ফনেটিক ইউনিজয়
‘বুর্জোয়া’
ফরহাদ মজহার

আমরা ‘বুর্জোয়া’ বুঝি কি?
বামপন্থায়, তবে বিশেষ ভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে, একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হচ্ছে ‘বুর্জোয়া’। শ্রেণি রাজনীতি যাঁরা করেন, তাঁদের কাছে এই শব্দটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আমরা তরুণ বয়সে যখন কমিউনিস্ট রাজনীতিতে দীক্ষা নেই তখন শব্দটার প্রতি আমাদের আকর্ষণ ছিল প্রবল। শব্দটি মনের মধ্যে প্রচণ্ড শত্রু শত্রু ভাব জাগাত কারণ এর বিরুদ্ধেই শ্রমিক শ্রেণি বা কমিউনিস্ট ভাষায় ‘প্রলিতারিয়েত’কে লড়ে বিপ্লব করতে হবে। শব্দটার প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকলেও রহস্যে টইটুম্বুর এই বিদেশি শব্দের আসল মানে আমরা জানতাম না। এর দ্বারা সমাজের শোষক শ্রেণিকে যে বোঝানো হচ্ছে, সেটা বুঝতাম বটে কিন্তু বুর্জোয়া শ্রেণির ঐতিহাসিক আবির্ভাব এবং ইতিহাসে তার বৈপ্লবিক ভূমিকার তাৎপর্য আমরা তত বুঝতাম না। সামন্ত বা বিভিন্ন প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক শৃঙ্খল ভেঙে ব্যক্তির আবির্ভাব ও তার তাৎপর্য বুঝতে পারা কঠিন ছিল। মনে পুষিয়ে রাখা শত্রু শত্রু ভাবের জন্য বুর্জোয়াকে ঘৃণা করতে হবে, এটাই বুঝতাম। কমরেডদের কাছ থেকে এতটুকুই বুঝতাম যে ধনী শ্রেণিকে বোঝাতেই ‘বুর্জোয়া’ কথাটার ব্যবহার। আমরা সেভাবেই অর্থ করতাম। এ থেকেই বুঝতাম কমিউনিস্টদের লড়াই ধনীদের বিরুদ্ধে। তো তারা খারাপ, আমরা ভালো। নৈতিক দিক থেকে এটা খুব আরামের আর নিজেকে এর জন্য খুব উচ্চস্তরের আদর্শবান মনে হতো। ধনী ও ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে শহুরে মধ্যবিত্ত মার্কা ঘৃণা মধ্যবিত্তের শ্রেণি চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
সেই ঘৃণাকে অযৌক্তিক বা মিথ্যা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশে এখনকার ধনিক শ্রেণির লুটতরাজ, ডাকাতি ও লুম্পেন চরিত্র দেখে ধনি শ্রেণিকে ভালোবাসা কঠিন বটে। মাত্রায়, চরিত্রে ও বৈশিষ্ট্যে আমাদের সময়কালের ধনীদের সঙ্গে এখনকার ধনীদের পার্থক্য আছে, কিন্তু ঘৃণা করার মতো যথেষ্ট গুণ তাদেরও বর্তমান ছিল।
ধনী শ্রেণির প্রতি এই ন্যায়সংগত বিদ্বেষ থাকে বলেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৃহৎ একট অংশ ধনীদের বিরুদ্ধে একটা নৈতিক অবস্থানে রাজনীতি করে। কমিউনিস্ট আন্দোলন শোষণ, লুটতরাজ ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে এই নৈতিক অবস্থানকে অস্বীকার করে না। নিপীড়িত শ্রমিক, কৃষক ও গরিবের দিক থেকে দেখলে একে অস্বীকার করার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবে কাজ হচ্ছে বাস্তব অবস্থাকে বাস্তব বৈশিষ্ট্য হিসেবে বুঝতে সহায়তা করা। শ্রমিক কৃষক সর্বহারাকে যেমন, তেমনি নৈতিক তাগিদ থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে রাজনীতিতে আসা তরুণ বিপ্লবীদেরও সামগ্রিকভাবে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক ও ব্যবস্থার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া ও সচেতন করাই কমিউনিস্টদের কাজ।
আরেকটি শব্দ হচ্ছে ‘প্রলিতারিয়েত’। এর অর্থ করা হতো শ্রমিক শ্রেণি। ‘বুর্জোয়া’ শব্দটির মতো এই ধারণাটিকে নিয়েও আমরা বিপাকে পড়তাম। যদি ‘বুর্জোয়া’ মানে ধনিক শ্রেণি আর প্রলিতারিয়েত মানে শ্রমিক হয়, তাহলে সেভাবে বললেই তো সহজ হয়, আলাদা করে শব্দ দুটি জারি রাখবার কী দরকার? নাকি ‘বুর্জোয়া’ ও ‘প্রলিতারিয়েত’-এর এমন কিছু অর্থ বা তাৎপর্য আছে যাকে কেবল মাত্র অর্থনৈতিক বর্গে নিষ্পন্ন করলে আসল মানে হারিয়ে যায়। আসলেই যায়। সেটা অনেক পরে নিষ্ঠার সঙ্গে কার্ল মার্ক্স পড়ে বুঝেছি।
সেই সময় টের পেতাম ‘বুর্জোয়া’ মানে স্রেফ ধনী না, আর ‘প্রলিতারিয়েত’ মানেও নিছক শ্রমিক না। ছাত্রাবস্থায় এ নিয়ে আমরা তর্ক করেছি, কিন্তু ফয়সালা করতে পেরেছি, তা হলফ করে বলতে পারব না। মার্ক্স, লেনিন বা মাওজে দং কীভাবে মানুষের জীবনের বৈষয়িক অবস্থা এবং চেতনাগত অবস্থার ফারাক কিংবা মিল বিচার করতেন এবং বিপ্লবী রণনীতি ও রণকৌশলে ব্যবহার করেছেন সে ব্যাপারে সত্তর দশক অবধি বাংলাদেশে কোনো স্পষ্ট ধারণা বামপন্থীদের ছিল না। তাদের লেখালেখি বইপত্রই তার প্রমাণ।
তখন মার্ক্স বা লেনিনের বই সহজে পাওয়া যেত না। প্রগতি প্রকাশনীর কিছু অনুবাদ পাওয়া যেত, চিনাদেরও নিজস্ব অনুবাদের কিছু বই ছিল। কিন্তু এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসার জন্য যে ধরনের মৌলিক বইপত্র হাতের কাছে থাকার দরকার, আমাদের তা ছিল না। ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি পুরো ষাট থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত এই দেশের ‘প্রগতিশীল’ বা ‘কমিউনিস্ট’ আন্দোলন বলতে বুঝত শ্রমিকের হয়ে ধনীদের বিরুদ্ধে লড়াই। বঞ্চিত মানুষদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। বিপ্লবের অর্থ ছিল শ্রমিক গরিব সর্বহারার পক্ষে ক্ষমতা ‘দখল’ করে সবাইকে সম্পদ সমানভাবে বিতরণ। ‘সাম্যবাদ’ কায়েম। উৎপাদনব্যবস্থা, উৎপাদন সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাখ্যার মূল ভারকেন্দ্র ছিল কীভাবে ধনিক শ্রেণি রাষ্ট্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। কীভাবে শ্রমিক কৃষকদের ন্যায্য পাওনা বা তাদের দ্বারা উৎপাদিত ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ শোষণ ও ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্র ভূমিকা রাখে। কীভাবে রাষ্ট্র জনগণকে সর্বহারায় পরিণত করে, আর সমাজের সম্পদ ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত করে। ফলে স্লোগান উঠত ‘এই রাষ্ট্র ভাঙতে হবে, এই রাষ্ট্র বুর্জোয়া রাষ্ট্র’। বিপ্লব মানে ‘শোষণহীন সমাজ’ কায়েম করা। শোষণ না হয় কিছুটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা বোঝা যেত। কিন্তু ‘শোষণহীন সমাজ’ মানে কী? গরু না মহিষ? তার কোনো কূলকিনারা বোঝা যেত না।
কমিউনিস্টরা শ্রমিক হয়ে কারখানায় কাজ নিত, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করত, শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলত, ইত্যাদি। সেই ক্ষেত্রে তাদের আত্মত্যাগ ও নিষ্ঠা ছিল অপরিসীম। শ্রমিক আন্দোলন শুধু নয়, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে বামপন্থীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। কিন্তু প্রগতিশীল আন্দোলন বলতে প্রধানত অর্থনৈতিকভাবে যারা ধনী তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বোঝাত। কমিউনিজমকে অনুবাদ করা হতো ‘সাম্যবাদ’। কিন্তু কোন অর্থে ও কীভাবে সেই সাম্য কায়েম হবে, সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। অর্থনৈতিক শ্রেণিভেদের বিলোপ ঘটিয়ে সবাইকে সমাজে অর্থনৈতিকভাবে একই কাতারে নিয়ে আসার অধিক কোনো চিন্তা সেই সময় ছিল তার প্রমাণ দেওয়া কঠিন। কমিউনিজম সমাজের বৈষয়িক অসাম্য নিরসন করে অর্থনৈতিকভাবে সবাইকে সমান মাত্রায় সম্পদশালী করার প্রতিশ্রুতি হিসেবেই জারি ছিল।

শ্রেণি চেতনা?
প্রায়ই মুশকিল বাধত ‘শ্রেণি চেতনা’ নিয়ে। বামপন্থী ও কমিউনিস্ট(?)দের সব সময়ই ‘চেতনা’ নিয়ে খুব বিব্রত হতে দেখেছি। শ্রেণি চেতনা অর্থনৈতিক স্বার্থবোধের অধিক কিছু অর্থ বহন করত না। অর্থনৈতিকভাবে কেউ একজন শ্রমিক হতেই পারেন। তাহলে শ্রমিকের চেতনা মানে কি সেই বাস্তবের শ্রমিকের মনমানসিকতা? সর্বহারার চেতনা? গ্রামে জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব মানুষ যখন শহরের বস্তিতে এসে মাথাগোঁজার জন্য একটা ঘর বাঁধে সর্বহারার চেতনা কি তাদের সব হারাবার বেদনা ও ধনীদের বিরুদ্ধে ক্রোধ? শ্রমিক বা সর্বহারার চেতনা বলতে আসলে এটাই ছিল প্রধান চিন্তা। এই যুক্তিতে কমিউনিস্টদের কাজ হয় শ্রমিক বা সর্বহারার মধ্যে ধনীদের বিরুদ্ধে ক্রোধ আরও উসকে দেওয়া এবং বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ধনীদের জমিজমা ধনসম্পত্তি দখল করে বঞ্চিতদের মধ্যে সমানভাবে বিতরণ। মালিকানা সম্পর্ক বদলে দেওয়া। সম্পত্তির মালিকদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সেই সম্পদ বঞ্চিতদের বিতরণ করা। ব্যাতিক্রম থাকতে পারে, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির চেতনা বলতে এর অধিক বোঝাত কি না তা এখন সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয়। সর্বহারা বা শ্রমিক শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত; সেই বঞ্চনার চেতনাই শ্রমিকের চেতনা। শ্রমিকের চেতনার অর্থ বড়লোক বা ধনীকে ঘৃণা করা, তাদের সম্পত্তি একদিন জব্দ করে সবাইকে বিলিয়ে দেবার স্বপ্ন দেখা। বামপন্থী দলগুলোর কথাবার্তা, কাজকর্ম, চলাফেরা জীবনযাপন সবকিছুর মধ্যেই তাদের এই ‘চেতনা’র প্রকাশ ঘটত।
কমিউনিস্ট হতে হলে সেই সময় জীবন যাপনে শ্রেণিচ্যুতির (de-class) কথা কমিউনিস্টরা বলতেন, নিজেরাও ধর্ম বিশ্বাসের মতো ত্যাগী বা সন্যাসীর জীবনকে কমিউনিস্ট আদর্শ হিসবে মানতেন। এর প্রকোপ সেই সময় বাংলাদেশে বেশি হওয়ার একটা বড় কারণ ছিল বাংলাদেশে যাদের হাত দিয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাদের প্রায় অনেকেই ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে আসা ত্যাগ বা সন্যাসব্রতকে উচ্চস্তরের আদর্শ হিসেবে গণ্য করতেন। ধর্মীয় ঐতিহ্য কমিউনিস্ট আন্দোলনেও ছাপ ফেলেছিল। অনেকে ব্রিটিশ বিরোধী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, ফলে পরমার্থিক উদ্দেশ্যে নিজেকে আত্মাহুতি দেওয়া কিংবা আত্মত্যাগের আদর্শ জীবনের ব্রত হিসেবে তারা মানতেন। মিতাচারী সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবনের আত্মপরায়ণ শক্তি অস্বীকার করার জো নেই। তাদের আড়ম্বরহীন জীবন তরুণদের অনুপ্রাণিত করত। মনে করা হতো, এটাই কমিউনিস্ট হওয়ার পথ।
