ফনেটিক ইউনিজয়
বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রসঙ্গে
সলিমুল্লাহ খান

‘ভবিষ্যতের একটা বাস্তব পরিকল্পনা না থাকলে প্রকৃত অতীত রহস্যের উদঘাটনও সম্ভব নয়। কেননা প্রকৃত অতীতের ওপরই সত্যিকারের ভবিষ্যতের ভিত্তি।’ -আহমদ ছফা (১৯৮১: ৮৬)


১৯৭১ সালেÑবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়Ñকলিকাতা হইতে সিকান্দার আবু জাফর ‘অভিযান’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করিয়াছিলেন। এই পত্রিকায় প্রকাশিত আহমদ ছফার একটি প্রবন্ধের নাম ‘বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গে’। নিবন্ধটি ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তাঁহার ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নামক প্রবন্ধ সংকলনেও স্থান পাইয়াছে। দুঃখের মধ্যে, এই নিবন্ধটি অনেকের- এমনকি আহমদ ছফার একান্ত অনুরাগীদেরওÑদৃষ্টি এড়াইয়া গিয়াছে। যাওয়া উচিত হয় নাই। এই নিবন্ধের এক জায়গায় আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘যে কোন জাতির জন্য আদর্শবদ্ধ দুঃখের হিমশীতল স্পর্শের চাইতে মহৎ শিক্ষা আর কিছু হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ যাঁরা লড়াই করছেন সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন [এবং] হবেন। অনেকে প্রিয়জন বিসর্জন দিয়েছেন, দিচ্ছেন এবং দেবেন। বাঙ্গালি জাতি সামগ্রিকভাবে এমন আত্মবিসর্জন ইতিহাসের আর কোন পর্যায়ে করেনি। এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই অন্ধবিশ্বাসের মরচে প্রচণ্ড বাস্তব আঘাতের মুখে ঝরছে এবং চরিত্রের যা সত্যিকার শক্তি তা সৃষ্টিশীলতায় বিকাশলাভ করছে। এই লড়াই প্রচন্ড একটা ধাক্কা দিয়ে বাংলার ইতিহাসের ভরকেন্দ্র ঢালাই হওয়া মানুষদের সমাজ থেকে বাংলার পাললিক মৃত্তিকার আসল সন্তানদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে। বাংলাদেশে যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় আসন্ন হয়ে উঠেছে তার স্থপতি বাংলার জনসাধারণ।’ (ছফা ১৯৮১: ৮৭)
‘ঢালাই হওয়া মানুষ’ বলিতে আহমদ ছফা ঠিক কি বুঝাইয়াছেন তাহার একটুখানি আলোচনা আশা করি অপ্রাসঙ্গিক মনে হইবে না। ‘বাঙ্গালি গড়ে ওঠেনি, ঢালাই হয়েছে’Ñপ্রমথ চৌধুরীর নামে প্রচলিত এই সারবান উক্তিটি চয়ন করিবার পর পর আহমদ ছফার মন্তব্য ছিল, ‘বাঙ্গালি সমাজের কোন অংশ ঢালাই হয়েছে সে বিষয়ে চৌধুরী মহাশয় অধিক কিছু না বললেও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ধরে নেয়া যায়, বিভিন্ন সময়ে রাজশক্তির আনুকূল্য করেছে যে সকল শ্রেণি তারাই ঢালাই হয়েছে, বাংলাদেশের আসল মানুষের গায়ে আঁচড়ও লাগেনি।’ (ছফা ১৯৮১: ৮৬)
