ফনেটিক ইউনিজয়
পেনিলোপির অদৃশ্য তাঁত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রেয়সী হেলেনের মানবিক রূপটি দেখেছেন মহাকবি হোমার, প্রতীক্ষমাণা স্ত্রী হিসেবে দেখব আমরা তাকে ইউরিপিডিসের নাটকে। কিন্তু নারীর মূর্তি তো একটি নয়, অনেক। হোমার কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, শ্রেষ্ঠ তিনি এ ক্ষেত্রেও। এখানেও। নারীকে তিনি আরও এক রূপে দেখেছেন, সে হচ্ছে গৃহিণী। তাঁর দ্বিতীয় মহাকাব্য ওডিসিও নায়কেরই কাহিনি, কিন্তু নায়িকা যদি থাকেন কেউ তাতে তবে সে মায়াবিনী কেলিস্পো নয়, ডাইনি শার্শি নয়, কিশোরী নওসিকাও নয়, নায়িকা হচ্ছে ওডিসিয়ুসের স্ত্রী পেনিলোপি। পেনিলোপি ইথাকার রানি, ওডিসিয়ুস যে-রাজ্যের রাজা। ছোট দ্বীপ। রাজা গেছেন প্রবাসে। দশ বছর তিনি যুদ্ধে ছিলেন। সে খবরটি জানা ছিল সবার। যুদ্ধে গেছেন, ফিরবেন কি ফিরবেন না কে জানে। আশা ছিল ফিরবেন, আশার সেই প্রদীপটি জ্বেলে রেখেছেন ‘পেনিলোপি’। কিন্তু পেনিলোপির স্বামী ফেরেন না। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, ধ্বংস হয়ে গেছে ট্রয়, এবার ঘরে ফেরার পালা। অনেকেই ফিরে এসেছেন। মেনালাউস, অ্যাগামেনন, নেষ্টার-এঁরা সবাই ফিরে এসেছেন। ফেরেননি শুধু একজন। ওডিসিয়ুস।
এক বছর গেল, দুই বছর গেল। তিন, চার, পাঁচ-একে একে দশ বছর যায়, ওডিসিয়ুসের খোঁজ নেই। তিনি কোথায়? নিশ্চয়ই বেঁচে নেই, বেঁচে থাকলে অবশ্যই ফিরে আসতেন। তাঁর হাড়গোড় কোথায়? কোন মাটিতে মিশে গেছে কে জানে। কিংবা হয়তো তলিয়ে গেছে কোনো অতলে। সবাই বলছে এ কথা। পেনেলোপি নিজেও ভাবছেন। কিন্তু কী করতে পারেন তিনি, অপেক্ষা করা ছাড়া? তবে তাঁর সমস্যাটা শুধু অপেক্ষা করার নয়। কেবল যে প্রতীক্ষমাণা স্ত্রী তা তো নন পেনিলোপি, তিনি গৃহিণীও। সদ্যোজাত ছেলেকে রেখে গেছেন ওডিসিয়ুস। সেই ছেলে, টেলিমেকাস, বড় হচ্ছে। তাকে দেখতে হয়। বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি আছেন, তাঁরা অন্য বাড়িতে থাকেন, তবু তাঁদের খবর নিতে হয়। দেখাশোনা করতে হয় নিজের সংসারের। পঞ্চাশজন দাসী আছে প্রাসাদে। তারা সবাই যে মৈত্রীপ্রবণ তা নয়, কেউ কেউ রীতিমতো শত্রুতাই করছে। আছে পাইক-বরকন্দাজের তদারক করার কাজ। সর্বোপরি রয়েছে বিষয়-সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব।
