ফনেটিক ইউনিজয়
লুম্পেন সাহিত্যিকের জুতো সাহিত্য
ইমতিয়ার শামীম

স্বাধীন বাংলাদেশে বোধকরি এমন সময় আর কখনোই আসেনি, যখন সাহিত্যিকদের এত অবনত মনে হয়েছে।
সাহিত্যিক বড় অবনত এই সময়ে, কারণ তারা বেশি রাষ্ট্রসংলগ্ন হয়ে পড়েছেন। রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষার সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশার যোগ থাকে না বা যোগ ঘটে না, সে কথা বলব না; কিন্তু সরকার যেখানে রাতারাতি রাষ্ট্রের হাড়হাড্ডি পর্যন্ত পাল্টে দেয়ার ক্ষমতা রাখে, যেখানে রাষ্ট্রের ধারণা আর কাঠামোয় পরিবর্তনের ব্যাপারটি সরকারের হাতের মোয়া, সেখানে মানুষের প্রত্যাশা আর ঠাঁই পায় না। মহাকালের হিসাবে এ তো খুব বেশি আগের ঘটনা নয়, যখন রাজ্য চলত রাজার ইচ্ছেমতো। সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, ভৌগোলিক বিন্যাসেও পরিবর্তন এসেছেÑ এখন আর রাজা নেই, আছে সরকার; রাজ্য নেই, আছে রাষ্ট্র- কিন্তু সামন্ত যুগে যেমন রাজদরবারে ঠাঁই না পেলে জাতে উঠতে পারতেন না কবি-সাহিত্যিকরা, এ সময়ে এসে আবারও সে রকম ঘটতে চলছে।
ইতিহাস বলে, ইরানের সামানাইড রাজা মনসুরের কাছ থেকে রাজকবি হাকিম আবুল কাশেম ফেরদৌসী তুসি বেশ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে ‘শাহনামা’ লিখতে শুরু করেছিলেন। পরে রাজা মনসুরের পরাজয় ঘটে, ইরানের রাজ্য পদানত হয় তুর্কি গজনবী সুলতান মাহমুদের। ফেরদৌসী তার সময়েও এই ‘শাহনামা’ লেখা অব্যাহত রেখেছিলেন। সমালোচকদের ধারণা, সুলতান মাহমুদের সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কম থাকায় ‘শাহনামা’র শেষের দিকে তাই ফেরদৌসী নিজের আবেগ ও বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে কিংবদন্তি বলে, সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কম থাকলেও অর্থের ব্যাপারটা সুলতান মাহমুদ বেশ ভালো বুঝতেন। ফেরদৌসীকে তিনি বলেছিলেন, ‘শাহনামা’র প্রতিটি শব্দের জন্যে একটি করে স্বর্ণমুদ্রা দেবেন; কিন্তু লেখা হয়ে গেলে স্বর্ণমুদ্রার বদলে রৌপ্যমুদ্রা দিলেন তিনি। আর যে ফেরদৌসীর রাজানুকূল্যের ওপরই নির্ভর করতে হতো, তারও তখন কী যে হলো, সুলতান মাহমুদের পাঠানো ৬০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা তিনি বিলি করে দিলেন চাকরদের মধ্যে। রাজার কাছে এ খবর পৌঁছে গেলÑ তিনি ক্রুদ্ধ হলেন এবং পালিয়ে থাকতে থাকতে মৃত্যু ঘটল কবি ফেরদৌসীর। পরে রাজার ভুল ভেঙেছিল, তিনি স্বর্ণমুদ্রাই দিতে চেয়েছেন তাকে, কিন্তু ততদিনে ফেরদৌসীর মৃত্যু ঘটেছে আর তার কন্যাও প্রত্যাখ্যান করেছেন ওই স্বর্ণমুদ্রার ডালাকে।
