ফনেটিক ইউনিজয়
পাগলচাঁদ সম্প্রদায়ের আদর্শবাদ ও ধর্মীয় রীতিনীতি
রঞ্জনা বিশ্বাস

পাগলচাঁদ সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক চরিত্র অনুধাবনের জন্য এ সম্প্রদায়ের দার্শনিক চেতনা ও সাধন-পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সামাজিক, পারিপার্শ্বিক এবং নানাবিধ ধর্ম-সংস্কৃতির দ্বন্দ্বের কারণে গৌণ ধর্ম সম্প্রদায়গুলোর সাধন-পদ্ধতি অনুধাবনে বস্তুগত অসুবিধা দেখা যায়। লোকায়ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত গৌণ ধর্ম-সম্প্রদায়ের ধর্মদর্শন ও সাধন-পদ্ধতি বিশ্লেষণে এ অসুবিধা প্রকট হওয়ার মূল কারণ হলো, এসব সম্প্রদায়ের সাধন-পদ্ধতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট লিখিত কোনো দলিল থাকে না। গুরু-শিষ্যপরম্পরায় প্রবাহিত সাধন-পদ্ধতি ও সংগীতই ধর্মদর্শন বিশ্লেষণের একমাত্র সহজ উপায়। সম্প্রদায়ভুক্তরা ‘আপন ভজন কথা, না কহিবে যথাতথা’ নীতিতে বিশ্বাসী বলে সে চেষ্টাও খানিকটা ব্যাহত হয়। তবে এসব সম্প্রদায়ের দর্শন, সংগীতকে আশ্রয় করে বিকাশ লাভ করে বলে, ‘সঙ্গীত’ই হয়ে ওঠে ধর্মদর্শনচর্চার একমাত্র উৎস। রূপক, প্রতীক ও সংকেতের সাহায্যে প্রহেলিকাধর্মী ভাষায় এ সংগীতগুলো রচিত হয় বলে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে এর মর্মোদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। সাধনতত্ত্ব সম্পর্কে এ সম্প্রদায়ের প্রধান কোনো আকরগ্রন্থ নেই। ফলে পাগলচাঁদ পথিকের কাছে, ভক্তদের গাওয়া ‘পাগলসংগীত’ হৃদানন্দ পাগলের ‘হৃদানন্দসংগীত’ প্রভৃতি একমাত্র ধর্মচর্চার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
আধ্যাত্মিক চেতনার চূড়ান্ত অভিপ্রায় প্রকাশ পায় দার্শনিক তত্ত্বের মাধ্যমে, যা বিশেষ দার্শনিক প্রত্যয়কে অবলম্বন করে ধর্ম হিসেবে গড়ে ওঠে। এ তত্ত্বের চরম নির্বাণপ্রাপিÍর কর্মপ্রণালি হলো সাধন-পদ্ধতি। পাগলচাঁদ তার ভক্তদের জন্য বিশেষ পাঁচটি আজ্ঞা দিয়ে যান। এগুলো পঞ্চ আদেশ নামে পরিচিত। এগুলো হলোÑ
 ১। পিতামাতাকে ভক্তি করো, ২। সদা সত্য কথা বলো, ৩। হিংসাদ্বেষ ত্যাগ করো, অন্তর-বাহির সমান করো, ৪। স্বামী-স্ত্রী দাম্পত্য প্রেমে থাকো, ৫। প্রজা হয়ে রাজভক্তি করো।
পাগলচাঁদ সম্প্রদায়ের ধর্মসংগীত বিশ্লেষণ করলে এ ধর্মের দার্শনিক তত্ত্ব সম্পর্কে অনেকখানি অবহিত হওয়া যায়। পাগলচাঁদের কর্ম ও দর্শনসমূহ এসব গানে আশ্রয় লাভ করেছে বলে এ গানগুলোকে পাগলসংগীত বলে। পাগলচাঁদ তার ধর্ম সাধনার মূলে একেশ্বরবাদকে স্থান দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘মানুষ সারা জীবন সাধনা করেও এক দেবতাকে খুশি করতে পারে না। সে আবার বহু দেবতাকে খুশি করতে চায় কীভাবে?’
