ফনেটিক ইউনিজয়
যে গল্প ফুরায় না
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

এক.
বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা ছাড়া উপায় নেই-ডাক্তার সাহেবের মুখে এমন নির্মম কথা শুনে ইকবাল হোসেনের মাথাটা শৈশবের লাটিমের মতো ভনভন করে ঘুরতে থাকে। সে কি বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে-এমন বিভ্রম অবস্থার মধ্যে যেন তাকে কেউ টানটান করে ঝুলিয়ে রাখে। তার পাশে এমন কেউ নেই, যে তাকে সান্ত¡না দিবে; এমন কেউও নেই যার বুকে মাথা রেখে সে চিৎকার করে কাঁদবে। ডাক্তার সাহেব আরো কী কী কথা যেন বলছিলেন কিন্তু কোনো কথাই আর ইকবালের কানে ঢুকছে না। তার কানের ভেতর তখন কেবল বেজে চলছে: বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা ছাড়া উপায় নেই, হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা ছাড়া! একটু পর ডাক্তার সাহেব চলে গেলেন। ইকবাল হোসেনের চোখ বেয়ে ঝমঝম নোনা বৃষ্টি নামতে শুরু করলো রুক্ষ পৃথিবীতে।

দুই.
গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তা। চাকুরির সুবাধে প্রতিদিনই সাইকেল চেপে এ পথে যাতায়াত করে ইকবাল হোসেন। একটি ওষুধ কোম্পানির মার্কেটিং অফিসার সে। বয়স অল্প হলেও তার কাজ অল্প নয়। জীবিকার প্রয়োজনে কতজনের সাথে কত সত্য-মিথ্যা কথা বলতে হয় তাকে। কখনো কখনো টাকা আদায়ের জন্যে ফার্মেসিগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে মাছরাঙার মতো স্থির বসে থাকে। কখনো ঝগড়া করে বকেয়া টাকা আদায়ের জন্যে, কখনো ফার্মেসি মালিকদের অবহেলা সয়ে যাওয়া ছাড়া  উপায় থাকে না। কত কত কাজ তার। অথচ কোম্পানির বেতন বাড়ানোর নাম নেই। ইকবাল হোসেন গত মাসে তার বসকে বলেছিলো বেতন বাড়ানোর কথা। শুনে বস হাসতে হাসতে বলেছিলেন, এত টাকা দিয়ে তুমি কী করবা ইকবাল? তুমি একলা মানুষ, না আছে মা-বাবা, না আছে বউ! ইকবাল কিছু বলতে পারেনি। সত্যিই তো, তার কেউ নেই। অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে সে ভেবেছিলো, এ জগতে কুকুরেরও সঙ্গী থাকে, অথচ সে নিঃসঙ্গ মানুষ। নিজেকে তার কুকুর বলেও মনে হয় না। তবে একটু পরই হঠাৎ মনে হতে থাকে- তার বুকের মধ্যে, মনের মধ্যে, চোখের মধ্যে একটি তরুণীর মুখ আবছাভাবে উঁকি দিচ্ছে বারবার। ইকবাল উঁকি দেয়া মুখটিকে ভালোবাসতে চায়। গ্রামের ভাঙা রাস্তায় সাইকেলের প্যাডেল চাপতে চাপতে সে মিটিমিটি করে হাসতে থাকে। মেয়েটার সরল হাসিমুখ তখনো সে দেখতে পাচ্ছিলো। ইকবাল হোসেন একা থাকতে চায় না। সে চায় তারও কেউ থাকুক। অন্তত মেয়েটি থাকুক। ইকবাল হোসেনের হাসি হাসি চোখের চাহনি বেয়ে রূপালি জ্যোৎস্না নামতে শুরু করে গ্রামের উদার জমিনে।