সোজা কথায়, আহমদ ছফা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে শুধু একটা জাতির ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলিয়াই ছাড়িয়া দেন নাই, ইহার মধ্যে তিনি একটা অন্তর্গত শ্রেণি সংগ্রামও আবিষ্কার করিয়াছিলেন। আর দশ কথার ফাঁকে ফাঁকে তিনি একথাও লিখিতে কসুর করেন নাই: ‘উনসত্তর সালের আইয়ুব খেদানো আন্দোলনের পর থেকে বাংলার সাধারণ মানুষের মনে এ প্রতীতি জন্মেছে যে ইতিহাসসৃজনে তার নিশ্চয়ই প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। সে বোধ এখন রণক্ষেত্রে পরীক্ষিত হচ্ছে। বাংলার জনগণই বাংলাদেশ স্বাধীন করছে এবং বাংলার জনগণই তার সমাজ বিন্যাসে রূপান্তর আনবে। এই সাধারণ মানুষরাই এখন বাংলার ইতিহাসের নায়ক।’ (ছফা ১৯৮১: ৮৮)
আহমদ ছফাকে কথাটার প্রচলিত অর্থে ‘ইতিহাস ব্যবসায়ী’ বলা চলিবে না; তবে তাঁহার এই বিচার আমাদের ইতিহাস ব্যবসায়ের গোড়ালি ধরিয়া টান দিয়াছে। ইতিহাস অতীতের কাহিনী মাত্র নহে, ইতিহাস বলিতে ভবিষ্যতও বোঝায়। আহমদ ছফা মোটের উপর এই সংবাদই দিতেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই সেই ভবিষ্যত যাহার দৌলতে এদেশের অতীত ইতিহাসও নতুন আলোকে বিচারের যোগ্য হইয়া উঠিয়াছে। আহমদ ছফা সেই কথাই স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়াছেন। তাঁহার কথা হইতে আরো একটু উদ্ধার করার দরকার আছে। তিনি লিখিয়াছেন, ‘জগৎসভায় বাঙ্গালি ভাবের ক্ষেত্রে এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে আসন পেয়েছে। এবার জাতি হিশেবেও প্রতিষ্ঠা পেতে যাচ্ছে। রাশিয়ান, আমেরিকান, চিনা এবং জাপানিদের মতো বাঙ্গালিও ধ্যানসমৃদ্ধ, শক্তিপ্রবুদ্ধ একটা জাতি। সে অপরের চাইতে ছোট নয় এবং অপরকেও ছোট ভাবে না। এই বোধ বাঙ্গালি সমাজে দাবানলের মতো দ্রুত সঞ্চারিত হতে লেগেছে এবং নতুন করে বেঁচে উঠছে বাঙ্গালি। এই নবজাগৃতি তার প্রকৃত ভবিষ্যতের চিত্রলেখা রচনা করেছে।’ (ছফা ১৯৮১: ৮৮)
যে জাতির ভবিষ্যত নাই, তাহার অতীতকে লইয়া ভয় থাকিবেই। কিন্তু যে জাতির ভবিষ্যত এখন গঠনের পথে অতীত লইয়া তাহার হীনমন্যতা থাকিব কেন? আহমদ  ছফার মতে এতদিন পর্যন্ত যাঁহারা বাংলার ইতিহাস লিখিয়া আসিতেছিলেন তাঁহারা প্রমথ চৌধুরী কথিত সেই ঢালাই হওয়া মানুষেরই দল। ইহারা পুরানা যুগেরÑরদ হওয়া আমলেরÑস্মৃতিচিহ্ন মাত্র। আহমদ ছফার কথাই যদি পুনশ্চ বলি, ‘এই ঢালাই হওয়া মানুষেরাই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক বাঙ্গালি সমাজের সংস্কৃতিতে লাবণ্যের সঞ্চার করেছেন। বাঙ্গালি মনের পরিধি বিস্তার করেছেন। বাংলার ইতিহাসও লিখেছেন তাঁরাই। তার ফলে দেখা যাবে ইতিহাসে ঢালাই হওয়া মানুষদের রুচি এবং দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পেয়েছে।’ (ছফা ১৯৮১: ৮৬)
মুক্তিযুদ্ধের অলাতচক্রের মধ্যখানে মধ্যক্ষণে দাঁড়াইয়া আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন: ‘সুতরাং অতীতকে নিয়ে ভয় নেই। আর্য না হলে দোষ নেই। ইরানি, তুরানি, আরব পরিচয় দেয়া গৌরবের পরিচায়ক নয়। বাংলার মাটির সাক্ষাৎসন্তান স্বীকার করে নিয়েও আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশে একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ধর্মগত, সম্প্রদায়গত, দেশগত সংকীর্ণতার বেঢপ চশমা এঁটে অতীতের পানে তাকাবার প্রয়োজন বাংলাদেশে অবসিত।’ (ছফা ১৯৮১: ৮৮)