কিন্তু এসব কর্তব্য কিছুই নয় পেনিলোপির আসল দায়িত্বের তুলনায়। সেটি হচ্ছে পাণিপ্রার্থীদের ঠেকানো। বিয়ের আগে সুন্দরী শ্রেষ্ঠ হেলেনের প্রেমিক ছিল সাতাশজন, গৃহিণী পেনিলোপির প্রেমিক ঠিক চার গুণ বেশি, গুনে গুনে তারা এক শ আটজন। অবিবাহিতা হেলেন সাতাশজনের ভেতর থেকে একজনকে বেছে নিয়েছিল, বিবাহিত পেনিলোপি কাকে বেছে নেবেন? প্রশ্নই ওঠে না। পেনিলোপি হচ্ছেন সদগুণ ও সতীত্বের ভাবমূর্তি। ওই ব্যাপারে অনমনীয় তিনি। তাই তাঁর সমস্যা, প্রধান সমস্যাই হচ্ছে এই পাণিপ্রার্থীদের ঠেকানো।
ওই পুরুষেরা তেমন নিরীহ নয়। আশপাশের অঞ্চল থেকে এসেছেন ছাপান্নজন, বাইরে থেকে বায়ান্ন। তাদের লোভ যে কেবল রানীকে পাওয়ার তা নয়, রানির রাজত্ব পাওয়ারও। পেনিলোপি ওই জন্যই বিশেষ আকর্ষণীয়। তাঁর বয়স অল্প নয়। তাঁর ছেলের অবশ্য বয়স বাড়ছে। তবু তিনি লোভনীয়। কেননা তাঁকে বিয়ে করলে রাজত্ব পাওয়া যাবে। ওডিসিয়ুস আর ফিরছেন না, ওডিসিয়ুসের বৃদ্ধ পিতা মৃত্যুপথযাত্রী, রাজপুত্র টেলিমেকাস এখনো কিশোর বৈ নয়; রানির পাণিপীড়িন করতে পারা মানে একই সঙ্গে স্ত্রী পাওয়া এবং রাজত্ব পাওয়া।
সেই লোভেই এসেছে তারা দল বেঁধে। গ্রিক সমাজে আধিপত্য পুরুষেরই। তারা পেনিলোপির বাবার কাছে যেতে পারত। বলতে পারত, এই নিন বিয়ের পণ, আপনার মেয়েকে দিন আমার হাতে তুলে। সেটা কিন্তু তারা করছে না। কেননা পেনিলোপির বাবা তো তাদের রাজত্ব দিতে পারবে না, তারা একাধারে স্বামী হবে এবং রাজা হবে, মনস্কামনা সেটিই। সুন্দরী রমণীর শয্যা পাবে, আর পাবে সম্পূর্ণ রাজত্ব।
লোকগুলো ঘাঁটি গেড়েছে রাজপ্রাসাদের আশপাশে। পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী তারা। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো কলহ-বিবাদ নেই। কেননা তারা সবাই আশাবাদী। প্রত্যেকেই ভাবে সে-ই রাজা হচ্ছে। প্রত্যেকেই রাজা হবে। সবারই বক্তব্য ওই একটি, আমাদের যেকোনো একজনকে বেছে নিন, যাকে ইচ্ছা নিন, কিন্তু নিতে হবে, না নিলে ছাড়ছি না।
না, তারা ছাড়বে না। তারা মচ্ছব বসিয়েছে। রাজবাড়ির জিনিসপত্র দিচ্ছে তনছন করে। শূকর আর গাভি যত ছিল দ্রুত চলে যাচ্ছে তাদের উদরে। পানীয় যা পাচ্ছে গিলছে মহোৎসাহে। রাতদিন হল্লা, হট্টগোল, নৃত্য, বাদ্য, সংগীত। মনে হবে সর্বদাই বিবাহ উৎসব চলছে ওই বাড়িতে। পেনিলোপি অতিষ্ঠ। কিন্তু তিনি তো সামনে কোনো আশা দেখেন না। স্বামী ওসিডিয়ুস কি ফিরবেন কোনো দিন?
