ফনেটিক ইউনিজয়
তোমাকে অভিবাদন শহীদ কাদরী
রাহাত রাব্বানী

পঞ্চাশোত্তর বাংলা কবিতায় আধুনিক মননের ছাপ যারা রেখেছেন, কবি শহীদ কাদরী তাদেরই অন্যতম। সুগভীর মননের অধিকারী কবি শহীদ কাদরীর কবিতায় রয়েছে নান্দনিক চিত্রকল্প। তার প্রায় কবিতার পঙ্‌ক্তিই পাঠক হৃদয়ের ইন্দ্রিয়াতীত বোধকে উদ্দীপিত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি’, জীবনানন্দ দাশের ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’ লাইনগুলোর মতোই শহীদ কাদরীর ‘রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন আমার প্রস্তাবগুলো’ বা ‘এবং বাউলের একতারার মতো বেজে ওঠে চাঁদ’ অথবা ‘মগজের কু-লীকৃত মেঘে পিস্তলের প্রোজ্বল আদন’ লাইনগুলো কবিতা পাঠকের মননে-মগজে সর্বত্রই বাজে। বৈশ্বিক বোধকে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনার আশ্রয়ে কবিতায় প্রকাশযোগ্য করে তোলা শহীদ কাদরীর মূল প্রবণতা।
কলকাতা শহরে জন্ম তাঁর, শৈশব কেটেছে সেখানে; শহরের চার দেয়ালে। এ কারণেই ব্যস্ত শহুরে জীবনের সুস্পষ্ট ছাপ তার কবিতায় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিক নগর যন্ত্রণা আর নগর ভাবনার কবি। জীবনের আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ কংক্রিটের শহর থেকে উপলব্ধি করেছেন। সে চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে তার কবিতায়-
‘আমি করাত কলের শব্দ শুনে শুনে মানুষ।
আমি জুতোর ভেতর, মোজার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ।’
নাগরিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশের পাশাপাশি স্বদেশপ্রেম, বাংলার জন্ম-ইতিহাস তার কবি ভাবনায় যোগ করে নতুন মাত্রা। বিশেষত, ষাটের দশকের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বোপার্জিত বোধকে প্রকাশ করার উপায় হিসেবে তিনি রূপক-প্রতীকের আড়ালকে সাফল্যের সাথে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর বর্বর হামলা কবিকে প্রচ-রকম আহত করে। হয়তো এ কারণেই ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতায় লিখেছেন-
‘ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে
মার্চপাস্ট করে চ’লে যাবে
এবং স্যালুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।’
কবি যুদ্ধ নয়, শান্তি চেয়েছেন। রচনা করেছেন নান্দনিকতাঋদ্ধ পঙ্‌ক্তিমালা-
‘হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাক ছুরি।’
কবিমাত্রই সত্য ও সুন্দরের পূজারি। অসুন্দরের বেড়াজাল পেরিয়ে কবি বারবার চোখ রাখতে চান সুন্দরে। অনুভূতি প্রকাশে শহীদ কাদরী প্রতীকীর মালা গাঁথেন সূক্ষ্ম হাতে। অনুভূতির চাদর জড়িয়ে নান্দনিক সূত্রধরের মতো সৃষ্টি করেন একটি নিদারুণ অভিশাপ কিংবা সুরভিত ভবিষ্যদ্বাণী।
‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
 কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না।’