পিতা-মাতাকে ভক্তি করো
তিনি বললেন, ‘এই জগৎ সংসারে মাতা পিতা ঈশ্বরের বাস্তব প্রতিকৃতি : তাঁরাই প্রধান উপাস্য, তাঁদের সেবাতেই ঈশ্বর সেবা হয়।’
হৃদানন্দ পাগল তাই গেয়ে ওঠেন-
‘পিতা-মাতা কর পূজা, মার মজা সত্যের ধ্বজা উড়াও ব’সে’
একইভাবে মহিম পাগল বলেন-
‘পাগল নামের মালা জপ করো না।
করো মাতা-পিতার চরণপূজা, দেহের গৌরব আর রাখিস না।’
হৃদানন্দ পাগল তার গানে বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ বলেন-
‘মাতা লক্ষ্মী পিতা নারায়ণ’ মনরে-
মাতা-পিতা যোগেতে, জন্মেছ এ জগতে,
আগেতে তাই দরশন॥’
পিতা-মাতার দয়ার গুণে সন্তান নরক যাতনা থেকে মুক্তি পায়।
‘মাতা-পিতার কি দয়া, দেয় যদি পদছায়া,
ডরে তারে কাল শমন;

তাই এই পিতা-মাতাকে ব্যথা দিলে সন্তানের মঙ্গল নাশ হয়-
হৃদানন্দ বলেন-    ‘এত সাধের পিতামাতা,
    কভু- দিলে তাদের প্রাণে ব্যথা, গো-
    অবশ্য তার নরকে পতন;’

পাগলচাঁদের অনুসারীরা মাতা-পিতাকে গুরু নয় ঈশ্বর জ্ঞানে মান্য করেন, পূজা করেন। তারা মনে করেন, মাতা-পিতার দয়ানুগ্রহ ছাড়া স্বর্গলাভ অসম্ভব। তাই বারবার পাগলসংগীতে ভক্ত গেয়ে ওঠেন-
    বলো সবে সত্য কথা, ভজন করো পিতা-মাতা :
    মনে মুখে কর একতা;
তাই বারবার ভক্ত তার সন্তানদের সতর্ক করেন এই বলে-
    ‘মন তুই, -এই যুক্তি নে, এই উক্তি নে,
    এই যুদ্ধে মুক্তি পাবি নে;
    পিতা-মাতার ভক্তি বিনে
    এইযুদ্ধে মুক্তি পাবি নে।’
এভাবে পাগলচাঁদ সম্প্রদায়ের প্রতিটি ভক্তের গৃহ হয়ে ওঠে একেকটি দেব গৃহ মন্দির। মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের ভক্তি ও কর্তব্য কর্মের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় চমৎকার সামাজিক বন্ধন, যা সামাজিক অবক্ষয় রোধে ভীষণ রকম কার্যকারী।
এ প্রসঙ্গে পাগলচাঁদের প্রশ্ন- ‘প্রতিমা পূজা’ করার সময় পুরোহিতেরা মন্ত্রবলে প্রতিমার চক্ষুদান করেন ও প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। অথচ তারা একজন অন্ধকে চক্ষুদান করতে পারেন না কেন, একজন মৃত ব্যত্তির মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না কেন? যখন দুর্গা পূজা হয়, তখন কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়। একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাকে দেবী দুর্গার আসনে বসিয়ে তাকে শ্রী দুর্গা জ্ঞানেই অর্চনা করা হয়। সেখানে মাটির বা পাথরের প্রতিমা থাকা সত্ত্বেও কুমারী পূজার আয়োজন কেন? তবে কি মাটির প্রতিমায় অপূর্ণতা থাকে বলেই এ আয়োজন? পাগলচাঁদ বলেন, ‘ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরকে তোমরা পিতার মাঝেই দেখতে পারো। আর মা, সে তো জগজ্জননীর জীবন্ত প্রতীক। কালী, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মনসা আদি যত দেবীর কল্পনা করা হয়, সবাইকে মায়ের মধ্যে খুঁজে পেতে পারো।’ তাই দেব-দেবীর পূজা অর্থ ব্যয় নিষিদ্ধ করেন পাগলচাঁদ। বলেন, ‘মাতা-পিতার অর্চনা করো, তাদের সেবা করো।’
তাই ভক্ত কালাচান পাগল গেয়ে ওঠেন-
    ‘গৃহে থাকতে মাতা-পিতা পূর্ণঘট
    তা থুইয়া কিনিয়া পূজা কুমার বাড়ির পোড়াঘট!’
হৃদানন্দ পাগল বলেন-
    ‘আদিব্রক্ষ পিতা মাতা,
    বলে, -আদি ধম্ম সত্য কথা, গো।’
এভাবে পাগলচাঁদের ধর্মমতে মাতা-পিতা হয়ে ওঠেন জীবন্ত দেব-দেবী এবং চূড়ান্তভাবে পূজ্য ও আরাধ্য। দেবদাস কবিরাজ বলেন-
মাতা-পিতা লৌকিক কিন্তু তাদের সৃজনী শক্তি অলৌকিক। অতএব মরা কাঠ আর মাটি, পাথরের পূজা ছেড়ে মাতা-পিতারূপ ঈশ্বরের ভজনা করাই সর্বোত্তম পথ।

সদা সত্য কথা বলো
