ফনেটিক ইউনিজয়
শিল্পকলায় রীতি-আচার
মিজানুর রহমান শেলী
লি টুস ডি’অডুবার্টে গুহায় যৌনসঙ্গমরত দুটি বাইসনের মূর্তি
----

সময়ের আবর্তনে অজানার প্রতি উদ্বিগ্নতা ও ভীতি নানারূপে আচ্ছন্ন হয়। এটা শুরু ও শেষের ক্ষণ; এমনকি তা প্রান্তিক মুহূর্তের এক অজানা চাঞ্চল্য। তখনই মানুষ কিছু কর্মানুষ্ঠানের প্রবর্তন করে, অথবা আগের কর্মানুষ্ঠানের সংস্কারে মেতে ওঠে। ধর্ম ও রীতি-আচার দুই-ই এই কর্মানুষ্ঠানের ভেতর প্রতিষ্ঠা পায়। কর্মানুষ্ঠানের নব্যপ্রবর্তন বা সংস্কার ধারা বুঝতে পারলে ওই সময়ের প্রতিবেশ, সঙ্কট, চিন্তা ও সম্ভাবনা আঁচ করা যায়। আবার বিভিন্ন উপায়ে ধর্ম ও রীতি-আচারও অনুধাবন করার সুযোগ থাকে। সময়ের এই সন্ধিক্ষণে জড়িয়ে থাকে মর্মস্পর্শী সমূহ অনুভূতি। তা আবার সহজে ছড়িয়ে পড়ে। কর্মানুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই উদ্বিগ্নতা সহসা প্রশমিত হয়। এটা অস্তিত্বের প্রশ্ন। এখানেই শিল্পকলা এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।
রীতি-আচার ও কর্মানুষ্ঠান উভয়ই সাধারণত প্রশান্ত আচরণকে উৎসাহিত করে। এগুলো আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্ত হয়। এক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক তৎপরতা যদিও গুরুত্বপূর্ণ, তবুও বাহ্যিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই কর্মানুষ্ঠান ও রীতি-আচার প্রতিষ্ঠা পায়। নিয়ত ছন্দবদ্ধতা ও চক্রাকারে পুনরাবৃত্ত প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলে।  
বৃহৎ পরিসরে দেখা যায়, রীতি-আচার সময়ের পরম্পরায় সর্বাঙ্গীন একটি আইনে পরিণত হয়। তাই তা লঙ্ঘন করা যায় না। এমনকি, একটি ঐতিহ্য হিসেবেও চিহ্নিত হয়। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটাকে বহন করে, ধারণ করে ও পালন করে। নিশ্চিতভাবে, উচ্চ পুরাপলীয় শিল্পকর্মের কাঠামোগত ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে। তার ভালো উদাহরণ হলো, লি টুস ডি’অডুবার্টে গুহার নরম কাদার মেঝেতে পাওয়া দলবদ্ধ শিশুদের পায়ের গোড়ালির ছাপ। এটা রীতি-আচারের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভৌতিক নিদর্শন। সম্ভবত শিশুরা দলবদ্ধভাবে নৃত্যরত ছিল। এই পদচিহ্নের পাশেই মাটির তৈরী যৌনসঙ্গমরত দুটি বাইসনের মূর্তি পাওয়া গেছে। ফলে রীতি-আচারীয় উপলক্ষ্য এখানে আরো বেশি যৌক্তিক হয়ে ওঠে।
এই শিল্পকাঠামোর ভেতরে ৩০ হাজার বছর অবধি অনেক বিষয়- অনেক নিদর্শন দৃঢ়তার সাথে টিকে আছে। এটা রীতি-আচারের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহ্যের বহমান ধারাকে নির্দেশ করে।