কমিউনিজম ধনীর বিরুদ্ধে সর্বহারার লড়াই। সর্বহারা শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়ত, কারণ ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ আছে বলেই একশ্রেণির মানুষ সম্পত্তির মালিক, আর বাকিরা সম্পত্তিহারা। এই ক্ষেত্রে কালপ্রিট হচ্ছে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’। বাংলাদেশে ‘কমিউনিজম’-এর প্রধান লক্ষ্য হলো ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র উৎখাত। বাংলাদেশে ‘কমিউনিস্ট’ নামের আদর্শ এর অধিক ভাবতে অক্ষম ছিল। এখনো তার খুব একটা হেরফের হয়নি। যে কারণে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েম করতে চায় বলে যাঁরা নিজেদের ‘কমিউনিস্ট’ দাবি করতেন কিংবা এখনো করেন তাঁরা ধন, ধনোৎপাদন বা ধনীর প্রতি বিদ্বেষী; বিদ্বেষটাই প্রকট হয়ে ধরা পড়ে, পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা কীভাবে বাংলাদেশে শোষণ করে তার বিশেষ চরিত্রের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা সর্বহারা ও ধনীর মাঝখানে থেকে সব সময়ই আরও গরিব হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত থাকে তাদের এই ঈর্ষা ও ধনসম্পদ ও ধনী শ্রেণির প্রতি প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে পাশ্চাত্য দর্শনের সবচেয়ে বিকশিত ক্ষেত্র জার্মান ভাবাদর্শের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে কার্ল মার্ক্স ‘কমিউনিজম’কে যেভাবে ভেবেছিলেন তার সঙ্গে এই ধরনের মধ্যবিত্তসুলভ প্রতিক্রিয়ার সম্বন্ধ নাই বললেই চলে। তবে শ্রেণি চেতনা বা ইতিহাস চেতনা বলতে কার্ল মার্ক্স কি বুঝিয়েছিলেন তা নিয়ে তর্ক আছে। ব্যবহারিক রাজনীতিতে লেনিন বা মাও জে দং যেভাবে বুঝেছেন, তা মার্ক্সের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ সেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তর্ক আকারে রয়ে গিয়েছে।
‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র ওপর উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়েছি এ কারণে যে ‘ব্যক্তিগত মালিকানা’ আর ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ এক নয়। যদিও ইংরেজি Private Property-র অনুবাদ হিসেবে দুটোরই চল বাংলা ভাষায় আছে। আমাদের ছাত্রাবস্থায় এই দুটো ধারণা একই অর্থে ব্যবহার করা হতো। এখনো তার বিশেষ অন্যথা হয় না। নিজের ভোগের জন্য অনেক কিছুই আমার নিজের সম্পত্তি বলে বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু সেই অধিকার উৎখাতের কথা কমিউনিজম বলে না। কমিউনিজম মানেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্থাৎ নিজের ভোগের জন্য ধার্য সম্পত্তির অধিকার থেকেও উৎখাত এটা কার্ল মার্ক্সের ভাষ্য নয়।
অনেক কিছুই হয়তো একালে আর আগের মতো না। কিন্তু আমার মনে হয় না ধনী/নির্ধন অর্থনৈতিক বিভাজন এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎখাতের বাইরে চিন্তার দিক থেকে বাংলাদেশের বামপন্থা খুব একটা অগ্রসর হতে পেরেছে। এর দোষ পুরাটা বাংলাদেশের বলা যাবে না। বিপ্লবী শ্রেণি রাজনীতি নিজেও নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে। তদুপরি বৈষয়িক অবস্থা মানুষের চেতনাকে নির্ধারণ করে নাকি চেতনা বৈষয়িক অবস্থার নির্ণায়ক এই তর্কের চূড়ান্ত মীমাংসা হয়েছে বলে আমার জানা নাই। যদি বৈষয়িক অবস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে চেতনার কোনো ভূমিকা না থাকে তাহলে ইতিহাস-সচেতন অগ্রসর চেতনাসম্পন্ন কমিউনিস্ট পার্টিরও বা কী দরকার? পার্টি কথাটার অর্থই হচ্ছে কোনো না কোনো চেতনা অর্থাৎ মতাদর্শ, উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, অভিপ্রায়, প্রতিজ্ঞা বা সংকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংগঠিত তৎপরতা। যদি মানি যে পার্টি সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাতে পারে, তাহলে এটাও মানতে হয় যে মানুষের চেতনা বৈষয়িক অবস্থার বদল বা রূপান্তর ঘটাতে সম্ভব। চেতনা অবশ্যই ঐতিহাসিক কর্তা হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারে ও রাখে; বৈষয়িকতা যে অর্থে ইহলৌকিক এবং সত্য, ইতিহাসের কর্তাসত্তা হিসাবে চেতনাও ঠিক সেই অর্থেই বৈষয়িক ও সত্য। মানুষের কর্তাসত্তার ইতিহাস বদলানোর কিংবা মানবেতিহাসের বিশেষ অভিমুখ নির্ণয়ের ভূমিকা থাকে।

প্রশ্ন করার তাগিদ
এই প্রশ্নগুলো তুলছি বিপ্লবী রাজনীতির পুনর্গঠনের দরকারে। দর্শন বা চিন্তার ইতিহাস যেসব গোড়ার প্রশ্ন তুলেছিল তাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। তার জন্য আমাদের নিজেদের অন্তর্গত বিপ্লবী কর্তাসত্তাকে সব সময়ই সজাগ রাখা জরুরি। দরকার সব কিছুকেই পর্যালোচনা করবার হিম্মত অর্জন এবং বর্তমানের করণীয় নির্ধারণ। তার জন্য নিজের চিন্তাকে শাণিত করা। চিন্তা যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয় তাকে ধামাচাপা না দিয়ে মোকাবিলা করার সাহস ও শক্তি অর্জন জরুরি।
ছাত্রাবস্থায় আমরা যারা কমিউনিস্ট ইশতেহার মনোযোগ দিয়ে পড়েছি, তারা পদে পদে হোঁচট খেয়েছি। কারণ নতুন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি, যা কমিউনিজম সম্পর্কে প্রচলিত বা প্রথাগত ধারণার সঙ্গে মিলত না। অন্যদিকে মীমাংসার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা বা পরিমণ্ডল দরকার, সেটাও অনুপস্থিত ছিল।