রাষ্ট্রের শাসকদের সচরাচর এভাবে কোনো শিল্পী-সাহিত্যিককে পুষতে হয় না; কিন্তু বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের ভূমিকা, প্রাতিষ্ঠানিক যোগ আর দৌড়াদৌড়ি দেখেই জনগণ বুঝতে পারে, কে বা কারা রাষ্ট্রানুকূল্যে আছেন। রাজ্য থেকে রাষ্ট্রের যুগে এলেও এই বাংলাদেশে শেষ মুহূর্তে ওই ফেরদৌসী হওয়ার সাহসটুকুও কয়জনের আছে, তা বলা মুশকিল। কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক সবাই এখানে জানেন, কার পায়ের জুতোর মাপ কতটুকু, তারা সেই মাপ অনুযায়ীই তাদের সেই সাহিত্য নামক জুতোগুলো তৈরি করে থাকেন। এই জুতো সাহিত্য এমনই সুখকর যে, সাহিত্যিক নিজেও তা তার গলায় পরে ঘুরতে লজ্জাবোধ করেন না আর স্বৈরতন্ত্রী সরকারও তা সাহিত্যিকের গালে মারবেন কী, নিজের গলায় পরতেই আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
অনেক আগে এই বাংলা সাহিত্যের এক বিদগ্ধ পণ্ডিত আবু সয়ীদ আইয়ুব আরও অনেকের মতো সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে গিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েছিলেন। তার দুর্ভাবনার কারণ ছিল, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, সাহিত্যকে নিজের আবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতে চাইছে শক্তিশালী এক রাজনৈতিক ধারা। এর তুলনা টানতে গিয়ে লিখেছিলেন তিনি, মধ্যযুগে যেভাবে শিল্প-সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের বিকাশকে ধর্ম গ্রাস করেছিল, সেভাবেই ঘটতে চলেছে রাজনৈতিক ধারার এই বিজড়ন। তবে মধ্যযুগের রেনেসাঁর মধ্যে দিয়ে চার্চের বদলে জায়গা করে নিয়েছিল রাজনীতি, আর এখন সেই রাজনীতিই হয়ে উঠেছে খোদ চার্চের মতো। অনেকের মতো লুকোচুরি করেননি আবু সয়ীদ আইয়ুব, সরাসরি অভিযুক্ত করেছিলেন তথাকথিত একশ্রেণীর মার্ক্সবাদীদের এ কারণে যে, তাদের কাছে শিল্প-সাহিত্যের কোনো অর্থই থাকে না, তা রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারালো অস্ত্র হতে না পারলে। তা তেমন সময় বাংলাদেশেও গেছে- আমরা দেখেছি সাহিত্যকে শ্রেণিসংগ্রামের হাতিয়ার হতে, নাটককেও দেখেছি শ্রেণিসংগ্রামের হাতিয়ার হতে। তবে আবু সয়ীদ আইয়ুবের মূল বক্তব্যটি ছিল এই যে, সাহিত্য কেবল রাষ্ট্রবিপ্লবের হাতিয়ার হতে পারে না, কেননা রাষ্ট্রবিপ্লবের উদ্দেশ্যই তো এমন এক শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষ তাদের জীবনকে শিল্পে সাহিত্যে সংস্কৃতিতে নানাভাবে আরও বিকশিত করবে।
তো আবু সায়ীদ আইয়ুব যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে এই দেখে নিশ্চয়ই লজ্জা পেতেন, বাংলা সাহিত্য কীভাবে বখে যেতে বসেছে, কীভাবে ক্রমশই লুম্পেন সাহিত্যিকদের দখলে চলে যাচ্ছে; লুম্পেন সাহিত্যিকদের এ উল্লম্ফনের চেয়ে তার কাছে নিশ্চয়ই মার্ক্সবাদীদের সেই আড়ষ্ট, অসম্পূর্ণ উদ্দেশ্যকেও অনেক মহৎ মনে হতো। নতুন সময়ের নতুন আবাহন সৃষ্টি করা দূরে থাক, অনেক আগের বঙ্কিমীয় সাহিত্যচর্চার সেই ধ্রুপদ অঙ্গীকারটুকুও আমরা সাহিত্যিকরা এখন হারিয়ে ফেলছি। ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ শীর্ষক যে লেখাটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, তা তো কেবল আবেদন-নিবেদন ছিল না, তা ছিল অঙ্গীকারওÑ ছিল একজন লেখকের কাছে সেই দেশের মানুষের প্রত্যাশার সংক্ষিপ্তসার। বঙ্কিম লিখেছিলেন, তিনি ‘যশের জন্য লিখিবেন না। তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভালো হইবে না। লেখা ভালো হইলে যশ আপনি আসিবে।’ লিখেছিলেন তিনি, ‘টাকার জন্য লিখিবেন না। ইউরোপে এখন অনেক লোক টাকার জন্যই লেখে, এবং টাকাও পায়; লেখাও ভালো হয়। কিন্তু আমাদের এখনও সেদিন হয় নাই। এখন অর্থের উদ্দেশ্যে লিখিতে গেলে, লোক-রঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া পড়ে। এখন আমাদিগের দেশের সাধারণ পাঠকের রুচি ও শিক্ষা বিবেচনা করিয়া লোক-রঞ্জন করিতে গেলে রচনা বিকৃত ও অন্বিষ্টকর হইয়া উঠে।’
বঙ্কিম এ রকম আরও বেশ কয়েকটি নিবেদন করেছেন; যেগুলো পড়লে আমাদের মনঃকষ্ট আরও বাড়বে। কারণ বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের গড় প্রবণতা এখন বরং বঙ্কিম নির্দেশিত নিষিদ্ধ ওইসব লক্ষণগুলোর দিকেই আকৃষ্ট হওয়া। গত ৪৭ বছরে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে, পাশাপাশি এই শ্রেণির অর্থনৈতিক কাঠামোয়ও যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে জনপ্রিয় সাহিত্যের একটি শক্তিশালী পরিধিও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো, যেসব সাহিত্যিকরা জনপ্রিয় হওয়ার প্রচেষ্টা করছেন কিংবা জনপ্রিয় সাহিত্যিকের তকমা এঁটে বসে আছেন, তারা নিজেরাও জনপ্রিয় সাহিত্যকে নিষ্ঠার সঙ্গে চর্চা করছেন না। কারণ তাদের মূল লক্ষ্য আসলে জনপ্রিয় সাহিত্যকেও উর্বর করা নয়; তাদের মূল লক্ষ্য নাম আর টাকা কামানো। ‘সিরিয়াস সাহিত্যিক’ বলে কোনো কোনো সাহিত্যিকের প্রতি তারা যত আক্রোশ যতভাবে ক্রমাগত ঝেড়ে থাকেন, তা থেকে মনে হয় এই ‘সিরিয়াস সাহিত্যিকদের’ নিপাত নিশ্চিত করার আগে তারা সুস্থিরভাবে সাহিত্যচর্চা করতে পারবেন না। অথচ নিজেদের কোনো কোনো বইয়ের ব্যাপারে তারা যেভাবে ‘এটা কিন্তু আমার সিরিয়াস বই, খুব খেটে লিখেছি’ জাতীয় সংলাপ সম্প্রচারে নামেন, তাতে সিরিয়াস সাহিত্যিক হিসেবে নাম কামানোর যে গোপন আকুতি তারা লালন করে থাকেন, তাও বেরিয়ে আসে। সব মিলিয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে পাঠক সৃৃষ্টির যে অপার সম্ভাবনা থাকে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ কিংবা কাজী আনোয়ার হোসেনরা পাঠক সৃষ্টির যে দুয়ার খুলে দিয়েছেন, তথাকথিত জনপ্রিয় সাহিত্যিকরা তার কফিন বয়ে চলেছেন। একই কথা বলা চলে তাদের বেলায়ও- যারা নিজেরাই বলতে ভালোবাসেন, তাদের লেখা একটু ‘অফ ট্র্যাকের’, তাই পাঠক কম; এমন বলার পরও তারা চাতক পাখির মতো নিজের পাঠকসংখ্যা গুনে চলেন।
এদিকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রসারিত হচ্ছে- যদিও এদের মধ্যে পাঠক হিসেবে কতজন বিকশিত হয়েছেন বা হচ্ছেন, তা বলা মুশকিল। তবে ‘লেখক’ হিসেবে এই শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা সবাই-ই যে ‘সম্ভাবনাময়’ কিংবা ‘উদীয়মান’ কিংবা ‘গজায়মান’, তাতে কোনো সন্দেহই থাকছে না। প্রযুক্তির বিকাশ আজকাল মুদ্রণের ব্যাপারটিকে এত সহজ করে তুলেছে যে, কেউ একটু চেষ্টা করলেই বই ছাপতে পারছেন। এইসব শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কোনো বই-ই ব্যাকরণ মেনে হচ্ছে না। তাদের লক্ষ্যই থাকছে, নিজের নামে একটি চকচকে বই ছাপানো- নিজের বাক্যের কিংবা বানানের ভুল নিয়ে তেমন একটা আগ্রহ নেই তাদের। এদের কেউ ডাকসাইটে কর্মকর্তা, রাজনীতিক, শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা... ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত লোকজন সেসব বই কিনে তুষ্ট করছে, বিভিন্ন ব্যাংকে যাচ্ছে তাদের বই, যাচ্ছে বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে, অনুগত কর্মী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা শিক্ষার্থীরা তাদের বই নিয়ে পড়ূক বা না পড়ূক, বিলি করছেন অনেকের মধ্যে। সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই যে ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে এক দম্পত্তি ছিলেন, যাদের একজন বই সম্পর্কে বলেছিলেন, ওটাও তো আমাদের একটা আছে; ঠিক তেমনি এ ধরনের পদাধিকারবলে হওয়া সাহিত্যিকরা বই ছাপেন মূলত এ সুপ্ত আকাক্সক্ষা নিয়ে, যাতে যেকোনো সময় বলা যায়, ও... বই? তা ওটা কিন্তু আমিও লিখেছি, লিখতে পারি...।
এই যে এত সব সাহিত্যিক- তারা যে রাষ্ট্রের নৈকট্য চাইবেন, তাতে তাই আর সন্দেহ কি! বড় বেশি প্রত্যাশা এই লুম্পেন সাহিত্যিকের, ‘স্বাধীনতা পদক’ কিংবা ‘একুশে পদক’ নিয়ে সেগুলোকে কলঙ্কিত করা, সেগুলো দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে রাখা, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলে না হোক, আঞ্চলিক কোনো সাহিত্য উৎসবের প্রতিনিধি দলে যুক্ত হওয়া! বঙ্গভবন আর গণভবনের নিমন্ত্রণও বড় বেশি কাক্সিক্ষত তার। বড় বেশি প্রত্যাশা তার, তাদের সঙ্গে একটা-দুটো সেলফি তুলে সামাজিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার; বড় বেশি প্রত্যাশা পুলিশের বড় কোনো কর্তার বাসায় নিমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে হল্লা করার ছবিও প্রচার করে বেড়ানো। সমাজের আর দশটা অর্থনৈতিক পেশার সঙ্গে এই সাহিত্যিকের এখন আর কোনো পার্থক্য নেই। সেই যে আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেছিলেন, সাহিত্যিক সমাজের একজন, তাই সামাজিক দায়দায়িত্ব গ্রহণ করা তার কর্তব্য, আবার সাহিত্যিক বলেই তার মূল ধর্ম সৌন্দর্যের তপস্যা করা। কিন্তু আমাদের সাহিত্যিকরা সমাজের একজন নন- তারা রাষ্ট্রের একজন, তাদের মূল ধর্ম রাষ্ট্র ও সরকারের তপস্যা করা। প্রবল রাজনৈতিক-সামাজিক বিপর্যয়ে এসব সাহিত্যিকের সামাজিক দায়দায়িত্ব এখন সীমাবদ্ধ কেবল বিস্মিত কিংবা দুঃখিত হওয়াতে, নির্লজ্জের মতো রাষ্ট্রীয় ভবনগুলোয় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোয় আমন্ত্রিত হওয়ার খেলায় মেতে ওঠাতে। যারা আমন্ত্রিত হতে পারেন, তাদের জন্যে এখন ফেসবুক আছে, ইনস্টাগ্রাম আছে, টুইটার ছাড়াও আরও কত কিছু আছে; মুহূর্তে তাদের সেই সামাজিক অংশগ্রহণের খবর চলে আসে। সাধারণ মানুষকে তারা কলসির কানা মারতেই ভালোবাসেন, তবু প্রেম দিতে কুণ্ঠিত হই না আমরা।
