ফনেটিক ইউনিজয়
ঢাকা লিট ফেস্ট : পাওয়া না-পাওয়ার খতিয়ান
সুজিত সজীব

সম্প্রতি বাংলা একাডেমিতে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৬’ অনুষ্ঠিত হলো। এ নিয়ে অনেকেই বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। অনেকে এই সম্মেলনকে ঔপনিবেশিক চিন্তার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন এমন আয়োজনে। লিট ফেস্ট শুরুর অনেক আগে থেকেই নগরের সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনা ছিল, সম্মেলনে কারা আসবেন? কীভাবে বিশ্বখ্যাত এই লেখক ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে বাংলা সাহিত্যকে উপস্থাপন করা হবে? কীভাবে আমরা বিশ্বসাহিত্যের বর্তমান অবস্থা গ্রহণ করব?
সম্মেলন শুরু হলো, শেষও হলো! নানা বিষয়ে আলোচনা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী লেখকের সামনে উপস্থাপিত হলো বাংলা সাহিত্য, আমরা নিলামও হয়তো অনেক। তবে এর মধ্যেও কিছু কথা এসে যায়!            
প্রথমত, সম্মেলনের অতিথিদের সামনে আমাদের সাহিত্যের উপস্থাপন বিষয়ক। আমি জানি না, বাংলা সাহিত্যের কতগুলো বই ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে? বা তার মানের অবস্থা কী? তবে ফেস্টে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে হতাশই হলাম! হাতে গোনা কয়েকটি বই! এই গুটি কয়েক বই দিয়ে কীভাবে বাংলা সাহিত্যকে উপস্থাপন করা যায়? তা জানা নেই। আয়োজকেরা হয়তো তা জানতে পারেন। তা ছাড়া যে বইগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা আদৌ বাংলা সাহিত্যের আয়না কি না, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।
অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সম্মেলনের তিন দিন বাংলা একাডেমি ইংরেজি একাডেমি হয়ে গিয়েছিল। এমন চিন্তা করা মোটেও উচিত নয়। ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি, পর্তুগিজ ইত্যাদি ভাষায়ও চাইলে কেউ কথা বলতে পারে, লিখতে পারেন, যেখানে খুশি। ভাষা জানাটা মোটেও দোষের কিছু নয়, আর তার ব্যবহার করাটা তো নয়-ই। তবে স্থান কাল পাত্র বিবেচনায় না আনলে আপনি বিব্রত হতে পারেন। আমাদের নবীন লেখকেরা সেই বিব্রতবোধ নিয়ে এবারের সম্মেলনে খাবি খেয়েছেন। তাঁরা যে ইংরেজি বোঝেন না তা নয়। কিন্তু উচ্চারণের ভিন্নতার কারণে সেই ভাষা দুর্বোধ্য ঠেকেছে তাঁদের কাছে। নাইপলসহ দু-একটি সেশনের যে রকম অনুবাদ হয়েছে, তা কি পুরো সম্মেলনের সেশনগুলোর ক্ষেত্রে করা যেত না?
এবারের সম্মেলনে নবীন লেখকদের ক্ষেত্রে একটু অবহেলাই করা হয়েছে। বিভিন্ন সেশনে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব কি নিশ্চিত করা যেত না? এমনিতেই আমাদের সাহিত্যের খরাকাল চলছে। ভালো কবিতা নেই, ভালো উপন্যাস নেই, নেই কোনো ভালো মানের শিল্পরসে সমৃদ্ধ সৃষ্টি। এমন সময়ে আমাদের নবীনদের দিকেই কি দৃষ্টি দেওয়া উচিত নয়? ঢাকা লিট ফেস্ট কি এই দায়িত্বটুকু নিতে পারত না? নাকি তারাও খ্যাতির যশে গা ভাসিয়ে দিতেই অভ্যস্ত। এই সম্মেলনের মাধ্যমে কি নবীন-প্রবীণের সম্মিলিত প্রয়াসে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করা যেত না?
অনেকের মতে, এই সম্মেলনে দেশের সাহিত্য কিছু পাচ্ছে না, আমাদের দেশের নবীন লেখক-সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। তবে লিট ফেস্টের এদেশীয় দর্শনার্থীদের নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। দর্শনার্থী যারা ছিল তাদের বেশির ভাগই সমাজের উচ্চবিত্ত। এটাই বোধ হয় আমাদের লিট ফেস্ট আয়োজকেরা অনুধাবন করেছেন। নইলে দেশের অভিজাতপাড়াগুলোর দেয়ালেই কেন কেবল লিট ফেস্টের পোস্টার সাঁটানো হয়?
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের এই এলিট গোষ্ঠীর বাংলা সাহিত্যে অবদান কতটা? তারা কতটুকু এই সাহিত্যের প্রতি নিবেদিত? তারা কয়জন রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তদের রচনার সান্নিধ্য নেয় নিয়মিত? তারা কতজন আমার দেশে পালাকবি, মরমি শিল্পীর সৃষ্টির পরশ নেয়। তারা কি সত্যিই এই সম্মেলন থেকে কিছু নেয়? নাকি গাড়ি হাঁকিয়ে সম্মেলনে এসে কফির কাপ হাতে সেলফি তুলে ভুল ইংরেজিতে ফেসবুকে জানান দেয়, ‘ইটিং ঢাকা লিট ফেস্ট ১০১৬!’
আমাদের দেশের গ্রামের আনাচকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে কীর্ত্তন, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি ইত্যাদি সুরের পরশ। বাতাসে ভাসে সুরের জাদু। হাজারো শিল্পী, লোককবি-সাহিত্যিক রচনা করছেন অগণিত সৃষ্টি। যা আমার সংস্কৃতির সম্পদ। এমন আবহে আমাদের অনেক বেশি শিল্পের রসিক হয়ে ওঠার কথা। আমরা হয়তো আরও বেশি উদার হতে পারতাম। লিট ফেস্ট আয়োজকেরা কি প্রতি সম্মেলনে পারেন না এমন কিছু মানুষের বই প্রকাশ করতে। তারা কি পারে না প্রতিশ্রুতিশীল লেখকদের সামনে নিয়ে আসতে। তাঁদের সৃষ্টিগুলোর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে তা এই সম্মেলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে, সারা বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে। কেবল তাহলেই সর্বাঙ্গীন সফল হয়ে ওঠতে পারত এই লিট ফেস্ট।

Disconnect