ফনেটিক ইউনিজয়
প্রতিবেদনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, দাবি সরকারের
গুম-হত্যা নিয়ে এইচআরডব্লিউর তীব্র সমালোচনা
এ আর সুমন

গত ৩ জুলাই রাজধানীর শ্যামলী থেকে নিখোঁজ হন বিশিষ্ট কবি-প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার। পরে তার স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় টানা ১৯ ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর যশোরের অভয়নগর থেকে উদ্ধার হন তিনি। তবে উদ্ধারের পর থেকে নিখোঁজ হওয়া নিয়ে কোনো কথা বলেননি তিনি। এমনকি পুরো ঘটনা নিয়ে কুয়াশার ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। পক্ষ-বিপক্ষের মতে আবারো চলে এসেছে গুম-হত্যার আলোচনা। আর এ আলোচনার আগুনে যেন বাতাস দিয়েছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে গুম-হত্যা নিয়ে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারকেই দায়ী করা হয়। অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ওই প্রতিবেদনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে বিরোধী দল বিএনপির মতে, প্রতিবেদনটিতে যথার্থ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আর অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, পশ্চিমা রাজনীতির অংশ হিসেবে প্রতিবেদনটি করা হলেও বিষয়টি হেলাফেলার নয়, আইনপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন সময়ের দাবি হয়ে পড়েছে।
৬ জুলাই প্রকাশিত এইচআরডব্লিউর ওই প্রতিবেদনে এই গুম-হত্যার অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে, দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ২০১৩ সাল থেকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীসহ কয়েকশো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে আটক করেছে। তাদের গোপন স্থানে লুকিয়ে রেখেছে। ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়া গুমের প্র্যাকটিস অবিলম্বে বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন এই মানবাধিকার সংস্থাটি। এইচআরডব্লিউ একই সঙ্গে এসব অভিযোগের দ্রুত নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগের জবাব এবং এ ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিচার করার আহবানও জানিয়েছে।
‘সে আমাদের কাছে নেই: বাংলাদেশে গোপন আটক ও গুম’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে গুম হয়েছেন অন্তত ৯০ জন। এইচআরডব্লিউ বলছে তাদের কাছে থাকা তথ্যমতে, আটক হওয়া ২১ জনকে হত্যা করা হয়েছে, আর ৯ জনের হদিস এখনো মেলেনি। এরমধ্যে বেশ কয়েকজনকে মাস কয়েক পরে আদালতে হাজির করা হয়। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৪৮টি নিখোঁজের অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
৮২ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এতোকিছুর পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বরাবরই দাবি করে আসছে, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়নি। তাদের এ দাবিকে প্রায়ই সমর্থন দিয়ে আসছেন সরকারি পদস্থ কর্মকর্তারা। পাল্টা জবাবে তারা বলেন, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় গোপনে লুকিয়ে আছেন। এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে না। ২০০৯ সাল থেকে টানা আট বছরে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩২০ জনের নিখোঁজ বা গুম হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে, যাদের মধ্যে বিরোধী দলের কয়েকজন নেতাকর্মীও রয়েছেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে এইচআরডব্লিউর এসব অভিযোগ ‘তুড়ি মেরে’ উড়িয়ে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেছেন, ‘এইচআরডব্লিউর ওই প্রতিবেদন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই মানবাধিকার সংগঠনটি তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ করেছে, তা সঠিক নয়।’ মন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছিলাম, তখন এই সংগঠনটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তারা তখন বলেছিল যে, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। দেশে যা ঘটেনি, বিভিন্ন সময়ে সেসব নিয়েও তারা মন্তব্য করেছে। সেজন্য তারা যে প্রতিবেদন দিয়েছে, আমরা তা গ্রহণ করছি না।’
অন্যদিকে গুম-হত্যা নিয়ে প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এই প্রতিবেদনকে সঠিক ও যথার্থ বলে মত দিয়েছে বিএনপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে যেসব তথ্য তুলে ধরেছে তা সঠিক ও যথার্থ। এ দুঃশাসনের মধ্যেও তারা যতটুকু পেরেছে, নির্ভুল প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সরকারের বিষাক্ত থাবার কাছে প্রকৃত অনাচার তুলে ধরা মুশকিল। প্রকৃত অবস্থা আরো ভয়াবহ, আরো ভয়ঙ্কর।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এইচআরডব্লিউ এক বিবৃতিতে বলেছে, “না বাংলাদেশ, সত্য বলার মানে ‘নেতিবাচক প্রচারণা’ নয়।” তাদের দাবি, গুম-হত্যা নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘ ওয়ার্কিং গ্রুপের ক্ষেত্রেও বারবার অভিযোগগুলোর ব্যাপারে মন্তব্য করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ এ ব্যাপারে ‘কঠোর সতর্কতা’ জারি করেছে বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
আন্তর্জাতিক আইন স্মরণ করিয়ে দিয়ে এইচআরডব্লিউ বলছে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত পরিচালনার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারকে বাংলাদেশে এসে তদন্ত পরিচালনার আমন্ত্রণ জানানো। প্রতিবেদনের সুপারিশমালায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও সোচ্চার হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে সরকারকে চাপ দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিখোঁজ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সন্ত্রাস দমন অভিযানে অংশ না নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে এইচআরডব্লিউ।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন, রাজনৈতিক আগ্রাসন এবং গুম-হত্যা নিয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট অপরাধবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জিয়া রহমানের। তিনি বলেন, ‘এসব প্রতিবেদন মূলত পশ্চিমা রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারণীরই অংশ। যা দিয়ে তারা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে হাতের মুঠোয় রাখতে চায়। সোজা বাংলা বললে, মোড়লগিরি করতেই তারা এসব প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আমি এটাকে অতোটা গুরুত্ব দিতে চাই না।’
তবে গুম-হত্যার ইস্যুটিকে ‘গুরুতর সমস্যা’ উল্লেখ করে ড. জিয়া আরো বলেন, ‘মূলত দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় রাজনৈতিক আগ্রাসনের মতো এসব ঘটনা ঘটে থাকে। যেটা ঘটছে সেটা নতুন না, আগের সরকারের আমলেও ছিল, এখনো আছে, সংখ্যার হিসেবে কম আর বেশি।’
সমস্যাটি সমাধানে এই অপরাধবিজ্ঞানী আরো বলেন, ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। এসব বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে হবে। স্বজনহারাদের কষ্ট আমরা সবাই বুঝি, যারা হারিয়েছেন তাদের সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করে কাউকে দোষ দিয়ে লাভ হবে না। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, পরিবর্তনটা তাদেরই করতে হবে।’

Disconnect