ফনেটিক ইউনিজয়
স্মৃতির আনন্দ আশ্রম
হরিপদ দত্ত

স্মৃতি মানেই দূর অতীতের রহস্যময় ধূসর-পাংশু এক পৃথিবী। দশ বৎসর বয়সের পৃথিবীর নবীন অতিথির স্মৃতি আর ষাট বৎসর বয়সের পৌঢ়ের স্মৃতির পার্থক্যটা এখানেই। নবীন শরীর-মন-হৃদয়-চোখের তৃষ্ণা মেটানোর যে আনন্দ-সুখানুভূতি-বিনোদন-উৎসবের আশ্রম, তাকেই মানুষ মনে রাখে। মানুষের মন নাড়া দেয়, দোলা দেয়। শত সুখের উৎসবের স্মৃতিও চোখে জল ঝরায়। এরই নাম আনন্দ মেশানো বেদনার সুখানুভূতি। তাই সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সেও খুব ইচ্ছে জাগে দশ-বারোর স্মৃতির পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে অর্বাচীন বালক হয়ে যেতে। সুখস্মৃতি তো কৈশোরেরই সম্পদ।
কিশোর বয়সের সেই সব হারানো পৃথিবীর উৎসবে ফিরে যেতে মন চায়। তাই খ্রিস্টীয় বড়দিনের মেলার স্মৃতি আজও আমাকে আবেগে ভাসায়। পরিণত বয়সে সেই মেলায় আর কোনো দিন যাওয়া হয়নি আমার। আমার বড়দিদির শ্বশুরবাড়ির দু’টো গ্রাম পরেই সেই বিখ্যাত খ্রিস্টীয় ধর্মপল্লী ‘নাগরী’ গ্রাম। ঢাকা শহরের অদূরে রূপগঞ্জ থানাধীন নাগরী গ্রাম। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের বাসস্থান। এই তো সেই খ্রিস্টীয় ক্যাথলিক চার্চ যেখানে বসে পর্তুগিজ পাদ্রী ফাদার শ্যামুয়েল বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ ‘গ্রামার অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ’ রচনা করেছিলেন। অবশ্য তা ছাপা হয়েছিল পর্তুগালের লিসবন শহরে।
বড় দিনের উৎসব শুরু বঙ্গ ভূ-ভাগ ইংরেজদের দখলের আগে থেকেই পর্তুগিজ ধর্মপ্রচারকদের চেষ্টায়। পলাশী যুদ্ধের পরে ইংরেজ অনুগত গ্রাম্য দরিদ্র অশিক্ষিত হিন্দু-মুসলমান প্রজাদের একটি অংশ খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা নেয়। তখন খ্রিস্টধর্ম ছিল রাজার ধির্ম। ইংল্যান্ডের ইংরেজ রাজার ধর্ম একাংশ বাঙালিরও ধর্ম। ঐতিহাসিক কার্য-কারণেই বাঙালি হিন্দুদের একাংশ ছিল রাজা ভক্তিতে আপ্লুত। এর প্রমাণ আমি এখন থেকে অর্ধশতাব্দীকাল পূর্বেই কিশোর বয়সেই পেয়েছিলাম। আমার প্রিয় বড়দিদি, যাকে আমি ‘সোনাদি’ নামে ডাকতাম, তিনি আজ নেই। পঁচিশ বছর পূর্বে তার মৃত্যু ঘটেছে। সেই দিদির হাত ধরেই আমি একাধিকবার বড়দিনের মেলায় গিয়েছিলাম। আজো স্পষ্ট মনে আছে, চোখের সামনে ভাসে সেই মেলা। দিদির হাতে মোমবাতি, আমার হাতেও একটি। গীর্জার বারান্দায় মা ম্যারী, কোলে শিশু যীশুখ্রিস্ট, মাটির মূর্তি। করুণা আর বিগলিত খ্রিস্টান এবং হিন্দু নারী-পুরুষ সেই মূর্তির পাদদেশে মোমবাতি আর খুচরো পয়সা ফেলে প্রণাম করছে। দিদিকে অনুসরণ করে আমিও তাই করলাম। দিদির চোখে জল। সেই মূর্তির পাশেই ক্রুশে বিদ্ধ যীশুর মূর্তি। দিদি অপলক দৃষ্টি সেদিকেই। একেই বলে রাজভক্তি। রাজার ধর্ম প্রজারও ধর্ম। কেননা প্রায় দু’শ’ বছরের শাসন শেষে মাত্র ক’বছর পূর্বে ’৪৭ এ দেশ ছাড়লে প্রজাদের একাংশের কাছে নবীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রভাবের ভেতরও খ্রিস্টান ইংরেজের প্রভাব অবশেষ অংশ হয়েও টিকেছিল। দিদির মুখেই শুনেছিলাম স্থানীয় মুসলমানেরা সেই মেলায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার টানে উপস্থিত থাকলেও মেরি-যীশুর পাদদেশে মোমবাতি জ্বালানো থেকে বিরত ছিল ধর্মীয় বিধানের কারণেই। আজো আমাকে অবাক করে এ বিষয়টি ভাবলে যে, তখন সেই উৎসবে উপস্থিত হিন্দু নর-নারীগণ ঈশ্বরপুত্র জ্ঞানে নয়, বরং ঈশ্বররূপেই যীশুকে প্রণিপাত করেছিল। খোঁজ নিয়েছি আজও বিধর্মী হিন্দুরা ঈশ্বরপুত্র যীশুর মূর্তিতে মোম জ্বালিয়ে ভক্তিদানের রেওয়াজ থেকে মুক্তি নিয়েছে বড়দিনের উৎসবে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত গ্রাম-ভিত্তিক পূর্ব বঙ্গের সমাজে পাশের বাড়িতে অধিকার ছিল না বিধর্মী প্রবেশের। বিশেষ করে হিন্দু বাড়িতে মুসলমানের প্রবেশ। কেবল তা-ই নয়, নীচু বর্ণের হিন্দুদের বেলায়ও ঠিক তাই। নিজের অভিজ্ঞতাতেই দেখেছি জেলে, কৈবর্ত, নমো, মাঝি ও ইমালি সম্প্রদায়ের পুরুষদের আমাদের ‘দত্তবাড়ি’র অন্দর মহলে ঢোকার অনুমতি ছিল না। মহিলাদের অধিকার থাকলেও ঘরের ভেতর প্রবেশ নিষিদ্ধ। এমনকি বারান্দায় ওঠাও। ওরা বসত উঠানে। মুসলমান এবং নীচু বর্ণের হিন্দুদের জন্য আমাদের ‘বাংলা ঘরে’ বিশেষ একটি হুক্কা থাকত যার ভেতর জল থাকত না। একটু বড় হয়ে কারণ জানতে চাইলে বড়দের কাছে উত্তর পেতাম- ওরা মুসলমান, ওরা গরুর মাংস খায়। ওরা নীচু জাতের কৈবর্ত, শরীর নোংরা।
পূর্ববঙ্গের এই বর্ণবাদী হিন্দু অভিজাতদের সব অহংকার চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় ’৪৭ এর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি। পাঁচের দশক পর্যন্ত এই অবৈজ্ঞানিক, অমানবিক অন্ধ-মিথ্যা বিশ্বাস অভিজাত হিন্দু পরিবারে, কিছুটা টিকে থাকলেও ’৬৪ সালের দাঙ্গা এবং ’৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের অভিঘাতে সেই মিথ্যা-অসত্যের হিন্দুয়ানি আভিজাত্য ভেঙে ধূলায় মিশে যায়। হিন্দুদের রাজনৈতিক ক্ষমতা পতনের ভেতর অর্থনৈতিক ক্ষমতাও স্বমূলে উৎপাটিত হতে থাকে। পাকিস্তানি ধর্মীয় বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, দেশ ত্যাগ, উদ্বাস্তুকরণ, জাতিগত নিঃস্বকরণ, হিন্দু আভিজাত্যকে চিরকালের জন্য উৎপাটন করে দেয়। যতই নির্মম হোক, মানবতা বিরোধী হোক, পূর্ববঙ্গে হিন্দু অভিজাততন্ত্রের এই ভাঙনের ফলে একটি শুভ দিনের উদ্ভব ঘটে। তা হচ্ছে হিন্দু সমাজের চিরস্থায়ী সংস্কারের পতন। জাত-পাত-ছুঁৎমার্গের মূলে কুঠারাঘাত। আমার জন্য আসে এক নতুন দিনের আবাহন। যে বাল্যবন্ধুদের মুসলমান হবার কারণে বাড়িতে ডেকে আনতে পারিনি, তারাও আমাদের গৃহে প্রবেশের অধিকার পায়। আমার যে নিষেধাজ্ঞা ছিল মুসলমান বাড়িতে প্রবেশ এবং খাদ্য গ্রহণের, তাও প্রত্যাহার হয়। অলিখিত মৃদু নিঃশব্দ আদেশ ছিল গোমাংস ভক্ষণ যেনো না ঘটে। কী দুঃসময়ই না ছিল!
