ফনেটিক ইউনিজয়
সেই যে আমার নানা রঙের ঈদগুলি
ফেরদৌস নাহার

সে বছর যখন দেশে গেলাম, তখন থেকেই শুনছি, আমি চলে আসার কদিন পর থেকেই রোজা শুরু হবে, কাজেই ভাইবোনেরা জোরেশোরে ঈদ পর্যন্ত থেকে যাওয়ার আবদার করে বসল। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়, দিন-ক্ষণ-তারিখ সবকিছু হিসাব-নিকাশ করে তবেই পাড়ি দিতে হয় এ দূর পরবাস ভেঙে। তাই মনে মনে ইচ্ছে থাকলেও মনকে বুঝাই, এভাবেই অনেক রোজা আসবে, রোজা শেষে ঈদের চাঁদ দেখার মাতামাতির মাঝে ঈদও আসবে, কিন্তু তোমার তো থাকা হবে না হে ফেরদৌস। কারণ তুমি বেছে নিয়েছ দীর্ঘ পরবাস। তাই দেশের মাটির অনেক উৎসব থেকে বঞ্চিত হবে। আত্মীয়পরিজন, বন্ধুবান্ধব ঘেরা উৎসবের মাঝে হয়তো তোমার অনুপস্থিতির কথা উচ্চারিত হবে, শুধু তুমিই থাকবে না স্বশরীরে!
ঠিক, আমি যে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছি জগজ্জোড়া হাজারো আয়োজনের ডাকে। এ যাত্রায় যেতে হবে কলকাতায়। সেখানে ‘বাহান্ত প্রকাশ’-এর প্রকাশনা উৎসবে যোগ দিতে আমিসহ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসবেন আরও বেশ কজন বাংলা ভাষাভাষী লেখক। আমাদের প্রত্যেকেরই নতুন বই প্রকাশ হবে। সেই মহাযজ্ঞে থাকার আগ্রহও অনেক। তাই বাড়ির সবার আবদার একপাশে সরিয়ে যথাসময়ে উড়াল দিলাম কলকাতা, প্রকাশনা উৎসবের উদ্দেশে। পেছনে পড়ে রইল আপনজনদের আবদার আর কটা দিন থেকে গেলেই পারতি, এবার ঈদটা একসঙ্গে করা যেত, কত না ভালো লাগত আমাদের! কথাগুলো ভেতরে বহন করে নিয়ে আসি, কিন্তু থাকা হয় না।
কলকাতায় পৌঁছতেই রোজা শুরু হয়ে গেল, নিউমার্কেট এলাকায় ইফতারি আর রোজাদারদের খাবারের তোড়জোড় দেখে বেশ আমোদ পেলাম। বাহান্ন প্রকাশের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা সহযাত্রী বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে ইফতারিও খেলাম। পেঁয়াজু, ছোলা, বেগুনি, জিলাপির স্বাদ নিতে নিতে ঢাকায় ফেলে আসা রোজা, ঈদ-উৎসবের স্মৃতি নিয়ে আমরা সবাই অনেক গল্প করলাম। দীর্ঘশ্বাস ছড়ালাম। রোজার এক মাস বাংলাদেশে যে উদযাপন ও আয়োজন তা যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, সামনে উৎসব! আমাদের খুব আনন্দ হতো এ উপলব্ধিতে। আমরা যারা বয়সে নবীন ও তরুণ ছিলাম, তারা ঈদের আগমনী শুনতে পেতাম রোজার এক মাস ধরে প্রতিটি দিন। অধীর অপেক্ষায় থাকতাম।
