ফনেটিক ইউনিজয়
সেচ পাম্পে বিদ্যুৎ-সংযোগ পাচ্ছেন না কৃষক
নিজস্ব প্রতিবেদক

সেচ মৌসুম শুরু হয়ে গেছে প্রায় এক মাস। দিনাজপুরের কৃষক সাইদুল হোসেন এরও দুই মাস আগে তাঁর পাম্পে বিদ্যুৎ-সংযোগের জন্য স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে (পবিস) আবেদন করেন। গত বছরও তিনি একই সংযোগের জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু পাননি।
সারা দেশে সাইদুলের মতো হাজারো কৃষক সেচ পাম্পে বিদ্যুৎ-সংযোগ চেয়েও পাচ্ছেন না। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যাপ্ত বললেও বাস্তবতার সঙ্গে মিল পাচ্ছেন না তাঁরা। ফলে বেশি খরচে ডিজেলচালিত পাম্পে সেচকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ-চালিত সব পাম্পে বিদ্যুৎ-সংযোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে। কিন্তু বেশ কিছু স্থানে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ক্ষমতা কম। তাই কৃষক চাইলেও আপাতত বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। আবার কৃষকদের একটি অংশ অভিযোগ করছে, পবিসের কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারকে ঘুষ দিলে সংযোগ পাওয়া যায়। ঘুষ না দিলে সংযোগ মেলে না। এ ক্ষেত্রে ওভারলোড তাদের অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ সেচ পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১২ লাখ ৬০ হাজার পাম্প ডিজেলে চলে এবং বাকিগুলো গ্রিডভিত্তিক ও সৌরবিদ্যুৎ-চালিত পাম্প। বিদ্যুৎ-চালিত পাম্পের সেচে প্রতি একর বোরো উৎপাদনে খরচ হয় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। ডিজেলচালিত পাম্পে এ খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ টাকায়। অর্থাৎ সেচে ডিজেলচালিত পাম্পের চেয়ে বিদ্যুৎ-চালিত পাম্পে খরচ কম।    
বিদ্যুতে সেচকাজ পরিচালিত হলে এ বাবদ খরচ এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে। আর সার্বিক ফসল উৎপাদন খরচ প্রায় ১০ শতাংশ কমবে।
প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল, এ পাঁচ মাস মূলত কৃষি সেচ মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কোনো বছর খরা দীর্ঘায়িত হলে মে মাস পর্যন্ত সেচ মৌসুম সম্প্রসারিত হয়। সাধারণত মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত সেচের ব্যস্ত সময়। গত বছর ৫০ লাখ একরের বেশি জমিতে বোরো চাষ হয়। বর্তমানে এ মৌসুমে বোরো ছাড়া অন্য ফসলও উৎপাদন করছেন কৃষকেরা। এ শুষ্ক মৌসুমে বীজ বোনা থেকে শুরু করে ফসল ফলন পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিন বলেন, কৃষক চাইলেই বিদ্যুৎ-সংযোগ দিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফিডার ওভারলোড না থাকলে তারা দ্রুতই সেচ-সংযোগ দিচ্ছে। ওভারলোডের কারণে যাঁদের এখনই সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না, সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা বাড়িয়ে তাঁদের যত দ্রুত সম্ভব সংযোগ দেওয়া হবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফরি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে গত চার বছরে কৃষি সেচে অন্তত ১৫ শতাংশ বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। এর আগে ২০১১-১২ সালে কৃষি সেচে ৪০ ভাগ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০১৫-১৬ সালে তা বেড়ে ৬৪ শতাংশ হয়েছে। সৌরচালিত কৃষি পাম্প দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। বরিশাল অঞ্চলে কৃষি সেচে সৌরশক্তির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
এ প্রসঙ্গে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, কৃষি খাতে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সোলার হোম সিস্টেমের মতো কৃষিতেও যদি সৌর বিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তবে ভালো ফল আসবে। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন খরচ ও তেলের আমদানি খরচ কমবে। আবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপরও চাপ পড়বে না।
আরইবি সূত্র জানিয়েছে, গত বছর সারা দেশে তাদের অধীনে সেচ পাম্প ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার। চলতি বছর তা সাড়ে তিন লাখ হতে পারে। এতে অন্তত ২০ হাজার নতুন সেচ-সংযোগ দিতে হবে। সেচ গ্রাহকদের চাহিদামত দ্রুত সংযোগ দেওয়ার দায়িত্ব পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর। আরইবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সেচে বিদ্যুৎ-সংযোগের কারণে চলতি বছর আরও ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের নতুন চাহিদা তৈরি হবে। বোরো মৌসুমে রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল সূত্র জানায়, কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বেড়েছে। কৃষক ধান ছাড়াও অন্য ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। তারা সব থেকে বেশি মুনাফা করছে বেগুন বিক্রি করে। এক একর জমির বেগুন বিক্রি করে কৃষক দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা করে। ফলে ওই সময়েও সেচের জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন। ফসল উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতেও বিদ্যুৎ-চালিত সেচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই সেচে শতভাগ বিদ্যুৎ-সংযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিবিদেরা।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, সেচ মৌসুমের জন্য গত বছর ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন ছিল। এবার তা বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াটে দাঁড়াবে। এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানায়, সারা দেশে সেচ মৌসুমে ডিজেলের বিক্রি দশমিক ৯ ভাগের মতো কমেছে। দেশের ধান উৎপাদনের প্রধান এলাকা উত্তরাঞ্চলে ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৪-১৫ সালে ডিজেলের বিক্রি কমেছে ৩ দশমিক ৪৪ ভাগ।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম কমানোর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রয়েছে। এ তেলের দাম যত দ্রুত কমানো হবে, কৃষক ও কৃষি তত বেশি উপকৃত হবে। কৃষি উৎপাদন খরচ কমবে।

Disconnect