হাজার বছর পাশাপাশি বসবাস করেও মুসলিম ঘর কিংবা খাদ্য তালিকা, পোশাক, উৎসব যা ছিল নিষিদ্ধ, সেই লৌহ কপাট ভেঙে পড়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের ফলে। যারা ছিল দ্বার রক্ষক অর্থাৎ হিন্দু গ্রামীণ ধনী জোতদার, উচ্চবর্ণের মহাজন- সমাজপতি তাদের দেশ ত্যাগ হিন্দু সমাজে অভিঘাত সৃষ্টি করে। নিম্নবর্গের হিন্দুদের কাছে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি তাদের রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক মুক্তির দিশা না- দেখাতে পারলেও সামাজিক-সাংস্কৃতিক মুক্তির আলোর ঝলকানি দেখাতে সক্ষম হয়। একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। সম্ভবত আমি ৫ম বা ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের গ্রামের সতীশ আর জগদীশ নামের দশম শ্রেণির দু’জন ছাত্র ধূতির পরিবর্তে লুঙ্গি পরে স্কুলে যাতায়াত শুরু করে। দিন কয়েকের ভেতর অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজন হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে মাঠে ঘেরাও করে লুঙ্গি কেড়ে নিয়ে উলঙ্গ করে তাদের ছেড়ে দেয়। কেননা তখনও হিন্দুদের লুঙ্গি পরা নিষিদ্ধ ছিল। কারা এই ঘটনার পেছনে ছিল আজ আমার মনে নেই।  
আমি প্রথম লুঙ্গি পরা শুরু করি গ্রাম ছেড়ে ঢাকা শহরে কলেজে পড়তে এসে। স্পষ্ট মনে আছে ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন (মাধ্যমিক) পরীক্ষা দিতে ঢাকা শহরে এসে প্রথম মুরগির মাংস খাই। যা কোনোদিনই আমার পিতা-মাতা বা গ্রামের লোক জানতে পারেনি। আমাদের বাড়িতে লুঙ্গি পরা এবং মুরগির মাংস খাবার প্রচলন শুরু হয়  ’৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে। আমার পিতা যুদ্ধের ভেতর দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে লুঙ্গি পরে সীমান্ত অতিক্রম করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ এক বিস্ময়কর ঘটনা বটে। একটা যুদ্ধ এভাবেই রক্ষণশীলতার মূলে প্রচণ্ড আঘাত করে। যুদ্ধ শেষে বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন ধূতির সঙ্গে লুঙ্গিও পরতেন। এই যুদ্ধই আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছিল গ্রামের মুসলমান বাড়িতে ঈদ পার্বণের দিনে আহার গ্রহণের। একাত্তরের যুদ্ধের ভেতর দিয়েই আমি পরিপূর্ণভাবে ঈদ উৎসবের আনন্দ-সুখকে অনুভবের সুযোগ পাই। একটা যুদ্ধ কত কিছুই না উল্টে দিতে পারে।