এদিকে রাষ্ট্র ক্রমশই দানব হয়ে উঠছে; তবে তার নিষ্ঠুরতা যে সামরিকতন্ত্রের চেয়েও পেলব বোধ হচ্ছে, তার কারণ- তার এ দানবীয়তাকে ক্রমাগত বৈধতা দিয়ে চলেছে গণতান্ত্রিকতাই। নতুন এক গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হয়েছে এ দেশে। সেই গণতন্ত্র মনে করে, উন্নয়ন আর দুর্নীতি পাশাপাশি চলে; অতএব উন্নয়ন পেতে হলে আমাদের দুর্নীতি মেনে নিতে হবে! এ গণতন্ত্র মনে করে, ক্ষুদ্র উদ্যোগের কোনো মূল্য নেই, তেমন সব উদ্যোগ গ্রাস করাতেই বরং আনন্দ অপার। কোটি কোটি জনগণের এ ঘনবসতিপূর্ণ দেশে শ্রমঘন শিল্পের প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিদিন অস্বীকার করা হচ্ছে, অস্বীকার করা হচ্ছে স্থানিক জ্ঞানচর্চা বিকাশের ধারাকে; শিল্পোদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্যই এখানে পুঁজিঘন শিল্পের জন্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা লোপাট করা আর জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যই এখানে পরদেশে গিয়ে থিতু হওয়া। যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোগ সম্ভাবনাময়, লুণ্ঠনতন্ত্র আর চাঁদাবাজি সেগুলোকে সবসময় আতঙ্কিত করে রেখেছে। একবার রাষ্ট্র যে দানবীয় ক্ষমতা অর্জন করে, সরকারের বদলেও তা আর বিদূরিত হয় না। কারণ পরবর্তী সময়ের নতুন সব সরকারও সেই দানবীয় ক্ষমতাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ হাতছাড়া করে না। ইতিহাসে এ রকম ঘটতে আমরা বারবার দেখেছি। পাকিস্তান আমলে যেসব আইন গণবিরোধী বিবেচনায় বাতিলের জন্য আন্দোলন হয়েছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেসব আইন স্রেফ বাংলা শিরোনাম দিয়ে বহাল রাখা হয়েছে; এ স্বাধীন বাংলাদেশেও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারী বড় বড় দলগুলোকে শিল্প জাতীয়করণের পক্ষে কথা বলতে শোনা গেছে, শিক্ষাকে অধিকারে পরিণত করার পক্ষে কথা বলতে শোনা গেছে। কিন্তু কার্যত সামরিক শাসন বিদায় নেয়ার পর আসা প্রতিটি সরকারই বেসরকারীকরণের ধারাকে তীব্র বেগে অব্যাহত রেখেছে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ঘটিয়েছে। হাতের কাছে মালয়েশিয়ায় এই তো কয়েক সপ্তাহ আগে নির্বাচন হলো; সেই নির্বাচনের আগে মাহাথির জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সরকারের বহুল সমালোচিত ভুয়া খবরবিরোধী আইনটি তিনি বাতিল করবেন- কিন্তু ভোটে জিতেই তিনি বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার একটা সীমা থাকা উচিত। সে কারণে আইনটিকে বাতিলের বদলে পর্যালোচনা করা হবে! এটি একটি ছোট্ট উদাহরণ- যেমন উদাহরণগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়- এভাবেই রাষ্ট্র ও সরকারের আকাক্সক্ষা পাল্টায়। পাল্টে যাওয়ার এ খেলায় রাষ্ট্র দানব হয়ে ওঠে, সরকারকেও তার কাছে চুনোপুটি মনে হয়। কার্যত তখন এ দানব রাষ্ট্রকে বহাল রাখতে প্রয়োজনে সরকারকেই বিদায় নিতে হয়।
