ফনেটিক ইউনিজয়
মৈনট ঘাটে মৃত্যুঝুঁকি
জাহিদুর রহমান

দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি, ছোট-বড় ঢেউ, সঙ্গে মৃদুমন্দ বাতাস। দেখে খটকা লাগতেই পারে কোনো সাগরপাড়ের দৃশ্য কিনা। ঢাকার অদূরে দোহারের মৈনট ঘাটে এমন রূপেই ধরা দেয় খরস্রোতা পদ্মা। নদীর এপারে দোহার, ওপারে ফরিদপুর। আর এ দুই জায়গার মানুষের যোগাযোগ ঘটতো মৈনট ঘাটেই। দোহার উপজেলার কার্তিকপুর বাজার থেকে যে সড়কটি পদ্মা নদীর পাড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে, তার নাম ‘মৈনট ঘাট’।
এতোদিন অনেকটা আড়ালে থাকলেও ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনট ঘাট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সম্প্রতি জায়গাটি পরিচিতি পেয়েছে ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ হিসেবে। হয়ে উঠেছে রাজধানীসহ আশপাশের মানুষের অবসর কেন্দ্রে। এরই মাঝে যা পরিচিতি পেয়েছে ‘মিনি কক্সবাজার’ হিসেবে, হয়ে উঠেছে ঘোরাঘুরির নতুন একটি গন্তব্য।
প্রতিদিন প্রায় চার-পাঁচ হাজার মানুষ ভিড় জমান পদ্মাপাড়ে। কিন্তু খরস্রোতা পদ্মার ক্রমাগত ভাঙন আর দর্শনার্থীদের অসতর্কতা ঝুঁকিতে ফেলছে নদীতে নামা মানুষদের। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নয় মাসে মৈনট ঘাটে পানিতে নেমে মারা গেছেন অন্তত দশজন, যাদের তিনজনই মারা যান এবারের ঈদুল ফিতরের পরদিন। কর্তৃপক্ষ বলছে, চেষ্টা সত্বেও কমানো যাচ্ছে না মৃত্যুঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মার ভাঙন ঠেকানো গেলেই মিলতে পারে এর সমাধান। নদীশাসন করে স্থানটিকে নিরাপদ করা বেশ জটিল। তাই বিকল্প উপায়ে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরামর্শ তাদের। দর্শনার্থীরা বলছেন, পরিকল্পিত উন্নয়ন ঘটাতে পারলে, মৈনট ঘাট হয়ে উঠতে পারে সব বয়সী পর্যটকের পছন্দের গন্তব্য।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর মৈনট ঘাটে বেড়াতে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ১৪ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পদ্মায় গোসল করতে নেমে মৃত্যু হয় আবরার তাজোয়ার, নির্ঝর ও আহমেদ হাসানের। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি মৈনট ঘাটের পদ্মা নদীর মধ্যবর্তী চরে ফুটবল খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় মিজানুর রহমান মিন্টু ও শাওন সরকারের। তারা রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষার্থী ছিলেন। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর মৈনট ঘাটের পদ্মায় গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হন মিরাজ (১৮) ও তালহা (১৮) নামের দুই মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। দুদিন পর তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ ঈদের পরদিন ২৭ জুন মৈনটের পদ্মায় গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হন ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএর ছাত্র ইসতিয়াক আহমেদ মাহিন (২২), মিরপুর কমার্স কলেজের শিক্ষার্থী সুপ্রিয় ঢালী (১৯) ও মিরপুর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সালমান বিন জামাল (১৯)। পরদিন সকাল ১০টায় মাহিনের লাশ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। এখনও হদিস মেলেনি দুই শিক্ষার্থীর।
মৈনট ঘাট এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘাটের ইজারাদার চৌকির সামনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বসাধারণের জন্য জরুরি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তির ব্যানার টানানো রয়েছে। পদ্মায় বেড়াতে আসা দর্শনার্থী ও ভ্রমণপিপাসুদের পদ্মায় নামতে দিচ্ছে না পুলিশ।
রাজধানীর ধানমণ্ডি থেকে আসা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনিক ইসলাম বলেন, “আমরা চার বন্ধু ‘মিনি কক্সবাজার’ বলে খ্যাত এই মৈনট ঘাট এলাকায় বেড়াতে এসেছি। ভেবেছিলাম নদীর টলমলে স্বচ্ছ পানিতে গোসল করব। কিন্তু সেই উপায় নাই। পুলিশ নদীতে নামতে দিচ্ছে না।”
দোহার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাভেদ পারভেজ বলেন, ‘সাঁতার না জেনে নদীতে নামা উচিত নয়। সাঁতার না জানার কারণে এসব শিক্ষার্থী পদ্মায় ডুবে মারা গেছেন। এ ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধে এই ঘাটে গোসল ও নদীতে নামা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’
এ সম্পর্কে দোহার থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘ঈদের দিন ও পরের দিন মৈনট ঘাট এলাকায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ ঘুরতে এসেছিলেন। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে না পেরে আমরা সারাদিন মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক করেছি, যাতে কেউ পদ্মায় গোসল করতে না নামেন। কিন্তু অনেকেই আমাদের কথা না মেনে পদ্মায় নামেন। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে।’
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাব-লেফটেন্যান্ট তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে অসচেতনতার কারণে। ঢাকা থেকে যারা এখানে ঘুরতে আসেন, তারা ভাবে পদ্মা নদী ও সাগর একই রকম। আসলে দুটির রূপ ভিন্ন। পদ্মায় প্রবল স্রোত থাকে। বর্ষায় স্রোতের তীব্রতা বাড়ে। পদ্মার গভীরতা একেক স্থানে একেক রকম। নদীর যেখানে পানি কম ভেবে দর্শনার্থীরা নামেন, তার এক ফুট দূরে গভীরতা অনেক বেশি। ভাঙনের কারণে রয়েছে বড় বড় গর্ত ও ঘূর্ণন স্রোত। পা ফসকে সেখানে পড়ে গেলেই ভয়ের কারণে মৃত্যু হয় অনেকের। আর সাঁতার না জেনে নদীতে না নামার বিষয়টি তো রয়েছেই।’
নদী বিশেষজ্ঞ ড. ইনামুল হক বলেন, ‘সাঁতার কাটার জন্য নদী ভাঙনের জায়গায় পাথর কিংবা কংক্রিটের বস্তা বেঁধে দেয়া উচিত নয়। কারণ নদীর নিয়মই হলো খরস্রোতা। সে তার আপন গতিতে চলবে। যেখানে সে বাধা পাবে সেখানেই সে গভীর গর্ত করবে।’
পর্যটন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘নদীকে কেন্দ্র করে কোনো পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে প্রয়োজন বিশেষ সতর্কতা ও পরিকল্পনা। এখানকার পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে তা হবে রাজস্ব আয়ের নতুন একটি খাত। সেই সঙ্গে তা ইতিবাচক পবিবর্তন আনতে পারে স্থানীয় অর্থনীতিতেও।’

Disconnect