ফনেটিক ইউনিজয়
আহমদ ছফার ‘ডেপুটি বাবু’
ফরহাদ মজহার

‘বাংলাদেশ বিভাগ করার জন্য কোনো একজন ব্যক্তিকে যদি দায়ী করতে হয়, তিনি অবশ্যই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ ‘শতবর্ষের ফেরারি’, আহমদ ছফা, পৃষ্ঠা: ১৯।

ছফা ও হীনম্মন্য বাঙালি মুসলমান!
‘শতবর্ষের ফেরারি’ (১৯৯৭) পুস্তিকাটি ‘ডেপুটি বাবু’ অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে (১৮৩৮-৯৪) নিয়ে লেখা আহমদ ছফার ৬০ পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধ। খুদে পস্তিকা হিশাবে প্রকাশিত। এর ১৬ বছর আগে ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৮১) পুস্তিকাটি ছাপা হয়েছিল। সেই বইয়ে ছফা ‘শহীদে কারবালা’, ‘জঙ্গনামা’, ‘সোনাভান’, ‘জৈগুনবিবি’ ইত্যাদি দোভাষী পুথির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন’ বাঙালি মুসলমান মনোবাসনা হচ্ছে পুথির নায়ক মহাবীর হামজার মতো ‘দেশ-দেশান্তরে ঘুরে ঘুরে কাফেরদের সদলবলে পরাস্ত’ করা এবং ‘তাদের ঘরের সুন্দরী নারীদের পাণিপীড়ন’ করা।
পুঁথিকে মুসলমানের মন নির্ণয়ের জন্য ছফা প্রামাণ্য কেন গণ্য করলেন, সে এক মহাজিজ্ঞাসা বটে! হিন্দু বা মুসলমান সমাজ কোনোভাবেই একাট্টা শ্রেণিহীন লিঙ্গহীন সমাজ নয়। তাতে কী! ছফার কাছে বাঙালি মুসলমান একাট্টা একটি জাতি এবং তাদের ‘মন’ও একরকম। তারা কাফেরদের কতল করতে চায় এবং তাদের ঘরের মেয়েদের শাদি করে যৌন ‘পীড়ন’ করতে চায়; তাই ‘পাণিপীড়ন’। ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ পুস্তিকায় ছফার অনুমান হচ্ছে- দোভাষী পুথিই মুসলমানের মনোজগতের প্রতিনিধি, এর বিপরীতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে উচ্চবর্ণের হিন্দুর লেখালিখি, সাহিত্য সংস্কৃতি হচ্ছে হিন্দুর মনোজগতের প্রতিনিধি। বাংলার নবজাগরণের হিন্দু বাঙালি সভ্য ও সংস্কৃতিবান, বিপরীতে মুসলমান কী ধরনের খতরনাক, সেটা তাদের পুথি পড়লেই বোঝা যায়। এটা অতি সরলীকরণ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই অতি সরলীকরণের মানদ- দিয়েই আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমান সমাজকে ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু সমাজের তুলনায় হীনম্মন্য, সংকীর্ণ ও চরম সাম্প্রদায়িক বলে চিত্রিত করেছেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু সমাজের সঙ্গে একই সময়ের মুসলমান সমাজের গুরুতর পার্থক্য আছে। প্রথমত, রয়েছে আর্থসামাজিক দ্বন্দ্ব, বিশেষত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের সঙ্গে কৃষক সমাজের অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব। রয়েছে জুলুম-নিপীড়নের ফারাক। এরপর ঔপনিবেশিক ইংরেজের সঙ্গে সম্বন্ধ রচনা ও বহাল রাখবার ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমানদের পার্থক্য। মুসলমানরা প্রায় ১০০ বছর ইংরেজি শেখেনি। আর এ সময় হিন্দুরা ইংরেজি শিখেছে এবং বিভিন্ন সরকারি মহলে কাজও পেয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে দুটি সমাজের তাঁবেদারি বা প্রতিরোধের সম্পর্ক সমাজের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার বিবর্তন ঘটিয়েছে; তারও কোনো সতর্ক পর্যবেক্ষণ ছফাতে নেই। সামগ্রিকভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরিণতি, আর্থসামাজিক অবস্থার বিচার, ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করা না করার বিতর্ক, মুদ্রণ যন্ত্র, সাহিত্য ও সংবাদপত্রের বিকাশ এবং ‘বাংলা ভাষা’ ও ‘বাঙালি পরিচয়ের দৃশ্যমান আবির্ভাবের ইতিহাস’। ছফা সেসব দিক নিয়ে ভাবিত ছিলেন না বললে অন্যায় হবে, কিন্তু ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ পড়লে মনে হয় তিনি লেখাটি শুরুই করেছেন বাঙালি মুসলমানের হীনম্মন্যতা প্রমাণ করার জন্য।
মনে রাখা দরকার, আহমদ ছফা এ সংবেদনশীল লেখাটি ঔপনিবেশিক ইংরেজ কিংবা পাকিস্তান আমলে লেখেননি। লিখছেন একাত্তরে একটি ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রীতিমতো সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আবির্ভাবের পর- বাঙালি মুসলমান নিজেকে শুধু ‘মুসলমান’ নয়, বরং ‘বাঙালি’ পরিচয় রক্ত দিয়ে আদায় করে নেয়ার জন্য একটি সফল মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়াার পরে। সময়টা মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছফা যখন প্রবন্ধটি লিখছেন, তখন স্বাধীন বাংলাদেশ আবির্ভাবের পর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ছফা একাত্তরের আলোকে ঐতিহাসিক জায়গা থেকে বাঙালি মুসলমানের মন নিয়ে ভাবার যথেষ্ট ফুরসত পেয়েছেন। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান তার ‘মন’ নামক বস্তুর যে বাস্তব পরিচয় দিয়েছে, সে ঐতিহাসিকতা আহমদ ছফার চোখে পড়েনি। বাঙালি মুসলমানের মন বোঝার জন্য তিনি পুথিকেই প্রামাণ্য মেনেছেন। একাত্তরের তাৎপর্য বিচারের মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালি মুসলমানের হদিস নিতে পারতেন। কিন্তু সেটা করেননি। একাত্তরের পর বাংলাদেশের জনগণের ‘মানসিক জগত’ পুথির জগত তো দূরের কথা, অন্য কোনো ধোঁয়াটে বা বিমূর্ত পরিম-লে লুকানো ছিল না। রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিশাবে ইতিহাসে হাজির হয়ে গিয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমানের মন মূর্ত ইতিহাস হয়ে হাজির। কিন্তু ছফা বর্তমানকে নয়, এত বড় ঘটনার পর বাঙালি মুসলমানের মন বিচার করার জন্য আশ্রয় নিয়েছেন প্রাচীন বটতলার দোভাষী পুথির ওপর। যে দেশের জনগণ তাদের ভাষিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দাবি রাজনৈতিকভাবে কায়েম করতে দ্বিধা করেনি, সেই তুমুল মুহূর্তে ছফা ‘বাঙালি মুসলমান’ মানসিক ও চিত্তবৃত্তির দিক থেকে কতটা নীচ, সাম্প্রদায়িক ও হীনম্মন্য সেটাই প্রমাণ করতে কলম ধরেছিলেন। তিনি প্রমাণ করতে নেমেছিলেন, বাঙালি মুসলমান সমাজ পুথিকারদের মতো ভাবে। তাদের বাসনা পুথির গল্পের মতো ছিন্ন সীমারের কল্লা থেকে আজরের মতো ব্রাহ্মণ পরিবার কলমা পড়ে মুসলমান হবে, তারা হিন্দু মেয়েদের হরণ করে শাদি করে যৌন লালসা মেটাবে। এটাই তাদের ‘মন’, এটাই বাঙালি মুসলমানের মানসিকতা। ধর্ম নয়, বরং ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য যারা শহীদ হয়, যার তুলনা বিশ্বে নেই, সেই বাঙালি মুসলমানের মন ছফার বিচারে ‘এখনো আদিম অবস্থায়’ রয়েছে। সান্ত¡নার দিকটা এতটুকু যে, ‘সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুন তার মনের ওপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত হয়ে রয়েছে, সজ্ঞানে তার বাইরে তারা আসতে পারে না’। অর্থাৎ সজ্ঞানে নিজের আদিম অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সামর্থ্য বাঙালি মুসলমানের নেই। কিন্তু এ ‘ঐতিহাসিক পদ্ধতি’ কী বস্তু- ছফা তার কোনো ব্যাখ্যা দেন না। বরং ‘ঐতিহাসিক পদ্ধতি’ বলতে তিনি বাঙালি মুসলমানের মনের একটা চিরায়ত ও শাশ্বত দুর্দশাকেই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, এমনই তা কঠিন যে, সজ্ঞানে এ অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়া বাঙালি মুসলমানের জন্য কঠিন। হিন্দু সমাজ পেরেছে, বাঙালি মুসলমানের পক্ষে সম্ভব না। খেয়াল করতে হবে এবং আবারও বলছি, ছফা এসব লিখছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ কায়েমের এক যুগ পরে। সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন-
‘বাঙালি মুসলমান যদি এক পা এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতি এ সমাজকে চালিয়ে থাকে। দুই বছরে কিংবা চার বছরে হয়তো এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবে না, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের মনের ধরন-ধারণ এবং প্রবণতাগুলো নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়তো পাওয়া যেতে পারে।’ (ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন, ২০০১, পৃষ্ঠা: ৩৪)
নির্মোহভাবে আলোচনার অর্থ ছফার কাছে বাস্তবিক ইতিহাস বিচার না, যা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ হিশাবে আহমদ ছফার সামনে মূর্তভাবে হাজির- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নয়। বাঙালি মুসলমানের মন বোঝার জন্য মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সংস্কৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্র বাঙালি মুসলমান ঐতিহাসিকভাবে হাজির করেছে, তার ভালোমন্দ বিচারও নয়, আমাদের এখন ‘শহীদে কারবালা’, ‘জঙ্গনামা’, ‘সোনাভান’, ‘জৈগুনবিবি’ ইত্যাদি দোভাষী পুথি খুঁজে খুঁজে পড়তে হবে। সেখানেই ‘খবিস’ বাঙালি মুসলমানকে চেনা যাবে।
বাঙালি মুসলমানের এই ‘খবিস’ চরিত্র ব্যাখ্যা করে, বলা বাহুল্য, বাঙালি জাতিবাদীদের কাছ থেকে আহমদ ছফা বিস্তর বাহবা পেয়েছিলেন। ড. আনিসুজ্জামান ছফার এ বইকে ‘বিগত শতবর্ষে প্রকাশিত হাতেগোনা শ্রেষ্ঠ গ্রন্থসমূহের একটি’ বলে অভিহিত করেছেন। ২০০১ সালে বইটি তৃতীয়বার প্রকাশের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, ‘শ্রীপ্রকাশ’-এর পক্ষে শিবনারায়ণ দাশ। তিনি ‘প্রকাশকের নিবেদন’ হিশাবে লিখছেন-
‘এ ধরনের একটি অসাধারণ গ্রন্থ বাংলাদেশে যে পরিমাণ পাঠক প্রিয়তা লাভ করার কথা, সে প্রত্যাশার একাংশও পূরণ হয়নি। এটা আমাদের কিছু পরিমাণে হলেও বিস্মিত করেছে। আমরা নিজেদের বারবার প্রশ্ন করেছি, বাংলাদেশে সিরিয়াস পাঠকের সংখ্যা একেবারেই কি নগণ্য? এ রকম একটি প্রয়োজনীয় বইয়ের প্রতি অধিকসংখ্যক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ না হওয়া অত্যন্ত আশংকার বিষয়। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ চারদিক থেকে ঘনিয়ে আসছে, সে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বাঙালি মুসলমানের মনের মতো আলোকিত একটি গ্রন্থের প্রভূত প্রচার হওয়া প্রয়োজন। মুখ্যত এ গ্রন্থের মর্মবাণী জনসমাজে ব্যাপকভাবে প্রচার করার উদ্দেশে আমরা এ গ্রন্থের একটি নতুন সংস্করণ প্রকাশ করতে উদ্যোগী হয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, গ্রন্থটির অসাধারণ তিমির-বিনাশী ক্ষমতা রয়েছে। এ ধরনের মেধাসম্পন্ন দশটি গ্রন্থও যদি প্রকাশিত হয়, তবে বাংলাদেশে রেনেসাঁ কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।’ (ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন, ২০০১)
