সৈয়দ আহমাদ তারেক-কবিতার মানুষ

সৈয়দ আহমাদ তারেক।

সৈয়দ আহমাদ তারেক।

সৈয়দ আহমাদ তারেক- কবিতার দুঃসাহস, প্রেরণা ও প্রাণোচ্ছল এক বহমান নদী যেন। বয়সের ব্যবধান ঘুঁচিয়ে ছোটবড় সবার সঙ্গে কী সুন্দর মিশে যান তা সত্যিই অবাক করার মতো। তিনি সবুজ-সতেজ প্রাণের বিস্তার ঘটান, তারুণ্যকে ধরে রাখেন জাদুমন্ত্রের মতো নিজস্ব করপুটে।

তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছাত্র রাজনীতিতে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আবারো লেখালেখিতে মনোনিবেশ করি। এমনই একদিন কুমিল্লা কান্দিরপাড়ে দেখা হয় কবির সঙ্গে। আলাপ পরিচয় অল্পই হয়। তিনি আমাকে তার লেখা কবিতা উপহার দেন- পাঠান্তে কিছুই বুঝিনি, তবে দারুণ এক ভালোলাগা কাজ করে গহিনে।

তখনো তাকে বুঝে উঠতে পারিনি। অন্যদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় জানতে পারি তিনি অত্যন্ত উঁচু মানের কবি। এক সময় দেশব্যাপী তুমুল আলোড়ন তুলেছিল তার লেখা গল্প ও কবিতা।

আমার সঙ্গে যখন তার পরিচয় তখন তিনি আর গল্প তেমন লেখেন না। এক সময় ‘বিচিত্রা’য় তার গল্প ছিল পাঠকের কাঙ্ক্ষিত শব্দরং। তিনি লিখেন ‘চুইংগাম’র মতো অসাধারণ গল্প। যদিও এসব আমার শোনা কথা।

তবুও তার ‘চুইংগাম’ গল্পটি পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কি সে গল্পের বয়ান! বিষয়বস্তুর কি সে বিস্তার। গল্পের উপমা উৎপ্রেক্ষাগুলো তিনি যেন কোনো সূদূরের রূপকথার কল্পরাজ্য থেকে তুলে এনে বাস্তবে রূপায়িত করেন। সন্ধানীতেও তার গল্প ছাপা হতো নিয়মিত। জয়ন্তীকে বোধ হয় ভালোবাসি, খাবার টেবিলে খুন, মিরপুরে মেয়েদের চিড়িয়াখানা তার সাড়া জাগানো গল্পগুলোর অন্যতম।

সৈয়দ আহমাদ তারেক নিছক লেখক অর্থে লেখক নন। তিনি শিল্পকে ধারণ করেন হৃদয়ে ও জীবনাচরণে। তিনি আমাকে এক সময় বলেছিলেন, ‘কবিতার শ্রমিক না হয়ে কবিতা হয়ে যাও।’ সৈয়দ আহমাদ তারেক নিজের বেলাতেও এ নীতিতে অটুট। আজন্ম বোহেমিয়তা তার নিত্যসঙ্গী।

জীবনকে ভেঙেচুরে, সত্যকে আঘাতে আঘাতে চিনে নিতেই তিনি অভ্যস্ত। গৃহী অথচ সন্ন্যাস- মন তার নিত্যই উড়াল উড়াল। জীবনের অনিশ্চয়তাকে ধারণ করে জীবনভর তার এমনিই বেঁচে থাকা, ভালো থাকা। তিনি বলেন, ‘এইতো জীবন।’ জীবনের সব রঙকে তিনি একত্রিত করেন শব্দের কারুকাজে। শব্দকে পোষ মানানোর এক অনন্য যাদুবিদ্যা তার হস্তগত।

জেদ চেপেছিল ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করবেন। হলো না। তারপর আবার চারুকলায় পড়াশোনা করেন। তুলিতে কালিতে জীবন ও জগতের রহস্যময় বৃত্তকে ভাঙতে তার নিরলস প্রয়াস। যেনো কোনো দৈবিক সৌন্দর্য হাতের পাঁচটি আঙুলে খেলা করে।

