রবীন্দ্রনাথের হাস্যরস

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

পৃথিবীর বিখ্যাত সব কবি-সাহিত্যিক কেবল তাদের জীবনে সিরিয়াস ও গুরুগম্ভীর রচনা তৈরি করেছেন তা নয়। তারা হাস্যরসেও ছিলেন ভীষণ রকম ওস্তাদ। আমাদের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কেবল কবিগুরু নন, গোপাল ভাঁড়ের মতো তারও রয়েছে হাস্যরস করবার মতো অদ্ভুতরকমের মজার মজার গল্প। সেসব গল্পের ভেতর থেকে সাম্প্রতিক দেশকালের পাঠকদের জন্য থেকে কিছু হাস্যরসের ঘটনা পুন:লিখন করেছেন দিদার মিয়া। 

১.


কবি একদিন সন্ধ্যায় শান্তিনিকেতনের কয়েকজনের সঙ্গে বসে গল্প করছিলেন। শান্তিনিকেতনের চীনা ভবনের জনৈক চীনা অধ্যাপকও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

কথায় কথায় বাঙালির খাদ্যের কথা উঠল। খাদ্যের কথা উঠলে চীনা অধ্যাপক কবিকে বলিলেন- গুরুদেব, চীনা খাদ্য খাবেন? তাহলে খাবার তৈরি করে পাঠাব।

শুনে কবি খুশি হয়ে বললেন-  নিশ্চয়! কি জানি কি সে খাদ্য। পাঁচ শো বছরে পুরনো ডিম, না পাখির বাসা।

কবির কথা শুনে উপস্থিত সকলেই হেসে উঠলেন।


২. 

আশ্রমে সেবার কয়েকটি নাটকের অভিনয় হবে ঠিক হয়েছে।

কবি তখন আশ্রমে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ির দোতলায় বাস করছেন। ওই বাড়িরই নিচের তলায় অভিনয়ের জন্য রিহার্সেল চলছে।

অভিনয় আসন্ন। সেদিন ফুল রিহার্সেল। সকলেই হাজির। কবি নিজে উপস্থিত থেকে রিহার্সেল পরিচালনা করছেন।

রিহার্সেল পুরাদমে চলছে। ঘরের মধ্যে কেমন যেন একটা বেশ থমথমে ভাব। কেবল যার যার বলার প্রয়োজন তারাই কথা বলছেন। বাকি সকলে চুপচাপ শুনে যাচ্ছেন।

দিনুবাবু একটা দৃশ্যে তাঁর অংশ অভিনয় করছেন। এই অভিনয় অংশে সমস্ত বাড়িঘর ছেড়ে দেওয়ার একটা কথা ছিল। তাই দিনুবাবু কথাগুলো বলে গেলেন।

কবি দিনুবাবুর কথা ক’টা শুনে হঠাৎ বলে উঠলেন- সব না ছেড়ে শুধু দোতলাটা ছাড়লেই চলবে।

এইরূপ একটা গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে কবি এই কথা বলা মাত্রই সকলে হো হো করে হেসে উঠলেন।


৩. 

কবি একদিন উত্তরায়ণে তাঁর ঘরের বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে বলে পার্ষদ সুধাকান্ত রায় চৌধুরী ও আরও দু’জনের সঙ্গে তাঁর স্বভাবসুলভ রহস্যালাপ করছিলেন।

কথাবার্তার মধ্যেই কবি হঠাৎ একবার থেমে গেলে, সুধাকান্তবাবু জিজ্ঞাসা করলেন- আপনার শরীর ভালো আছে তো?

কবি সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন- দেখ, আমাদের মধ্যে শ্রীচরণ কমলেষু লেখার যে প্রচলন আছে- তার চরণের সঙ্গে কমলের যুক্ত করবার কারণ আজ আবিষ্কার করেছি। 

সবাই বিস্মিত হয়ে কবির মুখের দিকে চাইলে, কবি বললেন- এখানে এত ফুল-ফল, আরও কত মধুমান পদার্থ আছে; কিন্তু তা সব ছেড়ে, দেখ মৌমাছিটা আমার পায়ে বসে ‘মৌ-রস’ সংগ্রহ করতে এসেছে। 

ও নিশ্চয়ই চরণকেই কমল ভেবেছে।


৪. 

এক সময় এক পাগল কবিকে প্রায়ই বড় বড় চিঠি লিখত। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কত কথাই না সে লিখত। তার সংসারের কথা, তার সুখ-দুঃখের কথা, তার আত্মীয়-স্বজনের কথা- পাগলের প্রলাপ অসংলগ্নভাবে লিখে লিখে পাঠাত। আর তার ওই দীর্ঘ চিঠিতে সে তার অস্তিত্বহীন বিষয় সম্পত্তি বার বার কবিকে দানপত্র করে দিত।

ওই পাগলের চিঠি এলে, কবি মাঝে মাঝে তাঁর পার্ষদদের ঠাট্টা করে বলতেন- এই আমার একমাত্র যথার্থ ভক্ত, যে তার সমস্ত সম্পত্তি বার বার আমায় দান করছে। তবে সম্পত্তিটা নিরাকার, তাই দানটা এত সহজ। 

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

<