ঊনবিংশ শতাব্দীর উচ্চবর্ণের হিন্দুর ‘রেনেসাঁ’ বাঙালি মুসলমানকেও রিপিট করতে হবে। বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য যে, ১৯৯৫ সালে ছফা বইটির একটি ‘উত্তর ভূমিকা’ লেখেন। বইটি প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় ভাবার তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু নতুন কিছু ভাবতে ছফা সক্ষম হননি। তার চিন্তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। ‘উত্তর ভূমিকা’য় তিনি লিখেছেন, একদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। সেখানে মাথায় গোল টুপি পরা আবুল ফজলকে দেখে আহমদ ছফা ‘ভীষণ আশ্চর্য’ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করায় আবুল ফজল সত্য কথাই বলেছেন, তিনি সিরাত মাহফিলে যাবেন। ‘সিরাত মাহফিল’ কথার অর্থ- যে সভায় নবীর জীবনী আলোচনা হয়। হজরত মোহাম্মদ (স.) কৃষ্ণের মতো কোনো পৌরাণিক চরিত্র নন, ঐতিহাসিক চরিত্র। ফলে তার ঐতিহাসিক জীবন নিয়ে আলোচনা মানেই ধর্মীয় আলোচনা ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু ছফা আবুল ফজলের সিরাত মাহফিলে যাওয়া মেনে নিতে পারলেন না। অথচ বাঙালি মুসলমানকে ধর্মনিরপেক্ষ জায়গা থেকে যদি নিজের ইতিহাস বোঝার জন্য পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করতে হয়, তাহলে ‘সিরাত মাহফিল’ অর্থাৎ ইসলামের নবী ও ইসলামের ইতিহাসের বাস্তব ঐতিহাসিক পর্যালোচনা সবচেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকর ক্ষেত্র। বঙ্কিমচন্দ্র কৃষ্ণকে ঐতিহাসিক চরিত্র বানানোর জন্য ‘কৃষ্ণচরিত্র’ লিখেছিলেন। কিন্তু পৌরাণিক চরিত্রকে ইতিহাসের চরিত্র বানানো যায় না। ইসলামের ঐতিহাসিক চরিত্রের ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় ছফার আগ্রহ ছিল না। বরং চরিত্রগুলো দোভাষী পুথিতে যেভাবে আছে, সেভাবে পড়েই ছফা আনন্দ পেতেন, আর তা দিয়ে বাঙালি মুসলমানের হীনম্মন্যতা প্রমাণ করতে পারেন। ইসলাম বা ইসলামের নায়কদের ঐতিহাসিকভাবে বিচারে ছফার অনাগ্রহ বিস্ময়কর বৈকি! যার ফল হচ্ছেÑ পুথির কেচ্ছায় অর্থাৎ পৌরাণিক কাহিনীতে তারা যেভাবে পর্যবসিত হয়েছে, সে অবস্থায় তাদের ফেলে রাখা।
অতএব ‘গোল টুপি পরা’ আবুল ফজলকে সিরাত মাহফিলে যেতে দেখে ছফা ‘মনে মনে একটা চোট’ পেয়েছেন। আবুল ফজল সম্পর্কে আহমদ ছফার মূল্যায়ন অন্য আরও নানা কারণে নেতিবাচক হতেই পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে ছফা বলছেন: ‘এ ঘোষিতভাবে নাস্তিক ভদ্রলোকটি আজকে ক্ষমতার স্বাদ পেতে না পেতে নিজেকে প্রচ- ধার্মিক বলে পরিচয় দিতে চাইছেন। এরকম কা- কী করে ঘটে, সেটা আমাকে ভয়ানক রকম চিন্তিত ও উতলা করে তোলে। অনেক নাস্তিক শেষ পর্যন্ত আস্তিকে পরিণত হয়েছে এরকম ভূরি ভূরি লোকের নাম আমি জানি। কিন্তু আবুল ফজল সাহেবের মতো লোক যিনি সারাজীবন নাস্তিকতার পুরোহিতের ভূমিকা পালন করে গেছেন, তিনি ক্ষমতার কাছাকাছি আসতে না আসতেই কোনো রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না দিয়েই একটি ভিন্ন পরিচয়ে নিজেকে চিহ্নিত করতে তৎপর হয়ে উঠলেন, সেটাই আমাকে সবচাইতে বিস্মিত করেছে।’
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রাতর্ভ্রমণে আবুল ফজলকে গোল টুপি মাথায় আকাশ সেনা প্রধান এমএজি তাওয়াবের সাথে দেখে আহমদ ছফার খারাপ লাগতেই পারে। বিশেষত ১৯৭৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ তক আবুল ফজল বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিশাবে শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে আহমদ ছফার কাছে সঙ্গত কারণেই তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু গোল টুপি পরা আবুল ফজলকে দেখে আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে যেসব মস্ত মস্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। আবুল ফজলের গোলটু পির প্রতিক্রিয়ায় ছফার সিদ্ধান্ত দেখুন-
‘এই যে হঠাৎ পরিচয় পালটে ফেলা তার পেছনে আমার মনে হয়েছিল একগুচ্ছ সামাজিক কারণ বর্তমান। আবুল ফজল উপলক্ষ মাত্র, কারণ নন। বাঙালি মুসলমান সমাজের ভেতরে এমন কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো ব্যক্তিকে কোনো বিশ্বাসের বিন্দুতে স্থির থাকতে দেয় না। ডানে কিম্বা বামে হেলতে বাধ্য করে। মনের এই উত্তেজিত অবস্থায় আমি এক রাতে একটুও না থেমে বাঙালি মুসলমান রচনাটি লিখে শেষ করি।’
‘গোল টুপি পরা’ আবুল ফজলকে দেখে ছফার এ প্রতিক্রিয়া এবং উত্তেজনায় সারারাত জেগে ‘বাঙালি মুসলমানের মন লিখে ফেলা’ খুবই ইন্টারেস্টিং তথ্য। তদুপরি একজন লেখকের ‘বিশ্বাসের বিন্দুতে স্থির থাকতে না পারা’কে ছফা রীতিমতো একটি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের বিন্দুতে স্থির থাকতে না পারা হিশাবে গণ্য করেছেন। একে যদি ছফা আসলেই একটি জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে বিচার করার মানদ- হিশাবে গ্রহণ করতে চান, তাহলে তার সবচেয়ে সফল প্রয়োগ হতে পারে হিন্দু সমাজে। এক বঙ্কিমচন্দ্র বা আহমদ ছফার ‘ডেপুটি বাবু’ই তাহলে হিন্দু সমাজকে বোঝার জন্য যথেষ্ট। একসময়ের ঘোর নাস্তিক ডেপুটিবাবু শেষ জীবনে এসে শুধু হিন্দুধর্মে ও হিন্দুত্বে বিশ্বাস করেননি, এমনকি ‘কৃষ্ণচরিত্র’, ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’, ‘দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম্ম’ ইত্যাদি লিখে হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য কীর্তন করে গিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিশ্বাসের স্থিরবিন্দু’ কী পরিমাণ অস্থির ও দুর্বল, তা প্রায় সবারই জানা। ছফা তা জানতেন না ভাবা মুশকিল। বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলছেন-
‘বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তাভাবনার অনেকবার পরিবর্তন হয়েছে। তিনি ২৫ বছর বয়সে অনাচারী হয়েছিলেন, ৩০ বছরে নাস্তিক হয়েছিলেন, ৪০ বছরে আস্তিক হয়েছিলেন। অতএব ২৫ বছরের বঙ্কিমচন্দ্র, ৩৫ বছরের বঙ্কিমচন্দ্র, ৫৫ বছরের বঙ্কিমচন্দ্র এক ব্যক্তি নন। আমি নিজে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা থেকে যে জিনিস তুলে ধরতে পারব, আর একজন তার লেখা থেকে ঠিক তার উল্টোটা দেখাতে পারবেন। কাজেই বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনে চিন্তার যে পরিবর্তন হয়েছে, তা অনুভব করা প্রয়োজন। আপনারা জানেন যে, বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম যৌবনে বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন, বৌদ্ধধর্ম নিরীশ্বর ধর্ম। সাংখ্য দর্শন নিয়েও তিনি তখন পড়াশোনা করেছেন। সে সময়ে নিরীশ্বরবাদের দিকে ঝুঁকেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। তার পরে বঙ্কিমচন্দ্র সোস্যালিজমের দিকে ঝুঁকেছেন, সাম্য লিখেছেন, বাঙলাদেশের কৃষক লিখেছেন। তারপর বঙ্কিমচন্দ্র কোঁতের দর্শন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেছেন, হিতবাদী হয়েছেন। শেষকালে বঙ্কিমচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণকে আদর্শ মানুষ বলে বর্ণনা করে নিষ্কাম কর্মের কথা বলেছেন, অনুশীলন তত্ত্বের কথা বলেছেন। এসবের মধ্যেও ইউরোপীয় প্রভাব রয়েছে। বঙ্কিমের চিন্তায় তিনবার বড় পরিবর্তন ঘটেছে।’ (বাঙলাদেশ উপন্যাস পরিষদের আয়োজিত বঙ্কিম নিয়ে আলোচনাসভার বক্তব্য, আনিসুজ্জামান, ২০০১, পৃষ্ঠা: ৬০)।
তুলনায় আবুল ফজল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির জীবনী আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন, ছফা শুধু অতটুকু দেখেই আবুল ফজল সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। কী এমন অপরাধ আবুল ফজল করলেন? আর এতে ‘বাঙালি মুসলমান কোনো বিশ্বাসের বিন্দুতে স্থির থাকতে পারে না’- এত বড় বিশাল সিদ্ধান্ত আহমদ ছফা ১৯৯১ সালে অনায়াসেই নিয়ে ফেললেন! এটা ভাবতেই বরং আশ্চর্য হতে হয়।
আবুল ফজলের মধ্যে ছফা যদি বাঙালি মুসলমান আবিষ্কার করতে চান, তাহলে তার উচিত ছিল আবুল ফজলের পুরো জীবন এবং তার সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক তৎপরতার ভালো-মন্দ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিচার করা। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। আবুল ফজল মসজিদের ইমামতির মধ্য দিয়ে পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ (১৯২৬) প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৩০ সালে তার সম্পাদক হয়েছিলেন ‘শিখা’ পত্রিকার জন্য, যারা ‘শিখা’ গোষ্ঠী হিশাবে পরিচিত। এটা এমন এক সময়, যখন সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মুসলমান সমাজকে মুক্ত করা বলতে বোঝাত বাবু কলকাতার নবজাগরণের আদলে মুসলমান সমাজকে তথাকথিত মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও ধর্মীয় সংস্কার থেকে মুক্তির পথ বাতলানো। বাঙালি মুসলমানকে ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু বাঙালির নবজাগরণের আলোকে বাঙালি জাতিবাদে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে মুসলিম সাহিত্য সমাজের ভূমিকা রয়েছে। ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার যখন রবীন্দ্রনাথকে পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী আখ্যা দিয়ে রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, আবুল ফজল তখন তার তীব্র বিরোধিতা করেন। আবুল ফজল ছিলেন আদর্শ সেকুলার মুসলমান। অর্থাৎ বাঙালি, কিন্তু যিনি ইসলাম ও মুসলমান ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। ফলে তার বিশ্বাসের স্থিরবিন্দুতে নড়চড় নেই বললেই চলে। এসব বিবেচনায় না নিয়ে গোল টুপি পরে কোনো এক প্রাতভ্রমণে আবুল ফজলকে ছফা সিরাত মাহফিলে যেতে দেখেছেন আর তার ভিত্তিতেই গোটা মুসলমান সমাজকে তিনি যেভাবে মূল্যায়ন করে বসলেন, তাতে বোঝা যায় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস বিষয়ে গভীরভাবে বিচার করার ক্ষমতা আহমদ ছফার ছিল না। বাঙালি জাতিবাদের ডামাডোলের বাইরে তিনি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারতেন না। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকে তিনি যেসব সিদ্ধান্ত টানতেন, সেখানে আপাদমস্তক সাহিত্যিক আহমদ ছফার তুলনা নেই। বাঙালি মুসলমান সমাজ মূল্যায়ন করবার ক্ষেত্রে ছফার পদ্ধতি আমাদের বিস্মিত করতে পারে বটে, কিন্তু বাঙালি জাতিবাদের সারকথাটুকু ছফা যত শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্যভাবে বলতে পেরেছেন, বাংলাদেশের আর কোনো জাতিবাদী লেখক পেরেছে কিনা সন্দেহ।