তিন.
মেয়েটিকে সে দেখেছিলো কামতা বাজারের সামনে। একদিন নয়, চার-পাঁচদিন দেখেছে সে। ছিমছাম মেয়ে, গুটিগুটি করে হেঁটে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরে। সে শব্দ করে হাসে, বান্ধবীদের সাথে খুনসুটি করে। ইকবাল ভাবে, গায়ের রঙ শ্যামলা হলেও মেয়েটির মুখের ভেতর কী যেন এক গোপন মায়া লুকানো আছে। মা ফার্মেসির সামনে বসে প্রায়দিন ইকবাল মেয়েটির জন্যে অপেক্ষা করে। হয়তো মেয়েটি জানেই না, তার জন্যেই ইকবাল এখানে বেশি সময় ধরে ফার্মেসির মালিকের সাথে গল্প করে, চা খায়। শৈশব থেকেই একা একা মানুষ হয়েছে সে। অনাদর যা পেয়েছে, আদর পায়নি তার সিকিভাগও। তাই সঙ্কোচও তার মধ্যে অনেক বেশি। অবশ্য একদিন মেয়েটিকে একা ফিরতে দেখে সসঙ্কোচে পিছু নিয়েছিলো ইকবাল। বাজারের শেষ মাথায় পৌঁছে যখন আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই, তখন সে তার সব কোমলতা কণ্ঠে ঢেলে মেয়েটির নাম জানতে চেয়েছিলো। মেয়েটি দাঁড়ায়নি, হাঁটতে হাঁটতেই বলেছিলো, আমি শিউলি। ইকবালের মনে হলো কত সহজ করে নিজের নামটি বলে ফেললো মেয়েটি! নাম শুনে কি বলবে তা আর মাথায় আসেনি ইকবালের। তবু সে মেয়েটির সাথে আরো খানিকটা পথ হেঁটেছিলো। শিউলি একটু দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে আবার বলেছিলো, এই ঘিয়ে কালারের শার্ট প্রতিদিন পরেন কেন আপনি? আর কোনো শার্ট নেই বুঝি? এমন কথা শুনে ইকবাল হোসেনের থমকে না দাঁড়িয়ে পারে না। নিজের কাছেই নিজের মুখখানি গণিতে বাঁকানো পাঁচের মতো মনে হয়। সত্যিই, এই শার্টটা প্রায়ই পরা হয় তার। তবে কি অনেক আগেই মেয়েটির দৃষ্টিতে পড়েছিলো সে! শিউলি চলে যায়। ইকবাল হোসেন শেষ বিকেলের লালচে আলোর মধ্যে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখে একা একা হাসতে থাকে। তার হাসি বেয়ে অসংখ্য সাদা সাদা শিউলি ফুল ঝরে পড়তে থাকে গ্রামের ভাঙাচোরা পথে।

চার.
শিউলির জন্যে প্রতিদিন অনেক স্বপ্ন নিয়ে ইকবাল হোসেন বসে থাকে। পৃথিবীর প্রতি এতদিন তার তীব্র বিতৃষ্ণা ছিলো। তার কেউ নেই, কেউ নেই জাতীয় নিঃসঙ্গতা থেকে সে কতবার পালাতে চেয়েছে! কতবার ভেবেছে এ জীবন দিয়ে সে কী করবে? এখন মনে হয় অন্তত একজন তার আছে। শিউলির সাথে দেখা করে সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে ইকবাল আরো অনেক কথা ভেবেছিলো। তার সাইকেলের পাশ ঘেঁষে সাঁৎ করে একটা মোটরসাইকেল ভটভট শব্দ করে যখন চলে যাচ্ছিলো, তখন ইকবাল ভেবেছিলো একদিন সেও একটা মোটরসাইকেল কিনবে। তার পেছনে শিউলিকে বসিয়ে শহরে নিয়ে যাবে, শহরটা ভালো করে ঘুরে দেখাবে, কেনাকাটা করবে সাধ্য মতো। ইকবালের ভাবনাটা শেষ হওয়ার আগেই তীব্র এক ধাক্কায় রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে সে। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাস্তার ওপর একটি সিএনজির ইঞ্জিন বন্ধ হতে শোনা যায়। সিএনজি-চালকের বয়স চৌদ্দ কি পনের হবে। আচমকা এই দুর্ঘটনায় সে কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে বলে রাস্তায় মানুষজন নেই। কিশোর সিএনজি চালক একদৌড়ে অজ্ঞান লোকটির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। রক্তে লোকটির জামা-প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে। আকস্মিক বিহ্বল হওয়া সিএনজি চালক ধরা পড়ার ভয়ে আর সেখানে দাঁড়ায় না।
কয়েক মিনিট পরেই সিএনজি স্টার্টের শব্দ শোনা যায়। ইকবাল হোসেনের দোমড়ানো দেহটা রাস্তার পাশে বেওয়ারিশ কোনো কুকুরের মতো পড়ে থাকে। তার পা থেকে তখন গলগল করে রক্ত ঝরছে।