কী চিত্রকলায়, কী সাহিত্যে- যেখানেই তিনি হাত দেন অমনি সেখানে সোনার ফসল ফলে, ঝরতে থাকে হীরক-দ্যুতি। অক্লান্ত নিষ্ঠায় তিনি গড়ে তুলেন শিল্পরাজ্য, বিম্বিত সৌন্দর্য আর নান্দনিকতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তার সমসাময়িক অন্যান্যদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রধানতম, কী সৃষ্টিতে, কী সৃষ্টিছাড়াপনায়।

তাকে কোনো ফ্রেমে ফেলতে পারেনি কেউ কোনোদিন। নিজেকে উৎসর্গ করে তিনি আর্যনীল, নীল বিষে ব্যথাতুর। তাকে কোনো সংজ্ঞায় প্রকাশ করা বা কোনো বিশেষণে বিশেষিত করা অন্তত আমার সাধ্যের বাইরে। লেখক আরশাদ সিদ্দিকী তার এক প্রবন্ধে তাকে কবিতার সুলতান বলে অভিহিত করেন।

কবিতার সুলতান সৈয়দ আহমাদ তারেক সংসারের তৃতীয় পুত্র। নিয়ন্ত্রণহীন উন্মাদনার জন্য কবির বাবা যখন বকাবকি করতেন, কবি বলতেন, ‘ইয়েস ফাদার, থার্ড সন অলওয়েজ থার্ড। স্থান-কাল-পাত্র ইত্যাদি সম্পর্কে এমন বেহিসেবি উদাসীন কবিকে কেন তবে খাদ্য অধিদপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তা পিতা চোখে চোখে রাখতেন? কাছে কাছে রাখতেন? তিনি দেখেছিলেন তার এই নির্লিপ্ত শিশুযুবক সন্তানটি আসলেই মোহহীন।

পিতাকে ঘুষ প্রদানের উদ্দেশ্যে আসা এক ব্যক্তির সঙ্গে কবির কঠোর আচরণ তার পিতা দেখেছেন। তাই তিনি তাকে ভালোবাসেন। আবার সেই সন্তানই পিতার টাকাভর্তি মানিব্যাগ নিয়ে ট্রাকে চড়ে ছুটে যান চট্টগ্রামে বাবার এক বিশ্বস্ত বন্ধুর বাসায়। না, বাবার মানিব্যাগ তিনি চুরি করেননি। পিতার কাছে কিছু টাকা চেয়েছিলেন। পিতা বলেছিলেন, বালিশের নিচে আছে, প্রয়োজন মতো নিয়ে নাও। কবি বালিশ উল্টে দেখলেন মানিব্যাগ ভর্তি টাকা। তাই তিনি ভাবলেন, ‘বাবা তো অল্প কিছু টাকা নিলেও বকাবদ্যি করবেন, সব নিলেও বকাঝকা করবেন। তারচেয়ে বরং সবই নিয়ে নেই।’

‘মোমবাতির দুদিকে আগুন’ জেনে কবি তাই নিশাচর। পিঠ ও বিছানার দূরত্ব মেপে, রাতের পথে কবি হাঁটেন অবাধ উল্লাসে। হাঁটতে হাঁটতে পথ ভুলে যান। চেনা গলিতেও কবি ঘুরপাক খেতে থাকেন অচেনা বৃত্ত রচে রচে। এ রকম একদিন কবিকে এক অচেনা বৃদ্ধ প্রহরী গলির সঠিক রাস্তাটি চিনিয়ে দেন। পথটি দেখে নিয়ে আবারো পথ ভুলেন কবি।

