ফনেটিক ইউনিজয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির রকমফের
আবুল কাসেম ফজলুল হক

ঐতিহাসিক কালে যুগ যুগান্তর ধরে আমাদের সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে পর্যায়ক্রমে বহিরাগত আর্য-প্রভাব, বহিরাগত মুসলিম-প্রভাব ও বহিরাগত ইউরোপীয় প্রভাব গ্রহণ করে। যুগে যুগে বৈদেশিক ধর্ম, আদর্শ, জ্ঞান, বিজ্ঞান, ভাষা ও আচরণকে নিজের মধ্যে সমন্বিত করে বাঙালি তার স্বকীয় সত্তা ও সংস্কৃতিকে বিকশিত করেছে। আবার স্বাধীনতা হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।
মানবজাতির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলে দেখা যায়, কালো মানুষ (প্রধানত আফ্রিকার), হলদে মানুষ (প্রধানত জাপান চীন কোরিয়া ও ইন্দোচিনের) ও সাদা মানুষ (প্রধানত ইউরোপের) এই তিন বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর লোকদের নানা রকম মিলন-মিশ্রণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশের নানা জনগোষ্ঠী বা এথনিক গ্রুপ। বাংলাদেশের মানুষ পূর্বোক্ত তিন বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর কোনোটির মধ্যেই পড়ে না। স্মরণাতীতকাল থেকে এ দেশে মূলত দুটি বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর লোক মিলন-মিশ্রণের মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছে, কালো মানুষ ও হলদে মানুষ। রামায়ণ-মহাভারতে নিষাদ (কালো মানুষ) ও কিরাত (হলদে মানুষ) জনগোষ্ঠীর উল্লেখ আছে। বাংলার জনপ্রবাহে সাদা মানুষদেরও সামান্য মিশ্রণ পরে ঘটেছে, যাকে বলা যায় সমুদ্রে বারিবিন্দুবৎ। বাংলার জনগণের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যাঁরা সন্ধান করেছেন, তাঁরা সবাই এই জনগোষ্ঠীকে মিশ্র বা শংকর বলে অভিহিত করেছেন। এই মিশ্রতা বা সাংকর্য এ দেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার মধ্যেই আছে। প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই মিশ্রতা নগণ্য। প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো নিজেদের ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষাও গ্রহণ করেছে এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসছে। তাদের চিরদিনের জন্য আদিবাসী করে রাখা অন্যায়। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিল এবং আছে। মুসলমান সমাজে আশরাফ-আতরাফ ব্যবধান ছিল, যদিও তা ধর্মের দ্বারা অনুমোদিত নয়। এসব পার্থক্যের প্রভাব এই ভূভাগের জনগণের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যর মধ্যে পাওয়া যায় না। এর কারণ হয়তো এই যে স্মরণাতীত কাল থেকে যে রক্তে সাংকর্য ঘটে আসছে, তাতে কেউই আর কোনো ধরনের রক্ত বিশুদ্ধতা দাবি করতে পারে না। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানে কোনো পার্থক্য নেই। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আন্তধর্মীয় বিবাহের রীতি না থাকার ফলে হয়তো হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে তাদের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। তবে কালক্রমে আন্তধর্মীয় বিবাহের রীতি প্রচলিত হতে পারে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও প্রচলন হতে পারে আন্তগোষ্ঠী ও আন্তধর্মীয় বিবাহের এবং বদ্ধতার সংস্কার ত্যাগ করে তারাও শামিল হতে পারেন।
‘আমাদের’ বলে আমি ‘বাংলাদেশের জনগণের’ বোঝাচ্ছি। সহজেই বলা যায়, আমাদের সংস্কৃতি হলো আদিকাল থেকে বিকাশশীল এই ভূভাগের জনগণের সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশ আমাদের লক্ষ্য। আমি আলোচনা করব আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি বিষয়ে, জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করে, জাতির অন্তর্গত সব জনগোষ্ঠীর ও শ্রেণির মানুষের কল্যাণে।
উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, বিত্তহীন, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, শ্রমজীবী, বুদ্ধিজীবী, নারী, পুরুষ, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, চাকমা, রাখাইন, গারো, সাঁওতাল, গ্রামবাসী, শহরবাসী নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষকে নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের জনগণ (people)। বাংলাদেশের ৪৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশের সামান্য বেশি। হিন্দুর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশের মতো। জৈন, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধশতাংশের কম। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিতে ক্রমে এসব জনগোষ্ঠীরই সংস্কৃতির সংশ্লেষণ (synthesis) বাঞ্ছনীয়। জাতির ভেতরকার সব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সংশ্লেষণ দ্বারা গঠিত হয় জাতির ব্যক্তিত্ব। জাতির অন্তর্গত প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মধ্যেই যেখানে যা কিছু ভালো, সেগুলোর প্রতি সহিষ্ণু মনোভাব আর জাতীয় ঐক্যবোধ ও স্বদেশপ্রেম বাঞ্ছনীয়।
সংস্কৃতি মানবীয় ব্যাপার, মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীরই সংস্কৃতি নেই। প্রকৃতিকে নিয়েই সংস্কৃতি, তবে প্রকৃতিই সংস্কৃতি নয়; সংস্কৃতির অস্তিত্ব প্রকৃতির অতিরিক্ত কিছুতে যা প্রকৃতিকে অবলম্বন করে মানুষে সৃষ্টি করে। বেঁচে থাকার ও উন্নতি করার জন্য মানুষকে চিন্তা ও কাজ করতে হয়। সংস্কৃতির অস্তিত্ব মানুষের চিন্তার, কাজের ও জীবনযাত্রার মধ্যে শুদ্ধিমান, পরিশ্রুতিমান, উৎকর্ষমান, সৌন্দর্যমান, উত্তরণশীল, ঋদ্ধিমান, প্রগতিশীল, পূর্ণতাপ্রয়াসী সব প্রবণতায় ও প্রচেষ্টায়। জীবনযাত্রার ও শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষের নিজেকে এবং নিজের পরিবেশকে সুন্দর, সমৃদ্ধ ও উন্নত করার যে প্রবণতা, চিন্তা ও চেষ্টা, তারই মধ্যে নিহিত থাকে তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতি যেমন ব্যক্তিগত জীবনের, তেমনি যৌথ বা সমষ্টিগত জীবনেরও ব্যাপার। জাতিগঠন ও রাষ্ট্রগঠনের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে, সেই সঙ্গে দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও শিল্পকলা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষ তার সাংস্কৃতিক সামর্থ্যরে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। সংস্কৃতি ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব পর্যায়েরই ব্যাপার। জীবনযাত্রার এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত কাজকর্মের ও শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষের সুন্দর হওয়ার ও সুন্দর করার, সমৃদ্ধ হওয়ার ও সমৃদ্ধ করার এবং উন্নত হওয়ার ও উন্নত করার ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা ও চেষ্টার মধ্যেই বিরাজ করে সংস্কৃতি। সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তির ও সমষ্টির কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয়, ও পরিবেশের সংস্কার, রূপান্তর ও নবজন্ম ঘটে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে, রাজনৈতিক দলে, রাজনৈতিক আন্দোলনে ও বুদ্ধিজীবীদের মহলে সংস্কৃতির চর্চা থাকলে তা দ্বারা সর্বসাধারণের জীবনে অশেষ কল্যাণ সাধিত হয়। নেতৃত্ব সংস্কৃতিমান হলে জনসাধারণও সংস্কৃতিমান হয়। ভারতীয় সংস্কৃতির ভিত্তি গ্রন্থে শ্রী অরবিন্দ লিখেছেন, ‘পৃথিবীকে স্বর্গে উন্নীত করাই সংস্কৃতির জীবন্ত লক্ষ্য।’ তিনি জোর দিয়েছেন মানুষের মনোদৈহিক উৎকর্ষ অর্জন ও আর্থসামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার উন্নতিসাধন-দুটোতেই। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত জীবনে সংস্কৃতি অবলম্বন করে মানুষ পর্যায়ক্রমে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে চলে। পৃথিবীকে স্বর্গে উন্নীত করার সজ্ঞান প্রচেষ্টা দ্বারাই চলে সেই পূর্ণতার দিকে অভিযাত্রা।