কমিউনিস্ট ইশতেহার পড়তে গিয়ে প্রথমেই যে বাক্যটির ওপর প্রচণ্ডভাবে হোঁচট খেয়েছিলাম, সেটা হলো, ‘উৎপাদনের উপকরণে অবিরাম বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে এবং তাতে করে উৎপাদন সম্পর্ক ও সেই সঙ্গে সমগ্র সমাজ-সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি বাঁচতে পারে না’। বুর্জোয়া শ্রেণি যে ঐতিহাসিকভাবে বৈপ্লবিক শ্রেণি, এটা জোরের সঙ্গে মার্ক্স বলেছেন। যা ‘বুর্জোয়া’ সম্পর্কে আমাদের ধারণার সঙ্গে একদমই খাপ খেত না। এর পরের কয়েকটি ছত্রে বুর্জোয়া শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন মার্ক্স ও এঙ্গেলস। ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে কমিউনিজমের নামে যে ঈর্ষা, বিদ্বেষ প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখি তার কিছুই এখানে নাই।
আরও হোঁচট খেয়েছিলাম যখন ছাত্রাবস্থায় প্রথম পড়ি, ‘শ্রমিক শ্রেণির অন্য পার্টিগুলোর প্রতিপক্ষ হিসেবে কমিউনিস্টরা পৃথক পার্টি গঠন করে না’। দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্টদের আলাদা পার্টি গঠনের কথা কমিউনিস্ট ইশতেহার বলছে না। কেন করে না? কারণ ‘প্রলেতারীয় আন্দোলনকে রূপ দেওয়া বা গড়ে পিটে তোলার জন্য তারা (কমিউনিস্টরা) কোন গোষ্ঠীগত নীতি খাড়া করে না’। দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্ট দল গঠন করে কোন ‘গোষ্ঠীগত নীতি’চর্চা কমিউনিস্টদের কাজ নয়। কমিউনিস্টরা অবশ্য অধিকাংশ সময় এটাই করেছে, বা এটাই করে।  
ব্যক্তিগত মালিকানার প্রশ্নে আসি। কমিউনিস্ট ইশতেহার বলছে, ‘সাধারণভাবে মালিকানার উচ্ছেদ নয়, বুর্জোয়া মালিকানার উচ্ছেদই কমিউনিজমের বৈশিষ্ট্যসূচক দিক’। অর্থাৎ কমিউনিজমের লক্ষ্য হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের উচ্ছেদ। ‘বুর্জোয়া বলার মানে হলো একে শুধু অর্থনৈতিক অর্থে বুঝলে চলবে না। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্থেও বুঝতে হবে। যদি সমাজে আমিত্বের ভাব প্রবল থাকে, তাহলে ডিক্রি জারি করে ‘আমি’ বা ‘আমার’ নিরাকরণ ঘটানো যাবে না। তাহলে কমিউনিজম বললে কেন মনে করা হয় যে ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ চাওয়া হচ্ছে?
কমিউনিস্ট ইশতেহারের ব্যাখ্যা হচ্ছে, ‘শ্রেণি বিরোধের ওপর, অল্পলোকের দ্বারা বহুজনের শোষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন এবং উৎপন্ন দ্রব্যগুলিকে নিজেদের অধিকারভুক্ত করার ব্যবস্থার চূড়ান্ত ও পূর্ণতম প্রকাশ হলো আধুনিক বুর্জোয়া ব্যক্তিগত মালিকানা। এই অর্থে কমিউনিস্টদের তত্ত্বকে এক কথায় প্রকাশ করা চলে : ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ’। পুঁজি বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে যতই পরিণত রূপ নিচ্ছে ততই ব্যক্তিগত মালিকানা বিশেষ ঐতিহাসিক রূপ পরিগ্রহণ করছে। তাহলে মালিকানার এই পরিণত রূপের উৎখাত ঘটানোই অর্থাৎ বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিলয় ঘটানোই কমিউনিজমের লক্ষ্য। শুধু কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার থেকে উদাহরণ দিয়েছি, কারণ মার্ক্সের অন্য বই না থাকলেও এটা যেকোনো কমিউনিস্ট দাবিদারের কাছে থাকার কথা।
উদাহরণ দিচ্ছি তিনটি কারণে। এক. কমিউনিজম, ব্যক্তিগত মালিকানা, সমাজ, ইতিহাস, শ্রেণি, শ্রেণি চেতনা ইত্যাদি সম্পর্কে মনগড়া ধারণা দিয়ে বিপ্লবী রাজনীতির পুনর্গঠন সম্ভব নয়। যদি আমরা মার্ক্সের ছাত্র হতে চাই তাহলে নিষ্ঠার সঙ্গেই তাঁকে পাঠ করতে হবে। অনুমানে কথা বললে হবে না। এতে কমিউনিস্ট আন্দোলন আগায় না, পিছিয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, মার্ক্স আসলে কীভাবে ধারণাগুলো ব্যবহার করেছেন, তা মার্ক্সের সামগ্রিক লেখালেখি পর্যালোচনা করেই বুঝতে হবে। কারণ বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে একই পরিভাষা তিনি ব্যবহার করছেন কিন্তু তার অর্থভেদ আছে, এবং
তিন. বৈপ্লবিক রাজনীতির পুনর্গঠনের জন্য মার্ক্সের লেখালেখিরও পর্যালোচনা জরুরি। ইতিমধ্যে পৃথিবী বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে। মানুষের চিন্তা-চেতনারও অনেক বিকাশ ঘটেছে।

বুর্জোয়া শ্রেণি ও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব
‘বুর্জোয়া’ শব্দটি ফরাসি ভাষা থেকে আসা। কোন লেখায় শব্দটি কীভাবে ব্যবহার করা হলো তার ওপর শব্দটি কী বোঝায়, সেটা নির্ভর করে। মূলে বা আদিতে বোঝাত গ্রামের বিপরীতে শহরে যারা বিশেষ পৌর এলাকায় বাসিন্দা এবং পৌর আইনে বিশেষ সুবিধাভোগী। ইউরোপে ১১ শতাব্দী থেকে তাদের আবির্ভাব শুরু হয় আর ১২ শতাব্দীতে নগরায়ণের সময় থেকে গ্রাম থেকে শহরে মানুষ আসা শুরু করার পর রেনেসাঁর সময় থেকে তারা বিশেষভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করে। ‘বুর্জোয়া’ পরিভাষা হিসাবে ব্যবহার শুরু হয় ১৩ শতাব্দী থেকে। বুর্জোয়া সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করত। বুর্জোয়া শহরবাসী, কিন্তু সব শহরবাসী ‘বুর্জোয়া’ নয়, কারণ তারা বুর্জোয়ার আইনি অধিকার ভোগ করত না।