রাতের বিভ্রম দেখেন জল ভরপুর চোখে। অলক্ষ্যে চশমা খুলে চোখ মুছেন। কেউ দেখে ফেললে চশমা মোছার অভিনয় করেন। রাতের পাশাপাশি বসে থেকে তিনি রাতের গল্প শোনেন। ঘাসেদের পরস্পর কথোপকথন শুনেন। দূর থেকে ভেসে আসা পবিত্র আয়াতের উচ্চারণ শোনেন। দুখের পাত্রে বেহিসেবি স্বাপ্নিক, ভোরের পঙতিমালা উচ্চারণ করেন সাবলীল ছন্দে।

কবি তখন ঢাকায় থাকেন। হাক্কার দোকানের চোলাইভাজা খেয়ে দিন-দুনিয়া সম্পর্কে উদাসীন কবি একদিন শুয়েছিলেন পরিত্যক্ত এক ট্রেনের বগিতে। সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখেন- ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের অপর প্রান্তে তিনি চলে এসেছেন। ময়মনসিংহ।

কোনো কারণে সেদিন সেই পরিত্যক্ত বগিটি জুড়ে দিয়ে ময়মনসিংহগামী ট্রেনটি ছুটে চলে। ট্রেনের সাইরেন, যাত্রীদের ওঠা-নামা কোনোকিছুই কবির অন্তহীন নিদ্রায় ব্যঘাত ঘটাতে পারেনি। তিনি ঘুমিয়েই ছিলেন। এই ফাঁকে হয়তো কোনো ফেরিওয়ালা হেঁকে গেছে- এই বাদাম বাদাম, চা গরম চা গরম, এই ডিম লাগবে ডিম। কিন্তু এসব কিছুই কবির কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। এমন নিষ্পন্দ ভ্রমণে কবি হয়তো আনন্দই পেয়েছিলেন।

তারেক জন্মেছেন- কুমিল্লার সৈয়দ পরিবারে। পড়াশোনা ও লেখালেখির সুবাদে ঘুরে বেড়িয়েছেন, থেকেছেন চট্টগ্রাম, ঢাকায়। ডেনমার্কে তার একটি চিত্রকলার প্রদর্শনী হয়। তবে তার দর্শনে তিনিও কবিতার জন্য নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছেন অমরত্ব। তাই যৌবনের উত্তাল সময়টিতে, রংধনুর সাতরং ছড়িয়ে পড়ার সময়টিতেই তিনি ফিরে আসেন কুমিল্লায়।

সংসার জীবনে তিনি নিতান্তই গৃহের সন্ন্যাস। সংসারে আছেন অথচ অবাক উদাসী। সকালবেলা গেট তালা দেওয়া থাকলে তিনি নিজের বাসার দেয়াল টপকে বেরিয়ে যান, ঝাউতলাস্থ অবকাশে। রাত করে বাড়ি ফেরা বললেও কম হয়। বলতে হয় গভীর রাতে বাড়ি ফেরা তার স্বভাব ধর্ম।

আমি তাকে কবিতায় পেয়েছি। তো কী সে কবিতার পঙতিমালা? কবির ‘শোকসভা বিকাল ৫টায়’ বইটিতে এক শোকাকূল কবিকে দেখতে পাই তার কাব্যের নামকরণের মতোই। শোকের অক্ষরে তিনি লিখে চলেন জলজ প্রার্থনার পঙতিমালা

তার অই কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার শিরোনাম ‘পিতার তৃতীয় পুত্র’। কবিতাটির পাঠ এরকম- ‘আমার দীনতা টের পাই/ ধু ধু মাঠ, ঘাস/ রক্তের বাগানে অস্থিরতা বিরাজমান/ ....পাখি ওড়ে, চোখে জল পড়ে/ ছায়া থাকে ভোরে অথচ শ্বাসকষ্ট বাড়ে/ ....দীঘল রাত্রির শেষে হরিৎ পত্রাবলি আবহমান।’ কবিতাটিতে আমরা এক স্বভাব বিনয়ী কবির সাক্ষাৎ পাই।