যারা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত দিক দিয়ে পশ্চাৎবর্তী ও দরিদ্র, তাদেরও সংস্কৃতি আছে। জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে তারাও উন্নতি করতে চায়, তাদের মধ্যেও ন্যায়-অন্যায়বোধ, সর্বজনীন কল্যাণবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও শিক্ষার আগ্রহ আছে। ইচ্ছায় হোক, কিংবা বাধ্য হয়ে হোক, অগ্রসর সংস্কৃতি গ্রহণের মাধ্যমে তারা সংস্কৃতিমান থাকে। আত্মবিকাশের পথে তাদের অন্তরায় অনেক। ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের নেতৃত্ব সৃষ্টি করে তারা শক্তিশালী হয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। যারা সৃষ্টিশীল নয়, তারা ঐতিহ্য ও পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত সংস্কৃতি নিয়ে চলে।
ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় থাকে তার কাজে ও ব্যক্তিত্বে। জাতীয় সংস্কৃতির পরিচয় থাকে জাতির অন্তর্গত জনগণের কাজে ও সমষ্টিগত ব্যক্তিত্বে। ভালো-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিত, ন্যায়-অন্যায়, আচার-অনাচার, কর্তব্য-অকর্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে জাতির অন্তর্গত জনগণের স্বীকৃত ধারণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে জাতীয় সংস্কৃতি। তবে সর্বস্বীকৃত নয় এমন ধারণাও থাকে জাতির অন্তর্গত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জীবনে। কোনো জাতির অন্তর্গত সব মানুষের সব চিন্তা ও কর্ম এবং উৎপাদন ও সৃষ্টিই সেই জাতির সংস্কৃতির বাহন।
প্রাণীবিশেষ (ape) জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, আপন চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তি ব্যবহার করতে করতে মানুষে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং সেই মানুষ আপন সংস্কৃতি চেতনার বলে পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে উন্নতি করে চলছে। গর্ডন চাইল্ডের বিখ্যাত বই Man Makes Himself এতে মানুষকে তিনি দেখেছেন সংস্কৃতিমান বিকাশশীল প্রাণীরূপে। ব্যক্তিগত কিংবা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের নিজেকে কিংবা নিজেদের গড়ে তোলা, সৃষ্টি করা, জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে বিকশিত হয়ে ও বিকশিত করে চলা, এরই মধ্যে নিহিত থাকে ব্যক্তির কিংবা সমষ্টির সংস্কৃতি। The Descent of Man গ্রন্থে ডারউইন উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন কী করে জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে মানুষ জ্ঞাতসারে ও অজ্ঞাতে নিজের জীবনযাত্রার ও কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে সৃষ্টি করে চলছে। সংস্কৃতির বিবেচনায় natural selection I survival of the fittest কথা দুটোও অবশ্য বিবেচ্য। প্রতিযোগিতার মধ্যে প্রাণীজগতের ও মানব সভ্যতার বিকাশ ধারায় সব প্রজাতি ও জাতি সমভাবে টিকতে পারে না।
সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলো কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনগণের চিন্তাধারা পরিবর্তনের আন্দোলন। প্রত্যেক জাতির প্রত্যেক ঐতিহাসিক কালের সংস্কৃতিচিন্তা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যেই প্রগতিশীল, রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল ধারা লক্ষ করা যায়। অপসংস্কৃতি কথাটাও তাৎপর্যহীন কিংবা গুরুত্বহীন নয়। সংস্কৃতি চেতনার বিকার ঘটলে অপসংস্কৃতি দেখা দেয়। জাতির জীবনে জাতীয় সংস্কৃতিই মূল। তাতে থাকে নানা প্রবণতা-বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। অপশক্তি সক্রিয় থাকে অপসংস্কৃতি নিয়ে। প্রত্যেক জাতিরই সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে অপসংস্কৃতিকে পরাজিত করে। এর কোনো বিকল্প ভাবা যায় না।
জাতীয় জীবনে সংস্কৃতি চেতনা দুর্বল হলে, বিকৃত হলে, জাতির উন্নতি ব্যাহত হয়। ব্যক্তির বেলায়ও এমনটাই ঘটে। কোনো জাতির জীবনে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় বা অপসংস্কৃতির প্রাধান্য চলতে থাকলে একসময়ে জনগোষ্ঠীগত অবক্ষয় শুরু হয়। তবে প্রত্যেক জাতির মধ্যেই সাংস্কৃতিক অবক্ষয় দেখা দিলে তারই মধ্যে নতুন সৃষ্টির ও নব-উত্থানের প্রচেষ্টাও দেখা দেয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের, বুদ্ধিজীবীদের ও ছাত্র-তরুণদের মধ্যে-বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজে-সংস্কৃতির এই ধারণা ও অনুশীলন এখন অল্পই খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে, বিনোদনের ধারণাকে সংস্কৃতির ধারণার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। এত দিনে সংস্কৃতি আমাদের এক হারানো প্রত্যয়। শব্দটি আমাদের ব্যবহারে আছে, কিন্তু মর্মহারা রূপে-ভিন্ন অর্থ নিয়ে।