আহমদ ছফার অন্যূন তিরিশ বছর আগে লেখা একটি প্রবন্ধে মোটের উপর একই সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়াছিলেন সেকালের তরুণ ইতিহাস ব্যবসায়ী আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ (১৯১১-১৯৮৪)। বাংলা ১৩৫০ সালের কথা। তখন কলিকাতা হইতে প্রকাশিত ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ ‘বাংলার মুসলমান’ নামে একটি নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ লিখিয়াছিলেন। নিবন্ধটি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তাঁহার ‘সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস’ নামক প্রবন্ধ সংকলনের অন্তর্গত হইয়াছে। হবিবুল্লাহর এই প্রবন্ধে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাহার অপূর্ব একটা পূর্ব ইতিহাস লেখা হইয়াছে। সেই দিক হইতে বিচার করিলে আহমদ ছফার লেখার সহিত তাঁহার লেখার একটা অন্তর্গত মিলনও ঘটিয়াছে। আমার আজিকার নিবেদন মাত্র এই কথাটাই।
সকলেই জানেন, আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ ইংরেজি ১৯৪৫ সাল নাগাদ ইংরেজি ভাষায় ‘ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্বের ভিত্তি’ নামে বেশ একখ- কেতাব প্রকাশ করিয়াছিলেন। ‘চতুরঙ্গে’ প্রকাশিত তাঁহার ‘বাংলার মুসলমান’ প্রবন্ধটি ঐ যুগেরই রচনা। আকারে ছোট হইলেও এই প্রবন্ধে তিনি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার বিষয় কিন্তু বিশাল। এই প্রবন্ধের নাম ‘বাংলার মুসলমান’ না হইয়া যদি হইত ‘বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভিত্তি’ তো মহাভারত অশুদ্ধ হইত না। প্রশ্ন হইতেছেÑকি সেই ভিত্তি? বর্তমান নিবন্ধে আমিও সেই প্রশ্নটাই তুলিতে চাহিতেছি।
আবু মহামেদ হবিবুল্লাহর বক্তব্য- আমি যদি ভুল না বুঝিয়া থাকি- ইতিহাসের কোনকালেই বাংলাদেশ উত্তর ভারতের রাষ্ট্রীয় বন্ধন স্থায়ীভাবে গ্রহণ করে নাই। তের শতকে উত্তর ভারতে তুর্কি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও বাংলাদেশ আপনকার পরম্পরাগত স্বাধীনতার ঐতিহ্য পরিত্যাগ করে নাই। এককথায় বলিতে, বাংলাদেশের জনসাধারণ যখন একটা বড় সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করিতেছে তখনও তাহারা উত্তর ভারতের অধীনতা স্বীকার করে নাই। আবু মহামেদ হবিবুল্লাহর কথায়, ‘বাংলাই বোধ হয় [ভারতবর্ষের] একমাত্র দেশ যেখানে ইসলামের আবির্ভাব ও প্রসারের গতি উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস অনুসরণ করেনি।’ হবিবুল্লাহর মতে বাংলাদেশে তুর্কি শাসন সম্প্রসারিত হইবার ঢের আগে হইতেই এই দেশ আরব ব্যবসায়ীদের দেখা পাইয়াছিল। তিনি লিখিয়াছেন, ‘পশ্চিম এশিয়া থেকে এই নতুন জীবনাদর্শের বাণী বাংলায় প্রথম এসেছিল স্থলপথে নয়- সমুদ্রপথে এবং এর বাহক তুর্কি-ইরানি নয়- আরব।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৩৮)