একাত্তরের পর সাহিত্যিকদের মেরুদণ্ড যে বড় বেশি ঋজু ছিল, সে কথা বলব না। যদিও শক্তিশালী সাহিত্যিকদের সবাই-ই শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। দেশের মধ্যে যারা ছিলেন, তাদের সঙ্গেও গেরিলা ও মুক্তিযোদ্ধাদের যোগাযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। শামসুর রাহমানের পাঠানো কবিতা মুক্তিযোদ্ধা গেরিলারা তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে বসে পড়েছেন- এমন বিরল সৌভাগ্য অবশ্য আর কোনও কবির নেই। আল মাহমুদ দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়েছিলেন, তিনিও শক্তিশালী কবি, কিন্তু তার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের তরঙ্গ অত খেলা করে না, তিনি এমন সৌভাগ্য অর্জনও করতে পারেন না। মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্ন কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও পাকিস্তানকে অস্বীকার করে লেখক সৈয়দ আলী আহসানও ভারতে চলে গিয়েছিলেন। আবার দেশের মধ্যে অবস্থানকারী আনোয়ার পাশা তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ শেষ হওয়ার পর আল-বদরদের হাতে জীবন দিয়েছেন। বড় বেশি জীবন্ত ওই উপন্যাস, নিজেকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। হতে পারে, অনেক সাহিত্যিকের মস্তিষ্কেই পাকিস্তানি ভাবধারা গিজগিজ করেছে (স্বাধীনতার পর দিন যতই গেছে, ততই যার প্রকাশ ঘটেছে), কিন্তু যেকোনোভাবেই হোক না কেন, বড় অংশটি মুক্তিযুদ্ধকেই সমর্থন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর এরই ধারাবাহিকতায় এমনকি সামরিক শাসনামলেও আমরা অনেক সাহিত্যিককে সংঘবদ্ধভাবে ঋজু হতে দেখেছি। সাহিত্যিকদের অনেককে ঋজু হওয়ার কারণে মাশুলও গুনতে হয়েছে। তবে সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে সাহিত্যিকদের মোটামুটি ঋজু একটি ভূমিকা দেখতেই জনগণ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কিন্তু সেই ভূমিকায় হঠাৎ করেই একটি উল্লম্ফন ঘটেছে গত কয়েক দশকজুড়ে। এখন চারপাশে সাহিত্যিকদের উল্লাস আর প্রাপ্তিযোগের আনন্দ দেখে মনে হয় না, রাষ্ট্র আদৌ কোনো দানব। এ রাষ্ট্রে এখন অনেকেই শাহনামা লিখে বেড়াচ্ছেন, তবে তাদের কেউই সেই ফেরদৌসী নন যে, শেষ পর্যন্ত তাকে রাষ্ট্রের কোপানলে পড়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবনযাপন করতে করতে করতে কবরে যেতে হবে। বরং রাষ্ট্রের আনুকূল্যে, স্তবকদের স্তুতিতে ভেসে বেড়াতেই বেশি উৎসাহী এ লুম্পেন সাহিত্যিকরা।

Disconnect