বাবা নীরব হয়ে গেলেন। গ্রামের মুসলমান বাড়িতে আমার আহার গ্রহণের বিষয়ে হঠাৎ বাবা নির্বিকার হয়ে গেলেন। হয় তো তিনি রক্ষণশীলতার মিথ্যেটা বুঝতে পেরেছিলেন। মা কেবল বলতেন- ঈদের দিনে মুসলমান বাড়িতে সব খেলেও মাংস যেনো না খাই। যদি তা গোমাংস হয় তবে যে ধর্ম নাশ! আসলে আমার বাবা-মা পরিবর্তনের সময়ের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। শক্তিহীন অসহায় মানুষে পরিণত হয়েছিলেন।
হয়তো অনেকের কাছে তা অবিশ্বাস্য মনে হবে। কিন্তু সত্যের সঙ্গে সাক্ষ্য দিয়ে আমি বলছি যে, ঈদ কিংবা তার পরদিন আমার চোখে পৃথিবীটা সম্পূর্ণ নতুন হয়ে ধরা দেয়। ধনী কিংবা দরিদ্র, প্রতিটি মানুষকে মনে হয় তারা পবিত্র নদী থেকে পবিত্র স্নান শেষে পবিত্র পোশাক পরে পবিত্র শরীরে অন্য এক দুনিয়া থেকে এই পৃথিবীতে নেমে এসেছে। নিশ্চয়ই ওরা গত সন্ধ্যায় আসমানে ঈদের চাঁদ দেখেছিল। না হলে তাদের চোখের তারায় এত আলো কেন?
তবে কি আমিও সেই ঈদের চাঁদের আলোর ছোঁয়ায় পরিবর্তন ও পরিণত হয়ে গেছি? ওই অন্তঃহীন আকাশের মহাশূন্যতার দিকে দৃষ্টি ফেলে ঈদের বঙ্কিমচন্দ্রের খোঁজে বিভোর হয়ে যাই। তখন ঈশ্বর কিংবা তাঁর মহিমার কথাও ভুলে যাই। বরং মহাকাশ বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, মহাবিশ্ব, মহাশূন্য, গ্যালাক্সি, আলোকবর্ষ দূরত্ব, কোটি কোটি সূর্য, মহাবিস্ফোরণ এবং হিলিয়াম রহস্যে ডুবে যাই।
কোরবানি ঈদে ঢাকা শহরের পশুরহাটে যাওয়াটা ছিল আমার প্রতি বছরের অভ্যাস। একবার এমনই একদিনে আমার সঙ্গী হয়েছিলেন কবি সমরেশ দেবনাথ। ওখানে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং নানা জাতের পশুদের আচরণ ভিন্ন এক দুনিয়া যেন। পশুরা কোরবানির উপকরণ। ওরা মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অপরাধী নয়, যাদের দণ্ড কার্যকরণের পূর্বে পবিত্র গোসল দেয়া হয়। ওরা নিরাপরাধ প্রাণী, কোরবানির পূর্বে পবিত্র গোসল তাদের ভাগ্যলিপি।
 আমি ঈদের জামাত শেষে কোরবানির উদ্দেশ্যে ধাবমান মানুষের চোখে দু’ধরনের আলোর দ্যুতি দেখতে পাই। একটি প্রেম-ভক্তি-অপার আনন্দের। অন্যটি আত্মত্যাগের বৃত্তে আবদ্ধ হিংসার। একটি পশু হত্যার, অপরটি সাম্য-মনুষ্যত্ব সৃষ্টির। তাই ইসলাম বিশ্বাস করে কোরবানির রক্ত স্রষ্টার কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় তার প্রতি আত্মনিবেদন।
পরম কৌতূহলে আমি যে কত কোরবানির প্রভাতে রাস্তায় নেমেছি। কোরবানি অবলোকনের জন্য, তার হিসেব নেই। হাতে তরবারির মতো লম্বা ছোরা, শাদা পোশাকে ছোপ ছোপ রক্তমাখা শশ্রুমণ্ডিত কোরবানি করা মোল্লা-মৌলভীদের দেখে হঠাৎ চমকে গেলেও পরক্ষণে মনে হয়েছে এই তো সেই দূরাতীত ইতিহাসের উহুদ বা বদরের যুদ্ধ শেষে পবিত্র ন্যায় যুদ্ধের বিজয়ী সৈনিক।
