ফনেটিক ইউনিজয়
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন
ড. এমাজউদ্দীন আহমদ

এক.
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও অধিকার সংরক্ষণের জন্য যদি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়ে থাকে, তাহলে বিচার বিভাগ হলো তার যথার্থতার মাপকাঠি। ব্রিটেনের সংবিধান বিশেষজ্ঞ লর্ড ব্রাইস (Bryce) বলেছেন, ‘কোন জাতি রাজনৈতিক অগ্রগতির কোন স্তরে রয়েছে, তা নির্ণয় করার সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো নাগরিকদের পরস্পরের মধ্যে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নাগরিকদের মধ্যে বিচারব্যবস্থা কতটুকু ন্যায়ানুগ ও আইনানুগ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তা বিচার করে দেখা। বলা হয়, আইন পরিষদ না থাকলেও রাষ্ট্র চলতে পারে, কেননা আইন পরিষদ ছাড়া আইনের অন্যান্য উৎস রয়েছে। আইন প্রথাভিত্তিকও হতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগ ছাড়া কোনো সুসংগঠিত সমাজ হতে পারে না। বিচার বিভাগ ছাড়া রাষ্ট্র অনেকটা ‘মাৎস্যন্যায়ের’ মতো, যেখানে বলপ্রয়োগই একমাত্র আইন। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আইনবিশারদ রউল (Rawle) বলেছেন, বিচার বিভাগ অপরিহার্য, কেননা তার দ্বারা অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, অন্যায়ের শাস্তি বিধান করা হয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। নির্দোষ ব্যক্তিগণকে অন্যের হস্তক্ষেপ ও অন্যায় থেকে রক্ষা করা যায় [It is indispensable that there should be judicial department to ascertain and decide rights, to punish crimes to administer justice and to protect the innocent from the injury and usurpation.]।
এসব যুক্তির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংগঠিত হয়েছে আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করার প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের সমন্বয়ে এবং প্রাচীনকাল থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে। সরকারের শ্রেণি-বিভাগে ‘আইনভিত্তিক সরকার’ (The Government of Laws) এবং ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরকার’ (The Government of Men)-এর মধ্যে যে পার্থক্য এরিস্টটল তাঁর গ্রন্থের তৃতীয় বিভাগে উল্লেখ করেছেন তা-ও এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। তাই বিচার বিভাগ হচ্ছে সরকারের এক অপরিহার্য অঙ্গ।
কিন্তু বিচার বিভাগকে তার ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হলে সরকারের জন্য দুটি বিভাগ-আইন পরিষদ ও নির্বাহী কর্তৃৃত্ব থেকে শুধু স্বতন্ত্র হলেই চলবে না, স্বাধীনও হতে হবে, যেন তা আইনপ্রণেতা ও নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রভাবমুক্ত হয়ে, শুধু আইনের নিরিখে বিচারকগণ বিচার্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। আইন হলো এরিস্টটলের কথায় : ‘এক আবেগমুক্ত যুক্তি’ (a Passionate reason)। এই আবেগবিহীন যুক্তিকে পুরোপুরি ধারণ করতে হলে বিচারকদের শুধু নির্মোহ হলেই চলবে না, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তারা যেন কারও ওপর নির্ভরশীল না হন, কারও অনুরাগ অথবা বিরাগের পাত্র হিসেবে পিচ্ছিল পথে চলতে বাধ্য না হন, তা নিশ্চিত হতে হবে এবং তা হতে হবে রাষ্ট্র কর্তৃক। তাই যুগে যুগে সরকারের তিনটি বিভাগের পৃথক্করণ এবং তাদের স্বতন্ত্র কার্যক্রমের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করা হয়েছে হাজার হাজার মঞ্চ থেকে।
ফেডারলিস্ট পেপার ৫১ (Federalist 51)-তে জেমস ম্যাডিসন যা লিখেছিলেন, তা উল্লেখযোগ্য। তার মতে, জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সরকারের ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারিত হতে হবে এবং সরকার যেন তার ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে, তারও রক্ষাকবচ থাকতে হবে। মানুষ যে স্বার্থপর এবং ক্ষমতালোভী, সুযোগ পেলেই যে একজন অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে এবং এই কারণেই যে সরকারের উৎপত্তি হয়েছে তা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে সরকারও সুযোগ পেলে নাগরিকদের অধিকারে অবলীলাক্রমে হস্তক্ষেপ করবে। তার নিজের কথায়, ‘মানুষ যদি দেবদূত হতো তাহলে কোনো সরকারের প্রয়োজন হতো না, যদি দেবদূতরা শাসনকাজে