ছফার উপলব্ধির পরিবর্তন
ঔপনিবেশিক কালপর্বে বাস্তব ঐতিহাসিক কারণে উচ্চবর্ণের হিন্দুর ঔরসে ‘বাঙালি’ নামে যে ভাষিক-সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পরিগঠন ঘটেছিল, সেই সীমাবদ্ধ পরিগঠন থেকে বেরিয়ে আসার কোনো গভীর তাগিদ বা দূরদৃষ্টি আহমদ ছফার মধ্যে ছিল না। কিন্তু কী এমন ঘটনা ঘটল যে, ‘শতবর্ষের ফেরারি’ নিবন্ধে বঙ্কিম সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আহমদ ছফার মনে হয়েছে ‘বাঙালিয়ানার একটি নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ’ করা দরকার। ঔপনিবেশিক কলকাতার ‘বাঙালি’ সংজ্ঞায় চলবে না। কিন্তু কীভাবে কেমন করে সেটা সম্ভব, আর কোত্থেকে সেটা শুরু করতে হবে, তার কোনো দিশা ছফা দেননি। কিংবা তার জন্য যেসব প্রাথমিক বুদ্ধিবৃত্তিক শর্ত তৈরি জরুরি, সে সম্পর্কেও কোনো ইঙ্গিত আহমদ ছফার কাছ থেকে পাওয়া যায় না। নিদেনপক্ষে কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণের হিন্দু বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি এবং তার অপর হিশাবে প্রতিস্থাপিত ইসলাম ও বাঙালি মুসলমানের বৃহৎ অংশের ধর্মচেতনার বিভাজন কোনো চিরায়ত বা শাশ্বত বিভাজন নয়, বরং ঐতিহাসিকÑ এই প্রাথমিক উপলব্ধিও ছফায়, অন্য যেকোনো বাঙালি জাতিবাদীর মতোই অনুপস্থিত। এই বিভাজন, বিভক্তি ও পরস্পরকে পরস্পরের অপরায়ণ প্রক্রিয়া ঐতিহাসিকভাবে অতিক্রম করে যাওয়ার পথ কী হতে পারে, সেটা আহমদ ছফার বুদ্ধিবৃত্তিক জিজ্ঞাসা ছিল না। তিনি ধরে নিয়েছেন ‘বাঙালিয়ানা’র নতুন সংজ্ঞা সাহিত্যিক কায়দায় লিখে দিতে পারলেই তার সমাধান হবে। যদি তাই হয়, তাহলে তর্ক করা যায়, সেক্ষেত্রে ‘বাঙালিয়ানা’ সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে ‘মুসলমানিয়ানা’র নতুন সংজ্ঞা না কেন? কেন ‘হীনম্মন্য’ বাঙালি মুসলমানকে তার হীনম্মন্য মুসলমানিত্বটুকু বাদ দিয়ে ‘বাঙালি’ হওয়ার দায় নিতে হবে? কেন বাঙালি মুসলমান ঔপনিবেশিক উচ্চবর্ণের বাঙালিত্ব নামক হিন্দুত্বের বিপরীতে বিপরীতে আরও মুসলমান হবে না। ছফার কাছে এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নাই। তারপরও একথা বলা যায়, ‘বাঙালিয়ানার একটি নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ’ করতে হবে- ছফার এটুকুন উপলব্ধির জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদী সাহিত্যের অন্তর্গত হলেও ‘শতবর্ষের ফেরারি’ পুস্তিকাটির তাৎপর্য আলাদা। এটা স্বীকার করে নেয়ার জন্যই মূলত এ লেখা।
‘শতবর্ষের ফেরারি’ বইটি বঙ্কিমের সামগ্রিক কোনো মূল্যায়ন নয়। বঙ্কিমচন্দ্র সাধারণভাবে বাংলাভাষীদের ঐতিহাসিক বিভাজন অতিক্রম করে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এ চ্যালেঞ্জকে শনাক্ত বা উপলব্ধি করা পশ্চিম বাংলার বাঙালির কাছ থেকে এক্ষুনি আশা করা যায় না। কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাঙালির আবির্ভাব ঘটেছে তার কাছে বঙ্কিমচন্দ্রসহ উচ্চবর্ণের হাতে গড়ে ওঠা বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি তার নিজের ঐতিহ্য বিচার এবং আত্মনির্মাণের বাইরের জিনিস নয়, ফলে এ ঐতিহ্য আত্মস্থ করা- অর্থাৎ ঐতিহাসিক বিভাজন অতিক্রম করে যাওয়া বাংলাভাষীদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। কারণ কোনো জনগোষ্ঠী নিজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য- বিশেষত ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না।
ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণেই বঙ্কিম স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য একটি বড়সড় চ্যালেঞ্জ। না, ঠিক বলিনি। বলা উচিত বিশ্বের সব বাংলাভাষীর জন্য বিশাল একটি চ্যালেঞ্জ। বঙ্কিমের একটি পূর্ণ পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন দরকার। সেই মূল্যায়নের গুরুত্ব বিবেচনা করলে ছফার পুস্তিকাটিকে নগণ্যই গণ্য করতে হবে। কিন্তু এ ছোট পুস্তিকাতেও ছফা তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। নিজের লেখা সম্পর্কে তার নিজের মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘আমার লেখাটিকে সঠিক অর্থে গবেষণা কর্ম বলা শোভন হবে না। আগামীতে যাঁরা গবেষণা করবেন, আমি আশা করি তাঁদের সামনে এ রচনাটি কতিপয় নতুন দিক উন্মোচন করবে এবং সেটাই হবে এই রচনার সার্থকতা।’ এক্ষেত্রে আমরা অনায়াসেই ছফার সঙ্গে একমত হতে পারি।
তবে ছফার উদ্দেশ্য ছিল সীমিত। তার লেখার কোথাও উল্লেখ না করলেও তিনি সে সময় ঢাকায় বঙ্কিমকে কেন্দ্র করে যেসব আলোচনা চলছিল, সেই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৫০ বছর জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ‘বাঙলাদেশ উপন্যাস পরিষদ’ ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল, সেখানে আহমদ শরীফের বক্তব্য তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করে। বঙ্কিম নিয়ে যারা সেই সেমিনারে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাদের নিবন্ধ ও বক্তব্যের অনুলিখন একটি পুস্তিকা হিশাবে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। সংকলন করেন ইসরায়েল খান এবং সম্পাদনা করেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। জাগৃতি প্রকাশনী এর আরেকটি নতুন সংস্করণ ২০০১ সালে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে বঙ্কিম সম্পর্কে জাতিবাদী বুদ্ধিজীবী মহলের প্রধান বয়ান ও অভ্যন্তরীণ তর্ক-বিতর্ক নিয়ে এ সংকলন। চলমান জাতিবাদী বয়ান ও বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতেই ছফা বঙ্কিম সম্পর্কে তার মত পেশ করার তাগিদ বোধ করেন। ‘শতবর্ষের ফেরারি’ বইয়ের মুখবন্ধে তিনি জানাচ্ছেন- বঙ্কিম সম্পর্কে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এবং সেসব বিতর্ক তিনি মনোযোগের সঙ্গেই পাঠ করেছেন। বলছেন-
‘সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নের জটসমূহ যখন ক্রমাগত হারে জটিল আকার ধারণ করতে থাকে, বঙ্কিম সম্পর্কিত বিতর্কও নতুন নতুন মাত্রা অর্জন করতে থাকে। আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে বঙ্কিম সম্পর্কিত বিতর্ক যেখানে এসে থেমেছে, সেটাকে বিচার বলা বোধ করি সঙ্গত হবে না। একদল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে রবীন্দ্রনাথের ওপরে স্থান দিতে চান, অন্যদল তাঁকে একেবারে খারিজ করতে পারলে বেঁচে যান।’
এ বিতর্ক চলে আসছে বলেই ছফা ‘শতবর্ষের ফেরারি’ লিখতে প্রলুব্ধ হয়েছেন। ছফা দাবি করেছেন, তিনি ‘প্রত্যক্ষভাবে কোনো ব্যক্তি বা মহলবিশেষের পক্ষে বা বিপক্ষে সমর্থন-অসমর্থন জানাবার জন্য লিখতে প্রবৃত্ত’ হননি। তার মনের কথা ‘সূত্রাকারে প্রকাশ’ করাই তার উদ্দেশ্য।
তবে আবুল কাশেম ফজলুল হক যথার্থই ছফার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, বঙ্কিম সম্পর্কে বাঙলাদেশ উপন্যাস পরিষদ যে মূল্যায়ন করছে, আহমদ ছফা তারই সমালোচনা করছেন। সেটা আবুল কাশেম ফজলুল হক পরিষ্কার করেই বলছেন, “এ গ্রন্থ (অর্থাৎ ‘শতবর্ষের ফেরারি’- ফ.ম) যে তিনি আমাদের সমালোচনায় লিখেছেন, তা অবশ্য কোথাও উল্লেখ করেননি।’ কথাটা হয়তো আংশিক সত্য, বরং বঙ্কিম সম্পর্কে ছফা তাঁর নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাইছিলেন, এভাবে বলাটাই হবে সঠিক। বঙ্কিম সম্পর্কে বাঙলাদেশ উপন্যাস পরিষদের আলোচনা সভায় আহমদ শরীফ বলছেন, তিনি বারো-চৌদ্দ বছর বঙ্কিম পড়াচ্ছেন, কিন্তু বঙ্কিম সম্পর্কে বাঙালি মুসলমানের ‘প্রচলিত ধারণা’ তিনি বদলাতে পারেননি। আহমদ শরীফ মুসলমান সমাজ সম্পর্কে অদ্ভুত এক অভিযোগ করেছেন। সেটা হোল, ‘মুসলমানরা বঙ্কিমকে সৎভাবে গ্রহণ করেনি।” অথচ বঙ্কিম নাকি মুসলমানদের জন্যও লিখেছেন। বঙ্কিমকে আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লিখছেন মনে হলেও তার সেইসব লেখা যে আসলে মুসলমানদের পক্ষেই লেখা সেটাই তার বক্তৃতায় আহমদ শরীফ প্রাণপণ প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মুসলমানগুলা বঙ্কিমের এই মুসলমান প্রীতি কেন বোঝে না, তার কারণ হিশাবে আহমদ শরীফ বলছেন-
‘এটা ঠিক তিনি (বঙ্কিমচন্দ্র- ফ.ম) হিন্দুর পক্ষে লিখেছেন, ভারতবর্ষের জন্য লিখেছেন। কিন্তু তিনি লিখেছেন মুসলমানদের জন্যও। তবে মুসলমানরা তাঁকে সৎভাবে গ্রহণ করেনি। এই না করার একটি প্রধান কারণ, আমি দেখেছি, মুসলমান সমাজের অশিক্ষা। যারা বঙ্কিমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের কারো সম্পূর্ণ শিক্ষা ছিল না। বিক্ষোভের মূলে ছিল বিক্ষুব্ধদের অসম্পূর্ণ শিক্ষা আর পূর্বলব্ধ ধারণা- যে ধারণা পোষণ করার কোনো নৈতিক অধিকার তদের ছিল না।’
নৈতিক অধিকার ছিল না কেন? আহমদ শরীফের যুক্তি হচ্ছে-
‘এক সময় মধ্যযুগে এই দেশ শাসন করেছে, এই দেশে বাদশাহী করেছে তুর্কি-মোগলরা। বঙ্কিমচন্দ্র আক্রমণ করেছিলেন সেই বিদেশী-বিভাষী তুর্কি-মোগলদের। আর বঙ্কিমচন্দ্রের বিরুদ্ধে যাঁরা দাঁড়ালেন, তাঁরা হলেন দেশজ বাঙলাভাষী বাঙালি মুসলমান, যাঁদের মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি কোনোটাই ছিল না।’ (শরীফ, ২০০১, পৃষ্ঠা : ৪২)
বাঙালি মুসলমান সমাজ অশিক্ষিত। অতএব তারা পূর্বলব্ধ ধারণা থেকে মুক্ত হতে পারে না। বঙ্কিম মুসলমানদের জন্য লিখলেও তারা এতই শিক্ষাবর্জিত যে, সেটা বুঝতে পারে না। অথচ বঙ্কিম লিখছেন তুর্কি-মোগল শাসকদের বিরুদ্ধে। হিন্দু তো সেটা করবেই, কারণ তারা দেশপ্রেমিক। অতএব বঙ্কিমের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করার কোনো নৈতিক অধিকার মুসলমানদের নেই। কিন্তু মুসলমান এমনই অশিক্ষিত যে, এটা বোঝার ক্ষমতাও তাদের নেই!
আহমদ ছফা মুসলমান সমাজ সম্পর্কে আহমদ শরীফের চেয়ে ভিন্ন কিছু ভাবতেন না, প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। মনে করতেন, বাঙালি মুসলমান সমাজ হীনম্মন্য। কিন্তু আহমদ শরীফ বাঙালি মুসলমানদের একাট্টা দোষারোপ করে যেভাবে বাবু-বাঙালির জাতীয়তাবাদের পক্ষে দাঁড়ালেন, আহমদ ছফা সেটা মেনে নিতে পারেননি। সেই কারণেই বাঙালিয়ানার নতুন সংজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছিলেন। সেই হিশাবে বলা যায়, ‘শতবর্ষের ফেরারি’ এক হিশাবে আহমদ শরীফের অবস্থান থেকে নিজের অবস্থানের পার্থক্য বোঝানোর জন্যই ছফা লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন। বঙ্কিমের প্রতি আহমদ শরীফ এবং অন্যদের অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসকে আহমদ ছফা ভালো চোখে দেখেননি। এখানেই ছফার বৈশিষ্ট্য ও অন্যদের সঙ্গে তার পার্থক্য।

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ও ‘শতবর্ষের ফেরারি’
যদি ঊনবিংশ শতাব্দী বঙ্কিমচন্দ্র ও অন্যান্য ‘আধুনিক’ লেখকদের মধ্য দিয়ে হিন্দুর আধুনিক ইতিহাসে প্রবেশের ঘটনা হয়ে থাকে, তাহলে একাত্তর বাঙালি মুসলমানের আবির্ভাবের মুহূর্ত। কিন্তু সেই প্রবেশ ঔপনিবেশিকতার গর্ভে বসে প্রাচ্যবাদী গবেষণার দ্বারা প্রভাবিত হিন্দুর ‘আত্মপরিচয়’ নির্মাণের ইতিহাস নয়। এমনকি যুক্তি ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বঙ্কিমের মতো ‘হিন্দু’ ধারণার পুনর্নির্মাণও নয়। একদমই না। বরং এমন এক ‘বাঙালি’র আবির্ভাব, যে নিজেও তার তাৎপর্য ও সম্ভাবনা সম্পর্কে যথেষ্ট সজ্ঞান ও সচেতন হওয়ার যথেষ্ট ফুরসত পায়নি। আধুনিক ‘বাঙালি হিন্দু’ যদি তার ইচ্ছা ও সংকল্পের দিক থেকে ইতিহাসে প্রবেশ ও নিজের জায়গা নির্দিষ্ট করার জন্য লায়েক হয়ে থাকে, বাঙালি মুসলমানের কাছে এখনও ইতিহাস মানে একান্তই তার নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ। সে জানে না এর আগের ইতিহাস কিম্বা উপমহাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের সঙ্গে সে কীভাবে জড়িত। কোথায় বাঙালি হিন্দুর সঙ্গে তার সম্বন্ধ ও বিরোধের ক্ষেত্র। এই পরিস্থিতিতেই আহমদ ছফা সবাইকে থতমত খাইয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দিলেন ‘বাঙালি মুসলমান’ নামে আলবৎ এক ঐতিহাসিক ব্যাপার আছে, যাকে প্রচলিত ‘বাঙালি’ সংজ্ঞার বদ্ধখাপে আঁটানো যায় না। শুধু নামের জন্যই ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘বাঙালি মুসলমান’ নামক একটি ঐতিহাসিক বর্গকে আহমদ ছফা বর্ণ হিন্দুর ইতিহাস ও বাঙালিত্ব থেকে আলাদা করছেন, এখানেই ছফার কৃতিত্ব।
সুদীপ্ত কবিরাজ ১৯৯৫ সালে বলছেন, যুক্তিবাদী ও আধুনিক বঙ্কিম চট্টোপাধায়ের ‘কৃষ্ণচরিত্র’ ও অন্যান্য ধর্মতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে লেখালিখির উদ্দেশ্য অন্যান্য হিন্দু বা ভারতীয়ের নির্মিত কোনো আদর্শের বিরোধিতা নয়, বরং তা একান্তই ‘যুক্তিবাদী খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব (rational theology of Christianity)। ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিশাবে যীশু বা বুদ্ধ তাঁর পর্যালোচনার বিষয় নয়, বরং খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব যে ‘আদর্শ খ্রিস্ট’ নির্মাণ করে, তার বিপরীতেই তিনি কৃষ্ণের চরিত্র দাঁড় করাতে চাইছেন। তবে তিনি বলছেন, ‘খুবই ইন্টারেস্টিং’ যে, মোহাম্মদ (সা.) তাঁর তালিকার মধ্যে নেই। সুদীপ্ত কবিরাজ মনে করেন, এ অনুপস্থিতি বোঝা দুঃসাধ্য। It is not always easy to read such silence (সুদীপ্ত কবিরাজ, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ৮৮)
ইসলামের সঙ্গে কোনো তর্কে জড়ানো বঙ্কিমের প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তার সমসাময়িক ভূদেব মুখার্জি বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামের ফারাক আছে, অতএব হিন্দু প্রভাবিত ধর্ম চিন্তার অধীনে তাকে আত্মস্থ করা সম্ভব। ‘ব্যাপারটা আসলেই ধাঁধাঁ এবং ব্যাখ্যার অতীত কেন হিন্দু ইসলামকে বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, রাজনৈতিক হুমকি গণ্য করে’- এই একটি বাক্য দিয়েই সুদীপ্ত কবিরাজ বঙ্কিম ও ইসলামের সম্পর্ক ‘ধাঁধাঁ’ বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। প্রায় একই সময়ে লেখা ‘শতবর্ষের ফেরারি’ বইতে আহমদ ছফা দেখাছেন সাধারণভাবে ঊনবিংশ শতাব্দী এবং বিশেষভাবে ইসলাম ও বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে হিন্দু বাঙালির সম্বন্ধ বিচারই বঙ্কিমকে বোঝার প্রধান চাবিকাঠি এবং সেই সম্বন্ধ মোটেও কোনো ‘ধাঁধাঁ’ নয়।
‘শহীদে কারবালা’ জাতীয় পুথি আর মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাস দিয়ে ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ সম্পর্কে গত শতাব্দীর আশির শেষের দিকে যে বিশাল সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, তার আধিপত্য এখনও প্রবল। বাঙালি জাতিবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ ধারার সমর্থক বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তের চিন্তা কাঠামো বোঝার জন্য ছফার বইটি গুরুত্বপূর্ণ। এর মুখ্য থিসিস ছিল এই যে, বাঙালি মুসলমান মনশ্চিত্তবৃত্তির দিক থেকে হীনম্মন্য। তাদের গুপ্ত মনোবাঞ্ছা মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাসে বলা কেচ্ছার মতো- কারবালা থেকে দামেস্কে সীমার কাটা মুণ্ডু হাতে যাচ্ছেন; পথে এক ‘ব্রাহ্মণ’ বাড়িতে রাত্রি যাপন। সেই রাত্রে কাটা মস্তকের কাছে ব্রাহ্মণ দারা-পুত্র-পরিবারসহ কলমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন! ব্রাহ্মণসহ সব হিন্দু এরকম কলমা পড়ে মুসলমান হোক, এটাই বাঙালি মুসলমানের গুপ্ত বাসনা। বলা বাহুল্য, কেন বাঙালি মুসলমান এরকম ভাবে, তার একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ছফা তার এই ক্ষুদ্র পুস্তিকায় দেয়ার চেষ্টা করেছেন। যদিও তা ভাসা ভাসা। কিন্তু যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের ধর্ম বিশ্বাস ও ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে শহুরে মধ্যবিত্তের ধ্যানধারণা পরিগঠনে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ পুস্তিকাটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এমনই যে, সেটা রীতিমতো আলাদা সামাজিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। যদিও তা এখানে আমাদের বিষয় নয়।
‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটি ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুস্তিকাটি বিখ্যাত হয়েছিল। কিন্তু খ্যাতির কারণ একান্তই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক। বাংলাদেশের জনগণ সবে একটি মুক্তিযুদ্ধ করে নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করেছে। এমন দেশের জনগণ- বিশেষত বাঙালি মুসলমান বাঙালি হিন্দুর তুলনায় মনমানসিকতায় হীনম্মন্য ও পশ্চাৎপদ- তাদের মন এখনও ‘আদিম অবস্থায়’ পড়ে আছে- ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক বয়ানই পুস্তিকাটির আর সবকিছু ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ‘সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুনই তা ঘটেছে ছফার এ ব্যাখ্যা থাকার পরেও, বইটি মূলত বাঙালি মুসলমানের প্রতি চিরাচরিত সাম্প্রদায়িক তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবমাননার ধারাকেই যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে ‘বীর বাঙালি’র ধারণার বিপরীতে দ্রুত আবার প্রতিষ্ঠা করতে প্রভূত ভূমিকা রেখেছে।
বাঙালি সবসময়ই ভীরু জাতি হিশাবে পরিচিত ছিল। এ জনগোষ্ঠী রীতিমতো সশস্ত্র যুদ্ধ করে নিজের দেশ থেকে দখলদারদের পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন করবে, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা। কিন্তু ইতিহাসে ঘটনাটা ঘটে গিয়েছে। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ রণধ্বনি নতুন করে ‘বাঙালি’কে গঠন করেছে। যার অর্থ ঔপনিবেশিক ‘বাঙালি’র এখন পশ্চাদপসরণ এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিতে পর্যবসিত হওয়ার কথা। কিন্তু একাত্তরের পর সেটা ঘটল না। যুদ্ধক্ষেত্রের চিহ্ন মুছে যাওয়ার আগেই বাঙালি মুসলমানকে শুনতে হলো, তারা হীনম্মন্য, পশ্চাৎপদ এবং তারা এখনও ‘আদিম অবস্থায়’ রয়ে গিয়েছে।
এ কারণেই বলছি, ছফা কোনো সাম্প্রদায়িক বই লেখেননি, কিন্তু সাম্প্রদায়িক কারণেই বইটি ঢাকা শহরের বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তশ্রেণির মধ্যে খ্যাতি ও মর্যাদা পেয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রতি মধ্যবিত্ত শিক্ষিতশ্রেণির এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার আহমদ ছফার উদ্দেশ্য ছিল না। যাদের কথা তিনি লিখেছেন, তাদের জন্য উৎকণ্ঠাই তাকে এ বই লিখিয়ে নিয়েছে বলা যায়। তার কাজ ও জীবন সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে, তারা সেটা বিলক্ষণ জানেন। কিন্তু আমরা যেভাবে চাই, বাস্তব সেভাবে আমাদের হুকুম মেনে চলবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বইটির খ্যাতির রাজনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। হীনম্মন্য ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী স্বশাসনের উপযোগী নয়, একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা পুথি পড়া বদ্ধচিত্ত বাঙালি মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয়- দিল্লির আধিপত্য বহাল ও দীর্ঘ করার জন্য বাঙালি মুসলমানের এ চরিত্র প্রমাণ খুবই ভালো ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক যুক্তি। এর জন্য আমরা ছফাকে দুষতে পারি না। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবেসে যে আবেগ ও উৎকণ্ঠায় ছফা বইটি লিখেছিলেন ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইতে তার কোনো প্রকাশ ছিল না। ছফা আবেগ দ্বারা তাড়িত ছিলেন, তার দেখবর ও বোঝাবুঝির দৃষ্টি সাহিত্য পরিসরে অধিক প্রসারিত ছিল না। অবশ্য তিনি নিজেও বাঙালি জাতিবাদ, আধুনিকতা ও বঙ্গীয় ধর্মনিরপেক্ষতার বিবিধ অনুমান ও ধারণার বাইরের কেউ ছিলেন না। এমনকি ১৯৯৫ সালে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটির ভূমিকা লিখতে গিয়ে ছফা বাঙালি মুসলমান সমাজ সম্পর্কে নেতিবাচক পূর্বধারণার বাইরে যেতে পারেননি। লিখেছেন, ‘বাঙালী মুসলমান সমাজের ভেতর এমন কিছু ব্যাপারস্যাপার আছে, যেগুলো ব্যক্তিকে কোনো বিশ্বাসের বিন্দুতে স্থির থাকতে দেয় না।’ এ নিয়ে আমরা আগেই আলোচনা করেছি।
