ফনেটিক ইউনিজয়
লিপির জন্য
কাজী মেহজাবিন

আমি আমার পছন্দের মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারিনি। ওর নাম ছিল লিপি। ছিপছিপে শ্যামলা মুখে বড় বড় দুটো চোখ বসানো। আমি লিপিকে বিয়ে করতে পারিনি। আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। একটা বড় প্রাইভেট ফার্মে বেশ চড়া দরের চাকরি করি। আজ সোমবার। দুপুর ২টা। এ সময় আমার অফিসে থাকার কথা। কিন্তু হলো না। বাবা সকালে মরে গিয়ে হুট করে একটু ঝামেলায় ফেলে দিলেন। ঝামেলা মানে রুটিনের গোলমাল। আমাদের বড়লোক পরিবারে রুটিনের গোলমালটা সচারচর হয় না। এ রুটিনের মেইনটেন্যান্সের দায়িত্ব মায়ের হাতে ছিল। ছিল বলছি দেখে ভাববেন না মাও মরে গেছে। না, মা মরেনি। সে শক্ত-সমর্থভাবেই বেঁচে আছে। ছিল বলছি কারণ পাঁচ বছর ধরে মানে আমার বিয়ের পর থেকে বাড়ির রুটিন বা নিয়ম-কানুনের ওপর কর্তৃত্বের ভারটা আমার মায়ের কাছ থেকে আমার বউ রিংকি নিয়ে নিয়েছে। খুব একটা বিনয়ের সঙ্গে যে নিয়েছে তা না। কেড়ে নিয়েছে বলাই ভালো। মা ভেবেছিল পছন্দ করে যাচাই করে নিয়ে আসা বৌমা তার বিরাট বাধ্য হয়ে থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করল আমার বাবার দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাকের পর থেকে। আমার শক্তিশালী মা একটু মুষড়ে পড়তে লাগলেন। আর সে সুযোগে তার বৌমা সুযোগ সন্ধানীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। বাবা ব্যবসায়ী সাদেকুর রহমান হিসাবে একটা গোলমাল করে ফেলেছিলেন। তিনি তার সম্পত্তির পুরোটা লিখে দিয়েছিলেন আমাকে। মায়েরও তাতে সায় ছিল। ভেবেছিলেন হয়তো ছেলে তো তার আঁচলে বাঁধাই আছে। তবে যে ছেলে আঁচলে বাঁধা পড়ে, আঁচল পুরনো হলে এবং নতুন মাড় দেয়া আঁচল তাকে বাঁধার জন্য ছলাকলা করছে দেখলে সেই নতুন গন্ধের শাড়িকে উপেক্ষা করার শক্তি আর প্রয়োজনীয়তা কোনোটাই অনুভব করে না, সেটা বোধহয় মায়ের জানা ছিল না। তাই অগত্যা আমি সেই ঠাণ্ডা লড়াই, যা আবার কখনও কখনও গরম হয়ে ওঠে, তাতে দর্শক হয়েই গ্যালারিতে বসে রইলাম। মাঠে নামার চিন্তা আমার মাথায় কখনও ভুলেও আসেনি।
যুদ্ধে নামার চিন্তা আমার মাথায় শুধু একবারই এসেছিল। যখন লিপিকে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু সে যুদ্ধের স্বরূপ এতটা ভয়াবহ হবে কে জানত! আমার মা লিপির বর্ণনা শুনে আমার বন্ধুদের থেকে লিপির ঠিকানা বের করে ওর বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। তারপর অতি সিনেমাটিক ভঙ্গিতে কেন একজন অতি সাধারণ সোসিওলজির স্টুডেন্টের একজন ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করার চিন্তা মাথায় আশ্রয় দেয়া উচিত না সেটা জানান। লিপিরা আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়ল। কারণ আমার সাথে লিপির কোনো সম্পর্ক ছিল না। লিপি জানতই না যে আমি ওকে পছন্দ করি। আমার মায়ের হঠাৎ আগমনেই সে প্রথম সে কথা জেনেছিল। আমি সেদিন জীবনে প্রথম ও শেষবারের মতো লজ্জায় মরে যেতে চেয়েছিলাম। সন্ধ্যায় লিপির বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। গেট খুলে দিল ওর বাবা। আমি বললাম, ‘লিপি বাড়িতে আছে? আমি ফারহাদ।’ ভদ্রলোক কিছু না বলে গেট থেকে সরে দাঁড়িয়ে ভেতরে যাওয়ার পথ করে দিল। আমি ওদের ড্রইংরুমে গিয়ে বসলাম। এক সেট বেতের সোফা, পাশে প্লাস্টিকের দুটো মোড়া। মাঝে বেতের ছোট একটা টেবিল। টেবিলের ওপর একটা নীল রঙের কাচের ছোট্ট ফুলদানিতে ক্যামেলিয়া ফুল রাখা। এই অল্পকিছু জিনিসে কী সুন্দর করেই না ঘরটা সাজানো। কে সাজিয়েছে? লিপি?