পাঁচ.
যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দুপুর। ইকবাল হোসেন উঠে বসতে গিয়ে দেখলো তার বাম পা ব্যান্ডেজে মোড়া। তীব্র ব্যথা তার সমস্ত শরীর জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। পাশের বেডের এক রোগীর কাছ থেকে ইকবাল হোসেন জানতে পারলো, তিনদিন আগে কারা যেন তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর এসে ডাক্তার বললেন, ইকবালের পায়ে প্রচণ্ড চোট লেগেছে। এক্সরে রিপোর্ট ভালো না। পায়ের রগ ছিঁড়ে গেছে, মাংসপেশী থেঁতলে গেছে মারাত্মকভাবে। এরপর আরো দুদিন কেটে গেলে হাসপাতালের মলিন বেডে। তার সাথে কোনো টাকা পয়সা নেই, মোবাইলটি খোয়া গেছে। এ দুদিনে কতবার যে তার শিউলির কথা মনে পড়েছে, কতবার বুকের ভেতর ব্যথার সুর বয়ে গেছে তার হিসেব নেই। অথচ শিউলির সাথে যোগাযোগ করা হয়ে উঠেনি। ইকবাল হোসেন ভেবেছিলো, একেবারে সুস্থ হয়ে সে শিউলির কাছে যাবে, শিউলিকে শুধু শুধু কষ্ট দিয়ে লাভ কি!
ইকবাল হোসেনকে যারা হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলো তারা আর ফেরত আসেননি। পরের জন্যে আর কত করবেন তারা! জ্ঞান ফেরার তৃতীয় দিন ডাক্তার ম্লান মুখে এলেন। হাতে এক্সরে রিপোর্ট। ইকবাল হোসেন মনে মনে জানতে চাচ্ছিলো কবে সে সুস্থ হয়ে উঠবে। তার আগে ডাক্তার মৃদুস্বরে বলেছিলেন, দেখুন ইকবাল, আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু আপনার বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা ছাড়া উপায় নেই! নতুবা পুরো পা-ই পচন ধরবে, মারা যেতে পারেন আপনি!
ইকবাল জীবনে অজস্র সংগ্রাম করলেও এমন নির্মম কথা আর শোনেনি। তার সাথে যে এমন হতে পারে সে স্বপ্নেও ভাবেনি কখনো। আরো বহুবিধ চিন্তায় ইকবাল হোসেনের মাথাটা জেঁকে বসলে জীবনকে বৃথা মনে হয়। আত্মহত্যা করার বাসনাটা বহুদিন পর আবার চাঙা হয়ে উঠে।