প্রাচীন যুগ (Ancient Regime) শেষ হচ্ছে আর নতুন যুগের আবির্ভাব ঘটছে, সেই সন্ধিক্ষণে ফ্রান্সের মধ্য যুগে নগরবাসী হিসেবে ‘বুর্জোয়া’ বিশেষ নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করত। ‘বুর্জোয়া’ বলতে তাহলে আদিতে তাদেরই বোঝাত, যারা পৌর আইনে বিশেষ ‘নাগরিক’ অধিকারের অধিকারী হয়ে শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য দোকানপাট কলকারখানা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। কিন্তু শুধু শুধু অর্থনৈতিক বর্গ হিসাবে বুর্জোয়াকে বুঝলে চলছে না। যে অধিকার আইনের দ্বারা সিদ্ধ (positive law) তার বাইরেও আইনে অনুপস্থিত (passive law) মানবিক অধিকার মানুষের আছে বুর্জোয়া শ্রেণি সে অধিকার ধারণ করে। যে কারণে আমরা দেখি ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে যে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে, তার আদর্শিক ভিত্তি ‘মানুষ ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণা’ (Declaration of the rights of Man and of the Citizens (১৭৯৩) এই ঘোষণা ইতিহাসে বিখ্যাত। এই ঘোষণায় কেন মানুষের অধিকারের কথা নাগরিক অধিকার থেকে আলাদা করে বলতে হলো, সেটা আইনের দ্বারা সিদ্ধ ও আইনে অনুপস্থিত অধিকারের পার্থক্য মনে রাখলে আমরা বুঝব।
‘মানুষ ও নাগরিক অধিকার’ ঘোষণা মূলত বুর্জোয়া শ্রেণির ভাবাদর্শিক ও রাজনৈতিক ঘোষণা। ন্যূনতম যেসব মানবিক ও নাগরিক অধিকার স্বীকার করলে কাউকে ‘বুর্জোয়া’ বলা যায় তার মানদণ্ড হচ্ছে ফরাসি বিপ্লবের ঘোষণা। ফরাসি বিপ্লবে বুর্জোয়া শ্রেণি শুধু নেতৃত্ব দিয়ে ক্ষান্ত থাকেনি, এই ঘোষণা এবং ঘোষণার ভিত্তিতে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, যে কারণে বিপ্লবের চরিত্রটিও ছিল বুর্জোয়া। কমিউনিস্টরা একেই ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করে। বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে ফরাসি বিপ্লব থেকে যে শিক্ষা কমিউনিস্টরা নেয় তার তাৎপর্য হচ্ছে যেসব দেশে বুর্জোয়া নাগরিক ও মানবিক অধিকার এখনো কায়েম হয়নি, সেসব দেশে তাদের সাংবিধানিক বা গঠনতান্ত্রিক আইনসিদ্ধ অধিকার হিসাবে নাগরিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। যেসব দেশে বুর্জোয়া শ্রেণি দুর্বল কিম্বা এই অধিকার কায়েমে অক্ষম কমিউনিস্টদের কাজ হচ্ছে তাদের নেতৃত্বে ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ সম্পন্ন করা। এই অধিকারকে সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়ার জন্য নতুন গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম। বুর্জোয়া বিপ্লবের জন্য কমিউনিস্টদের ‘শ্রমিক আর কৃষকের বৈপ্লবিক মৈত্রী’ গড়ে তুলতে হবে। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা এই নীতি অনুসরণ করেছিল।
এখানে বোঝার বিষয় হচ্ছে আমাদের মতো দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্বে বুর্জোয়া শ্রেণি না থাকলেও বিপ্লবের চরিত্র ‘বুর্জোয়া’ই হবে। কারণ বুর্জোয়া নাগরিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই তার আশু উদ্দেশ্য। অতএব সেটাও হবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। ‘বুর্জোয়া’ কথাটি বাদ দিলে আমরা তাকে গ্রেফ বলতে পারি ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব’। লেনিনও গণতান্ত্রিক বিপ্লবই করেছিলেন। কিন্তু তিনি নতুন একটি যুক্তি দিলেন। সেটা হলো কমিউনিস্ট পার্টি যদি সক্ষম হয়, তাহলে শুধু গণতন্ত্রে সন্তুষ্ট থাকবে কেন, সরাসরি ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েম করুক। এটা রাজনৈতিক দর্শন ও বিপ্লবের ইতিহাসে খুবই বড়সড় তর্ক হয়ে আছে।
রাজনৈতিক ক্ষমতার একটা ব্যাখ্যা লেনিন দাঁড় করিয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক বিপ্লবে রাজনৈতিক ক্ষমতা শ্রমিক ও কৃষকের বৈপ্লবিক মৈত্রীর ওপর নির্ভর করে। গণতন্ত্র মানে সবার জন্য গণতন্ত্র নয়, কৃষকের ও শ্রমিকের জন্য গণতন্ত্র, কিন্তু যারা শ্রমিক এবং বঞ্চিত চাষাভূষাদের স্বার্থের বিরোধী, তাদের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্র। একই যুক্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার দিক থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ বলতে লেনিন বুঝিয়েছিলেন শ্রমিক শ্রেণির নিজেদের জন্য গণতন্ত্র, কিন্তু অন্য সব শ্রেণির জন্য একনায়কতন্ত্র। সোভিয়েত রাশিয়ার পতন ক্ষমতা সম্পর্কে লেনিনের এই ধারণার মধ্যে নিহিত ছিল কি না সেটা রাজনৈতিক দর্শন ও ব্যবহারিক রাজনীতির অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিসাবে এখনো হাজির রয়েছে। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার উপায় হচ্ছে ‘বুর্জোয়া’ আকাঙ্খাকে পূর্ণভাবে আমলে নেওয়া। মানুষ ‘স্বাধীন’ এই বুর্জোয়া চেতনাকে গায়ের জোরে দাবিয়ে রেখে ইতিহাস সামনে অগ্রসর হতে পারেনি, বহু রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে সেটা বোঝা গিয়েছে। আগামী দিনের বৈপ্লবিক রাজনীতি পুনর্গঠনের জন্য এই শিক্ষা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে এটাও ঠিক যে ‘মুক্তি’, ‘স্বাধীনতা’ ইত্যাদি ধারণার পর্যালোচনা জরুরি। অবশ্যই। তাদের সীমা ও সম্ভাবনার বিচার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একে ‘বুর্জোয়া’ বলে ‘ধরো তক্তা মারো পেরেক’ জাতীয় রাজনীতি দিয়ে দমন করা যায় না; লাফ দিয়ে অতিক্রম করে যাওয়াও অসম্ভব। তাহলে মানবেতিহাসে ‘স্বাধীন ব্যক্তি’র ভূমিকা ভালোভাবে বোঝার দরকার। পুঁজির সঙ্গে তার সম্বন্ধের জায়গাও সব দিক থেকে বিচার করা জরুরি। ব্যক্তির ‘ব্যক্তিত্ব’ যেমন পুঁজির দ্বারা নির্ধারিত, একইভাবে তার মুক্ত ও স্বাধীন কর্তাসত্তা পুঁজিতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরোধিতাও করে। ব্যক্তি এই সম্ভাবনাও সমান মাত্রায় ধারণ করে। সেই কর্তাসত্তার উদ্বোধনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতা বাংলাদেশে কি হবে? সেটাই প্রশ্ন। একে আমলে না নিয়ে নতুন বৈপ্লবিক রাজনীতির পুনর্গঠন সম্ভব কি না সন্দেহ।
‘ব্যক্তি’ বহুকাল ধরেই দর্শনের কেন্দ্রীয় বিষয়। বুর্জোয়া বিশ্ব ব্যবস্থা আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে। বুর্জোয়া সমাজে মানুষ নিজেকে ‘স্বাধীন’ গণ্য করা ও ব্যক্তি অধিকারের সম্পর্কে সচেতন থাকাই স্বাভাবিক। অসচেতনতা শুরু হয় নিজের অধিকার রক্ষা করতে চাইলে অপরের অধিকার আমরা স্বীকার করতে চাই না। এখানেই অসচেতনতা। মানুষ নিজেকে ‘মুক্ত’ উপলব্ধি করতে চায়, স্বাধীনতার স্বাদ চায়। শুধু উপলব্ধি করে ক্ষান্ত থাকে না, তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রূপও দেখতে আগ্রহী। তাহলে মুক্তির এই আকাক্সক্ষা, তাগিদ ও স্বাদকে দাবিয়ে রেখে ইতিহাসের বুর্জোয়া কাল্পর্ব অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব কি না সেটাই একালের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নিজেরটা চাইতে হলে একইভাবে পরের অধিকার ও অপরের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে সক্রিয় থাকতে হয় এটা বোঝানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। এতে বোঝা যায়, বুর্জোয়া যুগ অতিক্রম করার ঐতিহাসিক শর্ত আসলে এখনো তৈরি হয়নি। বাংলাদেশে বুর্জোয়া পর্বই এখনো এল না, এর পরের আশা আকাশকুসুম মাত্র।
শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে মাও জে দং চিন দেশে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার নাম দিলেন ‘জনগণতান্ত্রিক’ বা ‘নয়া গণতান্ত্রিক’ বিপ্লব। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এটা নতুন ধরন। আমরা তরুণ বয়সে মাও জে দং-এর নীতি ও কৌশলের প্রতি প্রবলভাবে আকর্ষণ বোধ করার কারণ হচ্ছে চীনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে জনগণকে সংগঠিত করার দর্শন ও কৌশল আমাদের মতো দেশেও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বাংলাদেশে সম্পন্ন করা বাংলাদেশে সম্ভব হয়নি।

মার্ক্সের পরিভাষা হিসেবে ‘বুর্জোয়া’
মার্ক্স শুরুর দিকে হেগেলকে অনুসরণ করছিলেন। আমরা এখন যা বুঝি হেগেল  ‘নাগরিক সমাজ’, ‘সিভিল সোসাইটি’, ‘সিভিল সমাজ’ বলতে মোটেও সেটা বুঝতেন না। বুঝতেন আইন ও রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে স্বার্থপর ব্যক্তিদের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা হিসেবে; সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ স্বার্থপর ব্যক্তির ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার আর্থসামাজিক ক্ষেত্র। ধারণা হিসেবে নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের ধারণার অধীন। আইন ও রাষ্ট্র সম্পর্কে হেগেলের সামগ্রিক ধারণার আলোকে সেটা বুঝতে হবে। তবে সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি, যেখানে ব্যক্তি ও পরিবার তাদের বৈষয়িক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য হাজার কর্মকা-ে নিয়োজিত থাকেন, হেগেল সে ধারণাকেই তার অধিকার শাস্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্গ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সিভিল সোসাইটির বিপরীতে রাষ্ট্র হচ্ছে বিশেষ বিশেষ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবার সর্বজনীন ইচ্ছা ও অভিপ্রায় পূরণের জায়গা। হেগেলের সিভিল সোসাইটি বুঝতে চাইলে সাধারণত সমাজ বলতে আমরা যা দেখি ও বুঝি, সেটা মনে রাখলে সুবিধা হতে পারে। সমাজ আমাদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জায়গা, মানুষের নৈতিকতা তার আপন তাগিদে তাড়িত হয়ে সমাজ থেকেই উদ্ভূত হয়ে রাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহণ করে হেগেল সেটাই তার অধিকারশাস্ত্রের দর্শনে দেখাতে চেয়েছেন। রাষ্ট্র নৈতিকতার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা; নীতি ও অধিকার বোধের যৌক্তিক পরিণতি।