কিন্তু কী ছিল আহমদ ছফার উৎকণ্ঠা? তারই উত্তর আমরা ‘শতবর্ষের ফেরারি’ বইতে এসে পাই। সেটা হলো, ‘বাঙালিয়ানা’র যে পুরনো ও ঔপনিবেশিক ধারণা আমাদের মধ্যে বাসা বেঁধে রয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ এগিয়ে যেতে পারবে না। ‘বাঙালিয়ানার’ নতুন সংজ্ঞা প্রণয়ন দরকার। সেই দিকটি তুলে ধরাই এখানে আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটি যে ধারণা প্রতিষ্ঠা ও প্রচার করবার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে, সেটা হলো, বাংলাভাষী মুসলমান হিন্দু জনগোষ্ঠীর তুলনায় নাবালক। তারা ‘সাবালক’ নয়। তাদের মনের কোনো ‘সাবালকত্ব’ নেই। তাদের মনমানসিকতা এখনও ‘শহীদে কারবালা’ পুথি কিংবা মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’তে কাটা মস্তকের কাছে কলমা পড়ে মুসলমান হয়ে যাওয়া জাতীয় আজগুবি কাহিনীর মধ্যে বুঁদ হয়ে আছে। অবাক লাগে যে, আহমদ ছফা এ অতিসাধারণ প্রশ্নটি করেননি যে, যদি তাই হতো, তাহলে কী করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এ দেশের মানুষ যুক্ত হয়েছিল? যদি ধর্মীয় অন্ধত্বই তাদের মনে বাসা বেঁধেছিল, তাহলে বাংলাদেশের ‘শহীদে কারবালা’ আর ‘বিষাদ সিন্ধু’ পড়া পশ্চাৎপদ মুসলমান ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙতে গেল কোন দুঃখে? রক্ত দিয়ে তাদের ‘বাঙালি’ প্রমাণ করার কী দরকার ছিল? চোখের সামনে জলজ্যান্ত ঐতিহাসিক ঘটনা থাকবার পরও ছফা বাঙালি মুসলানের মনের জগতের খোঁজ নিতে গেলেন আজগুবি কল্পনার অস্পষ্ট জগতে। বাস্তব ইতিহাসে না। তার দাবির পক্ষে প্রামাণ্য উপাদান হিশাবে তিনি কবুল করলেন ‘শহীদে কারবালা’ ও ‘বিষাদ সিন্ধু’? বিস্ময়কর বটে! এ বইতে ছফা কী লিখেছিলেন তার একটি সারমর্ম তিনি নিজেই ১৯৯৫ সালে করেছেন। তিনি বলছেন-
‘আমি বাঙালি মুসলমান সমাজের সৃষ্টিকর্ম বিশ্লেষণ করে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম যে, বাঙালি মুসলমান রচিত কোনো শৈল্পিক ও দার্শনিক সৃষ্টি কোনো রকম তাৎপর্য দাবি করতে পারে না। কারণ এই সমাজ বাইরের দিক দিয়ে পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার চাপে বাধ্য হয়ে অল্পবিস্তর পরিবর্তিত হলেও তার কৌম সমাজের মনের গণ্ডিবদ্ধতার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাঙালি মুসলমানের সমষ্টিগত মনের প্রসারহীনতার একটি মুখ্য কারণই আমি নির্দেশ করতে চেষ্টা করেছি। শুরু থেকেই বাঙালি মুসলমান সমাজ রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিত ছিল না বলেই তার মনের ধরন ধারণটি অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের মতো থেকে গেছে। মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাই জাগতিক অগ্রগতির উৎস। বাঙালি মুসলমান চিন্তাই করতে শেখেনি। তার কারণ কখনও সে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করার অধিকার পায়নি। একটি রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে একটি সমাজ বিশ্বসমাজের অংশে পরিণত হয় এবং বিশ্বসভায় একটি আসন অধিকার করে।’ (ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন, ২০০১, p. xii)।
বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে খুবই কঠিন রায়। বাঙালি মুসলমান রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত ছিল না, ফলে রাষ্ট্র তৈরি ও পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে ১৯৭২-৭৫-এর অভিজ্ঞতা ছফার রয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সমর্থক ও কর্মী হওয়ার কারণে ‘রাষ্ট্র’ সম্পর্কে বাঙালি মুসলমানের অনভিজ্ঞতা কী ভয়ানক দুর্দশা ঘটাতে পারে, সে অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। ফলে ‘রাষ্ট্র’ তার চিন্তায় হাজির হয়েছে। বঙ্কিমকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক, সেটা ছফা ভাবতে পারছেন। বঙ্কিম সম্পর্কে ছফার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হচ্ছে-
‘বঙ্কিম ছিলেন আধুনিক বাংলা তথা ভারতের সর্বপ্রথম রাষ্ট্রবেত্তা। তিনিই সর্বপ্রথম একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বঙ্কিম ধর্মচিন্তা, সংস্কৃতিচিন্তা, ইতিহাসচিন্তা, বিজ্ঞানচিন্তা ও সাহিত্যচিন্তা- সব ধরনের চিন্তাপ্রবাহের গতিমুখ রাষ্ট্রচিন্তার মূল বিন্দুকে ঘিরে বিকশিত করেছেন। রাষ্ট্রচিন্তাই তার মুখ্য মনোযোগের বিষয়। অন্য চিন্তাসমূহকে রাষ্ট্রচিন্তার সহায়ক চিন্তা হিসেবে তিনি দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর ছিলো একমুখী মন। যাই লিখুন না কেনো একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তার মনে কম্পাসের কাঁটার মতো হেলে থাকতো। তিনি তাঁর সমস্ত কল্পনাশক্তিকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কামানের গোলার মতো ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।’ (ছফা, শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ১৮)।
বঙ্কিমের প্রতি ছফা প্রবল আকর্ষণ বোধ করতেন রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তার ক্ষেত্রে সংস্কৃতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য- অর্থাৎ সব দিক থেকে একমুখী হওয়ার নিষ্ঠার জন্য। বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্রচিন্তা নেই, এই অভাব ছফাকে বিচলিত করত। বঙ্কিম পাঠ ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ছফার এ উপলব্ধি অন্যদের মধ্যে পাওয়া যায় না।
১৯৯৫ সালে ছফার কিছু নতুন উপলব্ধি হয়েছিল। বুঝেছিলেন, যে সমাজে তিনি জন্ম নিয়েছেন ‘তার নিন্দা করা ঠিক হচ্ছে না’। এতটুকুই। লিখছেন-
‘আমার মনে সামান্য অস্বস্তি ছিল। বাঙালি মুসলমান সমাজকে আমি নানা দিক থেকে অভিযুক্ত করছি, অথচ আমার জন্ম এই সমাজে ঘটেছে, এই সত্য কোনোদিন অস্বীকার করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। নিজের সমাজের অবিমিশ্র নিন্দে করে কোনো মানুষ ভালো কিছু করতে পারে না। সে জন্য মনে মনে অনুসন্ধান করছিলাম এমন কিছু খুঁজে পাই কিনা, যা দিয়ে বাঙালী মুসলমানের দিক সামান্য হলেও আমি উল্লেখ করতে পারি।’ (ছফা, শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৯৯৫, p. viii)
অনুসন্ধানে তিনি ছহি বা খাঁটি বাঙালি মুসলমান না পেলেও শিল্পী এসএম সুলতানকে পেয়েছিলেন। সুলতান খুব ভালো উদাহরণ কিনা তর্ক করা যায়, কিন্তু ছফা তাকে দিয়েই নিজের অস্বস্তি মিটিয়েছিলেন।
মনে রাখা দরকার মুক্তিযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে, তার ১০ বছরের মধ্যে ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ লিখছেন। আশির দশকে লেখা এ বইটির লেখক তখনও কলকাতার বাবু-বাঙালির গৌরবের ইতিহাস থেকে নিজেকে পুরাপুরি বিযুক্ত করতে পারেননি। তিনি নিজেও বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্তশ্রেণির জন্য একই গৌরব অর্জনের স্বপ্ন দেখছেন। ততদিনে বিনয় ঘোষের মতো লেখকরা কলকাতায় এসে গিয়েছেন, ‘বাংলার নবজাগৃতি’র কঠোর পর্যালোচনা করছেন। ছফা সেসব খোঁজ রাখতেন। তার লেখায় বাংলার নবজাগরণের প্রতি উচ্ছ্বাসও কমে এসেছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমানকে তিনি একটাই মাত্র উপদেশ দিতে পেরেছিলেন, সেটা হলো মুসলমানি হীনম্মন্যতা ত্যাগ করে আধুনিক ও উদার হয়ে যাওয়া। ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ঔদার্যচর্চার বাইরে মধ্যবিত্তশ্রেণির মধ্যে সাধারণ মানুষকে দেয়ার মতো নতুন কোনো ভাবনা তখনও গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের জনগণের সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ বোঝার ক্ষেত্রেও বুদ্ধিজীবীশ্রেণির বিশেষ কোনো চেষ্টা দেখা যায় না। বিশেষত যেমন, কীভাবে বাংলাদেশের জনগণ তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির গৌরব নিয়ে নিজের ধর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকবে? ‘আধুনিক ও প্রগতিশীল হতে হলে দর্শন, রাজনীতি সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে কি তাহলে ইসলাম বাদ দিতে হবে? অর্থাৎ যদি থাকে, তবে সেটা থাকবে একান্তই প্রাইভেট ব্যাপার হিশাবে। প্রশ্ন করা যায়, তাহলে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে যা কিছু হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেসব বাদ দেয়া হবে না কেন? বাঙালি জাতিবাদীর কাছে তার কোনো উত্তর নেই।
অতএব পুথি আর ‘বিষাদ সিন্ধু’র কেচ্ছা দিয়ে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বোঝার চেষ্টা অতিমাত্রায় সরলীকরণ। ঐতিহাসিকভাবে বাঙলি মুসলমানের নিজের বোঝা এবং হিন্দু বাঙালির সঙ্গে বিরোধ ও সম্পর্কের জায়গা পরিচ্ছন্ন করার কাজ তো বাকি রয়েছেই, কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে তার সম্পর্কের জায়গাগুলোও অতি অস্পষ্ট এবং অপরিচ্ছন্ন। প্রশ্ন হচ্ছে বাস্তবোচিতভাবে ধর্ম এবং ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে কীভাবে জনগণ তাদের ঐতিহাসিক বোঝাপড়া মেটাবে? নিজ দেশে, উপমহাদেশে ও বিশ্বে ‘মুসলমান’ হিশাবে অন্য ‘মুসলমান’ কিংবা ‘মুসলিম উম্মাহ’র সঙ্গে তার সম্পর্ক কী হবে? ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে কীভাবে তারা যুক্ত থাকবে? ইত্যাদির কোনো নির্দেশ বা পরামর্শ আমরা আহমদ ছফার কাছে পাই না। কিন্তু বিমূর্ত উপদেশ পাই। যেমন, ‘বাঙালিয়ানার একটি নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ’ করতে হবে। তাই ছহি। এ আহ্বানও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিমণ্ডল থেকে আসা এ ডাককে গুরুত্বের সঙ্গেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে।

বাঙালি মুসলমানের দায়
‘বাঙালিয়ানার নতুন সংজ্ঞা’ আসলে কী? এবং কীভাবেই বা তার সম্পাদন সম্ভব?- তার কোনো উত্তর আহমদ ছফার নেই। সেটা নেই বা থাকুক। কিন্তু তিনি হিন্দু বাঙালির অভিজ্ঞতা থেকেও কোনো শিক্ষা নেননি। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম কিংবা রবীন্দ্রনাথ কেউই তাদের ধর্ম এবং হিন্দু পরিচয় থেকে আলাদা থাকেননি, ধর্ম নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন, হিন্দু ধর্ম ও ঐতিহ্যের মধ্যে জ্ঞানতাত্ত্বিক সত্য, হিন্দুর ইতিহাসে বাঙালির ঐতিহ্য এবং কর্মক্ষেত্রে সনাতন ধর্মের মধ্যেই তারা কর্মযজ্ঞের নৈতিক ভিত্তি খুঁজেছেন। আহমদ ছফার সামনে মহৎ হিন্দু লেখকদের এসব বিপুল দৃষ্টান্ত ছিল। আমাদের সামনেও রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ হাজির নাজির আছেন। তারা নিজ ধর্মের পর্যালোচনা করেছেন, নিজের ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। ভিন্নমতের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন, নিজ ধর্মেরও সংস্কার করেছেন। কিন্তু তারা কেউই হিন্দুর জ্ঞানকাণ্ড, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাইরের নন, বরং তাদের চিন্তার উৎস এবং ভিত্তি তারা বেদে, সংহিতায়, গীতায়, উপনিষদে খুঁজেছেন। পেয়েছেনও বটে। নিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে নিজেদের ‘অপর’ করে তোলেননি, নিজ জনগোষ্ঠীর দুশমন তো ননই। নাস্তিক কিংবা ধর্মে অবিশ্বাসী হলেও ধর্মতাত্ত্বিকদের পরিমণ্ডলে সাগ্রহে তারা অংশগ্রহণ ও তর্ক-বিতর্ক করেছেন। নিজ ধর্ম ও ঐতিহ্যের পর্যালোচনা করেছেন এবং যতটুকু দরকার সাগ্রহে নিয়েছেন, নিজের প্রশ্নটা ব্যক্তির বিশ্বাস কিম্বা অবিশ্বাসের ব্যাপার না, সমষ্টির, সমাজের- যথাসম্ভব পুরা সমাজকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মামলা।
বাঙালি মুসলমানের চ্যালেঞ্জ হিন্দু বাঙালির তুলনায় দ্বিগুণ বলা যায়। নিজেকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে ‘বাংলাদেশী’ বললে মূল চ্যালেঞ্জ অপসৃত হয় না। কারণ তখনও বাংলাদেশীরা ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে ‘বাঙালি’ ও ধর্ম পরিচয়ে ‘মুসলমান’ থেকে যায়। চ্যালেঞ্জের একদিকে আছে ‘বাঙালি’ হিশাবে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ বিচার, অন্যদিকে রয়েছে নিজের ধর্ম অর্থাৎ ইসলামের সঙ্গে বোঝাপড়া। বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ বিচার বাঙালি মুসলমানের যতটা দায়, ঠিক ততটাই- কিংবা হয়তো আরও বেশি দায় হচ্ছে নিজেদের বিশ্বাস। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামগ্রিকভাবে ইসলামের বিশ্ব ইতিহাসের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখা। অবশ্য সেসব দায় অস্বীকার করে নিজেকে শুধু ‘মুসলমান’ কিংবা শুধু ‘বাঙালি’ বললে সমস্যা চুকে যায়। দুই পক্ষেই এদের সংখ্যা বাংলাদেশে কম না। কিন্তু নিজেকে ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে ‘বাঙালি’ এবং একই সঙ্গে ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে ‘মুসলমান’ গণ্য করলে এ দায় অস্বীকার অসম্ভব। অথচ বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দুর নির্মাণ। অন্যদিকে ইসলাম আরব, ইরান ও তুরানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বহন করে। এ দুইয়ের মীমাংসা আমরা যত সহজ মনে করি, তত সহজ নয়।
ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে বাঙালি মুসলমান নিজের সম্বন্ধের পর্যালোচনা করতে বাধ্য। হিন্দুর পক্ষে হিন্দু হয়ে ‘বাঙালি’ হওয়া সহজ, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের পক্ষে নির্বিচারে ‘বাঙালি’ হওয়া কঠিন। উচ্চবর্ণের হিন্দুর হাতে তৈরি হওয়া বাঙালি পরিচয়কে বাঙালি মুসলমান ইতিহাস হিশাবে জানে; সে আরও না হয় জানতে পারে, আরও গবেষণা করতে পারে, কিন্তু পরিচয়ের বর্তমান সংজ্ঞা বাঙালি মুসলমান নির্বিচারে গ্রহণ করতে পারে না। এজন্যই বলেছি, স্বাধীন বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী হিশাবে বাঙালি মুসলমানের দায় যেমন ডবল, কাজও তেমনি দ্বিগুণ। এ ভার বহন সহজ নয়, বরং জাতিবাদের যুগে কঠিন ও বিপজ্জনক। বাস্তব কারণেই বাঙালি জাতিবাদের প্রতিক্রিয়া হিশাবে ধর্মীয় জাতিবাদের পরিগঠন স্বাভাবিক। বাংলাদেশে তা-ই ঘটেছে। ধর্মীয় জাতিবাদ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাস থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করার বাস্তব আপদ হয়ে উঠতে পারে। ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের দ্বন্দ্ব একটি বাস্তব সমস্যা। এর মীমাংসা দরকার।
কিন্তু এর উজ্জ্বল দিকও আছে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কথা ভাবলে দায়দেনার স্বীকার-অস্বীকারের সন্ধিক্ষণে বাঙালি মুসলমান উপমহাদেশে ও বিশ্বে নতুন ঐতিহাসিক সম্ভাবনাও বটে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম ইসলাম, যার মর্মে রয়েছে জাত-পাত বিরোধিতা, ইনসাফের ধারণা এবং পাশ্চাত্য চিন্তার পরিমণ্ডলের বাইরে নতুনভাবে দার্শনিক পর্যালোচনার ইঙ্গিত। বাঙালি মুসলমান আরব নয়, আর্য নয়, সিন্ধু নদের এপারেই তাদের অধিবাস। অনার্য ও শূদ্রের ইতিহাস সে বহন করে- একই সঙ্গে বহন করে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য। যাকে ‘সনাতন’ ধর্ম বলা হয়। সেই লৌকিক বিশ্বাস, ধর্মাচার ও সংস্কৃতির বাইরেও সে নয়। বাছবিচার করলেও ধর্মের চোখ রাঙানি এড়িয়ে নিজের লোকায়ত ঐতিহ্য বাঙালি ধারণ করতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে উত্তর-ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বাংলাদেশের জনগণ তাদের শেকড়বাকড় ডালপালা পাতাপুষ্প কীভাবে লালন ও রক্ষা করবে কিংবা করলেও কী রাখবে আর কী বাদ দেবে? সেই দিকটা এখনও একদমই অস্পষ্ট। একাত্তরের পরে তার ওপর এই দায় এসে পড়েছে। তার কোনো প্রস্তুতি নাই। হুঁশ আছে কিনা নিদেনপক্ষে সেটাই আপাতত বিচার্য।
আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমানের এ গুরুভার বহনের কোনো সমাধান দিতে পেরেছেন বলে আমি মনে করি না। বাঙালি জাতিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিমণ্ডলের আধিপত্য তার হৃদয় ও বুদ্ধির অনেকখানি অধিকার করে ছিল। হয়তো এই ডাবল গুরুদায়িত্বের জটিলতা তার কাছে স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু ‘বাঙালিয়ানার নতুন সংজ্ঞা’র দাবি জানিয়ে তিনি এতটুকু জানান দিতে সক্ষম হয়েছেন যে পুরোনা বাঙালিয়ানার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণকে ‘বাঙালি’ পরিচয় নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। ঔপনিবেশিক কলকাতার তৈরি সংজ্ঞায় কাজ হবে না। ছফার এ ঐতিহাসিক উপলব্ধি, সংবেদনা ও দূরদৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই ‘শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ পুস্তিকাটিকে তার অন্য যেকোনো কাজের চেয়ে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।
বাঙালি জাতিবাদের যে ধারা এখনও দাপুটে তাদের দাবি হচ্ছে- ‘বাঙালি’ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ হতে হলে বাঙালি মুসলমানকে নিজের ধর্ম বাদ দিয়েই ‘বাঙালি’ হতে হবে। ধর্ম থাকবে, কিন্তু সেটা হবে প্রাইভেট ব্যাপার। পাবলিক না। সংস্কৃতি, রাজনীতি, পরিবারের বাইরে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে ইসলাম থেকে মুক্ত রাখতে হবে। আধুনিক বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি উচ্চবর্ণের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি ধারণ করেই বাঙালির ঐতিহ্য। কিছুই হাওয়া থেকে জন্মগ্রহণ করেনি। কিন্তু বাঙালি মুসলমানও বাঙালি এই ঐতিহাসিক সত্য তারা মানতে চান না। তারা মনে করে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালির ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিক নির্মাণই ছহি- সেই নির্মাণই প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে উদার হিন্দুও সজ্ঞানে-অজ্ঞানে মনে করে বাঙালি মুসলমানের ধর্ম, ধর্মের ইতিহাস, সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য বাঙালির বাইরের জিনিস। সেখান থেকে বাঙালি সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের কিছুই নেয়ার নেই। বাঙালি মুসলমান বাঙালি হতে চাইলে তাকে উচ্চবর্ণের হিন্দুর ‘বাঙালি’ সংজ্ঞাই নির্বিচারে মেনে নিতে হবে।
আহমদ ছফা ‘বাঙালিয়ানার নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ’ করার কথা বলেন, কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব তার কোনো কার্যকর পথ দেখাতে পারেন না। বাঙালি জাতিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি- এ ফাঁদ থেকে বেরিয়ে না এলে অনিবার্যভাবেই প্রতিক্রিয়া হিশাবে বাংলাদেশে মুসলিম জাতিবাদী ধারার প্রাবল্য বাড়বে। সেটাই শেষাবধি বাংলাদেশের নিয়তি কিনা, সেটা বাংলাদেশের চিন্তাশীল লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী প্রভৃতিগণের কর্ম ও কর্মফলের ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু সাহিত্যিক হিশাবে আপাতত আহমদ ছফার উপলব্ধি ও পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা আমাদের কাজে লাগে। বাংলাদেশের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ভবিষ্যৎ কর্তব্য হিশাবে ‘শতবর্ষের ফেরারি’ পুস্তিকায় তিনি কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা তা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ‘ফেরারি’ বইটি কেন্দ্র করে সেটাই এখানে কিছুটা আলোচনা করবো।
 
ছফার বাসনা
‘ডেপুটি বাবু’ বঙ্কিমকে বিচার করার দৃষ্টি ‘শতবর্ষের ফেরারি’তে অনেক পরিণত। তবে এখানেও বাঙালি মুসলমান ছফার কাছে ‘ধর্মশাসিত’; তার মধ্যে ‘সামন্ত চিন্তা একচ্ছত্র প্রতাপে’ কাজ করে; ‘জাড্যতা’, ‘বদ্ধমত’, ‘কুর্মবৃত্তি’ ইত্যাদি বাঙালি মুসলমান ‘সমাজমানসকে সংকুচিত’ ও ‘অসহিষ্ণু’ করে রাখে; ‘বাঙালি মুসলমানের মানস ভুবনের প্রায় সমস্ত অঞ্চলে মধ্যযুগ এখনো রাজ্যপাট বিস্তার করে আছে... বাঙালি মুসলমান নিজের ভারেই নুইয়ে আছে’ ইত্যাদি।
এই হীনম্মন্য অন্ধকার জায়গা থেকে অভাগা বাঙালি মুসলমানকে আহমদ ছফা মুক্ত করতে চান, নইলে ‘বাঙালি মুসলমান সমাজ আধুনিক বিশ্বের সামনে নির্ভয় চিত্তে কখনও দাঁড়াতে পারবে না’।
ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শুরু অবধি হিন্দু নবজাগরণ দ্বারা ছফা অনুপ্রাণিত, কিন্তু ‘শতবর্ষের ফেরারি’তে ছফা বাঙালির রেনেসাঁর মোহ থেকে অনেকটাই মুক্ত। এ বইতে বঙ্কিম বিচার করতে গিয়ে ছফা অনেক স্থিরমতি, আগের অনেক লেখার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক চিন্তাশীল। ‘চিন্তাশীল’ কেন বলেছি, সে ব্যাখ্যায় পরে আসছি। নব্বইয়ের শেষের দিকে বঙ্কিম নিয়ে লেখা এ বইয়ে ছফার কিছু নতুন উপলব্ধি আগে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই।
ছফা একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাষ্ট্র চান। কিন্তু সেটা ‘ঘোষণা দিলেই’ হয় না। কারণ ‘একটি দরিদ্র কৃষিপ্রধান দেশ’ কিছুতেই এক লাফে সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করতে পারে না। এটা ‘একটা সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার’। ছফার দাবি হচ্ছে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের এ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এ ব্যাপারে ছফার সংকল্প এতই দৃঢ় যে, তিনি ‘শুরু করতে হবে’ বাক্যটি ‘জোর দিয়ে উচ্চারণ’ করেছেন। কাজের দুটো শর্ত ছফা দিয়েছেন। প্রথম শর্ত হলো, ‘বাঙালিয়ানার একটা নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করতে হবে’, দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, ‘বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত আধুনিক বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির যে পাটাতনটি সৃষ্টি করেছে, সম্পূর্ণ নতুনভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে একটি গ্রহণযোগ্য মানদ- আবিষ্কার করা। এর সারকথা হচ্ছে, বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণি ঔপনিবেশিক কালপর্বে বাঙালিপনার সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে সেটা অচল। বাঙালিয়ানার নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করাতে হবে, যেন ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি তা গ্রহণ করতে পারে। এখন ‘বাঙালি’র যে সংজ্ঞা, সেটা বাঙালি মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে ছফার কলম থেকে এই প্রস্তাবগুলো বেরিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ।
ছফা বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের ‘নানামুখী জাগরণের স্তর’ অস্বীকার করতে চান না। তবে বাঙালিয়ানার সংজ্ঞা নির্মাণের ভার তিনি হিন্দু মধ্যবিত্তের কাঁধে দিতে চাননি। বলেছেন, ‘ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষদের হাতে বাঙালিত্বের নতুন সংজ্ঞা নির্মাণের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে।’ কিন্তু সেই সংজ্ঞা বাঙলি মুসলমানের সংজ্ঞা হবে না। ‘এই প্রস্তাবিত নতুন সাংস্কৃতিক পাটাতন সমস্ত বাঙালি জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া এবং বিনিময়ের পথ অনেকখানিই প্রশস্ত করবে।’ আহমদ ছফা বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে একটা ঐতিহাসিক বোঝাপড়া চান।
বাঙালিয়ানার নতুন সংজ্ঞা নির্মাণের প্রকল্প ছফার দিক থেকে নতুন প্রস্তাব। তার নালিশ যে, ‘বাংলাদেশে মধ্যশ্রেণিভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রতি এমন এক ধরনের মোহমুগ্ধতা ক্রিয়াশীল, সেটাকে অনেকটা অন্ধত্বের পর্যায়ে ফেলা যায়। এ অসঙ্গত অতীতমুখিতা তাদের বর্তমানের প্রতি সম্পূর্ণ কর্তব্যবিমুখ করে রেখেছে।’ আরও বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বাংলাদশের অগ্রগণ্য প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবীদের বিরাট একটি অংশ বাঙালিয়ানার নামে যেসব চিন্তাচেতনা প্রচার করে আসছেন, তার বেশির ভাগই পশ্চিম বাংলা কলকাতাকেন্দ্রিক চিন্তাচর্চার চর্বিত-চর্বণ। মুসলিমপ্রধান একটি সমাজে বাঙালিয়ানার প্রচার ঘটাতে হলে বাঙালিয়ানার একটি নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করতে হবে।’ তবে সে লক্ষ্যে ধর্মশাসিত বাঙালি মুসলমান সমাজ থেকে ধর্মতান্ত্রিক সামন্ত চিন্তার একচ্ছত্র প্রতাপের অবসান চান ছফা। তিনি বাঙালি মুসলমানের জন্য নতুন বাঙালিয়ানার সংজ্ঞা চান। সেটা তাদের ধর্ম বিশ্বাস বা ধর্ম বাদ দিয়ে কিনা, তা তিনি স্পষ্ট করেন না। মানুষের মনোগঠনে ধর্ম, পুরাণ, কল্পনা, সংস্কার থাকবেই। বঙ্কিম ‘কৃষ্ণচরিত্র’, ‘ধর্মতত্ত্ব, ‘শ্রীমদ্ভগবতগীতা’ লিখেছেন, বুদ্ধদেব বসু ‘মহাভারতের কথা’ লিখেছেন। প্রতিটি যুগেই সাহিত্য জনগণের মনের সঙ্গে কথোপকথনে জড়াতে গিয়ে পুরনো পৌরাণিক কেচ্ছা, ধর্ম, লোককাহিনী ইত্যাদি নতুন করে বয়ান করতেই পারেন। হিন্দু সাহিত্যিকরা পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থকে তাদের সাহিত্যের বিষয়ে পরিণত করেছিলেন। তুলনায় ‘শহীদে কারবালা’ কিংবা ‘বিষাদ সিন্ধু’ ব্যতিক্রমী কোনো কাজ নয়। হিন্দু জাতিবাদের বিপরীতে বাঙালি মুসলমানের জাতিবাদী বাসনার অনিবার্য অভিপ্রকাশ মাত্র।
ছফার ধর্ম নিরপেক্ষতার এটাই হলো অবাস্তব ও অনৈতিহাসিক দিক, যেখানে তিনি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের চেয়ে আলাদা নন। হিন্দু বাঙালি তার ধর্ম ও পুরাণ নিয়েই ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু বাঙালি মুসলমানকে ধর্ম নিরপেক্ষ হতে হলে তার ধর্ম বাদ দিতে হবে। বাঙালি হিন্দুর সঙ্গে বোঝাপড়ার এটাই শর্ত।

প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু উত্তর দিতে পারলেন না
‘শতবর্ষের ফেরারি’ শুরু হয়েছে সরল কিন্তু খুবই দামি প্রশ্ন দিয়ে। ছফার যে অঞ্চলে জন্মগ্রহণ ও বসবাস, সেখানে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কের মধ্যে কোনো তিক্ততা ছিল না। কিন্তু শিক্ষাজীবনে ছফা দেখেছেন স্কুল বা কলেজ লাইব্রেরিতে বঙ্কিম তার বইয়ে যেসব জায়গায় মুসলমান সম্পর্কে ‘নিষ্ঠুর এবং অকরুণ’ মন্তব্য করেছেন, সেসব উপন্যাসের সব জায়গায় পুস্তকের মার্জিনে মুসলমান ছাত্ররা ‘শালার বঙ্কিম, মালাউন বঙ্কিম এবং ছাপার অযোগ্য গালাগাল লিখে রেখেছে।’ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও ব্যতিক্রম ছিল না। মাইকেল ও বিদ্যাসাগর ছাড়া, ছফার বক্তব্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর সব হিন্দু লেখকই ছিল সাম্প্রদায়িক। তাহলে বঙ্কিমের ক্ষেত্রে মুসলমান পাঠকদের এ স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ার কারণ কী? একে তিনি ‘সহজাত সাম্প্রদায়িক অনুভূতির প্রকাশ’ হিশাবে মানতে চাননি। কিন্তু বলছেন, ‘গায়ে মশা বসে কামড় দিলে যেমন হাত আপনি চালিত হয়ে মশাটিকে পিশে ফেলে, তেমনি বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গেই মুসলমান পাঠকদের একাংশ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে’... ইত্যাদি। ছফা তার কারণ অনুসন্ধান করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার দাবি, উত্তরও তিনি পেয়ে গিয়েছেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার মধ্যে ঘৃণা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে, যা ম্সুলমান পাঠককে পড়া মাত্রই আহত করে।’ এরপর বিজয়ীর ভঙ্গিতে ছফা লিখছেন, ‘খুব সম্ভবত মুসলমান পাঠকেরা বঙ্কিমের বইতে খারাপ কথা লেখে কেন তার একটা জবাব পেয়ে গেছি।’ (ছফা, শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ৪০)
প্রশ্নটা দামি, অথচ উত্তরটা অতিশয় হালকা। ঘৃণাকে ব্যক্তির বিকার হিশাবে উপেক্ষা করা সহজ, কিন্তু ঘৃণা এখানে মোটেও মুখ্য বিষয় নয়। এখানেও ঘৃণাতত্ত্ব দিয়ে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ছফা আবারও মারাত্মক ভুল করেছেন।