পাগলচাঁদের মতাদর্শে ‘সত্য কথা বলাকে’ অন্যতম প্রধান আজ্ঞা হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘সত্যই ঈশ্বর। সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ঈশ্বরকে পাওয়া সহজ হয়।’ ‘যার কথা সত্য নয়, তার জপ, ধ্যান, তপস্যা, পূজা, পার্বন’ সবই বৃথা। পাগলচাঁদ তাই ভক্তদের মধ্যে সত্যের চর্চা প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন। তিনি প্রতি বছর ১৪ ফাল্গুন (২৬ বা ২৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে যে ধর্মসভার আয়োজন করেন, সেখানে ‘পাপস্বীকার’ পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। ১৬ ফাল্গুন রাতে এ উপলক্ষে ভক্তরা সভায় নিজের পাপ স্বীকার করেন। পাগলচাঁদ বিশ্বাস করতেন, পাপ স্বীকারের মাধ্যমে ভক্তের মধ্যে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তার পাপ মোচন ঘটে। জীবদ্দশায় পাগলচাঁদ এ সভায় দাঁড়িয়ে বলতেন-
‘আজ এই ভক্ত সভায় বসে যে তার অতীতের পাপকর্মের গোপন কাহিনী খুলে বলতে পারবে, সে তার কৃতকর্মের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে।’ ভক্তরা তখন একে একে দাঁড়িয়ে সভার মধ্যে নির্দ্বিধায় আপন আপন কৃতকর্ম বলে যেত। তা শুনতে শুনতে সভায় আসা পাগলভক্তরা পাগলচাঁদের নামে পাগলী মায়ের নামে থেকে থেকে জয়ধ্বনি দিত।
প্রতি বছর ভক্তরা ‘পাপস্বীকার’ পদ্ধতির মাধ্যমে সত্য বলার চর্চায় যেমন রত হন, তেমনি পরবর্তী সময় ঘৃণ্য পাপ কাজ সম্পর্কে যাতে জনসমক্ষে বলতে না হয়, তার জন্য পাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকতে সচেষ্ট হতেন।
‘সত্যই’ মূলধর্মÑ সত্যই ঈশ্বর’ আর তাই সত্যের প্রতি চালিত করতে সবসময় পাগলচাঁদ উপদেশ দিতেন। হৃদানন্দ পাগলের গানে-
    ‘সত্যে মজ, মিথ্যা ত্যাজ গো- ভজ সবে-
    শ্রী চরণ মাতা-পিতার ॥’
তিনি আরও বলেনÑ
    ‘সদা সত্য উক্তি বিনে, এই যুদ্ধে মুক্তি পাবি নে;
    সত্য গুরুর শক্তি বিনে এই যুদ্ধে মুক্তি পাবিনে।
    ’’’ ’’’ ’’’ ’’’
    সত্য দেবে সদাচিন্তী, সত্য-ভাব হবে নিতান্ত,
    সত্য দেব হয় রাধাকান্ত, হৃদানন্দ গালাবে।’
অর্থাৎ ‘সত্য ছাড়া মুক্তি নেই। সত্যই শক্তির উৎস, সত্যই দেয় সৎচিন্তা করার ক্ষমতা এবং এ সত্যের সন্ধান দেন স্বয়ং রাধাপাগল বা পাগলচাঁদÑ যে সত্যের গুণে হৃদয় আনন্দ লাভ করে।’

লক্ষ্মীজ্ঞানে নারীকে সম্মান করো
পাগলচাঁদ দর্শনের মূল মন্ত্রের একটি হলো নারীকে শক্তিরূপে সম্মান করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, চৈতন্যের বৈষ্ণব ধর্মের মাধ্যমে বাংলায় যে নবজাগরণ শুরু হয়েছিল তার স্রোত বিভিন্নভাবে বিভিন্ন নামে লোকের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছিল আর তাদেরই একটি শাখা পাগলচাঁদের ধর্মমত। নারীর গুরু হয়ে ওঠার স্বীকৃতি তান্ত্রিক শাস্ত্রের বৈশিষ্ট্যসূচক হলেও সেখানেও নারীর নির্বাণ স্বীকৃত হয়নি। বৈদিক রীতিনীতি অনুসারে স্ত্রী বা একজন নারী গৃহস্থালি অনুষ্ঠানাদিতে সহধর্মিণী। কেবল স্বামীর অনুমতিসাপেক্ষে স্ত্রী তার মানত পূরণ করতে পারে, হোম-যজ্ঞ-ব্রত সম্পাদন করতে পারে। তান্ত্রিক শাস্ত্রানুসারে নারী শুধু মন্ত্র গ্রহণই নয়, গুরু হিসেবে মন্ত্র প্রবর্তন ও প্রদান করতে পারে।
কিন্তু পাগলচাঁদের ধর্মমতে নারী শুধু স্ত্রী নয়, শুধু গুরু নয়, সে স্বয়ং শক্তির আধার। বৈষ্ণব সহজিয়া চিন্তায় নারীরা হচ্ছে রাধার মূর্ত প্রকাশ; ধর্মতত্ত্বে নারীর কোনো স্থান না থাকলেও শচী ও বিষ্ণুপ্রিয়া, চৈতন্যের মা ও স্ত্রী সম্মানিত হয়েছিলেন। পাগলচাঁদের ধর্মমতে, প্রতিটি নারী নারায়ণের অংশ- লক্ষ্মী। জানা যায়, ‘পাগলচাঁদ কোনো সভায় বক্তৃতা শেষে আসন গ্রহণ করলে ধনলক্ষ্মী (পাগলচাঁদের স্ত্রী) মা দাঁড়িয়ে জোড় হাত হয়ে নারীর ধর্ম ও দাম্পত্য প্রেমে ঈশ্বরানুভূতি বিষয়ে বিনীতভাবে বক্তৃতা করতেন। আমার মা সকল, তোমরা গৃহলক্ষ্মী, জগজ্জননীর সাক্ষাৎ অংশী। তোমরা স্বামীকে নারায়ণ জ্ঞান করে সরল মনে তাদের সেবাযত্ন করবে।... যে নারী পতিকে নারায়ণ জ্ঞান করে, সে তো নিজেই লক্ষ্মী হয়ে যায়। তোমরা ঘরে ঘরে লক্ষ্মী-নারায়ণরূপে বিরাজ করবে এবং প্রতিটি পরিবারই হবে একেকটি উপাসনালয়।’