নিয়োজিত থাকতেন, তাহলে সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতো না। মানুষের ওপর মানুষের শাসন পরিচালনার জন্য গঠিত সরকারব্যবস্থার এই হলো সবচেয়ে বড় অসুবিধা। শাসিতদের ওপর শাসকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সর্বাগ্রে করতে হবে এবং তার পরপরই সরকারকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে’ [If men were angels, no government would the necessary. If angels were to govern, neither external nor internal controls on government would be necessary; in framing a government, which is to be administered by men over men, the great difficulty lies in this. You must first enable the government to control the governed, and in the next place oblige it to control itself.]|]।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা (one of the founding fathers) আলেকজান্ডার হ্যামিলটন (Alexander Hamilton) জেমস ম্যাডিসন (James Madison) আরও জোরেশোরে ফেডারালিস্ট পেপার-৭৮-এ (Federalist 78)) লিখেছেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের দুষ্কর্ম অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী প্রভাবশালীদের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের মুখ সংবিধান এবং জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য বিচারকরদের স্বাধীনতাই হলো প্রকৃষ্ট রক্ষাকবচ।’ [The independence of the judges is requisite to guard the Constitution and the rights of individuals from the ill-effects of those ill humors which the arts of designing men on the influence of particular conjunctives sometimes disseminate among the people themselves]। শুধু তখন কেন, সাম্প্রতিককালেও যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করে চলেছেন। ১৯৫৫ সালে American Political Science Review- APSR(49)-এ প্রকাশিত ‘Judicial Self Restraint’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে জন রচে (John P. Roche) লিখেছেন : ‘জনগণকে জনগণের নিকট থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার অভিভাবকত্ব ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান উপযোগী নয়, কেননা এটি দেশে আইনের শাসনের অঙ্গীকার নিবেদিত প্রাণ’ [The people must be protected from themselves and no institution is beter fitted for the role of chaperon than the federal judiciary, dedicated as it is to the supremacy of the rule of law]। তিনি এখানেই থামেননি। তাঁর কথায়, ‘রাষ্ট্রদেহে সত্যের রস সঞ্চারে প্রশ্নাতীতভাবে সবচেয়ে বড় ভরসা হলো যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর আস্থা।’ [Unquestionably the greatest hopes for injecting pure truth serum into the body politic have been traditionally reserved for the federal judiciary and particularly for the Supreme Court.]।
উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে ব্রিটেনের খ্যাতিমান সংবিধান বিশেষজ্ঞ এভি ডাইসি (AV Dicey) তাঁর Law of the Constitution (১৮৮৫) গ্রন্থে যেভাবে তিনি ব্রিটেনে আইনের শাসনের ব্যাখ্যা দিলেন, তাতে বিচার বিভাগের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রায় আকাশচুম্বী করে তোলেন। তাঁর মতে, জনগণের অধিকার কোনো সাংবিধানিক আইন থেকে উদ্ভূত নয়। বরং গণ-অধিকারের ভিত্তিতেই সাংবিধানিক আইন রচিত হয়েছে। অন্য ভাষায়, ডাইসিরির কথায়, অন্যান্য দেশে জনগণের অধিকারের রক্ষাকবচ যেমন সংবিধানে বিধিবদ্ধ আইনে, ব্রিটেনে কিন্তু বিভিন্ন আদালতের রায়ে সুনির্দিষ্ট, সুনির্ধারিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারগুলোই সাংবিধানিক আইনে রূপান্তরিত হয়েছে। ব্রিটেনের সাধারণ আদালতের সিদ্ধান্তে নাগরিকদের অধিকারের চার্টার রচিত হয়েছে। সুতরাং ব্রিটেনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ভিত্তিতেই নাগরিকদের অধিকারমালা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই এখানে অধিকার রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো দাবি নেই। দাবি করার আগেই তা প্রতিষ্ঠিত, অনেকটা স্বতঃসিদ্ধের মতোই। অনেকটা সুসভ্য জীবনব্যবস্থার মৌল উপাদানরূপেই, উন্নততর রাজনৈতিক সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ফল হিসেবে।
সংবিধান গণ-অধিকাররের মূল নয়। বরং গণ-অধিকারই সংবিধানের মূল এবং তা সাধারণ আদালতেরই সৃষ্টি। কিন্তু বাংলাদেশে বিচার বিভাগের এই দুরবস্থা কেন? স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পরও কেন বাংলাদেশের জনগণের আজও বিচার বিভাগের জন্য মিটিং-মিছিল করতে হয়? কেন এখনো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবিতে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে হয়? এ দেশে বুদ্ধিজীবীরা জানেন, পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত সার্থক যেকোনো গণ-আন্দোলনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সব সময় উত্থিত হয়েছে। প্রত্যেকের মনে রয়েছে, ১৯৫৪ সালের ২১ দফা দাবি নামার ১৫তম দাবিটি ছিল প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগর পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে ১১ দফা দাবি উত্থাপিত হয়, তার নবম এবং ১১তম দফায় ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি। তারও আগে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষাপটে ১৯৫৬ সালের ও ১৯৬২ সালের পাকিস্তানের সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্যকরণের প্রস্তাব স্থান পায়।
এক রক্তের নদী সাঁতারে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ছিনিয়ে আনলে নতুন সংবিধানের রাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্করণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য অনুচ্ছেদে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের সময়ও তিন দলীয় জোটের যে কটি ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বিচার বিভাগ-সম্পর্কিত বক্তব্য। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধন আইনেও এই প্রস্তাবটি স্থান পেয়েছে। সবচেয়ে  উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই জনপদে যে কটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার নির্ভুলভাবে এই দাবিটি স্থান পেয়ে এসেছে যে বাংলাদেশে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হবে। তার পরও এই এলাকা  আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল না এখনো। এর পরও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে বিভ্রান্তির কোনো অবসান হলো না। বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে পৃথক করা হলো না।
শুধু বাংলাদেশে নয়, বিদেশেও বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে লেখা প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে প্রচুর হতাশা। বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বাংলাদেশের বিচারপ্রার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের অধিকসংখ্যক ব্যক্তিকে বিচার কিনতে হয়। অর্থপ্রাপ্তি কোনো সম্ভাবনা না থাকলে কর্মকর্তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহের প্রকাশ ঘটে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এই বক্তব্য অবশ্য বাংলাদেশের বিচার বিভাগের নিম্ন পর্যায় সম্পর্কে। এত ঘন অন্ধকারের মধ্যেও কিন্তু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট, জ্বালিয়ে রেখেছেন গণমনে আস্থা ও বিশ্বাসের উজ্জ্বল এক দীপশিখা। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক প্রকাশিত ‘কান্ট্রি রিপোর্ট’গুলোয় রয়েছে এর উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ১৯৯৯ সালের কান্ট্রি রিপোর্টে লিখিত হয়েছে, ‘বিচার বিভাগের উচ্চতর পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বাধীনতা পরিলক্ষিত হলেও এবং এই পর্যায় থেকে ফৌজদারি, সিভিল, এমনকি বিতর্কিত রাজনৈতিক মামলায় বিচার বিভাগ সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিলেও নিম্ন পর্যায়ের আদালতগুলো এখনো রয়েছে নির্বাহী বিভাগের চাপের মুখে। আইনগত প্রক্রিয়া দুর্নীতিপূর্ণ বিশেষ করে নিম্ন পর্যায়ে।’  [The higher levels of the judiciary display a significant degree of independence and often rule against the government in criminal, civil, and even politically controversial cases, however, lower level courts are more susceptible to pressure from the executive branch. There is also corruption within the legal process, specially at lower levels.]