ফিরবেনই যদি তবে ফিরছেন না কেন? ফিরলেও কীভাবে কী অবস্থায় আসবেন কে জানে। যেভাবেই আসুন এসে একাকী তিনি পারবেন কি বিরাট এই বাহিনীর সঙ্গে লড়তে? কীভাবে?
নানা দুশ্চিন্তায় সময় কাটে পেনিলোপির। কাটে না বলাই ঠিক। দোতলায় একটি কামরায় থাকেন তিনি। দিন-রাত কাঁদেন। তাঁর অশ্রু শুকায় না।
প্রথম দিকে এক বুদ্ধি বের করেছিলেন পেনিলোপি। নিজের কামরায় তাঁত বসিয়ে কাপড় বুনছিলেন। রটিয়ে দিয়েছিলেন যে এই কাপড় হচ্ছে তাঁর শ্বশুরের কাফন। এটি বোনার কাজ শেষ হলে তবেই তিনি বিয়ের কথা ভাববেন। তার আগে নয়। সেই কাপড় বোনা আর শেষ হয় না। শেষ হবে কী করে? দিনে যা বোনেন রাতে চুপি চুপি তা খুলে ফেলেন।
কিন্তু এভাবে তো আর অনন্তকাল চলে না, চলতে পারে না। পাণিপ্রার্থীরা অস্থির হয়ে উঠেছে, কবে শেষ হবে কাপড় বোনা, কতটা এগুলো-এসব জানতে চাইছে। টাকা খেয়ে পেনিলোপির দাসীদেরই একজন ফাঁস করে দিল ঘটনা। তিন বছর পার করে দিয়ে ধরা পড়ে গেলেন তিনি। তখন আত্মরক্ষা আরও কঠিন হয়ে পড়ল।
ওদিকে স্বামী ওডিসিয়ুস বেঁচেই আছেন। তিনিও স্থির নেই। ট্রয়ের যুদ্ধ শেষ হতে না-হতেই রওনা দিয়েছেন দেশে। সঙ্গে জাহাজ ছিল বারোটি। পথিমধ্যে সব জাহাজ ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি একা সাঁতরে এসে উঠেছেন এক দ্বীপে।
ওই দ্বীপে আসার আগের ঘটনাগুলো রোমহর্ষক। ঝড়ের মুখে পড়েছেন। লড়াই করেছেন শত্রুর সঙ্গে। অন্ধ করে দিয়েছেন ভয়ংকর এক দৈত্যকে। ডাইনির পাল্লায় পড়েছেন। পদ্মভোজীদের দ্বীপে গিয়ে উঠেছিলেন একবার, যেখানে পদ্মফুল খেলে সব ভুলে যেতে হয় মানুষকে। তারপর টানা সাত বছর একাকী কাটাতে হয়েছে তাঁকে এক দ্বীপে। দ্বীপের মায়াবিনী রানি কেলিন্সো প্রেমে পড়েছে ওডিসিয়ুসের। ওডিসিয়ুস তাই আটক তার হাতে। কিন্তু ওডিসিয়ুসের তো মন পড়ে আছে স্বদেশে। সমুদ্রের পাড়ে বসে বসে তিনি আকাশ দেখেন, পানি দেখেন, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কেলিন্সো তাঁকে অমরতা দিতে চেয়েছিল; তিনি বলেছেন, আমার পেনিলোপিই ভালো, অমরতার চেয়ে। এভাবে সাত বছর কেটে গেছে। আরও কত কাল কাটত কে জানে। বাঁচালেন এক দেবী। দেব-দেবীদের মধ্যে ওই একজনই ছিলেন তাঁর মিত্র। দেবী এথিনী তাঁকে উদ্ধার করলেন দেবরাজ জিউসকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে।