মথুর পাগল তাই গেয়েছেন-
‘মা তোর লীলা বুঝতে পারে ভবার্নবে সাধ্য বা কার
তুমি মাতৃরূপে প্রসব কর ধাত্রীরূপে নাড় কাট তার।
তুমি জায়ারূপে হও কারও গৃহিণী
হয়ে মাসি পিসি খুড়ি জেঠি আবার কারও ভগিনী।’
মাকে শক্তিরূপে, স্ত্রীকে লক্ষ্মীরূপে সম্মান প্রদর্শন করে পাগলচাঁদ ধর্মান্দোলনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেন। তিনি নিজে ভক্তদের কাছে কৃষ্ণরূপে এবং তার পঞ্চপত্নী প্রেমের পঞ্চমূর্তিরূপে পরিচিত হয়ে উঠলেন। স্ত্রী-ধনলক্ষ্মীকে নিয়ে ভক্তরা গায়-
    ‘তারা- সিধা যেন রাধা-শ্যাম, গুরুজনে রাখে নাম,
    ধন লক্ষ্মী রাধাচরণ ॥’
কিংবা-
    কলির শেষে, বাংলাদেশে, এল লক্ষ্মী-নারায়ণ,
    ওরে- তারা বিনে, এ ভুবনে, (আর) কে হবে যুগল মিলন ॥
        লক্ষ্মী-নারায়ণের লীলা।
হ’তেছে এ খেজুর তলা,
    খেলা, করে ঐ দুইজন,
তারা-যুগল সাজে, আছেই মজে,
    ধনলক্ষ্মী-রাধাচরণ॥
শুধু ধনলক্ষ্মীকে কেন্দ্র করে ভক্তদের ভক্তি উৎসারিত হয়েছে এমন নয়।
তারা পাগলচাঁদের পঞ্চপত্নী-ধনলক্ষ্মী, মণি, শশী, মালতী, মানিক্যকে পঞ্চপ্রেমের মূর্ত প্রতীক জ্ঞানে আরাধনা করে থাকেন।
‘ধনলক্ষ্মী, কৃষ্ণরূপ পাগলচাঁদের আদ্যাশক্তিরূপে পরিচিত হন। তিনি মূল চালিকাশক্তি রূপিণী। ভক্তপাগলদের কাছে তিনি ধনলক্ষ্মী-রাধাপাগল যুগলরূপে আরাধ্য। তিনি পাগলের মধুর প্রেমের আধার। ভক্ত তাই গায়-
    ‘কিবা-পিরিতি রসের মুরতি খানি
    পাগল বেশে ভবে আসিলরে।
    নিয়ে ধনলক্ষ্মীরে বামে, যুগল সে প্রতিমে,
     খেজুর তলা ধামে পশিলরে।’
স্ত্রী মণি বরাভয়দায়িনী- বাৎসল্য প্রেমের প্রতীক।
তাই ভক্ত গায়-     ‘মণিময় বাৎসল্য মাস্তুল
    সে মাস্তুল যে ভবে অতুল,
    নাহি-চিনে হইলি বাতুল,
     তোর মতো মূর্খ কে আছে ॥’
ভক্তরা বিশ্বাস করেন, মা-মণি ভক্তের বিপদতাড়িনী। ‘তিনি কখনও লৌকিক কখনও অলৌকিক শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করে তাদের রক্ষা করেন।’
স্ত্রী শশী হলেন জ্ঞানদাত্রী সরস্বতী। সখ্য প্রেমের আধার রূপিণী এই নারীভক্তের হৃদয়ের অন্ধকার নাশ করে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বেলে দেন। -ভক্ত তাই গায়-
‘শশী, -হইয়ে নিপুণ, লয় সৌখ্যগুণ গো-
     যে গুণে নির্গুণে গুণ পেয়েছে।’
কিংবা- ‘ললাটে ধরাইয়ে শশী,
    ভ্রম- আঁধার দিবে নাশি
    সুধা রাশি বিলাবে তাই বলিলরে।’
মালতী মা হলেন পাগলচাঁদভক্তের সেবা প্রেমের প্রতীক। অর্থাৎ দাস্যপ্রেমের আধার। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, মা-মালতী হলেন ভক্তের হৃদয়ে ভক্তিরস প্রদায়িনী শক্তির উৎস।
আর মাণিক্য মাতা হলেন শান্তভাবের প্রতীক। তিনি ভক্তের সেবায় আত্মোৎসর্গী। ভক্তদের আহারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তার।
এ পঞ্চশক্তি নিয়ে কৃষ্ণরূপ পাগলচাঁদের লীলা।
ভক্ত তাই গায়-
    ‘করে- মানব লীলা, খেজুর তলা, গো
    রাধা পাগলা নামেতেই উদয় হয়েছে ॥
    পঞ্চপ্রেমের সেই মুরতি, তাদের সনে হয় পিরিতি,
    দিবারাতই বয় সুরীতি, কিবা রীতি করেই নিয়েছে
    হ’লÑ শশী সৌম্য, মালতী দাস্য গো-
        মাণিক্য শান্ত-প্রেমরূপে রয়েছে ॥
    বাৎসল্য প্রেমরূপে মণি, সে প্রেম যে অতুল্য মানি
    পরশ করে গুণমণি, পরশমণি নিজে সেজেছে;
    মধুর- প্রেমের সাক্ষী- মা ধনলক্ষ্মী গো
        মধুর মিল-
    দুজনাতেই মিলিয়েছে।...’