এদিকে কলকাতা থেকে যখন কানাডায় ফিরে এলাম, তখনও রোজা চলছে। টরন্টো পৌঁছে খুব মন ভার ভার লাগছিল। প্রিয়জনদের ছেড়ে দূরদেশে চলে আসার পর যে অনুভূতি গ্রাস করে, তাকে এককথায় ডিপ্রেশন বললেও কম বলা হবে। দীর্ঘ বিমান যাত্রার কারণে ‘জেট ল্যাগ’ পেয়ে বসেছে। নিজের ঘরে পৌঁছে ঘুমের কোলে আশ্রয় নিলাম। নিজেকে ক্লান্ত-শ্রান্ত সর্বহারা বলে মনে হতে লাগল। কোথায় ঢাকায় সবাই উৎসব নিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছে, আর আমি কিনা সব ফেলে চলে এলাম বিভূঁই প্রান্তরে। একেই হয়তো বাস্তবতা বলে।
টরন্টোতেও বেশ আয়োজন করে ঈদ উৎসব পালন করা হয়। ঈদ উপলক্ষে দেশ থেকে পাঠানো বা আনিয়ে নেয়া পোশাক, গহনা, জিনিসপত্র দিয়ে ভালোভাবেই ঈদ উদযাপন করে সবাই। এছাড়া এখানকার ইন্ডিয়ান ও বাংলাদেশী দোকানগুলোতেও প্রচুর জিনিস মেলে। তাই ঈদের বেচাকেনা এখানকার ঈদকেও রঙিন ও উজ্জ্বল করে তোলে। শাড়ি, চুড়ি, পাঞ্জাবি, কামিজ, কুর্তা, লেহাঙ্গা, চুড়িদার থেকে শুরু করে সব ধরনের পোশাক পাওয়া যায় এখানে। আপাতদৃষ্টিতে বাঙালিরা দেশ থেকে দূরে থাকলেও ঈদের জৌলুশকে মিস করে না। কারণ ঈদের আয়োজন নিয়ে প্রথম রোজা থেকেই শুরু হয়ে যায় ‘ঈদ মেলা’। কেনাকাটা, গানবাজনা, খাওয়াদাওয়া সবকিছুরই আয়োজন আছে। ইফতারের জন্যও বিশাল ব্যবস্থা বাংলা পাড়ার খাবারের দোকানে। এছাড়া ঈদের আগের দিন চাঁদরাতে মেহেদি লাগানোর উৎসব আনন্দকে আরেক ধাপ বাড়িয়ে তোলে। মাঝরাত পর্যন্ত চলে এ মেহেদি আল্পনার শিল্পকর্ম। এ সবকিছুই মূলত বাঙালি অধ্যুষিত বাংলা পাড়া ভিক্টোরিয়া পার্ক, ড্যানফোর্থ এলাকাতেই হয়ে থাকে। ঈদ আরও জাঁকজমকময় হয়ে ওঠে ঘরে ঘরে খাওয়াদাওয়া, আপ্যায়ন, উপহার ও রকমারি প্রস্তুতিতে। এত কিছু আছে, এত আনন্দের পসরা সাজিয়ে বরণ করা হয় টরন্টোর ঈদকে, তাও আমার বিরান লাগে এ দূর দেশের ঈদ। যদিও কানাডা সেই দেশ, যেখানে অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান রেখে চলার সবটুকু ব্যবস্থা করে রেখেছে। এ দেশ প্রমাণ করেছে- ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। কিন্তু আমি কোনো স্বাদ পাই না। হয়তো মনে মনে এখনো খুঁজে বেড়াই বাংলাদেশের মানচিত্রে বয়ে যাওয়া ঈদ উৎসবকে!