তবে তিনি হতাশ নন, আবহমান সৌন্দর্যে তিনিও বিভোর। ‘আগামীকাল বেদনা বিষাদ’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার শিরোনাম, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। কবিতার শিরোনামেই লক্ষ্য করা যায় একটি ভিন্ন সুন্দরের তৎপরতা। কবিতার নামও যে এমন হতে পারে তা একমাত্র সৈয়দ আহমাদ তারেকই দেখাতে পারেন।

তিনি তার এরকম বৈচিত্র্যতায় কবিতাগ্রন্থটি সমৃদ্ধ করেছেন। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ কবিতায় কবি মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করেন কালের আয়নায়। ‘বিশ্বাস করেছিলে/সীমাহীন সুদূরে চিত্রে/ফুল, কাব্য আর ফসলের দুর্গে/হেসে উঠবে মানুষ।/চেয়েছিলে অসত্যের অভিযান থেকে মুক্তি,/উষ্ণ করেছিলে সুবর্ণ শষ্যের মতো/ হৃদয়ের প্রসন্ন বিলাস।/আজ সেই সব কান্না, সুরভিত স্তব্ধতা/ প্রাণবন্ত স্পর্শের স্মৃতি।’ কবিতাটির একেবারে শেষের দিকে এসে কবি আমাদের বিবেকের দরোজায় কষাঘাত করেন ভয়ংকরভাবে।

তিনি লিখেন- ‘মগ্ন দেবদূত,/তুমি দেখো নীল অস্থিরতা জেগে আছে,/সবুজ পাতায় বিমর্ষ দুপুর, উদাসী সন্ধ্যে।/....আমাদের বেঁচে থাকা তাই রুগ্ন জাগরণ/ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’

কবি সৈয়দ আহমাদ তারেকের কবিতায় আমরা কবিকে পাই গভীর বেদনায় বিষাদগ্রস্ত। জগৎ ও জীবনের গভীর দুঃখবোধ কবিকে একই সঙ্গে বিধ্বস্ত ও দিগন্তগামী পথের রেখায় পাখিহৃদয়ের নান্দনিকতা দেয়। কবিও পৃথিবীর বিচিত্র ক্যানভাসে সৃষ্টিকে সমুজ্জল করে তোলেন, শোভনীয় করে তুলেন।

কবি সৈয়দ আহমাদ তারেক জীবনের বেপরোয়া সময়গুলোর হিসেব জানেন। ঘড়ির কাঁটাকে সামান্য তোয়াক্কা করতেও তার একান্ত অনীহা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যার শিল্পে মোড়া। ‘বন্ধনের অপেক্ষার চেয়ে’ কবিতার শুরুটা এরকম, ‘দেখছি আদরে সোহাগে কিশোরী তাহমিনা/দেখছি রৌদ্র-ছায়া মায়া কাননের দরোজা পেরিয়ে/নীল কামিজে ঢাকা আকাশী ওড়না।’ ‘সেই শুয়ে থাকা’ কবিতায় কবি লিখেন, অপেক্ষমাণ মাধুর্য আড়াল করে/তুমি শুয়ে ছিলে মসৃণতার অন্তরালে,/গোলাপী ওড়নায় ঢেকে রেখে অলৌকিক গ্রীবা,/তৃষ্ণার্ত কলকল হাসি মাখা মুখ-’

এরকম মর্মভেদী কাব্যকথা সৈয়দ আহমাদ তারেকের বিরহী হৃদয়ে ঢেউ তোলে। পাঠক থমকে যায়, নিজের অথবা সময়ের মুখোমুখি। কবি তার লেখনীর মাধ্যমে পাঠক হৃদয়ে এক ধরনের চরম উন্মাদনা তৈরি করে- তা নিবৃত্তও করেন। তিনি আসলে তার লেখায় পাঠকের সামনে একটি আয়না প্রস্তুত করে দেন।

শেষ করছি কবি সৈয়দ আহমাদ তারেকের অন্য একটি কবিতা উদ্ধৃতিতে- ‘এমন রঙিন দিনে আমাকে ঢেকো না/তোমার বাসনা কামনা বক্ষ সন্নিধানে,/ক্ষমা কর সমীচীন, না, আমি কিছুই পারি না।’

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh