পাও, মা। শান্ত্রীরা আমার গর্দান নিতে যাবে কেন, উল্টো মাথায় তুলে নাচবে।’
‘মাথায় তুলে নাচবে! কী বলিস, বাছা?’
‘নাচবে না কেন, বলো? আমি যদি তাদেরকে বলি যে কোন দেশের কোন মাঠের সেই কথা বলা কাকতাড়–য়াকে আমি চিনি, এনে দিতে পারব, তাহলে তারা আমাকে মাথায় তুলে নাচবে না, বলো?’
‘এসব কী আকথা-কুকথা, বাছা! কথা বলা কাকতাড়–য়াকে তুই চিনিস?’
‘খুব চিনি।’
‘খুব চিনিস! তাতে কী? তারা ঠিক গর্দান নেবে তোর। দরকার নেই বাছা ওসবের।’
‘রাজকন্যা কঙ্কাবতীকে আমি বিয়ে করব মা।’
‘কী-কী-কী? কী? ওম্মা! মা! মা! ও মা গো! কী শুনলাম গো? কী শুনলাম গো!’
সুরুজের বাবা গেছে বাণিজ্যে। আনাজ-পাতি নিয়ে বেরিয়েছে নৌকায়। বিক্রি করে এটা ওটা দরকারি জিনিস কিনে ফিরবে। সে আরও দিন আটেক। সুরুজের মার মনে হলো সে বিরাট এক মুশকিলে পড়েছে। তার পাগলা ছেলে সত্যি যদি রাজমহলে চলে যায় কাল?
ভাত খাবার পরও সুরুজের মা একা অনেকক্ষণ আহাজারি করল। আহাজারি করতে করতে একসময় ঘুমিয়েও পড়ল।
সুরুজ পরদিন ঘুম থেকে উঠল খুব সকালে। রোজই ওঠে। ভোর রাতের বেলায় হিম পড়ে এখন। ঘাস লতাপাতায় শিশির লেগে থাকে। পা ভিজে যায়। ক্ষেতে গিয়ে ক্ষেতির কাজ ধরল সুরুজ। নিড়েন দিল। আগাছা বাছল।
সূর্য উঠলেন।
কাজ শেষ করে সুরুজও উঠল। হাঁটা দিল রাজমহলের দিকে। এত সকালেও রাজমহল জমজমাট। রাজদরবার শুরু হয়ে গেছে। শান্ত্রী হাঁকল, ‘কে যায়?’
সুরুজ বলল, ‘আমি।’
‘আমি কে?’
‘আমি সুরুজ।’
ইয়া গোঁফঅলা শান্ত্রী। বর্শা ধরে আছে। বলল, ‘কী চাই?’
‘রাজকন্যা কঙ্কাবতীর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘কী বিষয়?’
‘কথা বলা কাকতাড়–য়াকে আমি তার কাছে এনে দিতে পারব।’
শান্ত্রী বলল, ‘বটে! সুরুজ কী করে, শুনি।’
‘চাষা।’
‘হায়রে কপাল
ভুলে যাই ভাষা!’
‘আমি কিন্তু সত্যি পারব।’
সুরুজ বলল।
‘পারলেই ভালো। যাও তবে।’
শান্ত্রী বলল।
‘রাজকন্যা কোন মহলে থাকেন?’
‘কঙ্কাবতী মহল। সরতা! সরতা! ও সরতা!’
সুরুজ কিছু বুঝতে পারল না। সরতা দিয়ে সুপারি কাটে। সেই সরতাকে ডাকছে শান্ত্রী?
না, এই সরতা একজন ছোটখাটো মানুষ। রাজপেয়াদা।
শান্ত্রী বলল, ‘সরতা!’
কঙ্কাবতীর মহলে
যাবেন এই কর্তা।’
শান্ত্রী আফসোস এবং বিদ্রুপ করে বলল, কর্তা। সুরুজ বুঝল। কী করে আর! রাজপেয়াদা সরতা সুরুজকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল রাজকন্যা কঙ্কাবতীর মহলে। সুরুজ দেখল রাজকন্যা কঙ্কাবতীকে। রূপের ডালি বললেও কম বলা হবে।
সুরুজ বলল, ‘রাজকন্যা, আমি সুরুজ।’
কঙ্কাবতী বললেন, ‘সুরুজ!’
সুরুজ বলল, ‘আমি চাষা। তলোয়ার দিয়ে বাতাস কাটতে পারি না, আকাশের তারা গুনতে পারি না...।’
রাজকন্যা অল্প হাসলেন, ‘এক থেকে দশ গুনতে পার তো?’
‘তা পারি।’
‘আর কী পার?’
‘চাষবাস।’
‘খুব ভালো কথা। আর কিছু পার?’
‘না, আর কিছু পারি না। তবে কথা বলা কাকতাড়–য়াকে আমি আপনার সামনে এনে দিতে পারব।’
‘সত্যি-ই-ই-ই?’
‘সত্যি না মিথ্যা নিজেই দেখবেন।’
‘দেখব। সময় কিন্তু আর মাত্র দুদিন, চাষা।’
‘দুদিন যথেষ্ট সময় রাজকন্যা।’
‘এতদিনে আর কেউ পারল না!’