কৃষ্ণ প্রণয়োপাখ্যানের যে টেক্সট, তা পাগলচাঁদের ব্যক্তিজীবনের ভূমিকায় উপস্থাপন করে ভক্তরা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই আরাধনা করতে সক্ষম হয়েছেন। পাগলচাঁদ এখানে কৃষ্ণের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান। আর তাই ভক্ত আবেগভরে গেয়ে ওঠেন
    ‘দয়া করি পাগল হরি, এসো আমার এ আসরে।
    তুমি বিপদ ভজন মধুসূদন, আবাহন করি তোমারে ॥
    ধনলক্ষ্মীরে ধরিয়া বামে যুগল বেশে দাঁড়াও এসে
         ত্রিভঙ্গঠামে;
    নিয়ে মণি, শশী, প্রেমে মিশি, দশদিশি আলো করে
    মালতী ফুল করেতে ধরি, প্রেম-হিল্লোলে, হেলে দুলে
         হৃদি-বিহারী;
    সাত রাজারধন এক মাণিক্য, এসো সে হার গলে প’রে ॥’
ভক্তদের কাছে ধনলক্ষ্মী, মণি, শশী, মালতী ও মাণিক্য যেমন শ্রদ্ধার, তেমনিভাবে নিজের ভার্যা অর্থাৎ স্ত্রীও শ্রদ্ধার। লক্ষ্মীরূপে পাগলভক্ত স্ত্রীকে গ্রহণ করেন। প্রচলিত হিন্দু ধর্মমতে সাতপাকে স্বামীকে বেঁধে তার পায়ে ফুল-জল ঢেলে তবেই বিবাহ সিদ্ধ হয়। কিন্তু পাগলচাঁদ প্রবর্তন করলেন চৌদ্দপাক। প্রথম সাতপাকে স্ত্রী স্বামীকে ফুল-জল দেন। পরে সাতপাকে স্বামীও স্ত্রীর পায়ে ফুল-জল দিয়ে বিবাহ সম্পন্ন করেন। পাগলচাঁদ অসামান্য শক্তির আধাররূপে নারীর যেমন সাধনা করেছেন, তেমনি ভক্তরাও নারীকে শক্তিরূপিণী মনে করেন। বলেন-
    ‘পরমকে জানবি যদি মেয়ে ধর।
    দেখবি মেয়ে, নেহারিয়ে, ঘুচবে মনের অন্ধকার ॥’
এই ‘মেয়ে ধরা’ মানে তান্ত্রিকদের বামাচার নয়। যোগ সাধনা পাগলচাঁদভক্তরা করে না। তারা নারীর শক্তিগুণকে ভজন করে। তাই তারা বলে-
    ‘যার স্তন দেখে মন যায় না রাখা বল দেখি সেই গুণটা কার;
     সেই মেয়ের সেই স্তনের গুণে মন-প্রাণ সহিতে টানে,
    ঐ স্তনের মধ্যে রয় কোন জনে, তারে চিনে লওয়া ভার ॥
     ’’ ” ” ”
    জানিয়া সেই মেয়ের কারণ, পাগল হ’ল রাধা চরণ
    ভষ্ম মেখে রয় পঞ্চানন, কালি মেয়ে তার বুকের পরÑ
    তারা সব মেয়ের গুণ পেয়ে, যমেরে দিচ্ছে তাড়াইয়ে;
    মথুর কান্দে ভাব না পেয়ে, গুণ জানতে কি সাধ্য তার ॥‘
খুব সহজে মেয়ে বা নারীর গুণের সাধনা করা যায় না। ভক্ত তাই গায়Ñ
    মেয়ের প্রেম সামান্যে ঘটে না।
    করলে মহাদেব সেই মৃত্যুকে জয়, করিয়ে মেয়ের সাধনা
    অনন্ত মেয়ের দেহ অন্ত তার পায় না কেহ
    ভাব ভক্তি প্রেম স্নেহ হয় না ইহা বিনা;
     ’’ ” ” ”
     জেনে মেয়ের কারণ, রাধচরণ ধনলক্ষ্মীর করে সাধনা।”
পৃথিবীর সব নারীই সৃজনগুণে শক্তিমতী ও শ্রেষ্ঠ। অতএব শ্রেষ্ঠ মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন অবশ্যকর্তব্য। আর এভাবে পাগলচাঁদ সম্প্রদায় সমস্ত নারীজাতিকে জগজ্জননীরূপে, শক্তির আধাররূপে সর্বোচ্চ সম্মান ও যোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন করে। কেবল মাতৃজ্ঞানেই নয়, লক্ষ্মীজ্ঞানে নারী পাগলচাঁদ সম্প্রদায়ের নমস্যা।

হিংসা-দ্বেষ ত্যাগ করো
পাগলচাঁদের ধর্মমতে ‘অহিংসা’ পরম ধর্ম। হিংসা-দ্বেষ ও পরনিন্দার কোনো ঠাঁই নেই পাগলচাঁদের কাছে। হিংসা মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে, অপবিত্র করে। তাই হৃদানন্দ পাগল বলেন-
    ‘দেহের জঙ্গল ঝোড় আগে,
    স্থূলের ঘরে, কপাট মেরে, প্রবৃত্ত হও কর্মযোগে॥
     ’’ ” ” ”
    অনুরাগের কুঠার ধরে (গাছ) কাট পুণ্যনাশা অহঙ্কারে
    হিংসা মাদার ফেলাও দূরে সত্য খোন্তার সহযোগে ॥
    নিন্দা কাটা হয় হরগজি, বিদ্বেষ-কেওরা বড় পাঁজি ॥
    মায়া-বেত তাই কাট বুঝি, আকড়া নাহি লাগে;
    গুরু বাক্য ছেনদায়ের বলে, এইসব কেটে দাওরে ফেলে
    চৌর্য্য গাছটি কাটবেই মূলে, ধৈর্য্য-ছুরিকাঘাত লেগে ॥’
বলেনÑ
    ‘হিংসা, বিদ্বেষ পরিহরি