বেশ কিছুক্ষণ পর লিপি এল। ওর মুখ থমথম করছে। দৃষ্টি তীক্ষè। ও আমার সামনে মোড়া টেনে মুখোমুখি বসল। আমি কোনোভাবেই ওর চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিল বেতের সোফায় একটু আলগোছে শুয়ে ঘুমোতে পারলে বেশ হতো। বহু কষ্টে লিপির দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ওকে বললাম, ‘আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি লিপি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।’ বলতে গিয়ে লক্ষ করলাম আমার গলা ধরে আসছে, চোখ ভিজে উঠছে। আমার অস্বস্তির সীমা রইল না। লিপি আমাকে এ অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিল। নরম স্বরে বলল, ‘চা খাবেন ফারহাদ ভাই? চা করে নিয়ে আসি? চায়ের সাথে কিন্তু কিছুই দিতে পারব না। ঘরে এ মুহূর্তে খাওয়ার কিছুই নেই।’ এই বলে সামনে থেকে সরে গেল। আমি সন্তর্পণে চোখ মুছে নিলাম। লিপি ফিরে এল আধঘণ্টা পর। ট্রেতে দুই কাপ চা আর কিছু বড়াজাতীয় বস্তু। ট্রে টেবিলে রেখে মোড়ায় না বসে আমার পাশের সোফায় বসে বলল, ‘আজ আপনি প্রথমবার এসছেন। শুধু চা কী করে দিই? নিন বড়াগুলো গরম গরম খেয়ে দেখুন তো। বৃষ্টি-বাদলার দিনে ভালোই লাগবে। আর সরি। অনেকক্ষণ একা একা বসিয়ে রাখলাম।’
আমি লিপির দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘লিপি তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ তো!’ লিপি বলল, ‘আপনি তো ক্ষমা চাওয়ার মতো কিছু করেননি।’ আমি বললাম, ‘কী জঘন্য একটা ব্যাপার ঘটে গেল আজ! অথচ আমি কিছুই করতে পারিনি! ইভেন, আমি এখন কী করব তাও আমি জানি না... আমি...।’ আমি কথা খুঁজে পেলাম না। লিপি আবারও আমাকে বাঁচিয়ে দিল। বলল, ‘ফরহাদ ভাই, আপনি চলে যান। আর কখনও ফিরে আসবেন না এখানে। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’ আমি বললাম, ‘চলে যাব!’ লিপি বলল, ‘এটা ছাড়া আর কোনো উপায় কি আপনার জানা আছে?’ আমি লিপির কথার উত্তর খুঁজে পেলাম না। সত্যিই তো! আমার কি আর কোনো কিছু করার আছে চলে যাওয়া ছাড়া? নিজের সীমাবদ্ধতার বাইরে হয়তো কেউ কেউ যেতে পারে, কিন্তু সবাই পারে না। আমি সেই কেউ কেউয়ের দলে কোনোদিনও থাকতে পারিনি। সেদিন চা আর বড়া খেয়ে আমি লিপির বাসা থেকে চলে এসেছিলাম। আর কখনও ফিরে যাইনি। লিপির সাথে যোগাযোগেরও কোনো চেষ্টা করিনি। আমার জীবনের প্রথম ও শেষ যুদ্ধ বোধহয় সেটাই ছিল।
