খোকা বাবু থেকে বঙ্গবন্ধু পথ পরিক্রমা

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ, ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায় সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তথা খোকা বাবু জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে পিতা স্থানীয় ভূমি অফিসের সেরেস্তাদার মরহুম শেখ লুৎফর রহমানের স্বল্প আয়ের তিন ভাই ও দুই বোনের সংসারে দিনভর বন্ধুদের সঙ্গে কাদায় ফুটবল খেলে বড় হয়েছেন তিনি।

১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। মিশনারি স্কুলে অধ্যয়নকালে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলে খোকাবাবু তাদের পথ রোধ করে স্কুলের ভগ্নদশা মেরামতের দাবি করলে ১২শ’ টাকা অনুদান আদায় হয়। সোহরাওয়ার্দী খোকা বাবুর সাহসী আচরণ দেখে বিমুগ্ধ হয়ে কলকাতায় এসে তার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরোধ করেন। সেই থেকেই নেতৃত্বদান শুরু বঙ্গবন্ধুর। 

১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাস করে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণে কলকাতার মওলানা আযাদ কলেজ তথা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন। ওই সময় সোহরাওয়ার্দীর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন এবং কলকাতার পথে পথে মুসলিম লীগের স্মরণিকা তথা পত্রিকা বিক্রি করে দলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেন। মুসলিম লীগের সাধারণ কর্মী হিসেবে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

এই সময় শিয়ালদহ সংলগ্ন ২নং বৈঠকখানা রোডের শেরেবাংলার বাসায় যাতায়াতকালে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে আসেন এবং কবিকে নিয়ে কলকাতা মোহামেডানের সমর্থক হিসেবে স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখতেন। রাজনীতির কর্মী হিসেবে শেখ মুজিব ১৯৪০ সালে ছাত্রাবস্থায় ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম ফেডারেশন’- এ যোগ দিয়েছিলেন।

ভারত বিভক্তি লগ্নে শেখ মুজিব ঢাকা ফিরে এসে ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। তবে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার কথিত অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শেখ মুজিবকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে। অজ পাড়াগায়ঁ জন্ম নেয়া খোকাবাবু সাধারণ পরিবার ও পরিবেশে জীবনকে খুব কাছ দেখেছিলেন বলেই ড্রইং রুম থেকে রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের দুয়ারে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। গ্রামীণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, চাহিদা ও প্রয়োজন খুব কাছ থেকে দেখে সমব্যথী হয়ে উঠেছিলেন, জীবনের বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সেদিনের খোকা বাবু অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন।

ঢাবি কনভোকেশন উপলক্ষে ২১ মার্চ ১৯৪৮, কার্জন হল প্রাঙ্গণে এসে মোহাম্মদ আলী জিন্না উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেব ঘোষণার পর শেখ মুজিব পাকিস্তানের কূট কৌশল চিন্তা করেই পাকিস্তানবিরোধী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, আর শুরু হয় তার কারাবরণের ইতিহাস। ঢাবির ফজলুল হক হলে ১১ মার্চ তারিখে গোপন বৈঠকে অল পার্টি পার্লামেন্টারি কাউন্সিল এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকালে শেখ মুজিবসহ ৭/৮ জনকে ইডেন ভবন তথা সচিবালয়ের সন্মুখ হতে গ্রেফতার করা হয়।

ছাত্রদের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে সরকার ১৫ মার্চ শেখ মুজিবসহ গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ঢাকায় ২৩ জুন ১৯৪৯-এ আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করে মুসলিম লীগ থেকে শেখ মুজিব বেরিয়ে যান এবং ভাষাভিত্তিক আন্দোলন বেগবান করতে সচেষ্ট হন। পাক-প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ঢাকা সফরের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বলিষ্ঠ অবদান রাখেন উদীয়মান নেতা শেখ মুজিব এবং ফলাফল কারাগারবরণ। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে কারাগার থেকে শেখ মুজিব আন্দোলনের দিক নির্দেশন প্রদান করেন।