ঈদ আমার কাছে ধর্মীয় কারণের চেয়ে শতগুণ বেশি আকর্ষণীয় উৎসবের কারণে। এই যে প্রতিদিন থেকে আলাদা করে একটি ভিন্নতার আমেজ বয়ে যায় চারদিকে, এই যে সবাই এক মাস রোজা রাখুক কিংবা নাই রাখুক, কিন্তু চেষ্টা করছে সেই আনন্দ উপলব্ধির পরিবেশ তৈরি করতে, এ সবকিছু আমাকে উৎসবের দিকে টেনে নেয়। এই যে টরন্টোর ঈদেও অনেক ঘনঘটা, তাও এ দেশের ঈদের সঙ্গে নিজেকে সেভাবে খুঁজে পাই না বললেই চলে। যেসব বছর দিনটি একেবারেই উদযাপন করা হয় না নানা রকমের বৈষয়িক ব্যস্ততায়- মন উদাস হয়, বিষণœ লাগে। মনে পড়ে রোজার এক মাস ধরে কত না আয়োজন। ঈদ সামনে রেখে কেনাকাটা, বাড়িঘর ঠিকঠাক করা। ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ঈদ কার্ডের বহর লেগে যেত। খুব ভালো লাগত নানা কথা ও ছবির কার্ডগুলো সাজিয়ে রাখতে। কৈশোরে আমার এক আত্মীয়র কাছে পাঠানো একটি ঈদ কার্ডে, একজন প্রেমপ্রত্যাশীর লেখা দুটি পঙ্‌ক্তি পড়ে ফেলেছিলাম, যা এ জনমে আর ভোলা হলো না-
‘ঈদ নিয়ে এলো শিরিন শিরিন মন হরিণের মেশক বাস
আমার মনের আতর গোলাপ ছড়িয়ে দিলাম সব সুবাস’
কার্ডের উপরে গোলাপ ফুলের নকশা আঁকা। ভাঁজ খুলতেই একটি আলগা কাগজে ছাপানো লাইন দুটি। কার লেখা এ পঙ্‌ক্তি? আজও জানা হয়নি, কিন্তু মনে আছে খুব। আমরা অবশ্য তারুণ্যে আজাদ কিংবা আইডিয়াল প্রডাক্টসের ছাপানো ঈদ কার্ড আদান-প্রদান শুরু করি। তার আগে আর্টকার্ড কাগজ কেটে নিজে হাতে এঁকে লিখে বন্ধুদের ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড পাঠাতাম। কাছেরজনদের হাতে হাতে, দূরেরজনদের পোস্ট করে। এছাড়া আশি ও নব্বইয়ের দশকে কিনতে পেতাম আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের হাতে আঁকা নানা রকমের কার্ড। সেগুলোতে খুব নতুনত্ব পেতাম। একেকটি আর্ট পিস বলে মনে হতো। আর যাদের দিতাম তারাও খুব খুশি হতো। কারণ কোনোটাই কোনোটার সাথে মেলে না। হাতে বানানো কার্ড বলে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতায় এসব কার্ড অনেক সময় একটু বেশি দাম দিয়ে হলেও কিনেছি। আজকাল সেভাবে ঈদ কার্ড আর কেউ কেনে না। অনলাইনে শুভেচ্ছা পাঠিয়ে ভারমুক্ত। ব্যক্তিগত ঈদ কার্ড দেয়া-নেয়া উঠে গেছে বললেই চলে। অথচ কানাডা, আমেরিকা ইউরোপে এখনো বড়দিনে যে পরিমাণ শুভেচ্ছা কার্ড বিক্রি ও পাঠানো হয়, তাতে পোস্ট অফিসের কাজ বেড়ে যায় বহুগুণ বেশি। প্রেরকের কাছে সেসব কার্ড সময়মতো পৌঁছে দেয়ার জন্য বাড়তি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে অবশ্য নানা রকমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে, ঠিকানা বরাবর সৌজন্য কার্ড পাঠিয়ে দেয়। তাতে কি আর আন্তরিকতা থাকে? থাকে করপোরেট বিশ্বের বাণিজ্য-ভাষা।