‘ঝিম ধরে বারান্দায় বসে আছ কেন?’ রিংকির ডাকে চমকে পেছনে তাকালাম। উত্তর দিলাম না। তাতে রিংকির কিছুই এলগেল না। সে যা বলতে এসেছে তা বলবেই। -বলি, ৩টা বাজে। তুমি শুধু শুধু এখানে বসে কী করছ? ভেতরে কত কাজ, কত লোকজন সে খোঁজ আছে? ‘কাজের জন্য হাজারটা লোক আছে। সব আত্মীয়স্বজনই তো চলে এল।’ -সবাই আর তুমি এক? তুমি তো নিজের ছেলে। একমাত্র ছেলে। পরে তো সবাই মিলে আমার খুঁত ধরবে। বলবে সব পেয়ে গিয়ে এখন শ্বশুরকে অবহেলা করছি। ‘কী আশ্চর্য! এসব কথা কোত্থেকে আসছে? সময়মতো সব কাজই হয়ে যাবে এবং যাচ্ছে।’ -বাসায় এত মানুষ। এদের দুপুরের খাবার তো দিতে হবে। তোমার খালার বাসা থেকে খাবার আসার কথা। সে খাবার এখনও এল না। আমি একা একা চোখে অন্ধকার দেখছি। কেউ এসে হেল্প করা তো দূরে থাক, সবাই শুধু আছে আজেবাজে কথা বলার তালে! আর তাতে ইন্ধন দেয়ার জন্য তোমার মা তো আছেনই। ‘আজ মায়ের শোকের দিন। তাকে তর্কে না টানলেই কি নয়?’- তোমার মা শোক তোমার বাবাকে নিয়ে করছেন না অন্য কিছু নিয়ে করছেন দেখতে পাচ্ছ না? নাকি মায়ের কুৎসিত অভিযোগনামা কানে যাতে না পৌঁছে তার জন্যই বারান্দায় ঘাপটি মেরে বসে আছ?
আমি কিছু বললাম না। এই পারিবারিক যুদ্ধে আমি কোনো অ্যাক্টিভ সৈন্য নই। বহু আগেই সারেন্ডার করেই আপাতত কারাগারে বন্দি আছি। তাই কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। সময়মতো মা নিজেই দেবে। অবশ্য দিতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। মায়ের জীবনে লাল বাতি জ্বলছে। রিংকি বলল, ‘যাও তো! অ্যাট লিস্ট মেয়েটার জন্য বাইরে থেকে কিছু খাবারটাবার নিয়ে এসো। সকাল থেকে ও কিছুই খায়নি। আর এখানে কখন খাবার আসবে তারও তো ঠিক নেই।’ আমি উঠে দাঁড়ালাম। রাস্তায় নামার পর মাথাটা একটু হালকা লাগতে শুরু করল। আজ সকাল থেকেই মাথাটা ধরে আছে। অবশ্য তার পেছনে বাবার ভূমিকা নেই। অদ্ভুত কারণে বাবার মৃত্যুর পর থেকেই আমার বারবার লিপির কথা মনে পড়ছে। আমি আমার পাঞ্জাবির পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলাম। ব্যাগে রাখা ছোট্ট একটা চিরকুটে লিপির বাসার ঠিকানা লেখা। গত মাসের ১২ তারিখ বিকালে অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎই লিপির সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল! সাত বছর পর। হুট করেই যেন আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা রিকশা নিয়ে নিলাম বাসাবোর উদ্দেশ্যে। আমার যেতে দেরি হলে আমার মেয়ে দিঠির খাওয়া আটকে থাকবে না। ওর মা কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করে মেয়েকে ঠিক সময়মতো খাইয়ে দিতে পারবে। আমি আজ লিপির সাথে দেখা করতে যাব। ওর সাথে বিকাল পর্যন্ত গল্প করব। আজ ওকে আবারও সেই আগের মতো দুই কাপ চা আর ডালের বড়া করে আনতে বলব।
লিপির সাথে সেদিন কালো, থলথলে গোঁফওয়ালা যে লোককে দেখেছিলাম, সেটিই লিপির স্বামী। আমরা তিনজন সেদিন একটা রেস্টুরেন্টে বসেছিলাম। ভদ্রলোক কোনো এক কোম্পানিতে কী সব যেন কাজ করে। মনে মনে তার সাথে নিজের তুলনা করে আমি সেদিন একবার তৃপ্ত হয়েছিলাম। আজ আরও একবার হলাম। বাড়িটা কি এ গলিতেই? বোধহয় তাই। আমি রিকশা ছেড়ে দিলাম গলির মুখে। ঠিকানা দেখে বাড়িটা বের করা খুব একটা জটিল হবে না। আমি লক্ষ করলাম, আমার পা কাঁপছে। বুকের ভেতর একসাথে অনেক রকম অনভূত হচ্ছে। ভয়াবহ উত্তেজিত আমি। আবার একই সাথে নিবিড় কোনো বোধ আমার পা আটকে ধরছে। আমার গতি আটকে দিতে চাইছে। বহু, বহু বছর পর কোনো অনুভূতি আমাকে এতটা স্পর্শ করল। আহারে! কিন্তু সত্যিই কি আমি আজ যাব লিপির সামনে? ওর মুখোমুখি হব? সেদিন রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরে আসার সময় আমি যখন লিপির কাছ থেকে বিদায় নিলাম, তখন কি আমি ওর সেই বড় বড় দুই চোখে সাত বছর আগের পুরনো এক গভীর মায়া দেখিনি? দেখেছি। আর সে মায়াই কি আমার এই নীতিহীন, কাপুরুষোচিত রুক্ষ, শুষ্ক জীবনে এক মুহূর্তের জন্য দু-ফোঁটা শ্রাবণ এনে দেয়নি? তার প্রতিদানে আমি কি সেই মায়াবতীর জীবনে অনাকাক্সিক্ষত ছন্দপতন এনে দিতে পারি? আমি লিপির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাতে ওর ঠিকানা লেখা এক টুকরো ছোট্ট কাগজ। লিপির স্বামী বলেছিলেন তিনতলায় ওনাদের বাসা। ছোটখাটো সেই ভদ্রলোকটির সরল ভালোমানুষিটুকু আমার এই কদিনে একবারও মনে হয়নি। আজ লিপির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল।
এই পচা-গলা পৃথিবী আর তার রুচিহীন মানুষগুলো আমার সবটুকু শুষে নিলেও লিপির ওই প্রবল মায়ায় ভরা চোখের দ্যুতি এতটুকুও ম্লান করতে পারেনি। সেদিনও তো এই মায়াবতীর চোখের ছায়াই আমাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য অবশ করে দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল কেউ বুঝি আমার গ্যাংগ্রিন ধরা শরীরে আজলা ভরা জল এনে মুছিয়ে দিচ্ছিল। আমি সেই চোখ জোড়ার জন্য কিছু করতে না পারি, অন্তত এই অসুস্থ ছোঁয়া থেকে তো তাকে বাঁচাতে পারি! আমি লিপির বাড়ির সামনে থেকে সরে এলাম। হাত উঁচিয়ে রিকশা দাঁড় করালাম। বাসায় ফিরতে হবে। যদিও দিঠির খাওয়া এর মধ্যে নিশ্চয়ই হয়ে গেছে, তবু কিছু একটা কিনে নিয়ে যেতে হবে। বাচ্চাটা বাইরের যেকোনো খাবারই খুব পছন্দ করে। রিকশা লিপির বাড়ির গলি থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। একবার কি পেছনে ঘুরে বাড়িটার তিনতলার বারান্দার দিকে তাকাব? না থাক!

Disconnect