বাংলা ভাষার পক্ষে ঢাকাসহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। গণ আন্দোলনের মুখে শেখ মুজিব ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, মুক্তি লাভ করেন। ১৯৫৬ সনে পাকিস্তানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণার প্রতিবাদে হক-ভাসানীর নেতৃত্বে যুক্ত ফ্রন্টের হয়ে কোয়ালিশন সরকারে শেখ মুজিব শিল্প, শ্রম, বাণিজ্য এবং দুর্নীতি দমন বিভাগে মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের পথ যাত্রায় নবাবজাদা নসরুল্লা খান সভাপতির পদ ত্যাগ করলে এবং মওলানা ভাসানী বাম ঘরানার রাজনীতির কারণে আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিলে শেখ মুজিব দলের একমাত্র কা-ারি রূপে আবির্ভূত হন।

কিন্তু ১৯৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খান ক্যু করে ক্ষমতা দখল করলে শেখ মুজিবকে বন্দি করে ১৯৬১ পর্যন্ত কারাগারে রেখে দেন। পরে এতদাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনে ১৯৬২ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে কাজ করেও সফলতা পাননি শেখ মুজিব। ১৯৬৯ সালে আইয়ূব খান ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং প্রধান সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া -রাষ্ট্রপতি হন। নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যেতে ১৯৭০ এ সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন জেনারেল ইয়াহিয়া।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও বাঙালিদের হাতে পাকিস্তানের শাসনভার অর্পণ না করার পরিণতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে আসে স্বাধীনতা, যার ইতিহাস সবাই কম-বেশি জানি আমরা। আন্দোলন-সংগ্রামে মুক্তযুদ্ধ পূর্ব ক্রান্তিকালে অবিসংবাদিত বাঙালির নেতা শেখ মুজিব ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দেওয়া উপাধিতে হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। খোকাবাবু হতে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার সুদীর্ঘ পথযাত্রায় পশ্চিম পাকিস্তান সফরকালে বাঙালির পৃথক স্বকীয়তার ধারক-বাহক ৬ দফা ঘোষণার দুঃসাহস একমাত্র শেখ মুজিবই দেখিয়েছিলেন। 

মাছে-ভাতে খাঁটি বাঙালি হিসেবে বঙ্গবন্ধু সাধারণ চাষি, দিনমজুর আর গ্রামীণ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর চাওয়া-পাওয়া জানতেন বলেই তার বক্তব্যে এদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের তাগিদ দিয়েছেন। রাজনীতিকে প্রাসাদ থেকে বটতলায় নিয়ে আসা শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু তাবৎ বিশ্বে অনুকরণীয়। ৭ মার্চ ১৯৭১, তৎকালীন রেসকোর্স মাঠে দেয়া স্বাধীনতার স্বপক্ষে প্রদত্ত তার ১৯ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণটি ইউনেস্কো কর্তৃক অন্যতম সেরা ভাষণের স্বীকৃতি বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্বিত করেছে নিঃসন্দেহে।

১৭ মার্চ জনদরদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১০০ বছরের জন্মদিনে পা রাখলেন বলে সংগত কারণেই সরকার বছরটি মুজিববর্ষ হিসেবে পালন করতে যাচ্ছে। তবে মুজিববর্ষ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তদীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অতি উৎসাহ দেখে প্রশ্ন ওঠে ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে এরা কোথায় ছিলেন! বঙ্গবন্ধু-কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মনেও বিষয়টি নাড়া দিয়েছে। সরকারদলীয় বেশকিছু পাতি নেতার বেশ-ভুষা, গাড়ি-বাড়ি আর সম্পদের পরিমাণ দেখলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর স্বাধীন বাংলার চারটি স্তম্ভের অন্যতম সমাজতন্ত্রের কোনো বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না। নারী-পুরুষ মিলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হবার প্রতিযোগিতা দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক আওয়ামী লীগ অর্থ-বিত্তের খনি।

অবস্থা এমন হয়ে উঠেছে, সাধারণ মানুষের চেয়ে দলীয় নেতা-কর্মীর সংখ্যাই বেড়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের ধনকুবের হারুনের তৎকালীন ইস্টার্ন ইনস্যুরেন্সে চাকরি করেই সংসার চালাতেন। অথচ আজ সমাজে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে ধনী-গরিবের ব্যবধান। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা না গেলে হাজারো জি কে শামীম আর পাপিয়ারা জন্ম নেবে। কেবল প্রধানমন্ত্রী সৎ থাকলেই হবে না। তাই মুজিব বর্ষে সৎ লোকের শাসন আর মুজিব-আদর্শ বাস্তবায়নের বলিষ্ঠ ঘোষণা আজকের প্রত্যাশা।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম পরিচালক, পিএমও

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh