ফনেটিক ইউনিজয়
সা ক্ষা ৎ কা র
মেশিন দিয়ে মেশিনগান হতে পারে, গান নয় : কুমার বিশ্বজিৎ

বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ও জননন্দিত শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। ১৯৮২ সালে ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গান দিয়ে তার পথচলা শুরু। গান করে চলেছেন তিন যুগ ধরে। তার গানে রয়েছে নতুন আবেদন, নিরীক্ষা এবং গুণগত কথা ও মান। তরুণদের নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন, কাজ করতে চান। আগামী কুমার বিশ্বজিতের কাছে নিরন্তর সম্ভাবনার! রাজধানীর উত্তরায় শিল্পীর বাসভবনে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন হাসান সাইদুল

৩৩ বছর হলো সংগীতাঙ্গনে কাজ করছেন। প্রাপ্তি-অতৃপ্তি কী আছে বলে আপনি মনে করেন?
সংগীতের ভুবনে এতদিন পার হয়ে গেছে, আমি কখনই অনুভব করিনি। মহাসাগরের যেমন কোনো তল খুঁজে পাওয়া কঠিন, ঠিক তেমনি সংগীতের বিস্তীর্ণ জগতে তল খুুঁজে পাওয়া মুশকিল। কাজের প্রতিদান অনেক পেয়েছি, চেষ্টা করে যাচ্ছি মানসম্মত কাজ করতে, কিছুটা হয়তো সফল হয়েছি, তাই এখনও গাইতে পারছি এবং আমার অনেক গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দর্শক-শ্রোতারা আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন। আমার অতৃপ্তি নেই। একটাই প্রত্যাশা, কোনো ব্যক্তিস্বার্থে আমাদের সংগীত শিল্পটা যেন ধ্বংস না হয়।

চলচ্চিত্রের গান করেছেন অনেক। শুরুটা জানতে চাই।
১৯৮২ সালে যখন বিটিভিতে ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানটি সম্প্রচার হয়, তখন স্বাভাবিকভাবে চলচ্চিত্র থেকে প্লেব্যাক করার ডাক এল। প্রযোজক রাকিব ও নির্মাতা বলাই ভাই আমাকে ডেকে বললেন, ‘সিনেমায় গান করতে হবে।’ সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলীর কথা শুনে প্রথমে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ আশির দশকে আমরা যখন গান গাওয়া শুরু করি, তখন আমাদের কয়েকজন আইকন ছিলেন। তাদের মধ্যে আলাউদ্দিন আলী ভাই অন্যতম। তার গান করব শুনে তো আমি খুশি। তিনি বলেছেন, আমার সাথে দ্বৈত কণ্ঠ দেবেন পাকিস্তানের পপ সম্রাট আলমগীর। একদিন আলাউদ্দিন ভাই গান নিয়ে বসলেন। গান তুললাম। গান তোলার পর আলাউদ্দিন ভাই আমাকে বললেন, ‘গানটা যেহেতু দ্বৈত, তুমি আলমগীরের বাসায় যাও। একদিন আলমগীরের বাসায় গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি স্কার্প দিয়ে মাথা ঢেকে বসে আছেন। কোনো কথা বলছেন না। আলাউদ্দিন ভাইকে বললাম, ভাই উনি তো আমার সাথে কথা বলছেন না। আলাউদ্দিন ভাই বললেন, কাল তার রেকর্ডিং তাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেশি কথা বললে নাকি গলা চুলকায়। এ দ্বৈত গানের মাধ্যমে শুরু হলো আমার সিনেমার গানে পথচলা। প্রথম সিনেমার নাম ছিল ‘ইন্সপেক্টর’।

‘চন্দনা গো রাগ করো না’- আপনার জনপ্রিয় এ গানের চন্দনা কে ছিলেন?
এটা গীতিকারের একান্ত নিজস্ব কল্পনা। কবিরা কল্পনাপ্রবণ বটে। আমার কাছেও ‘চন্দনা’ নামের অস্তিত্ব কল্পনায়, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই।

প্রয়াত নায়ক জাফর ইকবালের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার গল্পটা যদি বলতেন...
নায়ক জাফর ইকবালের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সংগীতজীবনের শুরুতেই। তিনি আমাকে ভীষণ পছন্দ করতেন। আলাউদ্দিন আলী ভাইয়ের সুরে জাফর ইকবালের অভিনীত ছবির প্লেব্যাক করি। তার প্রযোজিত প্রথম ছবি ‘প্রেমিক’-এ আমাকে অভিনয় করানোর খুব শখ ছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। ছবির গান করতে কলকাতায় গেলাম। রেকর্ডিং শেষে যেদিন দেশে ফিরে আসি, সেদিনই বিকালে আমার বাসায় এলেন নায়ক জাফর ইকবাল। এসেই ‘দোস্ত’ বলেই ধুম করে একটা ঘুষি মারলেন পিঠে। বললাম, গান কি ভালো হয়নি? বললেন দারুণ হয়েছে। মিউজিকের প্রতি তার ভীষণরকম ভালো লাগা ছিল। অনেক ভালো গান গাইতেন। অনেক স্মার্ট ছিলেন। শুধু পোশাক আশাকে না, রুচিবোধ, ফ্যাশনসচেতনতা সবই ছিল নজর কাড়া। শোবিজের আর কারও মধ্যে এ রকম দেখিনি। এখনকার কোনো নায়কের মধ্যে এমন ফ্যাশনসচেতনতা আছে কিনা জানি না।