    সাম্য-ভাবে নিশানধর
    ঘোর সর্ব্বদাই;
    সে ভাব বিনে কুল পাবিনে, রবি-সূত ঠাঁই’
    ধর্মপথে যাবে যদি, কর্ম কর ভাই ॥’
ব্যক্তিজীবনের সুখ-শান্তির জন্যই যে কেবল হিংসা-দ্বেষ ত্যাগ করা উচিত তা নয়। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতেও হিংসা-দ্বেষ ও পরনিন্দার মতো কু অভ্যাস পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। এজন্য চাই প্রেম। প্রেম হচ্ছে ঈশ্বরের পরম গুণ। মানুষকে এ গুণ অর্জন করতে হলে হিংসা-নিন্দা পরিত্যাগ করতে হয়। প্রেমের পথে এরাই সবচেয়ে বড় বাধা।
ভক্ত তাই গেয়ে ওঠেন-
    ‘হিংসা, নিন্দা, তমঃ-কণ্টক
    কাজে কাজে করে বণ্টক,
    (নিষ্কণ্টক) হ’ল না।
    গুরু নাম- প্রেম সুধা রসে
    তাতে আমার মন না রসে
    কাম-কু-রসে, নীরসে ত্যজিল না।
    এত কঠিন পাষাণ হিয়া,
    গুরু ভাবের রসান দিয়া।
    মাজে না।’
পাগলচাঁদ তাই তার ভক্তকে সদাসর্বদা সরল অন্তঃকরণে প্রেমে মজে থাকতে ‘বলেছেন। তাই, ভক্ত গায়-
    ‘ফেলি হিংসা, নিন্দা-গরল
    অন্তবাহ্য কর সরল
    প্রেমেতে হওরে সরল,
    (এ) উপদেশ দিচ্ছেন তিনি
    জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে,
    সাম্য-ভাবে চল হেসে-
    নিয়ে যাবে সত্য দেশে
    সত্য করে দিন রজনী ॥’
পাগলচাঁদের অনুসারীরা মনে করেন, ‘সবার মধ্যে এক পরমেশ্বর আছেন, সবার আত্মাই এক আত্মা, এ জ্ঞান থেকে শুধু মানুষ নয়, ইতর প্রাণীর প্রতিও মমত্ববোধ জন্মে।’ শুধু তা-ই নয়, পাগলচাঁদ সন্ন্যাসব্রতে বিশ্বাসী ছিলেন না। সংসারে থেকে কর্ম করাকেই ধর্ম বলে মনে করতেন। বলতেন, ‘সৎকর্ম করো। নিরলস কর্ম করো। কর্মই মানুষের আসল পরিচয়।’

জাতিভেদ প্রথাবিরোধী
পাগলচাঁদের ধর্মমতে জাতিভেদ প্রথার স্থান নেই। ব্রাহ্মণ্যবাদ ও জন্মগত জাতিভেদকে তারা অশান্তির কারণ বলে মনে করে। অন্তর যার প্রেমপূর্ণ, হিংসা-বিদ্বেষবিহীন সেই তো আসল মানুষ, সত্যের মানুষ। যে ব্যক্তি পবিত্র চরিত্রের অধিকারী সে হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ খ্রিস্টান-তেলি মুচি-ময়রা-চামার যা-ই হোক না কেন, তার প্রতি পাগলচাঁদ সম্প্রদায়ের বিধি অনুসারে রয়েছে শ্রদ্ধা ও সম্মান। একজন প্রকৃত সরল মানুষের, সত্য মানুষের বেদবিধির দরকার পড়ে না বলেই মনে করতেন পাগলচাঁদ। এজন্য ভক্ত মথুর পাগল বলেন-
    ‘পাগল কি ধরা যায় সহজে;
    যেজন বেদের আচার, হইয়া পার, যেতে পারে বিধি ত্যজে ॥
    বেদবিধি বৈদিক ক্রিয়া, এ সকল বিসর্জ্জন দিয়া
    এক ব্রহ্ম এই ভাবিয়া গুরুর পদে মজে;
    পেয়ে তত্ত্ব হয়ে মত্ত, সত্য মানুষ খোঁজে।’
জাত্যভিমানীদের দিকে তাকাতে নিষেধ করেছেন হৃদানন্দ পাগল। তিনি বলেন-
    ‘ ও দিকে কেউ চাসনে তোরা,
    চাইলেÑযশ-কুল-মানে হবি হারা, কুলে আছিস যারা,
    জাত মারিবে ঐ জাত মারা-
    জীয়ন্তে মরাই হবি পিছে।’
তাই পাগলচাঁদের প্রতি ভক্তের উদাত্ত আহ্বান-
    ‘হেন শক্তি দাও পাগলচাঁদ, সারা বিশ্বমাঝে,
    একই ভাবে, কাটাই সবে, ভাই ভগিনী সাজে।
    জাতিকুল অভিমান ভুলি,
    সমানভাবে সদাই চলি, গো;
    অন্তর হ’তে মুছিয়া ফেলি,
    ঘৃণা, শঙ্কা, লাজে ॥’
বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আকাক্সক্ষাই পাগলচাঁদের ধর্মমতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমরা তার মতবাদকে পাগলচাঁদের মতাদর্শ বললেও ভক্তরা তেমনটা মনে করেন না। তারা বলেন, ধর্ম মানুষের সৃষ্টি মানুষের জন্যই ধর্মের সৃষ্টি, ধর্মের জন্য মানুষ সৃষ্টি হয়নি। তাই বিশ্বের সব মানুষের কল্যাণ, যেখানে নিহিত সেখানেই পাগলচাঁদ থাকেন। যেখানে প্রেম আছে, সেখানেই পাগলচাঁদ আছেন। এজন্য তো বিশেষ কোনো ধর্মের প্রয়োজন পড়ে না!