অবিশ্বাস হলেও সত্য যে, আমি তিনবার কোরবানির দিনে ছাগল জবাই করেছি। বিধর্মী বলে কোরবানির অধিকার ছিল না বিধায় কসাই ঢেকে খাসি জবাই করেছি। ঈদের পূর্ব রাতে শেষ প্রহরে সস্তায় খাসি কিনতাম আমি। এ ব্যাপারে সহায়তা করতেন আমার অকাল প্রয়াত বন্ধু জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সহকারি পরিচালক শিল্পী আবদুর রউফ সরকার। তিনি ছিলেন আমার কলেজ শিক্ষক কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর ছোট ভাই।
অন্তত দু’বার আমি আমার ফেলে আসা এবং চির বিচ্ছিন্ন ঘোড়াশাল, পলাশের খানেপুর গ্রামে গিয়েছিলাম রোজার ঈদের পরের দিন। উদ্দেশ্য আমার চিরচেনা অথচ চিরবিচ্ছিন্ন জন্ম গ্রামের মুসলমান বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঈদের পিঠা সংগ্রহ করা। আমাকে পেয়ে কী আনন্দ, কী সুখ, কী পরমাত্মাতীয়তা মানুষগুলোর! ওদের স্মৃতিতে ওই যে দত্তবাড়ি, সেই দত্তবাড়ির ‘পোলা’ বলে কথা। ঝুরি পিঠে, চন্দ্র পিঠে, সূর্য পিঠে কত না হরেক পদের নাম। চালের গুঁড়ি  দিয়ে তৈরি পিঠায় খেজুর কাঁটা দিয়ে নকশা করা, ‘মহব্বতের পিঠে’ নতুন বউ তার স্বামীকে সোহাগ করে খেতে দেয়। সব পিঠাই রোদে শুকিয়ে তেলে ভেজে চিনি বা গুড়ের সিরায় ডুবিয়ে তৈরি।       
পূজার উৎসব আমার কাছে ভিন্নমাত্রা নিয়ে ধরা দেয়। জন কোলাহল, ভিড়, কানফাটা বাদ্য বাজনা আমি সহ্য করতে পারি না। শারদ উৎসবে এই ঢাকা শহরে কদাচিৎ ঢাকেশ্বরী মন্দির, রাম কৃষ্ণমিশন কিংবা জগন্নাথ হলে হয়তো কোনো বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছি। হয়তো পরিবার বিচ্ছিন্নতা কিংবা মূর্তি পূজায় অবিশ্বাসী বলেই এমনটা হয়েছে। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ অথবা লোকলজ্জার ভয়টাও এর জন্য দায়ী। এখন তো প্রতিটি শারদ উৎসব আমার কাছে আসে নিরানন্দ, যন্ত্রণা নিয়ে। সহ্য করতে হয় পারিবারিক আর সামাজিক চাপ। আমি হয়ে যাই পলাতক, আত্মগোপনকারী। প্রতিবেশীর দাবি, নাস্তিক হয়ে পূজায় অংশ গ্রহণ করতে দোষ কি? স্ত্রীর দাবি, এমনি করলে সমস্যা, ছেলে-মেয়ের বিয়ে-শাদী আছে, মৃত্যু হলে কারা আমার লাশ নিয়ে যাবে শ্মশানে? আমি আনত হই, ঘটে আত্মপরাভব। আসলে শারদ উৎসবের যত আনন্দ, সুখ, প্রশান্তি সবই ফসিল হয়ে জমাট বেঁধে আছে দূর অতীতের ফেলে আসা শৈশব কৈশোরে, অর্ধশতাব্দীকালেরও আগে। অতীত সুখ-স্মৃতি মুক্তিহীন আবেগ তাড়িত আলো আঁধারীর রহস্যময় মায়াজালের জগৎ। অর্থাৎ ম্যাজিকেল ওয়ার্ল্ড। ম্যাজিক বলেই স্মৃতি ব্যথা দেয়, চোখে জল ঝরায়, বুক ভাঙে বর্ষার গাঙের মতো।