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নিয়ে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক মত দেখতে পাই। যাঁরা ভীষণভাবে সক্রিয়, ঘটনাপ্রবাহের গতিনির্ধারক ও নেতৃত্বকারী, তাঁদের ভূমিকা লক্ষ্য করা যাক।
লেখক, শিল্পী ও রাজনীতিবিদদের একাংশে দেখতে পাই ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির প্রতি অনুকরণের মনোভাব। এঁরা রবীন্দ্রনাথকে মনে করেন সংস্কৃতির সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ (authority), আর শান্তিনিকেতনকে মনে করেন সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। সৃজন ও মননের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনকে এঁরা একান্ত অনুসরণীয় মনে করেন। অন্যদিক থেকে দেখলে দেখা যায়, এঁরা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ভাবধারারও অন্ধ অনুসারী। সাম্রাজ্যবাদী ভাবধারা থেকে পশ্চিমা প্রগতিশীল ভাবধারাকে আলাদা করে দেখার কোনো প্রবণতা এঁদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। স্বকীয়তা, নতুন সৃষ্টির তাগিদ ও দূরদর্শিতা এঁদের মধ্যে অল্পই খুঁজে পাওয়া যায়। সৃজনপ্রয়াস ও প্রগতি প্রয়াসের চেয়ে ভোগবাদী প্রবণতা এ ধারার ভাবুক ও কর্মীদের মধ্যে প্রবল। ধর্মনিরপেক্ষতার সরব সমর্থক এঁরা। মনে হয়, কেবল ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করাকেই এঁরা প্রগতি মনে করেন। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যাপারটিকে এঁরা জনগণের কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করতে পারেন না। এঁদের মধ্যে হিন্দু-সংস্কৃতির প্রতি কিছুটা কৌতূহল দেখা গেলেও মুসলিম-সংস্কৃতির প্রতি কোনো কৌতূহল দেখা যায় না।
এঁরা বাংলাদেশের জনগণের স্বতন্ত্র জাতীয় সংস্কৃতির কথা ভাবতে পারেন না। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির কথা এঁরা বলেন বটে, তবে এঁদের চিন্তাভাবনা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত কালের ঘটনাবলিতে সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের লেখক, শিল্পী ও রাজনীতিবিদদের অপর একটি অংশে দেখতে পাই ভারতের সংস্কৃতির প্রতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির প্রতি বিরূপ মনোভাব। এঁদেরও দেখা যায় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ভাবধারার অন্ধ অনুসারী। পশ্চিমা প্রগতিশীল ভাবধারার প্রতি এঁদেরও কোনো কৌতূহল নেই। এঁদের মধ্যেও নতুন সৃষ্টির তাগিদ ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টি দুর্লভ। প্রগতির কোনো বোধ এঁদের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। ভোগবাদী চিন্তাচেতনা এঁদেরও চালিকাশক্তি। দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এঁরা বিশেষ গুরুত্ব দেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে পাকিস্তান হয়েছিল বলেই বাংলাদেশ হয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে এঁরা অগ্রগতির এক অনিবার্য ধাপ মনে করেন। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এঁদের কোনো আবেগগত সংযোগ আছে বলে মনে হয় না।