বাংলাদেশের কোথায়ও আরব ব্যবসায়ীরা কখনও স্থায়ী বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন কিনা তাহার পক্ষে কোন পাথুরিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। কিন্তু মুসলমান সমাজে প্রচলিত কিংবদন্তি, জনশ্রুতি আর লোকগাথার ভিত্তিতে আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ অনুমান করিয়াছেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব লাভের পূর্ব পর্যন্ত’ বাংলাদেশে মুসলিম সমাজের একটা ‘সংস্কৃতিগত’ (‘মুখ্যত ধর্মগত নয়’- এই অর্থে) প্রভাব বিস্তৃত হইতেছিল। এই ‘সংস্কৃতিগত’ প্রভাব বাংলাদেশের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য- অন্তত উত্তর ভারতের মুখোমুখি দাঁড়াইলে যে স্বাতন্ত্র্যের প্রয়োজন হয় সেই স্বাতন্ত্র্য- প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হইয়াছিল। হবিবুল্লাহর মতে এই ঘটনার পিছনে আরব বণিকদের একটা পরিচ্ছন্ন ভূমিকা দেখা যায়। তাঁহার বিচারে এই বণিকেরা প্রথম প্রথম একাগ্রভাবে ধর্মমত প্রচারের চেষ্টা না করিয়া বরং ‘ইসলামি সংস্কৃতির মূলভাব, বিশ্বভ্রাতৃত্বের ও যুক্তিবাদিতার’ প্রসার ঘটাইতেই বেশি সচেষ্ট ছিলেন। বাংলার ইতিহাসের এই যুগসন্ধির নাম হবিবুল্লাহ রাখিয়াছিলেন, ‘ইসলামের শান্ত বিস্তারের যুগ’। তাঁহার কথায়, ‘ এগার শতকে ইসলামের ক্ষাত্রশক্তি যখন উত্তরভারতে রাষ্ট্রজয়ের উন্মাদনায় মত্ত, পূর্বভারতে আরবি-ইসলামি ভাবধারার তখন শান্ত বিস্তারের যুগ।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৩৮)
এই এক যাত্রায় দুই ধরনের ফল ফলিয়াছিল। একদিকে যেমন ইসলাম ধর্মের প্রসার অলক্ষ্যে ঘটিতেছিল, অন্যদিকে তেমনি ইসলামের একটা দেশজ রূপও গড়িয়া উঠিতেছিল। ‘পাকা ব্যবসাদার’ বলিয়া পরিগণিত আরব বণিকেরা যেমন বণিকস্বার্থের সম্ভাব্য ক্ষতি করিবে এমন কোন কর্মসূচি গ্রহণ করেন নাই, বাংলার হিন্দু শাসকেরাও তেমনি নতুন ধর্মমত প্রসারে কোন বাধার সৃষ্টি করেন নাই। কারণ তখন আরব বণিকদের সহিত ক্ষাত্রশক্তির কোন সাক্ষাৎ যোগ ছিল না। হবিবুল্লাহ লিখিয়াছেন, ‘মধ্য এশিয়ার স্থলপথে ইসলাম যখন রাষ্ট্রক্ষমতাকে অনুসরণ করে অগ্রসর হচ্ছে, বাংলার ব্যবসায়ী আরবি-মুসলিম সমাজের বিকাশের রীতি ও ধারা তখন প্রায় সুষ্পষ্টরূপে নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। বাঙ্গালি মানসিকতার সঙ্গে আত্মীয়তাবোধ, আত্মকেন্দ্রিক ধর্মীয়তা, প্রাদেশিক স্বাতন্ত্র্যবোধ ও গ্রামীন মনোভাব যেমন একদিকে এই সমাজে সংক্রামিত হতে থাকল, ক্ষাত্রভাবাশ্রিত তুর্কি-মুসলিম সংস্কৃতির [সঙ্গে] বিরোধের কারণও তেমনি অলক্ষ্যে সঞ্চিত হতে থাকল।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৩৯)