আমার জন্ম ইংরেজ আমলে বঙ্গের অঢেল ভূ-সম্পদের অধিকারী ধর্ণাঢ্য দত্ত পরিবারে। পিতা ছিলেন ইংরেজ শাসকদের ডাক বিভাগের চাকুরে। সে সব আজ আদি মানবের ধ্বংসপ্রাপ্ত গুহা গৃহের প্রাক ইতিহাস। একেই বলে ইতিহাসের নির্মম বিচার! ইতিহাসের ওই প্রাচীন পাণ্ডুলিপির পাতা উল্টোলেই চর্যাপদের মতো সান্ধ্যভাষার এক রহস্যময় জগৎ চোখের সামনে দুলে ওঠে। আজ বুঝতে পারি সেই চোখ, সেই মন, সেই সময় ছিল একেবারেই কাঁচা আবেগ আর কৌতূহলের ভিন্ন এক দুনিয়া, বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই। জটিল সংসার, কুটিল দুনিয়া নিরপেক্ষ এক কল্প-বাস্তব মেশানো কিশোর চোখ আর মনের গোলকধাঁধা। স্বপ্নের মতোই কুহক।
শারদীয় উৎসব আসছে। জয়দেবপুর-কাশিমপুরের ঝড়–পাল তার সহকারিদের নিয়ে বর্ষা শেষ হতেই আমাদের বাড়িতে হাজির। আচমকা নয়, পত্র যোগাযোগের পর। ১৫/২০ দিন ধরে খড়-বিচালি আর মাটির প্রলেপে তৈরি হবে দুর্গা প্রতিমা। তারপর প্রতিমার কারিগর ঝড়–পাল চলে যাবে অন্যত্র। এর মধ্যে শুকোবে মূর্তিগুলো। পুনরায় পূজার আগে এসে রঙ লাগাবে। শৈশব-কৈশোরে এ ছিল এক উন্মাদনা। আচমকাই পৃথিবীর আকার, রঙ, শব্দ আার দৃশ্যাবলী বদলে যাওয়া। কে যেন আসবে, কারা আসবে, কী যে আসবে? ভোরের আকাশ, প্রকৃতি, সন্ধ্যার স্তব্ধতার ভেতর রাতের জ্যোৎস্না পড়া উঠোনে, শরতের শিশির ভেজা মাঠে, আমাদের পুকুর-পাড়ের গুলঞ্চ ফুল গাছের পাতায় তারই আগমন আভাস।
দূর-কাছের আত্মীয়রা এসে ভিড় জমায় আমাদের তিন উঠোনের বিশাল বাড়িটিতে। কৈশোরের অপাপবিদ্ধ মন কেমন নাড়া খায় অনেকদিন পর দেখা কিশোরীদের খুব কাছে পেয়ে। বুকের ভেতর কেমন ঝাঁকুনি খায় উড়ন্ত পাখির হঠাৎ গাছের ডালে এলে বসলে পাতায় পাতায় যেমনি কাঁপুনি ওঠে, ঠিক তেমনি। চেনা আত্মীয়, তবু কথা বলতে দ্বিধা। এ কেমন লাজ, কেমন ভয়? কেবল ওরাই নয়, পাড়ার মেয়েগুলোও তখন খুব কাছে আসে, ধরা ছোঁয়ার ভেতর। পূজার বাজনার ভেতর প্রতিমার মুখ হয়ে যায় প্রতিটি কিশোরীর মুখ। আমাদের বাড়ি ঘেরা আম, কাঁঠাল আর লিচুর বাগান। তারপর তেপান্তরের মতো ঘেসো মাঠ। পূজার বাজনা আচড়ে পড়ে ধানের পাতায়। আকাশে চাঁদ- জোনাক। মাঠের এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো আম-কাঁঠাল গাছ। জোনাক রাতের ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকার। সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দূর গাঁয়ের দূর সম্পর্কের কোন কিশোরীকে কম্পমান স্বরে বলেছিলাম- ‘পূজা শেষ তো বাড়ি ফিরে যাবি, মাত্র ৪/৫টা দিন।’ সেই কিশোরীর নাম আজ মনে নেই। কোথায় থাকে তাও অজানা।
না জানার কারণ ছিল না যে, আমাদের পূর্ব-পুরুষের রক্তের বর্ণবাদ নামের রোগের জীবাণু রয়েছে। দুর্গা পূজার সময় শীতলক্ষ্যা পাড়ের মাঝি আর জেলে পল্লীর হতদরিদ্র মানুষগুলো দলবেঁধে এসে আমাদের বাড়িতে দু’বেলা আহার করার অধিকার পেত। এক পঙ্ক্তিতে নয়, আলাদা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে অভিমান, ক্ষোভ ছিল না। এ যেন হিন্দু ধর্মের ঈশ্বরেরই বিধান। ওরা মান্য করতো। কেননা, ওরা শুনেছে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে চার বর্ণের উল্লেখ রয়েছে। এই হীনতা, দীনতা অবিচারের আজ যেভাবে বুঝি, তখন কি তা বুঝতাম? দত্ত বাড়ির সেই ইতিহাস আজ মৃত।
আজো মনে পড়ে, আমাদের এই দুর্গা পূজার সময় গ্রামের গরিব মুসলমানরাও আসতো। মহিলারাও। কৌতূহলে। অপূর্ব সুন্দর মাটির পুতুল দেখতে। শিল্প দেখতে। বাজনা শুনতে। আরতীর নাচ দেখতে। কিন্তু কেউ নৈবেদ্য-প্রসাদ গ্রহণ করতো না। সত্য যে, আজকের মতো তখন গ্রাম সমাজে ধর্ম আর সম্প্রদায়ের কুটিলতা ছিল না। শিরক বা শেরেকি গোনাহের কথাও গ্রাম্য সরল মানুষগুলো জটিল করে ভাবত না। লক্ষ্মী পূজার নাড়ূ তো পকেটে করে স্কুলেও নিয়ে যেতাম। মুসলমান সহপাঠীরা মহানন্দে তা আহার করত। সময়টা ছিল পঞ্চাশের দশক। আমার এক ধর্মপিসিমা ছিল মুসলমান। পূজার মৌসুম তাঁর ঠিকানা ছিল আমাদের বাড়ি। বিস্ময় এই, গ্রামের কোনো মুসলমানই এ নিয়ে কোনো ফতোয়াই জারি করেনি।
উৎসবের সবটুকুই আমার স্মৃতি তাড়িত। শৈশব-কৈশোরের জটিল দ্বন্দ্বমুক্ত মনের সহজ-সরল কৌতূহল মাত্র। দ্বন্দ্ব ছিল না বলেই সবকিছুই মধুর বিস্ময়ের মনে হতো। নিষ্পাপ এক আনন্দ যেন। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মনের জটিল জিজ্ঞাসা আর আত্মসমীক্ষা সব তছনছ করে দেয়। আর ওই যে লেখার শুরুতে বলেছি জন্মগত পৈতৃক ধর্ম আর ধর্মাচরণের প্রতি ভয়, দ্বিধা, লোকভয়, লজ্জা, আর পলায়নপরতা তা তো মনের ভেতর তৈরি করেছে আমার সমবয়সী ধর্মীয় মৌলবাদী রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং আমার চেয়ে দুই দশকের অধিক কনিষ্ঠ সামরিক স্বৈরাচার আর সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র জন্মভূমি বাংলাদেশ। তবু স্মৃতির উৎসব স্মৃতির মধ্যেই অমর হয়ে থাকুক। উদার গণতন্ত্রী হোক আমার জন্মভূমি। হোক মানবতার আনন্দ আশ্রম।

Disconnect