এ ধারার চিন্তক ও কর্মীরা দলীয় স্বার্থে জনগণের মধ্যকার মুসলমানত্ববোধকে জাগ্রত রাখতে ও কাজে লাগাতে তৎপর। এ ক্ষেত্রে এঁদের ভূমিকা সম্পূর্ণ সুবিধাবাদী। এঁরা বাংলাদেশের জনগণের সংস্কৃতির আরম্ভ খোঁজেন মধ্যযুগের মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ইতিহাসে। এ দেশের মুসলিমপূর্ব কালের ইতিহাসের প্রতি এঁদের কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রতি এঁদের মনোভাব বিরূপ। ইসলামকে এঁরা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেন। ইসলামের প্রতি এঁদের আন্তরিক অনুরাগ খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে এঁরা বখতিয়ার খিলজির লক্ষণাবতি দখলের (১২০৪) আগে যেতে চান না। এই ধারার লেখক-শিল্পীরা আইয়্যামে জাহেলিয়াতের আরবে ইসলাম প্রচার থেকে আরম্ভ করে বাংলার মুসলমান তুর্কি, পাঠান, মোগল শাসকদের শাসনকাল ধরে, ওহাবি ও ফরাজি আন্দোলনের ধারা ধরে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা এবং পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে আসেন। গ্রামের কৃষকদের মধ্যকার ইসলামি পুনর্জীবনবাদী ওহাবি ও ফরাজি আন্দোলনের ধারা ধরে যে মুসলিম লীগের উদ্ভব ও পাকিস্তান আন্দোলন হয়নি, পাকিস্তান আন্দোলন যে ইসলামি আন্দোলন ছিল না, ছিল আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত শহুরে নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত সাম্প্রদায়িকতাবাদী আন্দোলন, এটা এঁরা বুঝতে চান না।
কার্যক্ষেত্রে জাতির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এজমালি বিষয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সহাবস্থানের ও সহিষ্ণুতার মনোভাব দুর্লভ- অসহিষ্ণুতা, হিংসা-প্রতিহিংসা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রবল। উভয় পক্ষই কেবল নিজেদের মতকে সম্পূর্ণ ঠিক এবং অপর পক্ষের মতকে সম্পূর্ণ ভুল বলে প্রচার করে। জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন কোনো পক্ষই বোধ করে না। আসলে দুই পক্ষের কোনোটিই নিজেদের বক্তব্যের সত্যাসত্য বিচার করে না। কোনো রকম সমালোচনাই কোনো পক্ষ সহ্য করে না, সমালোচনাকে মনে করে বিরোধিতা। বাংলাদেশকে রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার তাগিদ নেই কোনো পক্ষের মধ্যেই। প্রশাসন এই ধারায় বিভক্ত।

দুই.
বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিল তথা ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল দ্রুত বেড়েছে এবং বাড়ছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারাকে বিভক্ত করে বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংলিশ ভার্সন প্রবর্তন করেছে। ক্রমে ইংলিশ ভার্সন বাড়ানো হচ্ছে। সব ক্যাডেট স্কুল ও কলেজ বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংলিশ ভার্সন নিয়ে চলছে। সরকারি স্কুল ও কলেজগুলোও বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংলিশ ভার্সন চালু করে চলছে। প্রাইভেট স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ইংলিশ ভার্সন যারা এখনো চালু করতে পারেনি তারা এটা চালু করার চেষ্টায় আছে। সরকারের নীতি ও কথিত বিশিষ্ট নাগরিকদের অঘোষিত সমর্থন ইংলিশ ভার্সনের পক্ষে আছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণরূপে ইংরেজি মাধ্যম নিয়ে চলছে। এ ব্যাপারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো স্বচ্ছ নীতি নেই। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও ইংলিশ ভার্সন ধারা শিক্ষার্থীদের কী দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছে?
সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (CSO) ও এনজিও ধারার অনুসারী বিশিষ্ট নাগরিকেরা মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ প্রতিযোগিতাবাদ, সংস্কৃতির বহুত্ববাদ, উত্তরাধুনিকতাবাদ ও বিশ্বায়নের সমর্থনে অত্যন্ত উৎসাহী এবং বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে নির্লিপ্ত। বাংলাদেশ কখনো স্বাধীনভাবে চলতে পারবে না, তাকে চলতে হবে পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করে-এই কথাটা ঘোষণা না দিয়ে প্রতিদিন নানা কৌশলে তাঁরা সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করেন। বাংলা কি বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা থাকবে? বাংলা রাষ্ট্রভাষা না থাকলে বাংলাদেশ কি রাষ্ট্ররূপে অস্তিত্বশীল থাকবে? এখন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের অবস্থা কী? ইংলিশ মিডিয়াম ও ইংলিশ ভার্সন ধারা থেকে যারা বের হচ্ছে তারা বাংলাদেশকে রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলতে কি আগ্রহী হচ্ছে?