ছেলেবেলা মায়ের হাতের দুধ সেমাই, লুচি, জর্দা, ফির্নি, বুটের ডালের বরফি কাটা হালুয়া সাথে ঝাল মাংস। এসব দিয়ে শুরু হতো আমাদের ঈদের সকাল। তারপর সারাদিন তো পড়েই রয়েছে। রূপকথার হাজারও রকমের খাবার না হলেও একেবারে কমও যায় না। পোলাও, কোর্মা, কালিয়া, কোপ্তা, রেজালা, কাবাব, বিরিয়ানি কার কথা রেখে কার কথা বলব। সারাদিন বাড়িতে আত্মীয়স্বজন মেহমানের আসা-যাওয়া। ক্লান্তিহীন আপ্যায়ন আর আতিথ্যে মা আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন উৎসব-আনন্দের রহস্যামৃত। খাবারের কথা যতবার লিখতে যাই, ততবার মা চলে আসেন। আমার কাছে মায়ের রান্না মানেই পৃথিবীর সেরা রান্না।
ভোরের নাশতা দিয়ে শুরু করেই বাড়িতে ঈদ ঈদ ভাব তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। আগের রাতেই কত কিছু যে রেঁধে রাখতেন মা। শুধু সকালবেলা গরম গরম লুচি-পরটা আর পোলাও রাঁধতেন। আমাদের ১০ সিটের ডাইনিং টেবিলেও সাজানো হতো ঈদ স্পেশাল বাসনপত্র দিয়ে। মায়ের বিলেত থেকে আনা ৫৬ পিসের অটোম গ্লোরি ডিজাইনের জাজ পাইরেক্সের ডিনার সেট, বিশেষ দিনে কাচের আলমারি থেকে মুক্তি পেয়ে ঝলমল করে ভরিয়ে তুলত বিশাল ডাইনিং টেবিলের প্রাঙ্গণ। এর রূপ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, দুধ সাদার উপরে শরতের কমলা রঙের ফুল আঁকা। এদিকে ঈদের দিনে ঘরও সাজানো হতো একেবারে নতুন আনকোরা চাদর, পর্দা, টেবিলক্লথ দিয়ে। টেবিলক্লথের উপরে মায়ের হাতে ক্রুশকাঁটায় বোনা নকশাদার ঝালরের আবরণ। সেসব ক্রুশকাঁটার আবরণ দিয়ে কাঠের ট্রেতে ঢেকে রাখা হতো সাজানো হালুয়া, মোরব্বা বা মিষ্টান্ন শিল্প। ধোয়ামোছা শুরু হয়ে যেত ঈদের কয়েক দিন আগেই। যেদিকে তাকাও মনে হবে, আমাদের বাড়িটা নতুন সাজে সেজেছে। ২৭ রোজার আগের রাতে মেহেদি পাতা বাটার ধুম পড়ে যেত, ২৭ রোজা উপলক্ষে হাত ভরে মেহেদির কারুকাজ। সবাই বলতো এই মেহেদির রঙ আগামী কোরবানি ঈদ পর্যন্ত রাখা গেলে নাকি সওয়াব পাওয়া যাবে। ছোট-বড় কেউ বাদ যায় না, আমরাও। ওদিন আহ্লাদ করে আব্বার হাতেও একটি গোল বৃত্ত এবং কড়ে আঙুলে মেহেদির টুপি পরিয়ে দিতাম। ঈদের দিনের ভোর পর্যন্ত খুলে রাখা মার্কেট ও রাতভর পাড়ার মাইকে উচ্চ ভলিউমে বাজতে থাকা গান জানান দিত, ঈদ এসেছে! ঈদ এসেছে! সে সময় থর থর আবেগে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’ গান না শুনলে যেন ঈদই হবে না! কাজেই বাড়ির টেলিভিশনে ততোধিক জোরে সাউন্ড দিয়ে বাজাও-
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ’