তবু সময় লেগেছে ফিরতে। আরেক দেশে গেছেন। একাকী। ঝড়ের কবলে পড়েছিলেন, নৌকা গেছে ডুবে। তিন দিন ধরে কখনো সাঁতরে, কখনো ভেসে একটি দ্বীপে এসে উঠেছেন। সেই দ্বীপ থেকে অবশেষে দেশে ফেরা। দশ বছর কেটেছে যুদ্ধে, দশ বছর কেটে গেল ফেরার পথে।
ওডিসিয়ুস দেশে ফিরলেন ভিখিরির বেশে। রাজপ্রাসাদে গিয়ে রানির প্রণয়প্রার্থীদের হাতে লাঞ্ছিত হলেন। শেষ পর্যন্ত ওই দেবী এথিনির সাহায্যেই পাণিপ্রার্থীদের হত্যা করে উদ্ধার করলেন রাজ্যকে এবং স্ত্রীকে।
পেনিলোপির জন্য আত্মরক্ষার শেষ অস্ত্র ছিল ওডিসিয়ুসের ধনুক। শেষমেশ তিনি বলেছিলেন, ঠিক আছে, বিয়ে করবেন তিনি, তবে তাকেই যে ওডিসিয়ুসের ধনুকে জ্যা পরাতে পারবে। সেটা কেউ পারেনি, পারা তো দূরের কথা অনেকে টেনে তুলতেই পারেনি সেই ধনুক। ঘরে ফিরে ওডিসিয়ুস ওই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। ধনুকে তিনি জ্যা পরালেন অনায়াসে এবং সেই ধনুকে তীর লাগিয়ে হত্যা করলেন পাণিপ্রার্থীদের।
বিশ বছর পরে মিলন হলো দুঃসাহসী স্বামীর সঙ্গে প্রতীক্ষমাণা স্ত্রীর। আসলে স্ত্রীর নয়, গৃহিণীর। গ্রিক ভাষায় পেনিলোপির নামের প্রথম অংশ পেনি বলতে বোঝায় বোনা। পেনিলোপি কাপড় বোনেন। যেন তাঁতী তিনি। একটানা তিন বছর বুনেছেন। তারপর ধরা পড়ে গেছেন।
কিন্তু ধরা পড়ে যাওয়ার পরও কাপড়ই বুনছিলেন তিনি; অদৃশ্য তাঁতে, অদৃশ্য বস্ত্র। সে বস্ত্র তাঁর দুঃখের, তাঁর ধৈর্যের। ওডিসিয়ুস বীর, তিনি যোদ্ধা, তাঁর কাহিনি মহাকাব্যের বিষয়বস্তু। কিন্তু গৃহে, ইথাকায়, একাকিনী ওই যে নারী তিনিও কম বড় যোদ্ধা নন। দরিদ্র ঘরের গৃহিণী যেমন করে নীরবে লড়াই করে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, ঠিক তেমনি তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে পাণিপ্রার্থীদের সঙ্গে। গরিব গৃহিণী যেমন করে অপেক্ষা করেন স্বামীর জন্য, দিনান্তে কখন ফেরেন, বিলম্ব হলে প্রহরগুলোকে মনে হয় বছর একেকটি, তেমনিভাবে পেনিলোপি প্রতীক্ষা করেছেন তাঁর স্বামীর, কখন আসেন, কখন আসেন, বছরের পর বছর কেটেছে, স্বামী ফেরেননি।
ওডিসিয়ুস অতুলনীয় ছিলেন বুদ্ধিতে। ট্রয়ের ঘোড়া তাঁরই প্রকল্প। গৃহিণী পেনিলোপিও কিন্তু কম যান না। তাঁতের বুদ্ধিটা তাঁরই। ধনুকের পরীক্ষার আয়োজন তিনিই করেছিলেন। ওডিসিয়ুস যখন ফিরে এসেছেন গৃহে, কিন্তু পরিচয় দেননি রানির কাছে, অলক্ষ্যে থেকে তখন তিনি শোনেন স্ত্রী পেনিলোপি বলছেন পাণিপ্রার্থীদের একজনকে-আমার স্বামী যুদ্ধে যাওয়ার সময় বলে গেছেন, ফিরব কি না কে জানে, কিন্তু তুমি আমার মা-বাবার যত্ন নিয়ো। আর ছেলের গালে যখন দাড়ি-গোঁফ দেখা দেবে, তখন যাকে ইচ্ছা বিয়ে কোরো। তা ছেলে তো বড়সড় হয়েছে, এখন তো আমাকে বিয়ে করতেই হবে।’ বলে আশা দিচ্ছেন পাণিপ্রার্থীকে। শুনে ওডিসিয়ুস খুশি হয়েছেন। হ্যাঁ, স্ত্রী তাঁর বুদ্ধিমতী বটে। এবং খুশি হয়েই দেখলেন তিনি কেমন দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেল প্রেমিকদের ভেতর, রানিকে পাওয়ার লোভে। হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে কে কার আগে ভোট দেবে তাই নিয়ে।
পেনিলোপি অতিথিপরায়ণ। অনাহুত অতিথিদের জ্বালাতনে অস্থির যখন তিনি তখনো কেউ যদি আসে দ্বারপ্রান্তে, দৈবাৎ এসে উপস্থিত হয়, তাহলে অস্থির হয়ে পড়েন আতিথেয়তার দায়িত্ব পালনে। ভিখারির ছদ্মবেশে এসেছেন ওডিসিয়ুস, কিন্তু মর্যাদা পেয়েছেন অতিথির। আরও দেখলেন ওডিসিয়ুস, কেমন করে তাঁর কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খবর বের করছেন তাঁর স্ত্রী। এবং শেষ পর্যন্ত তো বোকাই বললেন।
পাণিপ্রার্থীরা সবাই যখন অন্তর্হিত, মিলন ঘটছে স্বামীতে-স্ত্রীতে তখন ওডিসিয়ুস সত্যি সত্যি ওডিসিয়ুস কি না, স্ত্রী তা পরীক্ষা করে নিলেন নিভৃতে। পরিচারিকাকে বললেন, ‘ঘরের বড় খাটটা বের করে এনে পেতে দাও একে।’ শুনে ওডিসিয়ুস আত্মবিস্মৃত হয়েছেন, ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠেছেন, ‘সেই খাটটা কে সরাবে? সেটা তো সরানো যায় না।’ রানি বুঝলেন, কোনো প্রতারক নয়, তাঁর স্বামীই এসেছেন ফিরে।
পেনিলোপিকে হোমার অনেক গুণে গুণান্বিত করেছেন। বুদ্ধিমতী ও ধৈর্যশীল এই নারী বিপদ আকুল হন না। রানির মতো তাঁর চলাফেরা। এমনকি সৌন্দর্যেও খাটো নন। দেবীর মতো। স্বাস্থ্যও অটুট : গুদামঘরের প্রকাণ্ড দরজাটা যখন চাবি ঘুরিয়ে দেখালেন তিনি, অবাক হয়ে তখন আমরা দেখি তাঁর দৈহিক শক্তি।
কিন্তু হোমার বাস্তববাদী। পেনিলোপিকে তিনি নায়িকা করেননি। মহাকবির অনেক দিকে খেয়াল। ওডিসিয়ুসের কাহিনিতে বহু রকমের বক্রাঘাত রয়েছে। যিনি অন্যের স্ত্রীকে উদ্ধার করতে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তাঁর নিজের স্ত্রীই ছিলেন বিপন্ন; তাঁকে উদ্ধার করার লোক ছিল না পৃথিবীতে। কাঠের ঘোড়ার ভেতরে বসে যিনি ট্রয়ে প্রবেশ করেছিলেন ওই নগরকে ধ্বংস করবেন বলে, শেষ পর্যন্ত তাঁকেই ছদ্মবেশে ঢুকতে হলো নিজের দেশে এবং নিজ প্রাসাদে। যে পেনিলোপি অতিথি হিসেবে তাঁকে সমাদর করেছেন সেই পেনিলোপি নিজেই অস্থির ছিলেন অতিথিদের জ্বালায়। অনাহুত অতিধিদের অত্যাচারের অতিষ্ঠ হয়ে তিনি যদি আতিথেয়তা ভুলতেন তাহলে কিন্তু ওডিসিয়ুসের বিপদ ছিল। তিনি প্রবেশাধিকার পেতেন না তাঁর আপন গৃহে। পেনিলোপি যে হেলেন নন, হোমার যদি তা না জানেন তবে জানবেন কে। পেনিলোপি ধ্বংসের কারণ নন, তাঁর ভূমিকা রক্ষাকর্তার। তিনি গ্রিক নৃপতিদের দলনেতা অ্যাগামেমননের স্ত্রী ক্লাইটুমেনস্ট্রা নন। ক্লাইটুমেনেস্ট্রাও স্বামীর প্রতীক্ষায় ছিলেন, জানি আমরা, হোমার নিজেই জানান আমাদের সে সংবাদ। তবে একাকী নন, ক্লাইটুমেনেস্ট্রার সঙ্গে ছিল এক প্রেমিক। আর তার অপেক্ষাটাও স্বামীকে বরণ করার জন্য যে ছিল তা নয়, ছিল তাকে হত্যা করার জন্য। ক্লাইমেনেস্ট্রা তুলনার মধ্যে আসে না।
 পেনিলোপি ফিনিসীয়দের রানি আরিতি থেকেও স্বতন্ত্র। রানি আরিতি স্বামীর সঙ্গে থাকেন, ঘরে তাঁদের আদরের কন্যা নওসিকা। অভাব নেই, অভিযোগ নেই। রানির কর্তৃত্ব সর্বব্যাপী। ওডিসিয়ুসকে তাঁরা আদর করে রাখেন। তাঁর গৃহপ্রত্যাবর্তনের আয়োজনে রানি আরিতি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু পেনিলোপির তো সেই ভাগ্য নেই। তাঁর স্বামী গেছেন হারিয়ে, তাঁর গৃহে দুর্বৃত্তদের সার্বক্ষণিক উৎপাত চলছে। তিনি কর্তৃত্ব করবেন কোথায়, কার ওপর?
 হোমার সব জানেন। পেনিলোপির অসামান্যতা তুলে ধরতে কবির কোনো কার্পণ্য নেই। তবু বাস্তববাদী তিনি এবং সেই কারণেই পেনিলোপিকে তিনি নায়িকা করবেন না। সম্ভব নয় করা। মহাকবির পক্ষেও নয়। মহাকবির পক্ষেই নয়-বিশেষভাবে। কেননা, তাঁর পক্ষে বাস্তববাদী না হয়ে উপায় নেই। ওই সমাজ পুরুষশাসিত, সেখানে গৃহিণী গৃহিণীই, নায়িকা নয়।
পাণিপ্রার্থীরা তাঁকে উত্ত্যক্ত করে। এমনকি নিজের সন্তান, টেলিমেকাসও দেখি তাঁকে ধমক দিচ্ছে। আবার সন্দেহও করে সে, মা বুঝি বিয়েই করে ফেলেন কাউকে। টেলিমেকাস খাঁটি রাজপুত্র, যেমন সুদর্শন, তেমনি বুদ্ধিমান এবং বাস্তববাদী। টেলিমেকাসের আরেক ভয় পাণিপ্রার্থীরা যেভাবে সবকিছু সাবাড় করে দিচ্ছে, তাতে সে না পথের ভিখারি হয়ে পড়ে। ওই যে দেবী এথিনি, পুরুষ নন, অত্যন্ত বিজ্ঞ তিনি, নিজেই বলেন ওডিসিয়ুসকে, পুরুষদের মধ্যে যেমন তুমি, দেব-দেবীদের মধ্যে তেমনি আমি চতুরতম; সেই দেবীও পেনিলোপিকে পুরুষের প্রচলিত দৃষ্টিকোণেই দেখেন মনে করেন, পেনিলেপি হয়তো বিয়ে করেই ফেলবেন, নিজের ইচ্ছায় না হোক, বাবা ও ভাইদের চাপে। আর বিয়ে যদি সত্যি সত্যি