‘তারা কেউ তো চাষা ছিল না।’
রাজমহল থেকে বের হয়ে আবার ক্ষেতের কাজে ফিরল সুরুজ। হাওয়ায় ধান ক্ষেতের দুলুনি দেখল। পাশের ক্ষেতে লুটুকে দেখল। ছয় বছর বয়স। ধান যতদিন ধরে পাকবে সারাদিন ধরে এরকম ক্ষেত পাহারা দিয়ে যাবে সে।
ধান এবার হয়েছে বটে। বেজায় খুশি রাজ্যের মানুষজন। দুই কুড়ি বছরের মধ্যে এরকম ধান তারা কেউ হতে দেখেনি। দুই কুড়ি বছর আগে দেখেছে, আট কুড়ি বছর আগেও দেখেছে একজন। সে হলো সুরুজদের গাঁওবুড়ো। সন্ধ্যার পর একছড়া সুপারি নিয়ে সুরুজ দেখা করতে গেল তার সঙ্গে। শেফালি ফুলের ডাঁটার রঙের মতো রঙ হয়েছে সুপারির। গাঁওবুড়ো খুব খুশি হলো দেখে। হাতের গাছ লাঠি উঁচু করে ধরে বলল, ‘তুই তিনশ তেত্রিশ বছর বাঁচবি।’
‘তোমার বয়স কত হলো, গাঁওবুড়ো?’
‘কত আর। আঠার-উনিশ কুড়ি।’
‘আঠার-উনিশ কুড়ি! তুমি তো তাহলে অনেক কিছু দেখেছ, বলো?’
‘মতলব কী, বল?’
‘কোন দেশের কোন মাঠ কোথায়, গাঁওবুড়ো?’
‘কেন রে? রাজকন্যা কঙ্কাবতীকে তুই বিয়ে করতে চাস বুঝি?’
‘তুমি সব জানো, গাঁওবুড়ো।’
‘তা জানি। কোন দেশের কোন মাঠ তাও জানি। কিন্তু তোকে বলব কেনরে? বলব না। বুদ্ধি করে নিজেই খুঁজে বের কর।’
বুদ্ধি করে নিজে খুঁজে বের করতে হবে? পরদিনই সুরুজ বের করে ফেলল। কোন দেশ তো এই দেশটাই, কোন মাঠ তো এই মাঠটাই। আর কথা বলা কাকতাড়–য়া? তাকে নিয়ে সুরুজ ছুটল। যায়, যায়, যায়, রাজমহল দেখা যায়। কঙ্কাবতী মহলও দেখা যায়। দেখা যায় কঙ্কাবতীকেও।
‘রাজকন্যা, এই যে সে।’
সুরুজ বলল।
কঙ্কাবতী বললেন, ‘ও কে?’
‘কথা বলা কাকতাড়–য়া। কিরে লুটু, বল।’
লুটু বলল, ‘হ্যাঁ, আমি ক্ষেতের কাকপক্ষী তাড়াই।’
তিতু বুড়ি কঙ্কাবতীর চুল বেণী করে দিচ্ছিল। বলল, ‘মরণ! কাকপক্ষী তাড়ায়। তাই বলে তুই কি কাকতাড়–য়া? তুই তো মানুষ।’
কঙ্কাবতী বললেন, ‘আহ্, তিতু বুড়ি। আমি কি একবারও বলেছি কথা বলতে পারা কাকতাড়–য়াকে খড়ের বানানো হতে হবে? যে কাক তাড়ায় সেই কাকতাড়–য়া। সে খড়ের হোক কি মানুষ।’
তিতু বুড়ি বলল, ‘মরণ! তুমি কি এখন এই চাষাকে বিয়ে করবে নাকি, রাজকন্যা?’
কঙ্কাবতী বললেন, ‘হ্যাঁ।’
রাজা শুনে বললেন, ‘বটে! চাষা বিয়ে করবে রাজকন্যাকে!’
কঙ্কাবতী বললেন, ‘কেন নয়, বাবা? আমার শর্ত পূরণ করেছে সে।’
রাজা বললেন, ‘করলই বা! তাই বলে একটা চাষা, চাষার ছেলেকে বিয়ে করবে আমার মেয়ে। এ হতে পারে নাকি কখনও? কখনও হয়েছে? না। না। না।’
‘কখনও হয়নি বলে কখনও হবে না, এমন কথা তো কোথাও লেখা নেই, বাবা।’
‘লেখা নেই? ও। তুমি তাহলে ওকেই বিয়ে করবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘করোগে যাও। কিন্তু আমার রাজমহলে তো কোন চাষার ঠাঁই হবে না, মা।’
‘না, হোক। আমি তোমার রাজমহলে থাকব না, বাবা।’
‘খুব ভাল কথা। রাজমহলে থাকবে না তুমি। কোথায় থাকবে তবে? কোথায় থাকবে?’
‘চাষার কুটিরে।’
‘কী? কী-কী-কী?’
রাজা আর কিছুই বলতে পারলেন না। তবে মেয়ের বিয়ের আয়োজন ঠিকই করলেন। পরদিন আশ্বিনের পূর্ণিমা। মহা ধুমধামের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল রাজকন্যা কঙ্কাবতী এবং চাষা সুরুজের। রাজকন্যা কঙ্কাবতী চাষাবউ কঙ্কাবতী হলো। তারপর? তারপর আর কী?
বেঙ্গমা বলল, ‘বেঙ্গমী গো!’
বেঙ্গমী বলল, ‘বেঙ্গমা গো!’
বেঙ্গমা বেঙ্গমী একসঙ্গে হাসল। আর বলল,
চাষার বউ
কঙ্কাবতী,
বিদ্যাবতী
বুদ্ধিমতী।’

Disconnect