বর্ণ ও জাত প্রথার কারণে মানুষকে ছুঁয়ে দিলে মানুষ যে অপবিত্র হয়, এমন অস্পৃশ্যতাবাদকে পাগলচাঁদ ঘৃণা করতেন।
নিজে নিম্নবর্ণের মানুষ হওয়ার ফলে নিম্নবর্ণের মানুষের যন্ত্রণা দূর করতে তিনি এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন, ‘কোনো মানুষ পিতৃপরিচয়হীন হলেও তাকে ছোট ভাবা চলবে না, বরং তাকে সমাজে আর পাঁচজনের মতো সমান অধিকার দিতে হবে। কারণ তার জন্মের জন্য সে নিজে দায়ী নয়।’ দেবদাস- পৃ. ৩৮)
‘এমনকি কোনো নারী অসহায় হয়ে পতিতাবৃত্তি অবলম্বন করে থাকলেও তার নারী-মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন।’ ( দেবদাস- পৃ. ৩৮)

দাম্পত্য প্রেমে থাক
পাগলচাঁদের ধর্মমতে গার্হস্থ্য আশ্রমই হলো শ্রেষ্ঠ আশ্রম। সেখানে নারী ও পুরুষ লক্ষ্মী ও নারায়ণরূপে তাদের সংসারধর্ম পালন করবে। মাতা-পিতা গৃহের দেবতা। ঈশ্বরজ্ঞানে তাদের পূজা করার কথা বারবার বলেছেন পাগলচাঁদ। পাগলসংগীতেও বারবার এ কথা বলা হয়েছে। স্বামীকে স্ত্রী যেরূপে নারায়ণজ্ঞানে ভক্তি-শ্রদ্ধা করবেন, তেমনি স্বামীও তার স্ত্রীকে লক্ষ্মীজ্ঞানে ভক্তি-শ্রদ্ধা করবেন। গার্হস্থ্য আশ্রমের সমান অংশীদার দুজনই। নিজ স্ত্রীকে যেমন পাগলচাঁদপন্থীরা লক্ষ্মীজ্ঞানে ভক্তি-শ্রদ্ধা করেন, একইভাবে অন্য নারীরাও তাদের কাছে লক্ষ্মীর ন্যায়। মতুয়া ধর্মে বিশ্বাসীরা নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেন এবং অন্য নারীকে মাতৃজ্ঞানে ভক্তি-শ্রদ্ধা করার কথা বলেন। কিন্তু পাগলচাঁদের ধর্মমতে নারী ও পুরুষ সৃষ্টি কাজের অংশীদার বলেই দেবতাতুল্য উভয়ই স্রষ্টার অংশ, ফলে যে গৃহে তারা বাস করেন, সেই গৃহে মন্দিরের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। গৃহ আপনি হয়ে ওঠে দেবা-দেবীর বাসস্থল।

গুরুবাদী দর্শন
পাগলচাঁদের ধর্মদর্শনে আধ্যাত্মিক কর্মের নির্দেশক হিসেবে গুরুর স্থান সর্বাগ্রে। তবে উচ্চবর্ণের গুরুবাদের সাথে পাগলচাঁদের প্রবর্তিত গুরুবাদে রয়েছে পার্থক্য। চৈতন্য পূর্ববর্তীকালে যে শাস্ত্রে নিম্নবর্ণের ধর্মের অধিকার ছিল না, সেই শাস্ত্রে তাদের গুরু হওয়ার স্বপ্নও ছিল অলীক। নারীরাও সেখানে পৌরোহিত্যের অধিকার পেতেন না। পাগলচাঁদ তার গুরুবাদী চিন্তায় জাতিভেদ প্রথাকে অস্বীকার করলেন এবং সমাজ ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তন করলেন। বিবাহ, মৃত্যুর শ্রাদ্ধাদির অনুষ্ঠানে যে কেউ পৌরোহিত্য করতে পারেন। জানা যায়, পাগলচাঁদের সাথে মালতীর বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল তার প্রথমা স্ত্রী ধনলক্ষ্মী মায়ের পৌরোহিত্যে। পাগলচাঁদের দর্শনে সত্য মানুষের সন্ধান একমাত্র গুরুই দিতে পারে- ধর্মতত্ত্বকথা গুরুর পদ ভজেই জানা সম্ভব। তাই মথুর পাগল গানে গানে বলেন-
    ‘বেদবিধি বৈদিক ক্রিয়া, এ সকল বিসর্জ্জন দিয়া
    এক ব্রহ্ম এই ভাবিয়া গুরুর পদে মজে
     পেয়ে তত্ত্ব হ’য়ে মত্ত, সত্য মানুষ খোঁজে
    ওসে ধরে মানুষ হয়েছে হুঁশ, পেয়েছে সেই রস রাজে ॥’
কিংবাÑ
    ‘গুরুকে রজক করে ভক্তি ক্ষারে,
    মন কাপড়ে আগে জড়া-’
পাগলচাঁদের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, ‘গুরুর দয়া’ ছাড়া কিছুতেই সিদ্ধির পথে উত্তরণ সম্ভব নয়।
তাই পাগলসংগীতে ভক্তরা গায়-
    ‘কিসে হরে গুরুর দয়া আমরা মন ভরা গরল
    অন্তরে অসুরের বুঝি আমার মুখেতে সরল ॥
    কারণ করি সকলেরে, হিংসা নিন্দা তমঃ ছেড়ে
    সদা বল হরি বল।’
পাগলচাঁদের ধর্মদর্শনে গুরু তার শিষ্যের অন্তরে আশার আলো জ্বালান। বীজমন্ত্র দিয়ে দীক্ষা দেন এবং পাগলচাঁদ প্রদর্শিত পথে জীবন পরিচালনায় অভ্যস্ত করে তোলেন। পুরাণের আচার প্রথানুসারে গুরু শিষ্যর কাছ থেকে যে দানদক্ষিণা পান, তা পাগলচাঁদের মতাদর্শী গুরু পান না। গুরুকে দানদক্ষিণা দেয়ার পরিবর্তে নিঃস্ব অসহায় আর্তপীড়িত মানুষকে স্বেচ্ছায় দান ও ভোজন করানোর নির্দেশ দেন। আর এভাবেই পাগলচাঁদের দর্শনে ‘গুরুবাদ’ একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
মূর্তি পূজা, দেব-দেবী পূজাবিরোধী