প্রেম চিরন্তন, প্রেম ধ্রুপদী আর শহীদ কাদরীর কবিতায় প্রেম এক অনন্য অলংকার। কবিতায় তিনি প্রেমের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন শৈল্পিকরূপে। তিনি জানতেন, হৃদয়হীনের সাথে প্রেমের কোনো সম্পর্ক নেই। কখনও কখনও তিনি সহজ স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন। বেদনার অবসান চেয়ে তিনি হয়তো প্রিয়তমাকে কিছু বর্বরের কাছে বিক্রি করে দিতে পারেন। আবার মনে হলো, তিনি তা পারবেন না কখনও! কারণ প্রেমকে তিনি ছিপছিপে নৌকো বলতে নারাজ, সাগরে ভাসা জাহাজের পাটাতন বলতে নারাজ কিংবা-
‘দারুচিনি দ্বীপ নয় অর্থাৎ কোনো আশ্রয় নয় প্রেম।’
তার বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। তিনি বলতেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের মতো বলতে চাই- ‘কবিতা লিখে কিছুই হয় না। কবিতা মননকে শাণিত করে। কবিতা নান্দনিক শিল্পবোধকে জাগ্রত করে। আর মানুষ বেঁচে থাকে সেই শিল্পসত্তার সঙ্গী হয়ে।’ কবিতায় আমি আমার সাম্রাজ্য খুঁজে পাই। ইটস্ মাই কিংডম। আধুনিক কবিতা শুধু অন্তর্মুখী নয়, বহির্মুখী। জাগতিক অনেক পাওয়া-না পাওয়ায় হিসেব আমরা কাব্যজগত ও ভাবনার সাথে মেলাতে পারি। যদি কেউ কবি হতে চায় তাকে দশ বছর শিল্প-সাহিত্য পড়েই পাঠে নামা উচিত। তার বক্তব্য ছিলো- কবিকে অবশ্যই শব্দ জানতে হবে। কারণ নতুন শব্দের ব্যবহার কবির নিজের চিত্রকল্প নির্মাণে সাহায্য করে। ওই কবিকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে সহায়ক হয়।’’
কবি শহীদ কাদরী তার সমসাময়িক কবিদের ব্যাপারে ছিলেন উদার। তার আয়োজিত ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’য় তিনি বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবিদের কবিতা পড়াতেন। পড়াতেন অনুজ কবিদের কবিতাও। একটি অনুষ্ঠানে তিনি কয়েকজন আবৃত্তিকার দিয়ে পড়িয়েছিলেন আল মাহমুদের কবিতা। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘কবি আল মাহমুদের কবিতা, বাংলা কবিতার শত শত বছরের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তৈরি করেছে নতুন বাঁক। তার কবিতার গীতল ধারা আমাদের সংস্কৃতির উত্তরাধিকার।’ কবিতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আবিদ আজাদ তার কর্মের তুলনায় বেশি আলোচিত হননি।’ অকালপ্রয়াত এ কবির ‘খেলনা পুতুল’ কবিতাটি শহীদ কাদরী নিজেই পাঠ করে বলেছিলেন, ‘বাংলা সাহিত্য কেন, গোটা বিশ্বসাহিত্যে এমন চমৎকার কবিতা লিখিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’ তিনি আবিদের কবিতা আরও পঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কবি শহীদ কাদরী ছিলেন অতি আড্ডাবাজ মানুষ। আড্ডা দিতে দিতে প্রায়ই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেতেন তিনি। সে স্মৃতিই খুঁজে পাওয়া যায় তার ‘অগ্রজের উত্তর’ কবিতায়।
‘না, শহীদ সেতো নেই; গোধূলিতে তাকে
কখনও বাসায় কেউ কোনদিন পায় নি, পাবে না।’
দীর্ঘকাল মাতৃভূমি থেকে দূরে, বাড়ি থেকে দূরে, প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন কবি। কিন্তু সকল অভিমান ভুলে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন আবার। কীর্তিনাশার কালো স্রোতে সারি সারি নৌকা দেখে তিনি যেন বলতে পারেন- ‘যাচ্ছি বাড়ি।/ যাচ্ছি বাড়ি।’ অভিমানী কবি জীবনের দীর্ঘসূত্রতার কবল ছিঁড়ে অবশেষে বাড়ি ফিরেছিলেন, সেই মাটিতে শরীর রেখে প্রশান্তির ঘুমে তিনি অনন্তকাল নিথর হয়ে থাকবেন।

Disconnect