তাহলে সিভিল সোসাইটি ( জার্মান ভাষায় burgerliche Geesellschaft) স্বার্থপর ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জায়গা, এই ধারণা অধিকারশাস্ত্রের বিচার ও রাষ্ট্রচিন্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এখানে, এই আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে, তার বিশেষ ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করে। নীতিতাড়িত সর্বজনীন বা সামষ্টিক বিবেচনা থেকে এই স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠতে গিয়ে মানুষ রাষ্ট্র গড়ে তোলে। নৈতিক আদর্শের পরিণত রূপ রাষ্ট্রের বিপরীতে হেগেল নাগরিক সমাজকে স্বার্থপরতা চরিতার্থ করার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিস্থাপন করেছিলেন।
হেগেলের ছাত্র হওয়ার কারণে বুর্জোয়া বলতে মার্ক্স তরুণ বয়সের লেখালেখিতে স্বার্থপর সমাজে ব্যক্তির ছোটলোকি স্বার্থপরতাই বুঝতেন। বাংলাদেশে আমরা তরুণ বয়সে স্বার্থপর ধনী শ্রেণিকে যেভাবে বুঝতাম, ১৮৪২ সালের দিকে মার্ক্স আইন ও দর্শনের বাইরে সবে যখন ‘বৈষয়িক’ বিষয়াদি নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন, তখন তাঁর বোঝাবুঝি আমাদের চেয়ে আলাদা কিছু ছিল না। রাইনল্যান্ডের যেসব অর্থশালীরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিরোধী ছিল তাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে মার্ক্স মন্তব্য করছেন: ‘আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে বুর্জোয়াদের, নগরবাসীদের (citoyen) না’। নগরায়ণ সামন্ত অর্থনীতির বদল ঘটাচ্ছে, তাকে তিনি ইতিবাচক ভাবছেন, কিন্তু ‘বুর্জোয়া’ তখনো তার কাছে খারাপ, ছোটলোক, সংকীর্ণ। ফরাসি নাট্যকার মলিয়ের (১৮২২-৭৩) কিম্বা হেনরিক ইবসেন (১৮২৮-১৯০৬) যেভাবে বুর্জোয়াদের হীনম্মন্য, সংকীর্ণ আর টাকা দিয়ে সম্মান আর আভিজাত্য কিনে নেওয়ার জন্য কাতর চরিত্রে রূপ দিয়েছিলেন মার্ক্সের ফরাসি ভাষা থেকে ধার করা ‘বুর্জোয়া’ পরিভাষাটির ব্যবহার সেই সময়ের সাহিত্যিক অনুষঙ্গ থেকে খুব আলাদা ছিল না। মার্ক্স তখনকার প্রচলিত ধারণা থেকে ভিন্ন কিছু ভাবছিলেন বলে মনে হয় না। বুর্জোয়া তাঁর প্রথম দিকের লেখালেখিতে স্বার্থপর সম্পত্তিবান শ্রেণি। এই শ্রেণির হীনম্মন্য ও সংকীর্ণ মানসিকতাকে মার্ক্স সমাজের বৃহত্তর বৈপ্লবিক আকাক্সক্ষা বা সর্বজনীন আকুতির বিপরীতে স্থাপন করেছিলেন।
শুরুতে মার্ক্স লেখালেখি করছিলেন বন থেকে  কাঠ চুরি নিয়ে আইনসভার তর্ক-বিতর্কে গরিবদের পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে। কিন্তু ১৮৪২-৪৩-এর দিকে লিখতে গিয়ে তাঁর মনে হলো এই ধরনের বৈষয়িক বিষয় বোঝার মতো পড়াশোনা তাঁর নেই। অর্থশাস্ত্র নিয়ে তিনি তখনো পড়াশোনা করেননি। নিজের বোঝাবুঝির এই অভাববোধ তাঁকে আইন ও দর্শন থেকে অর্থশাস্ত্র পাঠ ও পর্যালোচনায় প্রতি আগ্রহী করে তুলল। এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা। নিজের জীবনের এই কালপর্ব সম্পর্কে মার্ক্স নিজেই লিখছেন, পত্রিকার বনের কাঠ চুরি নিয়ে লেখালেখির সময় তিনি ‘প্রথম নিজেই খুব বিব্রত বোধ করলেন’ আর এটাই তাঁকে ‘অর্থনৈতিক প্রশ্ন’গুলোর দিকে নজর ফেরাতে বাধ্য করল (দেখুন, ১৮৫৯ সালের অর্থশাস্ত্র পর্যালোচনা ক্ষেত্রে একটি সংযোজন (A Contribution to the Critique of Political Economy)।
তবে ১৮৪৫-৪৪ এর সময় থেকে ‘বুর্জোয়া’ সম্পর্কে তাঁর ধারণা বদলাতে শুরু করে। বুর্জোয়া ফ্রান্সের সামন্ত সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, সেটা তিনি দ্রুতই টের পেয়েছিলেন। এটা তিনি পেরেছিলেন কারণ তত দিনে তিনি অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণিকে বোঝার কাজে এগিয়ে গিয়েছিলেন। ‘সাধারণভাবে ফরাসি অভিজাত শ্রেণি এবং ধর্ম যাজকদের ইতিবাচক চরিত্র বোঝা যায় পাশাপাশি বুর্জোয়া শ্রেণিকে দিয়ে, যারা তাদের  বিরোধী’। (Marx, ১৮৪৪) যাজক ও সামন্ত শ্রেণির বিপরীতে বুর্জোয়া ইতিবাচক। এর চার বছর পর কমিউনিস্ট ইশতেহারে আমরা বুর্জোয়া সম্পর্কে একদমই নতুন ধরনের কথা শুনি।
‘বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সমানে চলেছিল সে শ্রেণির রাজনৈতিক অগ্রগতি। এই যে বুর্জোয়ারা ছিল সামন্ত প্রভুদের আমলে একটা নিপীড়িত শ্রেণি, মধ্যযুগের কমিউনে যারা দেখা দেয় একটা সশস্ত্র ও স্বশাসিত সংঘ রূপে, কোথাও বা স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক নগর রাষ্ট্র (যেমন ইতালি ও জার্মানিতে) আবার কোথাও বা রাজতন্ত্রের করদাতা “তৃতীয় মণ্ডলী” রূপে (যেমন ফ্রান্সে), তারপর হস্তশিল্প পদ্ধতির প্রকৃত পর্বে যারা আধা সামন্ততান্ত্রিক বা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের সেবা করে অভিজাতবর্গের বিরুদ্ধে সমভার শক্তি হিসেবে, সেই বুর্জোয়া শ্রেণি অবশেষে আধুনিক শিল্প ও বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠার পর আজকালকার প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রের মধ্যে নিজেদের জন্য পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করে নিয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রের শাসকমণ্ডলী হলো সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কাজকর্ম ব্যবস্থাপনার একটা কমিটি মাত্র ঐতিহসিকভাবে বুর্জোয়া শ্রেণি খুবই বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে।’ (কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, ১৮৮৮)।