পাগলচাঁদ বাহ্মণ্যবাদের বিরোধী করার পাশাপাশি একেশ্বরবাদের কথা বললেন। এক পরমেশ্বরই সকল শক্তির উৎস। যারা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করে, তারা মূলত ব্রাহ্মণের আয়ের উৎসকে শক্তিশালী করেন, তথা পুঁজিবাদকে উসকে দেন। তাছাড়া দেব-দেবীদের সন্তুষ্ট করার জন্য যে ‘পশু হত্যা’, তারও বিরোধিতা করেন পাগলচাঁদ। তিনি বলেন, ‘হত্যা বা নিষ্ঠুরতা কোনো ধর্মের অংশ হতে পারেন, না বরং ত্যাগ ও জীব সেবাই ধর্ম।’
পাগলচাঁদের দেব-দেবী পূজার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে একেশ্বরবাদ জয়যুক্ত হয় এবং দেব-দেবীর স্থানে পিতা-মাতা হয়ে ওঠেন জীবন্ত দেবতা।
এ কারণেই পাগলভক্ত গেয়ে ওঠেন-
    ‘ধরে সেই রসের গোড়া, রসিক হয়েছে তারা
     বেদবিধির দফা সারা, দেব-দেবী না পূজে ॥’

জীবসেবা
পাগলচাঁদ ও মতুয়াদের মতো ‘জীবে প্রেম করো’ অর্থাৎ পৃথিবীতে জীবসেবাই পরম ধর্ম বলে বিশ্বাস করতেন।
প্রেম হলো মানুষের মহৎ অনুভূতি ও পবিত্রতম অনুভূতি। পাগলচাঁদ বলেন, ‘সবার মধ্যে এক পরমেশ্বর আছে। সবার আত্মাই এক আত্মা’- এ জ্ঞান থেকেই মানুষকে সকল জীবের সেবা করার নির্দেশ দেন পাগলচাঁদ। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন অস্পৃশ্যতাবাদ বর্জননীতি। মানুষের ছোঁয়ায় মানুষ কী করে অস্পৃশ্য হয়, তা মাথায় আসে না পাগলচাঁদের। জীবসেবার মধ্য দিয়ে তিনি এ ঘৃণ্য প্রথারই বিরোধিতা করেন। পাগলচাঁদ বিশ্বাস করতেন, কোনো জড়বাদী দর্শনকে আঁকড়ে না ধরে বাস্তব সত্যাবলম্বন করে জীবন চালিত করাই ধর্মের প্রধান ও মানবিক অনুজ্ঞা হওয়া উচিত।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার খেজুরতলা গ্রামে পাগলচাঁদ ধর্মের প্রবর্তক রাধানাথ পাগলের জন্ম। তিনি ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ভাদ্র মাসের পূর্ণিমায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম কৃষ্ণচন্দ্র মিস্ত্রী, মায়ের নাম চম্পাবতী। নিম্নবর্ণের ঘরে জন্মগ্রহণ করার ফলে উচ্চবর্ণের নানা রকম অত্যাচার সম্পর্কে তিনি ছোটবেলা থেকেই জানতে পারেন। এভাবে একদিন তার মনে নানা রকম প্রশ্ন দেখা দেয় এবং তিনি সে প্রশ্নের উত্তর নিজেই আবিষ্কার করতে সমর্থ হন। শুরু হয় প্রতিবাদ ও সংস্কার। এতে ব্রাহ্মণরা তাকে অনেকবার হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি বেঁচে যান। তিনি বর্ণভেদ প্রথা উচ্ছেদ, অস্পৃশ্যতা বর্জন করেন। তার জন্মের দুই বছর পর বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়। সেই আন্দোলনের অগ্রপথিক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিধবা বিবাহ আইন পাস হওয়ার পর ২০ জনের অধিক বিধবা বিবাহ দিতে সক্ষম হননি। এবং এ বিধবা বিবাহের জন্য তাকে পণ দিতে হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগর কর্তৃক শুরু হওয়া কাজ অনেকটা এগিয়ে নিয়েছিলেন পাগলচাঁদ। বরিশালের নাজিরপুর এমন একটি এলাকা, যেখানে মানুষ একেবারেই নিরক্ষর। শিক্ষার আলো সেখানে তখন পৌঁছেনি, সেখানে কোনো বিদ্যালয়ও ছিল না। এমন একটি অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে তিনি বিধবা বিবাহ দেয়ার উদ্দেশে বিবাহে ইচ্ছুক মেয়েদের নিজের নৌকায় তুলে নিতেন। এভাবে তিনি তার জীবদ্দশায় কোনো রকম পণ ছাড়াই প্রায় দেড় হাজর বিধবা বিবাহ দিয়েছেন। যে বিবাহে স্বামীকে সাতপাক ঘুরবে স্ত্রী এবং স্ত্রীকে সাতপাক ঘুরবে স্বামী। জাতপাতের তোয়াক্কা না করে তিনি বর্ণ অসবর্ণে বিয়ে দিয়েছেন। এমন একজন কর্মবীরকে, এমন একজন বিপ্লবীকে বাংলার শিক্ষিত সমাজ মনে রাখে না। মূল্যায়নও করেনি। কিন্তু হাজার হাজার সাধারণ মানুষের হৃদয়-কাননে তিনি বিহার করেন। খেজুরতলায় আজও ১৪ ফাল্গুন থেকে সাতদিনব্যাপী অনুষ্ঠান হয়। ১৪ তারিখ রাজশক্তি ও রাজপূজা, ১৫ তারিখ ভক্তপূজা, ১৬ তারিখ পাপ ও স্বীকারোক্তি, ১৭ তারিখ ‘বিধবা বিবাহ’ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিধবা বিবাহের অনুষ্ঠানটি হয় না বললেই চলে। শিক্ষিত ভব্য সমাজে পাগলচাঁদের কদর থাক বা না থাক, পাগলচাঁদের উদার মতাদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে তারা আজও দৈনন্দিন কার্য সম্পন্ন করেন।
তারা পাগলকে স্মরণ করে আপনমনে গেয়ে ওঠে-
    খেজুরতলায় মানবলীলা, আম বেড়েতে মিলায় মেলা,
        মুখে হরি বোলা,
    পাগল করল কুল-বালা, করল কুলে দফা সারা ॥
    মহাভাবের বন্যা দিয়ে দিল জগৎ ভাসাই য়ে,
        পাগলচাঁদ আসিয়ে।

Disconnect