বাংলায় তুর্কি শাসন সম্প্রসারিত হওয়ার পরেও যে এদেশের জাতীয় স্বাতন্ত্র্যবোধ হ্রাস পায় নাই বরং দিল্লিকেন্দ্রিক তুর্কি শাসন হইতে স্বাধীন জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের বাড় বাড়িয়াছে। ইহাতে বিস্মিত হইবার কারণ নাই। আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ লিখিয়াছেন, ‘তের শতকের গোড়ায় উত্তর ভারতে তুর্কি-মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং গঙ্গার সূত্র ধরে এসে তুর্কি সামরিক শক্তি এই প্রায়-বিচ্ছিন্ন বাংলাকেও দিল্লি তথা মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করে দিল। পরবর্তী দেড়শ বছর ধরে চেষ্টা চল্ল তুর্কিস্তান-কাবুল-দিল্লির সঙ্গে গৌড়ের যোগ অব্যাহত ও স্থায়ী করার। ক্ষাত্রশক্তির সহায়তায় মুসলিম সমাজ সম্প্রসারণের চেষ্টা সিন্ধু ও পাঞ্জাবের মত বাংলাতেও ক্রমাগতভাবে চল্ল। কিন্তু বাংলার মানসে উত্তরপথের সঙ্গে এই যোগ ও তার বিশেষ সাংস্কৃতিক পদ্ধতি স্বীকৃতিলাভ করতে পারেনি এবং এ জন্যেই বারে বারে বাংলা এ সময়ে দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৩৯-৪০)
একটি প্রশ্ন সহজেই জাগিতে পারে। দিল্লিকেন্দ্রিক তুর্কি শাসকদের সহিত লখনৌতি, লক্ষণাবতী বা গৌড়কেন্দ্রিক তুর্কি শাসকদের এই বিরোধে আরব ব্যবসায়ীরা কোন ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিল? আর বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের নেতারাই বা কি সাহায্য করিয়াছিলেন? হবিবুল্লাহ অনুমান করিয়াছেন, ‘আরব ঔপনিবেশিকদের দ্বারা পুষ্ট তখনকার বাঙ্গালি মুসলিম সমাজ সমগ্র দেশে সম্প্রসারিত না হলেও, আর্থিক সমৃদ্ধির বলে, একটা প্রাদেশিক মনোভাব ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণে ও বিস্তারে হিন্দুর আন্তরিক সহায়তাই পেয়েছিল।’ বাঙ্গালি সমাজের হিন্দু ও মুসলমান শক্তির এই মিলিত প্রকল্পের সহিত ঘটনাচক্রে আরব বণিকদের স্বার্থ এক হওয়াতে ইতিহাসের একটা গুণগত রূপান্তর ঘটিয়াছিল। হবিবুল্লাহ লিখিয়াছেন, উত্তর-ভারত-বিরোধী বাঙ্গালি মনোভাবের সঙ্গে ‘আরব-মুসলিম সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ একীভূত হওয়াতে বিদেশি জাতি ও মানসিকতার প্রতীক দিল্লির সঙ্গে বাঙ্গালির বিরোধ একরকম সহজাত হয়ে দাঁড়াল।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৪০)
মনোভাবের এই নতুন জগতকে শক্তি যোগাইয়াছিল আরও একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। সকলেই জানেন, ইংরেজি দশ শতকের মাঝামাঝি আসিয়া বাগদাদের আরব খলিফার ক্ষমতা তুর্কি ও ইরানি সেনাবাহিনীর হাতে ন্যস্ত হইয়া গেল। বাগদাদে খলিফার শাসনে কে বসিবেন তাহা সাব্যস্ত করিতেন তুর্কি-ইরানি আমির ওমরাহ ও সেনানায়কেরা। আরব বণিকেরা তখন ধীরে ধীরে ভারত মহাসাগরের উপকুলে ছড়াইয়া পড়িলেন। তের শতক নাগাদ উত্তর ভারতে তুর্কি বিজয় আরবদের এই মহাসমুদ্র বাণিজ্যকেও বিপন্ন করিয়া তুলিয়াছিল। হবিবুল্লাহ হইতে আবার কিছু উদ্ধার করি: ‘স্থলযুদ্ধে শত্রুর শ্রেষ্ঠতাকে এড়িয়ে যে নিরাপত্তা তারা সমুদ্রোপকুলের উপনিবেশে আবিষ্কার করেছিল, বাংলায় তুর্কি আধিপত্যের দরুন তা আবার ধ্বংস হতে চলল। বিপরীত আদর্শসম্পন্ন এবং বিপরীত পথে আগত এই দুই জাতির দ্বন্দ্ব তাই অনিবার্য ও তীব্রতর না হয়ে উপায় ছিল না এবং বাংলাই হলো এই সংঘর্ষের ক্ষেত্র।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৪১)