ঐতিহাসিকভাবে বুর্জোয়া শ্রেণি খুবই বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে-মার্ক্সের লেখায় বুর্জোয়ার এই ভূয়সী প্রশংসা শুনতে আমরা অভ্যস্ত না। যে কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ধনোৎপাদন ইত্যাদি সম্পর্কে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের বামপন্থার মধ্যে নেতিবাচক। বলাবাহুল্য, এই পর্যালোচনাহীন নেতিবাচক অজ্ঞতার সঙ্গে মার্ক্সের কিম্বা কমিউনিস্ট ইশতেহারের বিশেষ সম্পর্ক নেই। ফলে বাংলাদেশে বুর্জোয়া শ্রেণির সম্ভাব্য ইতিবাচক ঐতিহাসিক ভূমিকা কী হতে পারে, সে সম্পর্কে যথেষ্ট পর্যালোচনা আমরা করিনি। করার কর্তব্যবোধও জাগেনি। গতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য প্রাক্-পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বৈপ্লবিক রূপান্তর দরকার, সেই কর্তব্য নিয়ে যথেষ্ট ভাবিনি। এর জন্য কমিউনিস্টদের উপযুক্ত নীতি ও কৌশল গড়ে তোলা যায়নি। বরং যারা কিছুটা বুঝেছে, তার নির্ভর করেছে বাংলাদেশের লুটেরা ও লুম্পেন বুর্জোয়া শ্রেণির ওপর। লেনিনের ভাষায় পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের দ্রুত ও ত্বরান্বিত’ বিকাশ নিশ্চিত করা এবং গতিশীল ও শক্তিশাল জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার  ক্ষেত্রে বামপন্থী আন্দোলন সব সময়ই বাধা বা নুইসেন্স হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
মার্ক্স ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে ক্ষান্ত থাকেননি, তাঁর হাতে হেগেলের ‘সমাজ’ (burgerliche Geesellschaft) সংক্রান্ত ধারণার আমূল বদল ঘটে। নাগরিক ও মানবিক অধিকার হেগেল বিমূর্ত নীতিনৈতিকতার বিষয় হিসেবে হাজির করেছিলেন। ব্যক্তির ‘স্বাধীনতা’, ‘অধিকার’ ইত্যাদি ছিল বিমূর্ত ধারণা। এমন বিমূর্ত রাষ্ট্রের ধারণা আগে অনুমান করে নিয়ে হেগেল ‘অধিকার’-এর ধারণা তাঁর অধিকার শাস্ত্রের দর্শন গ্রন্থে নিষ্পন্ন করেছেন। মার্ক্স দেখালেন রাষ্ট্র আসলে বুর্জোয়ার অর্থাৎ এই স্বার্থপর মানুষের নিজ নিজ ব্যক্তিস্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল হিসেবে গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রের কাজই হচ্ছে ব্যক্তির বৈষয়িক স্বার্থ রক্ষা করা। রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বার্থপরায়ণতারই অভিপ্রকাশ মাত্র, ব্যক্তিগত মালিকানার ওপর গড়ে ওঠা সমাজ যার বৈষয়িক ভিত্তি। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি বিশেষ শ্রেণির স্বার্থই রাষ্ট্র রক্ষা করে আর সেই শ্রেণি হচ্ছে যারা পুঁজির মালিক। ব্যক্তিগত সম্পত্তির এই বিশেষ ধরনই আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহণ করে। পুঁজির মালিকেরাই আধুনিক রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ণয় করে। মার্ক্স লিখেছেন, ‘সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব’ বুর্জোয়া শ্রেণির এই বিশেষ সম্পত্তির ধরনেরই বিপ্লব। এই বিপ্লবে ‘মানুষ সম্পত্তি থেকে স্বাধীন হয়নি, সম্পত্তির মালিক হওয়ার স্বাধীনতা লাভ করেছে’ (Marx, ১৮৪৪, p. ১৬৭)।
এই কারণে কমিউনিস্ট ইশতেহারে ‘বুর্জোয়া’ কথাটা পুঁজির প্রতিনিধি বা পুঁজির স্বভাব যে শ্রেণির মধ্যে ‘কর্তা’ রূপে প্রকাশিত হয়, সেই অর্থে মার্ক্স ব্যবহার করেছেন। কিন্তু করেছেন এমনভাবে যাতে পরিষ্কার এই বুর্জোয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকা বিপ্লবী হলেও এই শ্রেণি ইতিহাসে চিরকাল থাকার জন্য আসেনি। সামন্ত শ্রেণির মতো তার বিলয়ও ঐতিহাসিক বিকাশের গতিপ্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত। সেটা ঘটবে তার বিপরীতে যে নতুন বিপ্লবী শ্রেণি গড়ে উঠবে তার দ্বারা।
বিপ্লবের নতুন কর্তা হিসেবে মার্ক্স কারখানার শ্রমিকদের  কথা ভেবেছেন। শ্রমিক শ্রেণি নতুন বিপ্লবী শ্রেণি। এখানেই অর্থনৈতিক শ্রেণি আর ইতিহাস সচেতন রাজনৈতিক কর্তাসত্তার তর্কটা ক্রমে ক্রমে একালে সামনে চলে আসে। শ্রমিক শ্রেণি বাস্তবে আদৌ একালে বিপ্লবের কর্তা কি না, তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক আছে। তর্কটা বৈষয়িক অবস্থা মানুষের চেতনা নির্ণয় করে নাকি চৈতন্য বৈষয়িকতার-সেই গোড়ার দার্শনিক তর্কের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিক থেকেও তর্ক আছে। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের সমাজতন্ত্রে রূপান্তর স্রেফ বিপ্লবী কর্তাসত্তার মামলা না। শ্রমিক শ্রেণি বিপ্লবী হলেও তারা ঐতিহাসিকভাবে ব্যর্থ হবে, যদি উৎপাদন শক্তির বিকাশ না ঘটে। বিকাশ এমন পর্যায়ে যেতে হবে, যাতে বিপ্লবী রূপান্তরের বৈষয়িক শর্ত তৈরি হয়।
এই তর্কগুলো আমরা আপাতত এখন করব না। আগামী কোনো লেখার জন্য তুলে রাখলাম। বলাবাহুল্য, বিপ্লবের কর্তাসত্তা একালে কীভাবে তৈরি হয় আর বাস্তবে সেই কর্তা কারা এই প্রশ্নের সুরাহা ছাড়া একালে বৈপ্লবিক রাজনীতির পুনর্গঠন অসম্ভব।
৬ জুন ২০১৭। ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪। শ্যামলী।

Disconnect