ছয়.
শিউলির সাথে ইকবালের আর কখনো দেখা হয়নি। অপারেশনের পর পরিচিত গ্রামেও ফিরে যায়নি সে। জীবনকে পাথর বানিয়ে নিজে নিজে প্রায়ই হাসে ইকবাল হোসেন। যে জীবন পাথরের, কুকুরের মতো পথে-ঘাটের- যে জীবন ল্যাংড়া- খোড়ারÑতার আর কী মূল্য আছে। শিউলিকে নিজের এই দুরবস্থা দেখাতে চায়নি ইকবাল। সে ভেবেছে, ছিমছাপ এই কোমল মেয়েটিকে কষ্ট দিয়ে আর লাভ নেই। কদিন পর তার কথা যে শিউলির মনে পড়বে না তা নয়। কিন্তু সে তো আবার ধাতস্থ হবে, অন্য কাউকে বিয়ে করে অন্য সব মেয়ের মতো স্মৃতি ভুলে ঘরকন্না করা শুরু করবে। হয়তো কোনো এক বৃষ্টির দিনে তার মনে পড়বে ইকবাল নামে যুবকটির কথা, যে বসে থাকতো তার জন্যে এবং যার সে ছাড়া অন্য কেউ ছিলো না। ইকবাল হঠাৎ হা হা হা করে হাসতে থাকে। দূর! কেউ কি কারো কথা এত মনে রাখে? ইকবালের  তীব্র কান্না হাসি হয়ে একতারার মতো বাজতে বাজতে চারদিকে মিলিয়ে যায়। সে গ্রামের কাছের এ শহর ছেড়ে, অন্য এক সমুদ্র শহরে কুকুর কিংবা বিড়ালের মতো বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকে এবং মৃত্যুর জন্যে তীব্র অপেক্ষা করে। অনেক অনেক অনেকদিন এভাবে কেটে যায়...

সাত.
ইমরুল ইসলাম সবে ডাক্তার হয়েছেন। তার পোস্টিং পড়েছে এক অজোপাড়াগাঁয়ে। বাবা-মা সেই গ্রামেরই একটি মেয়ে দেখে তার জন্যে পছন্দ করে বসলেন। প্রথমে নিমরাজি থাকলেও পরিবারের চাপে ইমরুল কনে দেখেছেন, কথাও বলেছেন। ছিমছাম শ্যামলা মেয়ে। ছোট ছোট চোখ। ইমরুল ইসলাম একসময় খেয়াল করলেন মেয়েটির চোখে মুখে কী যেন এক মায়ার ঘোর আছে। অবশেষে তার বিয়ে হয়ে গেলো ধুমধামে। ইমরুল ইসলামের স্ত্রীর ভাগ্য খুব ভালো। বিয়ের একবছরের মাথায় তার হঠাৎই পোস্টিং হয়ে গেলো চট্টগ্রামে। সমুদ্রের শহর, অন্যদিকে স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। ইমরুল ইসলাম খুশি হলেন। আরো খুশির খবর তিনি ছেলে বাবা হচ্ছেন। প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে স্ত্রীর সাথে কত খুনসুটি করেন তার অনাগত ছেলেকে নিয়ে। একদিন কথায় কথায় ইমরুল বললেন, আমার ছেলের নাম হবে ইনামুল ইসলাম। আমার নামের সাথে মিল রেখে নাম। কিন্তু স্ত্রী মানবে কেন! বলে, আমি ওর মা। আমার অধিকারই বেশি। আমার ছেলের নাম হবে ইকবাল, মানে ইকবাল ইসলাম। স্ত্রী তীব্রভাবে এটাই রাখতে চায় দেখে ইমরুল আর আপত্তি করেন না। তাই ক মাস পরে জন্মানো নবজাতকের নাম ইকবাল ইসলাম রাখা হলেও তার নামের রহস্যটি ছেলেটির মা ছাড়া আর কেউই জানতে পারেনি।
এই শহরেরই অন্য একপ্রান্তে একজন ইকবাল হোসেন একা একা থাকে। মুদি দোকানের আয়ে তার জীবন চলে। শিউলির কথা এখনো তার মনে আছে। সেই ছিমছাম মায়াময় মেয়েটি, ছোট ছোট চোখ, ইকবাল হোসেনের গল্পটি এভাবে চলতেই থাকে, এ গল্প আর ফুরায় না...

Disconnect