এ দেশের বড় দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যে শীর্ষ পর্যায় হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে রয়েছে, তার বিরুদ্ধেও রচিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের কালো কু-লী। বিষধর সাপ যেন নতুনভাবে ফনা উদ্যত করেছে বিচার বিভাগের শীর্ষের বিরুদ্ধে। নিম্নস্তর তো এরই মধ্যে দুর্নীতি ও নির্বাহী কর্তৃত্বের করাল গ্রাসের মধ্যে এসে গেছে, যা এখনো দেশের বিচারপ্রার্থীদের শেষ ভরসাস্থল, তা-ও বুঝি নিঃশেষ হয়। ক-বছর আগে, সাধারণ উত্তেজিত জনতা কর্তৃক নয় বরং ক্ষমতাসীন দলের বেশ কজন মন্ত্রী ও দলীয় নেতার নেতৃত্বে, পল্টন ময়দান থেকে লাঠি উঁচিয়ে, মাথায় ও গলায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে, হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে সেøাগান দিয়ে মিছিলের পক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য দান করেন, তা কি কোনো অশনিসংকেত নয়? এই নিবন্ধে তার বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।

দুই.
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাস মোটেই উজ্জ্বল নয়। অনল কু- থেকে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার রক্তরঞ্জিত পতাকা ছিনিয়ে আনে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে প্রবর্তিত হবে আইনের শাসন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানে কারণে-অকারণে সরকার যেভাবে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, বাংলাদেশে তার অবসান ঘটবে। তাই ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয়, ১৬ ডিসেম্বর থেকে যা কার্যকর হয়, সেই সংবিধান জগণের ২২টি মৌলিক অধিকার স্বীকার করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগকে মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার ক্ষমতা প্রদান করে এবং সংবিধানের জরুরি অবস্থা ঘোষণার কোনো ব্যবস্থা না রেখে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মনে হয়েছিল, জনগণের প্রত্যাশা এত দিন পরে বুঝি পূর্ণ হলো। কিন্তু না, সে অবস্থা বেশি দিন টেকেনি। বাংলাদেশ সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাত্র ৯ মাস ৭ দিন পরে, ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, জাতীয় সংসদ সংবিধান (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন প্রণয়ন করে নির্বাহী বিভাগের হাতে মৌলিক অধিকার পরিপন্থী ক্ষমতা অর্পণ করে। সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদকে বিনা বিচারে আটক রাখা-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা দেওয়া হয় এই সংশোধনী আইনের দ্বারা। সংবিধানের এই সংশোধনী আইন সংযোজিত হওয়ার মাত্র ৪ মাস ১০ দিনের মধ্যেই ১৯৭৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন (Special Powers Act 1974) প্রণীত হয়, যা এখন বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে কুখ্যাত কালাকানুনরূপে। সংবিধানের (দ্বিতীয় সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের দ্বারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা দেওয়া হয়। জরুরি অবস্থা জারি করা হলে নাগরিকদের ৬টি মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ছয়টি মৌলিক অধিকার হলো: চলাফেলার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক্স্বাধীনতা, পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি অধিকার। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হলো এসব অধিকার। জরুরি অবস্থায় যেকোনো মৌলিক অধিকার বলবৎকরণের লক্ষ্যে আদালতে মামলা করার অধিকার স্থগিত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা-সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার ১ বছর ৩ মাস পরে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বরে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক জীবন বিপদের সম্মুখীন হয়েছে এই অজুহাতে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
জরুরি অবস্থা কার্যকর থাকাকালেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন প্রণয়ন করে বাংলাদেশ থেকে সংসদীয় ব্যবস্থাকে নির্বাসন দিয়ে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি সরকার প্রবর্তন করে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মৌলিক অধিকার বলবৎকরণের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলোর যেকোনো একটিকে কার্যকর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতিকে একটি মাত্র ‘জাতীয় দল’ গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং বিধান থাকে যে, জাতীয় দল গঠিত হলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল আপনা-আপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে পর্যন্ত। ২৮ মে বাংলাদেশের রাষ্টপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশের ফলে সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের যে স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে এখতিয়ার কেড়ে নেওয়া হয়, তা সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং তার ৫ মাস পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের কুপ্রভাব সম্পর্কে অষ্টম সংশোধনীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় ঘোষণা করেছিলেন, সেই রায়ে তখনকার অন্যতম