মূল্যবোধ, যুক্তিবোধ, বিচার-বিবেচনা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা-এসবের গুরুত্ব স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রমেই অস্বীকৃত হয়েছে। গণতন্ত্রের নামে রাজনীতি অত্যন্ত কুৎসিৎ রূপ লাভ করেছে। গণতন্ত্র বলে এখন বোঝানো হচ্ছে কেবল নির্বাচন। আর নির্বাচনকে বলা হচ্ছে উৎসব-জনজীবনের সর্ববৃহৎ উৎসব। গণতন্ত্রের নামে এই উৎসব তো জনগণের সঙ্গে প্রতারণা মাত্র! নির্বাচিত সরকারগুলো ক্ষমতায় আসীন হয়ে যা কিছু করে, সবই গণতন্ত্র বিরোধী।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায়, সরকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে-জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ, প্রশাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদিতে যে সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়, তা সুস্থ-স্বাভাবিক নয়, অপব্যবস্থা ও দুর্নীতির কারণে বিকারপ্রাপ্ত। যেকোনো ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনের জন্য সংস্কারের প্রশ্ন উঠলেই দুই ধারার মধ্যে দেখা দেয় মতপার্থক্য ও তীব্র বাদ-প্রতিবাদ। এতে উন্নয়ন সম্ভব হয় না। সার্বজনীন কল্যাণের বিবেচনা যেখানে নেই, সেখানে মতপার্থক্য ও বিবাদ রূপ নেয় নগ্ন স্বার্থের সংঘাতে।
দেশব্যাপী জনগণের সংস্কৃতিচেতনাও নিম্নগামী। সাধারণ মানুষের মানসিকতা ও ব্যক্তিত্ব সুস্থ স্বাভাবিক নেই। বাংলাদেশে জনগণের মানসিকতাকে কে বা কারা কীভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক করে তুলবেন? দার্শনিক হেগেলের একটি উক্তি : যে জনগণ যখন যেমন নেতৃত্বের যোগ্য হয়, সেই জনগণ তখন ঠিক সেই রকম নেতৃত্বই লাভ করে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নানা ধারায় এতটাই বিভক্ত করে রাখা হয়েছে যে তা জাতি গড়ে ওঠার কিংবা জনগণের ঐক্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সরকার ও এনজিওগুলো এই বিভক্তিকে বাড়িয়ে চলছে। সর্বত্র দেখা যাচ্ছে দলীয়করণ ও দলবাজি। দলীয়করণ ও দলবাজির কারণে শিক্ষাব্যবস্থাও বিকারপ্রাপ্ত। শিক্ষাব্যবস্থার সর্বস্তরে চলছে নব্য-উদারতাবাদের অন্ধ অনুসরণ। পশ্চিমের প্রগতিশীল ভাবধারার প্রতি কৌতূহল খুঁজে পাওয়া যায় না, কৌতূহল কেবল সাম্রাজ্যবাদী ভাবধারার প্রতি।
নিকৃষ্ট রাজনৈতিক দলের হীন স্বার্থান্বেষী লেজুড়বৃত্তি দ্বারা লেখক-শিল্পীদের কোনো উন্নত সংস্কৃতির পরিচয় প্রকাশ পায় না। দলীয় গণ্ডির বাইরে সর্বজনীন কল্যাণের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যেগুলোকে দলমতনির্বিশেষে সবারই সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া কর্তব্য। সেগুলোকে বুঝতে না পারলে, মূল্য না দিলে জাতির সংস্কৃতি বিকারপ্রাপ্ত হয়Ñপ্রাণশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। জাতীয়তাবোধ, জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় স্বার্থ তেমনি একটি বিষয়। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে দরকার জাতীয়তাবাদের সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ। উপনিবেশবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ হলো জাতীয়তাবাদের বিকার। নতুন রেনেসাঁস, নতুন সভ্যতা-সংস্কৃতি ও প্রগতির প্রয়োজনে সব গণবিরোধী মতবাদ ও সব গণবিরোধী শক্তিকে দমন রাখতে হবে। জাতির অন্তর্গত সব জনগোষ্ঠীর ও সব স্তরের জনগণের স্বার্থকে যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে এবং জাতীয় ঐক্যকে নিশ্চিত করে জাতীয়তাবাদকে সফল করতে হবে।