অথচ পুস্তিকাটিতে আহমদ ছফা বঙ্কিমের যে বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, সেই বিশ্লেষণ থেকে কোনো ঘৃণাতত্ত্ব তৈরি হয় না। সাহিত্য নয়, বরং বঙ্কিমের হাতে তৈয়ারি হিন্দু রাষ্ট্রের তত্ত্ব কীভাবে বাঙালিকে তো বটেই, পুরা উপমহাদেশকে বিভক্ত, বিষাক্ত ও সহিংস করে তুলেছে, ছফা বরং সেই সত্যই সাহসের সঙ্গে হাজির করেছেন। ছফার কারণে বঙ্কিমকে আমরা আরও ভালো করে বুঝতে পারি। ছফা পড়ে আমাদের প্রশ্ন জাগে মুসলমান পাঠকরা কি আসলেই বঙ্কিমের মুসলমান বিদ্বেষের জন্য তার বইয়ের মার্জিনে গালাগালি করে? নাকি আরও গভীর এবং আরও সুদূরপ্রসারী কারণ আছে? বঙ্কিমকে তিরস্কার কি সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বিভেদ সৃষ্টির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়? বঙ্কিমের বইয়ের বাইরে নিত্যদিন যে প্রতিবেশীর সঙ্গে একত্রে বসবাস- বৈচিত্র্য, পার্থক্য, ও ঝগড়াঝাঁটির পরও দিন শেষে যেখানে একটা বন্ধনের ছায়া সবাইকে সমাজে একত্রিত রাখে। বঙ্কিম সেই সমাজটাই তো নিষ্ঠুর ও নির্দয়ভাবে ভেঙে দিচ্ছেন। এর বেদনা তীব্র। দীর্ঘকালের মুঘল ও সুলতানী আমলে হাজারও সমস্যার পরেও হিন্দু ও মুসলমান একসঙ্গে পাশাপাশি একই গ্রামে পুরুষ পরম্পরায় বাস করেছে, বঙ্কিম সেই জনপদগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন। যে ‘হিন্দু মালাউন’কে মুসলমান পাঠকরা গালি দিচ্ছে, সেকি আসলেই তার প্রতিবেশী? নাকি এই ‘মালাউন’ ভিন্ন? যার জন্ম ঔপনিবেশিকতার ঔরসে, আধুনিক জাতিবাদের গর্ভে? তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, বঙ্কিমের প্রতি বাঙালি মুসলমানের প্রতিক্রিয়া কি সবটাই শুধু মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা? নাকি তাদের ঐতিহাসিক উপলব্ধি? গ্রাম ও জনপদের ঐক্য ও সামাজিক বন্ধনের ক্ষেত্রগুলো প্রতিরক্ষার জন্য প্রতিরোধ? যাদের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের হাজার বছরের বসবাস, তাদের সঙ্গে আরও হাজার বছর থাকার আকুতি? এ জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে হলে আহমদ ছফার ঘৃণাতত্ত্ব দিয়ে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ব্যাখ্যার পদ্ধতি থেকে বের হওয়া খুবই জরুরি। বঙ্কিমের ভয়াবহ পরিণতি এখন আরও স্পষ্ট। একদিকে হিন্দুত্ববাদ ও তার প্রতিক্রিয়া হিশাবে পরিগঠিত মুসলিম জাতিবাদ উপমহাদেশের রাজনীতির নির্ধারক হয়ে উঠেছে। এ বিভাজনের পরিসমাপ্তি ঘটানোর জন্য নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটানো এখন খুবই দুঃসাধ্য। এর পরিণতি কোথায় দাঁড়াবে বলা মুশকিল।
‘বাঙালি মুসলমানের মন’ সম্পর্কে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার দুর্বলতা সত্ত্বেও কম-বেশি পরিণত ঐতিহাসিক চোখ দিয়েই ছফা বঙ্কিমকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। পদ্ধতি হিশাবে তার গুরুত্ব আছে। প্রচলিত ঘৃণাতত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাভাষী জনগণকে ঔপনিবেশিক আমলের বিভেদ রেখা অতিক্রম করে পরস্পরকে নতুনভাবে চেনার ও জানার ক্ষেত্রগুলোকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করা জরুরি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই কাজ করতে হলে ছফা যা ‘পেয়ে গিয়েছি’ বলে দাবি করেছেন, তাকে সিরিয়াসলি নেয়া যাবে না। তবে ছফার অনুসন্ধিৎসার সততা এবং গবেষণার অভিমুখ অবশ্যই আমাদের কাজে লাগে।
ছফা ঠিকই বলছেন, ‘আধুনিক বাংলার ইতিহাসে ঊনবিংশ শতাব্দী এক আশ্চর্য সময়’। বঙ্কিমকে বুঝতে গিয়ে আধুনিক বাংলার ইতিহাসকে ছফা ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে এবং পরে এ দুই ভাগে বিচার করতে চান। আগে যে ধারায় বাংলা বিকশিত হয়ে আসছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে সেটা ‘নতুন খাতে’ বইতে শুরু করে। কিন্তু সেটা ‘সমাজের একটি সীমিত অংশের সর্বব্যাপ্ত লক্ষণ’। সীমিত হয়েও সর্বব্যাপ্ত হোলো কীভাবে? কারণ সমাজের রক্ষণশীল অংশও এতে আলোড়িত হয়েছে এবং সেখানে রূপান্তর ঘটেছে। বঙ্কিমের গুরুত্ব কোথায়? তিনি উনিশ শতকি বাঙালি সমাজের জাগ্রত জিজ্ঞাসাসমূহের অনেকগুলোই ধারণ করেছিলেন। যেসব ‘গুণ ও বৈশিষ্ট্য’ ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্তানদের ‘অমরতার বসনে আবৃত করেছিল’ বঙ্কিমের মধ্যে সেই ‘প্রতিভা’ ছিল। প্লেখানভের বরাতে সেই ‘প্রতিভা’র ব্যাখ্যা ছফা দিচ্ছেন- ‘মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির সামাজিকীকরণের ক্ষমতা।’ কিছুটা রহস্যে ভরা ব্যাখ্যা। তবে ছফা বলতে চেয়েছেন, বিদ্যাসাগর, রামমোহন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, অক্ষয় দত্ত এমনকি রামকৃষ্ণ পরমহংস সবার মধ্যেই ‘প্রতিভা’ ছিল, কিন্তু তারা বিশেষ ‘গুণ ও বৈশিষ্ট্য’ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘কিন্তু বঙ্কিমকে যে জিনিসটি ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যবিধ মনীষীদের চাইতে আলাদা ও স্বতন্ত্র করে... সেটা হলো বঙ্কিমের রাষ্ট্রচিন্তা।’ ছফার দাবি, বঙ্কিমের রাষ্ট্রচিন্তাই তাকে ‘আধুনিক ভারতের রাষ্ট্রগুরু হিশাবে ইতিহাসের পাদপীঠে স্থাপন করেছে... বঙ্কিম ছিলেন আধুনিক বাঙলা তথা ভারতের সর্বপ্রথম রাষ্ট্রবেত্তা। তিনিই সর্বপ্রথম একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন।’ তুলনায় রবীন্দ্রনাথ রাজনৈতিক সংগ্রামের চাইতে গ্রাম সনাজকে নতুনভাবে গঠন করতে চাইতেন।
কীভাবে তিনি এ কাজ করলেন? ‘বঙ্কিম তাঁর রচিত সাহিত্যের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রচিন্তার বীজটি চারিয়ে তুলেছিলেন... বঙ্কিম ধর্মচিন্তা, সংস্কৃতিচিন্তা, ইতিহাসচিন্তা, বিজ্ঞানচিন্তা ও সাহিত্যচিন্তা সব ধরনের চিন্তাপ্রবাহের গতিমুখ রাষ্ট্রচিন্তার মূল বিন্দুকে ঘিরে বিকশিত করেছেন। রাষ্ট্রচিন্তা তার মুখ্য মনোযোগের বিষয়। অন্যবিধ চিন্তাসমূহকে রাষ্ট্রচিন্তার সহায়ক চিন্তা হিশাবে দাঁড় করিয়েছেন। তার ছিল একমুখী মন। যাই লিখুন না কেন একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তার মনে কম্পাসের কাঁটার মতো হেলে থাকতো তিনি তার সমস্ত কল্পনাশক্তিকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কামানের গোলার মতো ছুড়ে দিয়েছিলেন...। কিন্তু বঙ্কিম তার স্বপ্ন নির্মাণ করতে গিয়ে মুসলমানকে ইতিহাসের অধিকার থেকেই বঞ্চিত করলেন।’
বঙ্কিম তার হিন্দুরাষ্ট্র থেকে সজ্ঞানে সচেতনভাবে মুসলমানদের বাদ দিয়েছেন। তার এই রাষ্ট্রচিন্তায় মুসলমান দুশমন হিশাবে হাজির থাকে। সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের কথা আমরা জানি। বঙ্কিম ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে হিন্দু সন্ন্যাসীদের দিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াই দেখেছেন, কিন্তু সেই ইতিহাস থেকে ফকির বিদ্রোহ বাদ। সেখানে মজনু শাহ কিংবা তার পালক পুত্র চেরাগ আলী নেই। বঙ্কিম ‘হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত লড়াইকে একক হিন্দুর লড়াই দেখাতে গিয়ে ইতিহাসের এমন একটা বিকলাঙ্গ অগ্রগতির খাত খনন করেছেন, যা বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসকে একটি কানা গলির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে।’
ছফার বিশ্বাস- “বঙ্কিমের প্রাগ্রসর সম্মুখ দৃষ্টি, ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা, তৎকালীন ইউরোপীয় ধ্যান-ধারণার সঙ্গে নিবিড় পরিচয় এবং বিজ্ঞানমনস্কতা’ সত্ত্বেও ‘দেশ ও সমাজের সামনে একটি ভিন্ন রকম জাতীয় এবং সামাজিক আদর্শের দৃষ্টান্ত’ তুলে ধরতে পারেননি। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ছফা ‘ডেপুটি বাবু’ বঙ্কিমের জীবনের সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতার উল্লেখ করেছেন। তিনি অধিকতর যোগ্য ও দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও সারাজীবন তাঁকে অযোগ্য ও অপদার্থ লোককে সালাম ঠুকতে হয়েছে। তাঁর কোনো পদোন্নতি ঘটেনি। ছফার ব্যাখ্যা- ঔপনিবেশিক শাসন ব্যক্তিকে যেমন খ-িত করে, তেমনি তাঁর চিন্তা ভাবনারও একপেশে বিকাশ ঘটাতে বাধ্য করে।” ডেপুটি বাবুর হয়েছিল সেই দশা।
কিন্তু তার জন্যই উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছে। রক্তাক্ত হতে হয়েছে বারবার। ভবিষ্যৎ আরও রক্ত ও হানাহানির ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ডেপুটি বাবুর ভূত আমাদের মাথা থেকে তাড়ানোর পথ আমাদের অবশ্যই অনুসন্ধান করতে হবে। ভূত তাড়াতে হলে ‘বাঙালিয়ানার নতুন সংজ্ঞা চাই’- আহমদ ছফার এ ঘোষণার তাৎপর্য শুধু বাংলাদেশ বা বাঙালি মুসলমানের জন্য নয়- পুরা উপমহাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। তাৎপর্যপূর্ণ সারাবিশ্বের বাংলাভাষীদের জন্য। মাত্র ৬০ পৃষ্ঠার খুদে পুস্তিকাটির এ আহ্বানই নতুন বাংলার ইশতেহারের সমতুল্য হয়ে আমাদের চিন্তা ও কর্তব্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
এখানেই আহমদ ছফার গৌরবের দিক।
এ আহ্বান আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।

বইপত্রের হদিস
Kaviraj, Sudipta. The Unhappy Consciousness: Bankimchandra Chattopadhyay and the Formation of Nationalist Discourse in India. SOAS, 1995.
আনিসুজ্জামান- ‘বঙ্কিম আলোচনা’- বঙ্কিমচন্দ্র সার্ধশত জন্মবর্ষে, সম্পাদনা : আবুল কাসেম ফজলুল হক, জাগৃতি প্রকাশন, ২০০১
ছফা, আহমদ- বাঙালি মুসলমানের মন, শ্রী প্রকাশ, ২০০১
ছফা, আহমদ- শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রাচ্যবিদ্যা প্রকাশনী, ১৯৯৫
শরীফ, আহমদ- ‘বঙ্কিম আলোচনা’- বঙ্কিমচন্দ্র সার্ধশত জন্মবর্ষে, সম্পাদনা : আবুল কাসেম ফজলুল হক, জাগৃতি প্রকাশন, ২০০১

Disconnect