মজার বিষয়, সেই ইংরেজি তের শতকেই- অর্থাৎ ঐতিহাসিক বাংলার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর ভারতের সহিত বাংলাদেশের দ্বন্দ্ব তীব্র হইতে শুরু করিল। এই দ্বন্দ্বে স্বয়ং বাংলাদেশের তুর্কি শাসকেরা পর্যন্ত দিল্লির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হইলেন। এই বিরোধের একটা পরম্পরাগত কারণ আছেÑসে কথা আমরা খানিক আগেই আমল করিয়াছি। ইহার সহিত যুক্ত হইল নতুন যুগের নতুন বাণিজ্যযুদ্ধ। আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ লিখিতেছেন, ‘গাঙ্গেয় উপত্যকায় সামুদ্রিক বাণিজ্যের সব চাবিই ভূগোলের কৃপায় বাংলার হাতেই ছিলÑএবং এই একচেটিয়া বাণিজ্য দিল্লির নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ার সম্ভাবনায় বাংলার সমস্ত অর্থনৈতিক স্বার্থই চঞ্চল হয়ে উঠল।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৪১)


দিল্লিকেন্দ্রিক উত্তরপথের সঙ্গে বাংলাদেশের এই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ বহুবার হারিয়া গিয়াছে- একথা সত্য কিন্তু তাহার প্রতিক্রিয়া হইয়াছে সুদূরপ্রসারী। বাংলা বরাবরই উত্তর ভারতের- বিশেষ তুর্কি-ইরানি- সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিল। বাংলাদেশে একটা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তাগাদা আসিয়াছিল এই মাথা নত না করার নীতি হইতেই। এই নীতি বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলমানকে অনেকটা কাছাকাছিও আনিয়াছিল। এই নৈকট্য ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যে জাতীয় ঐক্য আমরা দেখিয়াছি তাহার সহিত তুলনার যোগ্য। অন্তত আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ তাহাই মনে করেন: ‘দিল্লির নিয়ন্ত্রিত তুর্কি শাসনের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি বিদ্রোহ ও পরাজয় বাঙ্গালি মুসলমান ও হিন্দু সমাজকে সংহত ও আত্মসচেতন করতে অনেকখানি সাহায্য করেছে একথা বলালে অন্যায় হয় না।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৪১)
এক্ষণে এই জায়গায় আসিয়া আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ অন্তত একপ্রস্ত পাথুরিয়া প্রমাণই দাখিল করিলেন। তিনি দাবি করিলেন, দিল্লির মধ্যস্থতাকে অগ্রাহ্য করিয়া সমুদ্রপথে আরব জগতের সঙ্গে ঘনিষ্টতা বাড়াইবার একটা চেষ্টা চলিয়াছিল। বাংলার তৎকালীন তুর্কি সুলতানদের সহিত আরব জগতের ঘনিষ্টতার সাক্ষ্য কিছু কিছু শিলালিপি কিংবা উৎকীর্ণ মুদ্রালিপিতে পাওয়া যাইতেছে। হবিবুল্লাহ লিখিয়াছেন, ‘মুসলমানের সংস্কৃতিক্ষেত্রে এই প্রাদেশিক স্বাতন্ত্র্যবোধ কোন পথে আত্মবিকাশ করতে আরম্ভ করেছিল তার কতকটা আভাস পাওয়া যায়- তুর্কি বা ফার্সির পরিবর্তে শিলালিপি ও মুদ্রায় আরবি ভাষা, প্রকাশভঙ্গি ও সংকেতের একচেটিয়া ব্যবহারে।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৪১)