অর্থ-বিত্ত ও শিক্ষা-সংস্কৃতির দিক দিয়ে যারা পিছিয়ে আছে, যারা মোট জনসংখ্যার শতকরা নব্বই ভাগ, যারা উৎপাদনশীল, সেই শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত কথিত উদার গণতন্ত্রে দারুণভাবে নির্জিত, বঞ্চিত, প্রতারিত। সব দিক দিয়েই তারা দুরবস্থায় আছে। অত্যুন্নত নতুন প্রযুক্তির বিকাশ ও উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে তাদের খাওয়া-পরার অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। কিন্তু শ্রমজীবীরা কঠোর শ্রমের হাত থেকে রেহাই পায়নি। সামাজিক ন্যায় ও মানবিক দিক লক্ষ করলে দেখা যায় তাদের অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও জীবপ্রযুক্তির বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয়ের পর পৃথিবীর সর্বত্রই তারা আগের চেয়ে বেশি নির্জিত, বঞ্চিত ও প্রতারিত হচ্ছে। যারা শক্তিমান, বিত্তবান, বিদ্বান, সর্বসাধারণের প্রতি তাদের সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ কমে যাচ্ছে। ফলে সামাজিক বৈষম্য ও বিযুক্তি (alienation /estrangement) বাড়ছে। সাধারণ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ও প্রতিকার চাওয়ার সাহস হারাচ্ছে। উদার গণতন্ত্রের নামে সাধারণ মানুষ শাসক শ্রেণির লোকদের উদ্দেশ্য সাধনের যন্ত্র হয়ে আছে।
বাংলাদেশে সবকিছু কেন্দ্রীভূত হচ্ছে রাজধানীতে, গ্রাম নিদারুণ বঞ্চনার শিকার। প্রান্তিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে দূরে সরিয়ে, বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে জনগণের রুচি-পছন্দ ও চিন্তা-চেতনার মান উন্নত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ও তাদের দেশীয় অনুসারীদের স্বার্থসিদ্ধির অনুকূল। সামাজিক ন্যায় কমতির দিকে হওয়ার ফলে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে, নারী নির্যাতন বাড়ছে, হত্যা-আত্মহত্যা বাড়ছে, হিংসা-প্রতিহিংসা বাড়ছে, অনাস্থা ও হতাশা বাড়ছে, সংস্কৃতি অপসংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে চলছে।
তিন.
জাতীয় জীবনে আলোর সন্ধান পেতে হলে বিভেদকে পেছনে ফেলে সংশ্লেষণমূলক নতুন প্রক্রিয়া সৃষ্টি করতে হবে। এর জন্য প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলো জনগণের চিন্তাধারা পরিবর্তনের আন্দোলন। রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরস্পর সম্পূরক। আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও সংস্কৃতি নিয়ে মতপার্থক্য থাকবে, তা স্বাভাবিক। তবে সব পক্ষকেই তথ্যনিষ্ঠ ও সত্যসন্ধ হতে হবে। মতপার্থক্যের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এবং জাতীয় ঐক্যের ও জাতীয় উন্নতির মনোভাবও অবশ্যই থাকতে হবে। এক পক্ষ সব সময় অন্য পক্ষকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টায় থাকলে শেষ পর্যন্ত তার ফল বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর হবে। জাতীয় জীবনে বিরোধের উপাদান যেমন আছে, তেমনি আছে সম্প্রীতির, ঐক্যের ও সংহতির উপাদানও। এ অবস্থায় বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের কিংবা বহুত্বমূলক সমন্বয়ের নীতি কার্যকর করতে হবে। সবাই এক রকম চিন্তা করবেন, তা ভাবা বাস্তবসম্মত নয়।
ভবিষ্যৎকে নতুন করে গড়তে হলে ভবিষ্যতের রূপকল্প দরকার, সেই সঙ্গে দরকার অতীত সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার পুনর্গঠন। অতীত সম্পর্কে মনকে পুরাতন ধারণায় আবদ্ধ রেখে গতানুগতিক সম্ভব, উন্নতি বা প্রগতি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে যাঁরা আজ ইউরো-মার্কিন আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির অন্ধ অনুসারী, তাঁদের বোঝা উচিত যে তাঁদের আচরণ ঐতিহ্যবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, যা আমরা ইউরোপ-আমেরিকার প্রগতিশীল মহান দর্শন-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে জানব, বুঝব এবং আমাদের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করব। আমাদের বুঝতে হবে যে পশ্চিমা আধিপত্যবাদীরা তাদের আধিপত্য লিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য যা কিছু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয় তাই গ্রহণ করা আমাদের জন্য আত্মঘাতী। উপনিবেশবাদী, ফ্যাসিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ভাবধারা ও কর্মধারাকে অবশ্যই আমাদের পরিহার করে চলতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর ইসলাম নিয়ে যাঁরা জাতিকে বিভক্ত করে উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করছেন, তাঁদের দুই পক্ষের মধ্যেই আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসমালোচনা ও আত্মোৎকর্ষের অনুশীলন দরকার। সংখ্যার শক্তিকে অগ্রাহ্য করা যায় না। যেসব উত্তেজনাকর বিতর্কে পড়ে আমরা ভুলপথগামী, সেগুলো থেকে আমরা রেহাই পাব যদি আমরা সুস্থ-স্বাভাবিক উন্নত সংস্কৃতি চেতনায় উত্তীর্ণ হই এবং জাতির সাংস্কৃতিক ভিত্তি বা উত্তরাধিকার সম্পর্কে ইতিহাসসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করি। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তার চলমান ধারাগুলোর কেবল একটিকে রক্ষা করার ও অপরটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চিন্তা ভুল। উভয় ধারারই আত্মশুদ্ধি ও আত্মোৎকর্ষ কাম্য। মিথ্যাচার ও ইতিহাস-বিকৃতি বর্জনীয়।
পৃথিবীর যেকোনো উন্নত জাতির মতোই আমাদেরও আছে প্রাক্-ইতিহাস (prehistor), আদি-ইতিহাস (protohistory) ও ইতিহাস। তাতে বিধৃত আছে আমাদের প্রবহমান সংস্কৃতির ধারা-উপধারা-জনজীবনের গতিময় উত্থান-পতন। ভৌগোলিক বাস্তবতারও ইতিহাস আছে। সে ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত কালের ঘটনাবলি নিয়ে কিংবা কেবল পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন থেকে ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত কালের ঘটনাবলি নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অসহিষ্ণু বিতর্কে মত্ত থাকা, প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া, ইতিহাসকে বিকৃত করা, গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনে সীমাবদ্ধ রাখা এবং সবকিছুকে নির্মম দলীয়করণে সীমাবদ্ধ করে দলবাজি ও দুর্নীতিতে মত্ত থাকা, গণতন্ত্রের নামে কালোটাকা, পেশিশক্তি ও বিদেশি দূতাবাসকে প্রাধান্য দেওয়া, বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব ও পরিবারতন্ত্রকে মেনে নেওয়া, হুজুগ সৃষ্টি করে জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা করা ইত্যাদি দ্বারা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে জাতীয় অপসংস্কৃতিতে পর্যবসিত করে রাখা হয়েছে। কোন পক্ষকে ভালো বলা যাবে?
সাধনা ও সংগ্রাম দুইই লাগবে। বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে গিয়ে ঘুমন্ত জনসাধারণকে জাগাতে হবে। জাতীয় জীবনে যথার্থ সাধনা ও সংগ্রাম দেখা দিলে উজ্জ্বল উত্থান অবশ্যই সম্ভব হবে। জনসাধারণকে জাগতে হবে, জনসাধারণ ঘুমিয়ে থাকলে হবে না। সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতির সঙ্গে বিরোধের মধ্য দিয়েই চলতে হবে, মানবস্বভাব এমন যে, কোনো স্থায়ী মীমাংসার উপায় পাওয়া যায় না। নিরন্তর সংগ্রামের মাধ্যমে সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতির ওপর জয়ী রাখতে হবে। বাংলাদেশে অপসংস্কৃতি কর্তৃত্বশীল, সংস্কৃতি নির্জিত। মানবপ্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে সংকটের উৎস। মানবস্বভাবকে উন্নত করার সব রকম উপায় সন্ধান করতে হবে। সাধনা ও সংগ্রামের বিকল্প নেই।

Disconnect