আপনার বেশির ভাগ গানে আক্ষেপ, বেদনা, বিরহ, দুঃখ-কষ্টের কথাগুলো পাওয়া যায়।
আসলে মানুষের জীবনে বেদনাটাই বেশি। আমার কাছে মনে হয়েছে দুঃখটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়। দুঃখের বিষয়টা যে গানের সঙ্গে মিলে যায়, সেই গানটা চিরস্থায়ী হয়ে যায় মানুষের মনে। আমি কিন্তু বিরহের গান একটু ব্যতিক্রমভাবে করার চেষ্টা করেছি। তোমাকে ছাড়া চলবে না, তোমাকে ছাড়া বাঁচব নাÑ এ ধরনের বিরহের গান করিনি।

এখন গানের ‘কথা’র প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন?
এ সমস্যাটা শুধু বাংলাদেশে না, সারা পৃথিবীতেই একই সমস্যা। এখন কয়টা ব্রায়ান অ্যাডামস, লতা মুঙ্গেশকার, আশা ভোঁসলে আছেন? কারণ  পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, গুলজার কই? এরপর তো আর কাউকে মানসম্মত দেখছি না শিল্পী কিংবা গীতিকবিদের মধ্যে। তারা যা করে গেছেন, সেটা ভেঙেই খেতে হবে? সৃষ্টি সব শেষ? এখন সেটিকে মডিফাই করে খেতে হবে? আমার কাছে মনে হয়, সবচেয়ে বড় সংকট যেটা তা হলো ভালো গীতিকবির অভাব। যারা এখনও লেখার মতো লোক আছেন, তাদের দিয়ে লেখানো হয় না। যারা এখনও গাওয়ার মতো লোক আছেন, তাদের দিয়ে গাওয়ানো হয় না। আমি যা-ই করলাম, তা একটা গোষ্ঠীভিত্তিক। তবে সেটা কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। তবে এদের পেছনের শক্তিগুলো অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী, যার জন্য তারা এ কাজগুলোয় হয়তো বিচরণ করতে পারবে। এ সুযোগ তারা যদি নিতে পারে, তাহলে ভালো। যদি আমরা এ বিশ্বায়নের দৌড়ে, বিশ্বায়নের যুগে আজ হেরে যাই, সেটা হবে একটা বুমেরাং।

আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে শিল্পী হওয়াকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আসলে সংগীত এমন একটা বিষয়, এটা প্রচার দিয়ে হয় না। এটা অভিজ্ঞতার ব্যাপার। মেশিন দিয়ে মেশিনগান হতে পারে, গান নয়। মানুষের হৃদয়ে পৌঁছতে হলে গান শিখে আসতে হবে। গান-বাজনা করতে মাল-মসলা লাগে, শুধু অনুকরণ করে কাটিং করে গান হবে না। ভিউয়ার্স দিয়ে তো জনপ্রিয়তা পরিমাপ করা যায় না। কারণ এখন প্রযুক্তির ব্যবহারে ভিউয়ার্সও বাড়ানো যায়। তবে আমি নিরাশ নই, সম্ভাবনা দেখি নতুনদের মধ্যেও।

নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী হতে পারে?
সংগীত সৃষ্টিশীল জায়গা। হাজার হাজার গান করে কোনো লাভ নেই। দুটো ভালো গান গেয়ে মরে যাওয়া ভালো। আমরা ৫০০ টাকায় ফিল্মের গান করেছি। এ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যদি চারজনকেও ধরা হয়, আমি কিন্তু একজন। সুতরাং কষ্টটা আমার বেশি লাগে।

ছেলের নির্দেশনায় মিউজিক ভিডিওতে কাজ করলেন...
এ গান আমার জন্য অন্যরকম অভিজ্ঞতা। কারণ এর ভিডিও নির্মাণ করেছে আমার ছেলে। ছেলের নির্দেশনায় কাজ, যারা এ পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়েছেন, তারা অনুভব করতে পারবেন না। কাজটিতে বাড়তি যতœ ছিল। সেই সঙ্গে আবেগও জড়িয়ে আছে। আশা করি গান ও ভিডিও সবার ভালো লাগবে।

শ্রোতা ও পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসুন। নিজের দেশের গান শিখুন। আমাদের দেশটা আয়তনে ছোট হতে পারে, কিন্তু এখানে অনেক গান আছে। আপনারা সুন্দর গান শুনুন। নিজের শিকড়কে সবার উপরে রাখুন। এটাই আমার চাওয়া।

Disconnect