বাংলাদেশে তুর্কি বা পাঠান প্রভৃতি জাতি হইতে উদ্ভূত মুসলমান সুলতানদের নেতৃত্বে দুইশ বছরেরও কিছু বেশি কালব্যাপী প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার কালজয়ী প্রভাব পরবর্তী প্রায় চার শ বছরের (১৫৭৬-১৯৭১) বিপরীতমুখী দীর্ঘ ইতিহাস অতিক্রম করিয়া বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্রের স্মৃতি আজো কিছুটা বাঁচিয়া আছে। সকলেই জানেন, গৌড়ে প্রতিষ্ঠিত নবীন রাজবংশের উৎপত্তি বাংলাদেশের বাহিরে বা তুর্কিস্তানে। সকলে ইহাও জানেন যে ব্যক্তিগতভাবে এই শাসকদের অনেকেই উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির সমজদার ছিলেন। কিন্তু রাজনীতির নাম বড় বাবাজি। প্রয়োজনের তাগিদে ইঁহাদের ‘শাসন পদ্ধতি ও মানসে প্রাদেশিক সমুদ্রমুখী বাঙ্গালিত্বই’ প্রাধান্য পাইয়াছিল। আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ লিখিতেছেন, ‘গৃহযুদ্ধে ও বৈদেশিক আক্রমণে ক্রমাগত পর্যুদস্ত হলেও দিল্লি বাংলার স্বাধীন অস্তিত্বকে কখনও ক্ষমা করেনি এবং সমরাস্ত্র তার জন্য সদাই উদ্যত থাকত। প্রতি মুহূর্তে এই আত্মরক্ষার প্রয়োজন প্রকরণই বহির্বঙ্গীয় মনোভাবসম্পন্ন এই রাজবংশকে শুধু বাংলার মুসলমানের সঙ্গেই নয়, হিন্দুর সঙ্গেও প্রায় এক করে দিল।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৪২-৪৩)
বাঙ্গালি সমাজের নৈতিক সমর্থন ও সক্রিয় সাহায্য ছাড়া তুর্কি সুলতানদের পক্ষে দিল্লির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন হইত। বাংলাদেশের নদীবহুল ভূপ্রকৃতি ও ঝঞ্ঝাত্যাপীড়িত আবহাওয়ার কারণে তুর্কি ঘোড়াসওয়ার কেন্দ্রিক রণকৌশল এখানে কিছুটা অচল হইয়া পড়িয়াছিল। হবিবুল্লাহর কথায়, ‘আগাগোড়া উত্তর ভারতের শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তনও বাংলায় প্রায় অসম্ভব এবং বহির্জগতের সঙ্গে যোগরক্ষার একমাত্র যে খোলা পথ সেই সমুদ্রবাহিত বাণিজ্য এবং সংস্কৃতিকেও অস্বীকার করা চলে না। স্বাধীন গৌড়ের বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদেরকে তাই অবিশ্বাস্য দ্রুততার সাথে বাংলার প্রকৃত ও সমাজকে আশ্রয় করতে বাধ্য হতে হলো।’ (হবিবুল্লাহ ১৯৭৪: ১৪৩)
বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলে ধর্ম ও রাজনীতি উভয়কে কেন্দ্র করিয়া একটা ঐক্যপন্থী সমাজ ও সংস্কৃতি গঠিত হইবার লক্ষণ প্রকাশ পাইতেছিল। এই প্রকাশ বন্ধ হইল অনেকদিন পরে, ষোল শতকের পাঠান-মোগল প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে। সেদিন দিল্লির সা¤্রাজ্যবাদী কৌশলের সামনে বাংলা তার জাতীয় স্বাধীনতা হারাইল। সে কাহিনী আজ আর নয়, ইহা আরেক পর্বে লেখার দরকার হইবে।
২৪ মে ২০১৮

দোহাই
১. আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ, সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৭৪)।
২. আহমদ ছফা, বাঙালী মুসলমানের মন (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮১)।

Disconnect