বিচারপতি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন বাংলাদেশ সংবিধানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন সব পরিবর্তন আনয়ন করে, যা তার মৌল কাঠামো পর্যন্ত পাল্টে দেয় বহুদলভিত্তিক সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার রাতারাতি পাল্টে সৃষ্টি করা হয় একদল ভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। সংগঠনের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। সরকারি দল ছাড়া অন্য সব দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় সংসদের যেসব সদস্য এই সরকারি দলে যোগ দেননি, তাদের আসন শূন্য হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করা হয়। [The Constitution Forth Amendment Act. dated 25 January 1975, changed the Constitution beyond recognition in many respects and in place of a democratic parliamentary form of government on the basis of multiple party system a presidential form of government, authoritarian in character, on the basis of a single party was brought about overnight. Fundamental right to form free association was denied; all political parties except the governent party were banned and members of Parliament who did not join this party lost their seat though they were elected by the people. Freedom of press was drastically curtailed.]।
এই সংশোধনী আইনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কীভাবে ক্ষুণ্ন করা হয় তার বিবরণ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান নির্বাহীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর বিচারপতিদের অপসারণ নির্ভরশীল করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হ্রাস করা হয়।’ অধঃস্তন আদালতগুলোর ওপর সুপ্রিম কোর্টের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বিলোপ ঘটিয়ে, তা সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে ন্যস্ত করা হয় সরকারের ওপর। এসব পরিবর্তন এত মারাত্মক ও তাৎক্ষণিক ছিল যে স্বাধীনতার বন্ধুরা হন বিভক্ত। স্বাধীনতার শত্রুরা প্রতিশোধ গ্রহণ করলেন। সমালোচকেরা উচ্ছ্বাসভরে বললেন, গণতন্ত্রের এই বিনাশ সাধনের প্রক্রিয়া একই-তা সে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারাই হোক আর সামরিক অভ্যুত্থানের মতো পদ্ধতিতেই হোক।’ [Independence of the judiciary was curbed by making the judges liable to removals at the wish of the chief executive; appointment, control and discipline of the subordinate Judiciary along with Supreme CourtÕs power of superintendence and control of subordinate courts were taken away from the Supreme Court and vested in the Government. The change was so drastic and sudden; friends were bewildered, enemies of the Liberation had their revenge and the critics said with glee that it was all the same whether the damage to democracy was caused by democratically elected person or by undermocratic means like military coup. “-Mahmudul Islam, ed. Bangladesh Legal Decision, 1980, pp 139-40]
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তার পূর্বতন অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। মাঝেমধ্যে ছোটখাটো দু-চারটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় মাত্র। ১৯৭৬ সালের ২৬ মে রাষ্ট্রপতি সায়েম তাঁর দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশে চতুর্থ সংশোধনী আইনে সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ যে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা পুনঃস্থাপিত হয়। তা ছাড়া চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে যেখানে বলা হয়েছিল, ‘বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরীকরণসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকবে’, সেই ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালে গৃহীত সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে ‘ন্যস্ত থাকিবে’ শব্দ দুটির পরে সংযোজিত হয়’ এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।’ ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের কিন্তু ব্যবস্থা ছিল সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় পদে অথবা বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশ ও পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তাঁরা নিযুক্ত হবেন। চতুর্থ সংশোধনী আইনের বিষক্রিয়া বিচার বিভাগের ওপর এতই মারাত্মক ছিল যে, আজ এতগুলো সংশোধনীর পরও বিচার বিভাগ তার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরে পায়নি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে জোরেশোরে বিঘোষিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৫ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ ছিল তার সাথে সংগতিপূর্ণ। ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গগুলো হইতে বিচার বিভাগের পথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হাজার হাজার যোজন দূরে ঠেলে ফেলে বরং নির্বাহী বিভাগের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই অবস্থার আংশিক পরিবর্তন এসেছিল বটে, কিন্তু স্বাধীনতার কাছাকাছি আসেনি।

Disconnect