নিতান্তই, রীতি-আচার পালনের চলমানতা সামাজিক চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। যেন মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে এবং সামনের দিকে ধেয়ে চলে। বিশ শতকের প্রাককালে হেরিসন শিল্পকলা ও রীতি-আচারের মধ্যে সাদৃশ্য পরীক্ষা করে দেখেন। তিনি প্লেটোর দেয়া শিল্পকলার সংজ্ঞাকে ব্যবহার করেন। এ সংজ্ঞায় বলা হয় শিল্পকর্ম এমন অপরিহার্য বিষয় যা বিশ্বপ্রকৃতিকে নকল করে। বর্তমানে আধুনিক মাপকাঠিতে এ সংজ্ঞাটি একটি সীমাবদ্ধ ও সেকেলে বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এ সংজ্ঞা চিন্তার জগতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অবকাঠামো দেয়, যার মাধ্যমে রীতি-আচার অনুধাবন করা সহজ হয়ে যায়।
হেরিসনের যুক্তিতে রীতি-আচার অনুকরণের একটি কাঠামো নির্মাণ করে। কিন্তু, এটা মুখস্তকরণ বা ভাসা-ভাসা পুনরাবৃত্তির মত কোনো অনুকরণ নয়; বরং পবিত্র রীতি ও উদ্ভূত অপরিহার্যতার মেলবন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক রূপদান করে। একটি মর্মস্পর্শী আবেগ বা অনুভূতিকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে রীতি-আচার অপরিহার্য চাহিদায় পরিণত হয়। এটা রেপ্লিকাও (প্রতিরূপ) নয় আবার মিমিক্রিও (অনুকৃতি) নয়। বরং একটি বিশেষ প্রেরণাশক্তি যা শিল্পকলা ও রীতি-আচারের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। আকাক্সক্ষা: এটি বিচ্ছুরিত করে অথবা নির্গত করে একটি দৃঢ় মর্মস্পর্শী আবেগকে অথবা অন্য কোনো আকাক্সক্ষাকে। এটি বিচ্ছুরিত হয় কোনো উদ্দেশ্যকে উপস্থাপনা বা প্রস্তুত বা সম্পাদনা বা বলবৎ করার মাধ্যমে, অথবা আকাক্সিক্ষত কর্মের মাধ্যমে। সাধারণ উৎসে এটি একটি প্রগাঢ়, বিশ্বব্যাপী আকাঙ্খা- যাকে প্রাকৃতিক জীবন বলা যায়। যে প্রাকৃতিক জীবনে মৃতের প্রাণ সঞ্চায়ন হয় বলে বিশ্বাস।
হেরিসন এ ক্ষেত্রে বলতে চেয়েছেন শিল্পকলা ও রীতি-আচার একটি মৌলিক সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। উপরন্তু, উভয় ক্ষেত্রেই একটি অপরিহার্য বিষয় হলো কর্ম। এ কর্মের ভেতর দিয়ে আবেগ-অনুভূতিকে পুনর্সৃষ্টি, পুনর্জীবন ও পুনরায় বিধিবদ্ধ করার প্রয়োজনে শিল্পকলা ও রীতি-আচার প্রতিষ্ঠিত হয়। শিল্পকলা ও রীতি-আচার একটি সাধারণ ও বস্তুবাদী আবেগের ভিত্তি থেকে উৎসারিত। আবেগসমূহ পুনরায় বিধিবদ্ধ হওয়ার কারণে তা আর ব্যক্তিক বা কারো নিজস্ব বিষয় থাকে না। বরং এগুলো জনসাধারণের এবং সমাজের সকলের আবেগ-অনুভূতি এখানে পুঞ্জিভূত হয়। আবার সবার অনুভূতি সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নেয়। একজনের আবেগ-অনুভূতি পুরো সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আবেগ-অনুভূতির প্রতিফলনের বাইরেই, এই কর্মকাণ্ডগুলো বিভিন্ন সাংঘর্ষিক অনুভূতিকে একই পাটাতনে আনতে পারে। তাছাড়া, মানুষকে তাদের নিজস্ব ভূবনে একটি শৃঙ্খলা আনায়ন করতে সহায়তা করে। রীতি-আচার সংশ্লিষ্ট যে কোনো আচরণ রীতি-আচারের মৌলিক অনুসঙ্গ, সর্বদা সক্রিয় এবং আলোচ্য কর্মকাণ্ডের সাথে রয়েছে যার এক মর্মস্পর্শী সংশ্রব।

Disconnect