ফনেটিক ইউনিজয়
পোস্টকার্ড
পোস্টকার্ড : ছোট কাগজের ভিন্ন আঙ্গিক
আহমদ জসিম

লিটলম্যাগের বাংলা অনুবাদ হিসেবে ‘ছোট বারুদ’ শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে। এ দেশে ছোট কাগজের নাম নিয়ে যেসব কাগজ  প্রকাশিত হচ্ছে, তারা যে নিজেদের চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে, এটা একটা ব্যাপার হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে ‘পোস্টকার্ড’ ব্যতিক্রম। একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনকে ধারণ করা দলনিরপেক্ষ পত্রিকা, মূলত রাজনৈতিক, সামাজিক বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ প্রাধান্য পেলেও ছাপা হয়েছে গল্প, কবিতা ও সাহিত্যবিষয়ক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ। অক্টোবরের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ওপর একটা প্রবন্ধ লিখেছেন কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন। তার এ নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে রুশ বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলো তিনি আমাদের সামনে হাজির করছেন। এ প্রবন্ধের পরই আমরা দেখছি ‘দুরায়ত পারাবত’ শিরোনামের  একটা ছোট গল্প, গল্পকারের নাম, সজল বিশ্বাস। বিষয়বস্তু যাই হোক, শিল্পের দায়বোধকে মাথায় রেখেই লেখককে শিল্প সৃজন করতে হয়, এ বিবেচনা বোধ করি লেখকের ছিল না। প্রাবন্ধিক শাহেরীন আরাফাত নর-নারীর মানসিক ও শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন দীর্ঘ বিশ্লেষণ ধর্মীয় মনোবৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ। প্রাবন্ধিক প্রচলিত নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে খারিজ করে নতুন কিছু চিন্তা পাঠকের সামনে হাজির করেছেন, যা পাঠের  মধ্যদিয়ে সমাজের প্রচলিত চিন্তাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ‘সাহিত্যে  সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষিত ও প্রভাব’ শিরোনামে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধটা লিখেছেন কামরুজ্জামান ভুঁইয়া। তিনি তার সুনিপুণ গদ্য ভাষায় দেখিয়ে দিয়েছেন, সাহিত্য কীভাবে, ঐশ্বরিক ধ্যানমগ্নতা থেকে বেরিয়ে এসে মানবজীবনের বিষয়বস্তু হয়ে উঠল। ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিসর’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছেন মযহারুল ইসলাম বাবলা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে যে স্বাধীনতার চেতনা ও তাকে কেন্দ্র করে যে লড়াই-সংগ্রামগুলো গড়ে উঠেছিল, সেই লড়াই-সংগ্রামের প্রশ্নে বিদ্যাসাগরের নির্লিপ্ততাকেই তার সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন প্রাবন্ধিক। তবে বিদ্যাসাগরসহ আরও অনেকের সততা ছিল সন্দেহাতীত। আন্তর্জাতিক মত হলো, কোরিয়া একটি স্বৈরাচারী কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। আবার এ দেশের বাম রাজনীতিকদের মতে, কোরিয়া একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ, এ দুই মতের বাইরে গিয়ে কোরিয়া সম্পর্কে একটা বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়, ঠিক এ বাস্তবতায় উত্তর কোরিয়া ওয়ার্কার্স পার্টি প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে, কিম ইল সুংয়ের একটা লেখার  অনুবাদ করেছেন রঞ্জন দে। বাসদ নেতা কমরেড খালেকুজ্জামানের লেখার শিরোনাম ‘জনযুদ্ধ পরবর্তী নেপাল’। তিনি প্রবন্ধে নানা তথ্য হাজির করেছেন। সংস্কৃতির ওপর বুর্জোয়া আধিপত্য নিয়ে লিখেছেন প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সেই সাথে বাসদ (মার্ক্সবাদী) নেতা কমরেড মবিনুল হায়দার চৌধুরীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটা বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি ও বাম আন্দোলনের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ব বহন করে। বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার পরও পোস্টকার্ড নামক এ ছোট কাগজ পাঠ শেষ হয় এক অসীম সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়ে, মার্ক্সবাদী চিন্তক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভাষায়, “সংস্কৃতির মধ্যদিয়ে বুর্জোয়ারা আমাদের চিন্তাজগতে অবিরাম তৎপরতা চালাচ্ছে, তার পরও সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম কিন্তু থেমে নেই, এই না থাকার একটা উদাহরণ হচ্ছে, ‘পোস্টকার্ড’-এর মতো একটা চিন্তাশীল ছোট কাগজের তৎপরতা।”

Disconnect