করেনই, তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? বলছেন তিনি সত্যি সত্যি টেলিমেকাসকে, সতর্ক করে দিয়ে, ‘তুমি তো জানোই মেয়েদের স্বভাব কেমন, কাউকে তারা যখন বিয়ে করে, তখন সবকিছু নিয়ে চলে যায়। আগের স্বামী-সন্তানদের বিষয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা করে না। আর স্বামী মারা গেলে তো কথাই নেই, মরা স্বামীকে আর স্মরণও করবে না। বোঝা যায়, কবি বোঝেন, আমরাও বুঝি; যে যতই দেবী হোন, এথিনি পুরুষশাসিত বটে।’
কিশোরী নওসিকা দেবী নয়। রাজকুমারী। ওডিসিয়ুসকে খুব ভালো লাগে তার। ভাগ্যাহত পুরুষটির দুঃখ বোঝে সে। সে বলছে শুনি, ‘তা আপনি নিশ্চয়ই আশা করেন যে ফিরে যাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, ঘরে ফিরে যাবেন, দেশে ফিরবেন।’ Penelope and the Suitors, by John William Waterhouse (১৮৪৯-১৯১৭), English Pre-Raphaelite painter ওডিসিয়ুসের বন্ধুদের কথা ওঠে, স্ত্রীর কথা ওঠে না। নওসিকার মনেই পড়ে না যে ওডিসিয়ুসের গৃহে একজন স্ত্রী আছে। মনে না পড়াটাই স্বাভাবিক। কেননা, স্ত্রী তো গৃহিণীই শুধু, বন্ধু নন। বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে, স্ত্রী সমান নন, তার স্থান নিচে; তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে কী করে। হোমারের লেখায় বন্ধুত্ব তাই পুরুষে পুরুষেই বটে, পুরুষে-নারীতে নয়। প্রেমের চেয়ে সে জগতে বন্ধুত্ব বড়; প্রেম অনেক সময়ে মোহ, কখনো বা লালসা; বন্ধুত্ব সর্বদাই মানবিক সম্প্রীতি।
বাস্তববাদী বলেই হোমার তাঁর ‘ওডিসি’র শুরুতে পেনিলোপির কথা বলেন না। শুরুতে দেখতে পাই যুদ্ধশেষে ওডিসিয়ুস দেশে ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছেন। কাহিনির সূত্রপাত সেখানেই। ওডিসিয়ুস গৃহে ফিরবেন, ফিরবেন তাঁর স্ত্রীর কাছে। প্রথমে আসে গৃহের কথা, পরে স্ত্রীর এবং শুরুতে স্ত্রীর নামও উল্লেখ করেন না মহাকবি। নামটি জানি বেশ পরে। শুনি তা ওডিসিয়ুসের শুভাকাক্সক্ষী দেবী এথিনির মুখে।
না, পেনিলোপি নায়িকা হবেন না। তখনো হবেন না, এখনো যে হবেন তারও উপায় নেই। তাঁর কারণটি হোমার জানেন। সেই বাস্তবতাকে তিনি অগ্রাহ্য করতে পারেন না, অগ্রাহ্য করলে তাঁর কাব্যের বাস্তবতার যে ক্ষতি হবে এ বোধ তাঁর স্বভাবগত। কিন্তু পেনিলোপি থাকেন। তাঁর অদৃশ্য কাপড় বোনার কাজ শেষ হয় না, কবে শেষ হবে কে জানে। তাঁতটি সহ্যশক্তির, কাপড়টি দুঃখের।

Disconnect