ঈদের নতুন জামা। সে যেন প্রতি বছর নতুন নতুন সারপ্রাইজ। রোজার প্রথম থেকেই শুরু হয়ে যেত নতুন জামার প্রস্তুতি। কিন্তু বন্ধুরা কেউ কাউকে জানতে দিতাম না, এবার ঈদে কী ধরনের বা কী রঙের জামা নিচ্ছি। কারণ বলে দিলেই তো পুরনো হয়ে গেল! তাহলে ঈদের নতুন জামার আনন্দ আর থাকল কই! আমি অবশ্য এসব লুকোচুরির মাঝে থাকতে চাইতাম না। কিন্তু ছোটবোনের মুখ চেয়ে আমাকেও চুপ থাকতে হতো। কারণ মা আমাদের দুজনার জন্য একই কাপড় কিনে আনতেন। তখন মায়েরা হাত চালানো সেলাই মেশিন চালিয়ে জামা-কাপড় তৈরি করে দিতেন, আর বাচ্চাগুলোও বিনা প্রশ্নে সেসব গায়ে দিয়ে দিব্বি তৃপ্তির হাসি হেসে মাকে খুশি করে দিত। এটাই যেন নিয়ম ছিল। তখন ঘরে ঘরে মায়েদের একটি করে সেলাই মেশিন ছিল। যাকে আমরা সিঙ্গার মেশিন বলে ডাকতাম। যেন সেলাই মেশিন মানেই সিঙ্গার মেশিন। তো ঈদের পোশাকের এ লুকোছাপা এতটাই সতর্কতার সঙ্গে করা হতো যে, সামান্য কাটা সুতো বা ছাঁটকাপড় পর্যন্ত দরজার বাইরে যেতে পারত না। ঈদ সকালে আনকোরা নতুন জামা গায়ে দিয়ে বন্ধুদের চমক দেয়ার প্রতীক্ষায় চেয়ে থাকতাম। সঙ্গে থাকত নতুন জুতো।
একটা বয়স পর্যন্ত ঈদের সকালে গোসল সেরে মায়ের হাতে তৈরি নতুন জামা পরেছি। পরে আরেকটু সাবালক হয়ে ওঠার পর নিজের পছন্দের ড্রেস পরে, সেন্ট মেখে রেডি। তখনও পারফিউম আসেনি, সেন্টই ছিল। ঈদের নামাজ শেষ করে ঈদগাহ থেকে ঘরে ফিরলেই বড়োদের পা ছুঁয়ে সালাম করার ধুম লেগে যেত। কারণ অপেক্ষায় আছি ঈদ-সেলামির জন্য। মা, বাবা, মামা, চাচা, খালা কেউই এ সেলামি দেয়া থেকে রেহাই পেত না। এ ছিল ছোটদের এক অনিন্দ্য আনন্দ উপভোগ ও পকেট ভারী করার প্রথা। আমরা সেলামি আদায় করে নতুন জুতা পায়ে বেরিয়ে পড়তাম। পায়ে ফোস্কা না ফেলা পর্যন্ত অবিরাম ঘুরে বেড়ানো। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, কারও সঙ্গে দেখা করা বাদ দিতাম না সেদিন, এর একটি প্রধান কারণ ঈদ-সালামি। মনে পড়ে, টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা চলা সুনসান ঈদ দুপুর, যার সামনে বসে আছে আমাদের গৃহকর্মী ও তাদের দলবল। মাঝে মাঝে আমরাও। রাতে ঈদ আনন্দমেলার বিশাল বিশাল সব ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ঈদের বিশেষ নাটক, হয় হুমায়ূন আহমেদ, নয় আমজাদ হোসেন। সেসব নাটক দেখে হাসতে হাসতে পেট খিল ধরে যেত। সারাদিন ঘুরে বেড়ালেও সন্ধ্যার পর ঈদ টিভি প্রোগ্রামের জন্য বাড়ি ফেরার তাড়া থাকত। বাড়িতে আয়েস করে এসব উপভোগ করার মজাই ছিল আলাদা। ঈদে আরেকটি প্রিয় জিনিস ছিল, অসংখ্য ঈদ সংখ্যা। কোনোটা ঢাউস এ-ফোর সাইজের, কোনোটা আবার দৈনিক পত্রিকার সাইজে হলেও অসংখ্য পৃষ্ঠার। এর যতগুলো সম্ভব সংগ্রহ করে, বেশ কিছুদিন পড়ার মতো রসদের ব্যবস্থা করে ফেলি। সেসব অনেক ঈদ সংখ্যাতেই প্রথম পড়েছি অসংখ্য বিখ্যাত উপন্যাস। যেগুলো পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
কতকাল কেটে গেছে ঈদ উপলক্ষে কোনো নতুন পোশাক কিনি না। কত ঈদ কেটে গেছে বৈষয়িক দায়িত্ব পালনে। প্রবাসের ঈদ আমাকে প্রতিবার দাঁড় করিয়ে দেয় অতীতের মুখোমুখি। আমি আজও স্পষ্ট অনুভব করি, ঈদ সকাল, নতুন জামা গায়ে মা-বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেই গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেছেন তারা। একটি অজানা অভিমান কাজ করে ভেতরে ভেতরে, মনে মনে বারবার বলি, এত কী তাড়া ছিল এতটা তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার! এভাবে ভাবনার গোলাঘর কত না আবেগ দিয়ে ঠাসা।
কলকাতা থেকে ফিরে ঈদের কথা ভেবে বিষণ্ন যখন, কানাডার পশ্চিমের রকি মাউন্টেনের কোলঘেঁষা শহর ক্যালগেরি থেকে ছোট ভাইয়ের ফোন পেলাম। বলল, চলে আয় এখানে, একসঙ্গে ঈদ করব। আমিও সঙ্গে সঙ্গে রাজি। মাত্রই যে দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে ফিরেছি, ভুলেই গেলাম। ডাক এলে মন ছুটে যায় প্রান্তরে প্রান্তরে। সাড়ে চার ঘণ্টার উড়াল শেষ করে ঈদের দুদিন আগে ঠিক ঠিক পৌঁছে গেলাম অ্যালবার্টা প্রভিন্সের গুরুত্বপূর্ণ শহর ক্যালগেরিতে, ভাইয়ের কাছে। এবারের রোজার ঈদ তাহলে একা নয়, আপনজনদের সঙ্গেই কাটবে।
এ দেশে বড়দিন ছাড়া আর কোনো উৎসবে সরকারি ছুটি নেই। চাইলে ঐচ্ছিক ছুটি নেয়া যায়। তবে যথারীতি কাজের গুরুত্ব থাকলে আগে কাজ, পরে উৎসব। ঈদের দিন চিকিৎসক ভাইও চলে গেল তার কর্মক্ষেত্র হাসপাতালে। সে হৃৎরোগ বিভাগে কাজ করে। কাজেই তার তো আরও ছুটি নেই। এদিকে ক্যালগেরিতে কদিন ধরে ঝমঝম বৃষ্টি আর উথাল-পাথাল বাতাস। তাপমাত্রাও বেশ ঠাণ্ডা। এসব মাথায় নিয়েই ভাইয়ের স্ত্রী ও কন্যাসহ পূর্বনির্ধারিত একটি ঈদ নিমন্ত্রণের উদ্দেশে দুপুরে বেরিয়ে গেলাম। দুর্যোগের মাঝেও সেখানে অনেক বাঙালির সঙ্গে দেখা হলো। নানা রকমের উৎসবের খাওয়া-দাওয়া ও গপ্পে কাটল সময়। বিকালে কাজ শেষে ভাইও সরাসরি যোগ দিল সেখানে।
সামাজিকতা সেরে সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে সারা পথ আমরা আমাদের ছেলেবেলার ঈদের গল্পে মেতে উঠি। সেসব গল্পে বারবার ফিরে আসে কত না স্মৃতি, কত না হারানো আপনজন, কতকাল পর। কোন ঈদে কে কী করেছিলাম, কোথায় গিয়েছিলাম, যেখানে অনেকদিন আর যাওয়াই হয়নি, কী হারিয়েছিলাম অথবা পেয়েছিলাম, কার বাড়িতে ঈদের দিন চটপটি খেয়ে অবাক ও মজা পেয়েছিলাম ইত্যাদি সহজ-সরল আন্তরিক গল্পগুলো কিছুতেই বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না রেখে আসা মাটি থেকে। আমাদের ট্রেন তখন ছুটে চলছে নির্দিষ্ট স্টেশনের দিকে। কিন্তু আমাদের গল্পগুলো সে রকম কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা থাকে না। আমরা চলতে থাকি, কুড়াতে থাকি এলেবেলে যা যা মনে পড়ছে, অবিরাম সেসব বলতে বলতে। এ বলা জানি ফুরাবে না এ জীবনে।

Disconnect